জীবনবেদ ২

-ড. এমদাদুল হক

১৫৩
মানুষের ধর্ম হলো মনুষ্যত্ব। আর মনুষ্যত্বের অলংকার হলো বিনয়। সত্য যেমন মুখস্থ করা যায় না তেমনি বিনয় কর্ষণ করা যায় না। বিনয় হলো আত্মার সৌন্দর্য। বিনয়ে সৌন্দর্য আছে বলেই বিনয়ীকে সবাই ভালোবাসে।

দৈহিক সাজসজ্জায় বিনয়ের সৌন্দর্য প্রকাশ করা যায় না। তাই বিনয় সবাই বুঝতেও পারে না। বিনয়ের সৌন্দর্য বুঝতে পারেন কেবল আত্মার শিল্পীরা। ছবি আঁকলেই শিল্পী হওয়া যায় না। শিল্পী হতে হলে অদৃশ্য সৌন্দর্য দেখার সামর্থ্য থাকতে হয়।

প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে দৃশ্যের আড়ালে- বিনয় লুকিয়ে থাকে আচরণের আড়ালে। আসল কথা লুকিয়ে থাকে শব্দের আড়ালে। ‘বিনয়’ শব্দের আড়ালে রয়েছে ‘বিশেষ নয়ন’। মনের নয়ন। মন যদি নিষ্পাপ হয়, তবেই মনের নয়ন লাভ করে স্বচ্ছ দৃষ্টি।

স্বচ্ছ দৃষ্টি ছাড়া কর্ষিত বিনয় হলো তোষামোদ, যা অহং এর কার্য। তোষামোদ অতি কদর্য। যারা হীনম্মন্যতা ও আত্মার দারিদ্র্যে ভোগে তারাই তোষামোদ করে।

যার বিনয় আছে সে বিনীত। বিনীত শব্দের প্রচলিত অর্থ সুশিক্ষিত, সংযত, শান্ত, নিষ্পাপ, ভদ্র, নম্র, সংস্কৃতিবান। সুশিক্ষিত ব্যক্তি যেমন নিজেকে সুশিক্ষিত ঘোষণা করতে পারে না, তেমনি বিনীত ব্যক্তি ঘোষণা করতে পারে না, ‘আমি বিনীত‘। নিজের ঢোল নিজে পেটানো বিনয় নয়- ঔদ্ধত্য অহং।

বিনীত ও বিনত শব্দ দুটি শুনতে প্রায় একরকম। কিন্তু তাৎপর্য এক নয়। বিনত শব্দটির মূলে ‘বিশেষ নয়ন’ নেই- আছে নম্। নম্ অর্থ, নত। বিনত বলার মাধ্যমে স্বীকার করা হয় যে, কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের প্রতি মান্যতা আছে। নতি স্বীকার করতে অহঙ্কারে লাগে। সম্ভবত, এ কারণেই বিনত শব্দটির স্থলে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে বিনীত শব্দটি।

পুনশ্চ, – মুসলিম শব্দের অর্থ কি?

– বিনীত।

গ্যাটে বলেছিলেন, জন্মগতভাবে প্রত্যেকেই মুসলিম অর্থাৎ, বিনীত, শান্ত, নিষ্পাপ।

জিদ্দু কৃষ্ণমূর্তিকে এক ভক্ত জিজ্ঞেস করেছিলেন- ‘বিনয় কী’? হাসতে হাসতে তিনি বলেছিলেন- ‘যাহা এদেশে নেই’।

১৬৬
চারপাশে ভোগের সুনিপুণ আয়োজন। ভোগের পৃথিবীতে মানুষের চিন্তার বিস্তার ২ইঞ্চি থেকে সাড়ে তিন হাত। মানুষ কাকে বলে? কে যেন বলেছিল- ‘মানুষ হলো পাখাহীন, দ্বিপদ, বুদ্ধিমান জন্তু’।

কয়দিনের জীবন। এই আছে এই নাই। সুতরাং উদর উপস্থ নিয়ে থাক। টাকা বানাও। টাকা উড়াও। ভেসে যাও। ভাসিয়ে দাও। তবেই না তুমি বুদ্ধিমান জন্তু! ইন্টেলিজেন্ট এনিম্যাল!

ভোগের পৃথিবীতে নীতি অচল। প্রেম ব্যর্থ। ধর্ম সান্ত্বনা। টাকা বানানোর তালে নাই তো অস্তিত্বই প্রশ্নবিদ্ধ। পরিবারে দাম নাই। সমাজে গুরুত্ব নাই।

বস্তুতন্ত্র মগজে ফিট করে দিয়েছে চাহিদা চিপ; মনে ভরে দিয়েছে মুদ্রামোহ।

পালাবি কোথায়?

ন্যায়, সত্য, প্রেম, জ্ঞান দিয়ে কী হবে? এইগুলো খায়, না পরে?

লাভ কী?

বুঝানো যায় না। যে বুঝতে পারে, তার নবজন্ম হয়। পাল্টে যায় জীবনের চিত্র। যে বেশি খেতে পছন্দ করতো তার খাদ্যে অরুচি আসে। যে বেশি কথা বলতো, সে চুপ হয়ে যায়। যে সারাদিন ঘুমাতো, তার ঘুম আসে না। যে টাকা ধরতো, সে টাকা ছাড়ে। অন্যরকম আনন্দ তাকে ঘিরে রাখে।

‘আনন্দ? এটি আবার কী বস্তু? কী লাভ?

দেবর্ষি নারদ কাঠুরিয়াকে বললেন, ‘আমি তোমাকে স্বর্গে নিয়ে যেতে পারি, এখনই। তবে শর্ত হলো, প্রশ্ন করতে পারবে না; প্রশ্ন করলেই স্বর্গ থেকে টাটা বাইবাই। কাঠুরিয়া রাজি। দেবর্ষি মুহূর্তেই তাঁকে নিয়ে গেলেন স্বর্গে। কয়েকদিন বেশ ভালোই কাটলো। হুর গেলমান শরাব কার না ভালো লাগে?

অতঃপর একদিন কাঠুরিয়া দেখলো, নন্দনকাননের মালীরা পারিজাত বৃক্ষের মরা ডালগুলো রেখে, কচি ডালগুলো কাটছে। এই অনাচার কি সহ্য করা যায়? মানুষ বলে কথা! শর্ত ভুলে গেলো কাঠুরিয়া। প্রশ্ন করে বসলো- ‘কাটতে হয় মরা ডাল কাটো, কচি ডাল কাটছো কেন?

সুতরাং প্যারাডাইস লস্ট।

আনন্দ শুরু তো প্রশ্ন উধাও।

অথবা, প্রশ্ন উধাও তো আনন্দ শুরু।

১৬৭
“এমন মানসজমিন রইল পতিত আবাদ করলে ফলতো সোনা।”

জমিন আবার পতিত থাকে নাকি? গাছ না লাগালে আগাছায় ভরে যায়।

ঘর তো আর খালি থাকে না- মানুষ না থাকলে ইঁদুর থাকে। তেলাপোকা, মাকড়সা, চামচিকা, সাপ বাসা বাঁধে।
মন আবার খালি থাকে নাকি? মনের কতো কাজ! আমেরিকার ট্রাম্প। চীনের অর্থনীতি। ভারতের মৌলবাদ। কোরিয়ার কিম জং। বাংলাদেশের গৌণতন্ত্র। নাটোরের বনলতা। শিক্ষামুক্ত রাজনীতি! পেঁয়াজের দাম। বুলবুলের আঘাত। ১২ই রবিউল আউয়াল, ৫৭০ খ্রিস্টাব্দ! আরো কতোকিছু নিয়ে যে ভাবতে হয়! ইয়ত্তা আছে?

কাজের চিন্তা কম। অকাজের চিন্তা বেশি।

চিন্তা করে যদি পেঁয়াজের দাম কমানোর একটি সূত্রও আবিষ্কার করা যেতো, তবে তা কাজের হতো। সমাধান নাই- তবু চিন্তা কি থামে?

ভালো হলেও চিন্তার শেষ নেই, মন্দ হলেও চিন্তার শেষ নেই। ভালো-মন্দ কিছুই যদি না হয়, তবেও কি চিন্তা থামে? শুরু হয় খোঁজাখুঁজি- হচ্ছে না কেন? ব্যাপারটি কি?

সবচেয়ে বড় অপচয় হলো চিন্তার অপচয়। সবচেয়ে বড় আসক্তি হলো চিন্তার আসক্তি। আসক্তি অকাজের প্রতিই বেশি হয়।

মানসজমিন উর্বর। বড়ই উর্বর। আবাদ করলে ফলতো সোনা। না করলে সাপের ফণা।

আবাদ ব্যাপারটি কি?

আবাদ হলো দেহের সঙ্গে মন।

মন যদি দেহের সঙ্গে থাকে, তবে যেখানে যাই সেখানেই সমাধি।

মন যদি দেহের সঙ্গে না থাকে, তবে পদ্মাসনেও মার।

দেহ যেখানে, মন সেখানে- শান্তি।

দেহ এখানে, মন ওখানে- অশান্তি।

১৬৮
প্রেমই ঈশ্বর। এই প্রেম কোন প্রেম? শাহজাহানের প্রেম?

আহারে! কত বড় প্রেমিকই না ছিলেন সম্রাট শাহজাহান। মমতাজ তাঁর কততম স্ত্রী? জানা নেই। তবে আগেও ছিল, পরেও ছিল। আর ছিল হেরেমে অপেক্ষমান হাজারো প্রেমিকার কলরব। প্রেমমন্ত্রকও ছিল নিশ্চয়!

সেই শাহজাহানই মমতাজের স্মৃতিতে একটি জঘন্য তাজমহল তৈরি করলেন। পাঞ্জাব থেকে আনলেন মার্বেল পাথর- শ্রীলংকা থেকে নীলমণি। ১০০০ হাতি খাটলো। ২০ হাজার শ্রমিক খাটলো, ২২ বছর। নির্মাণ শেষ হলো। প্রেমিক শাহজাহান কী পুরস্কার দিলেন শ্রমিকদের?

আঙুল কেটে দিলেন! কী নির্মম পরিহাস! কী ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা!! কী নির্দয় নৃশংসতা!!! অথচ তাকেই আমরা প্রেমিক বলছি! আর, তাজমহলকে বলছি প্রেমের নিদর্শন!

আরেকজনের বিবাহিতা স্ত্রী ছিল মমতাজ। স্বামীকে হত্যা করে পরস্ত্রী হরণ করেছিলেন শাহজাহান। এ যদি প্রেম হয়, লাম্পট্য কাকে বলে?

যে পৃথিবীতে লম্পটকে প্রেমিক বলা হয়, সে পৃথিবীতে প্রেম থাকে কোথায়? যে পৃথিবীতে তাজমহলকে ‘শ্বাশত প্রেমের অনন্য নিদর্শন’ বলা হয়, সে পৃথিবীতে ঈশ্বর থাকে কোথায়?

হেলেনের জন্য ট্রয়, পদ্মিনীর জন্য চিতোর ধ্বংস হয়েছিল।

জীবনের ধ্বংস প্রেম নয়। প্রেম হলো জীবনের লালন। লম্পটের লোলুপতা প্রেম নয়। প্রেম হলো ভক্তির ব্যাকুলতা। কাম হলো ধোঁয়া, প্রেম হলো অগ্নিশিখা, ভক্তি হলো উত্তাপ।

লম্পটের সুখ দেহভোগে।

প্রেমিকের সুখ উপাসনায়। উপাসনা হলো আসনের সন্নিকটে থাকা। কার আসন? ঈশ্বরের আসন। ঈশ্বর কে? ঈশ্বর হলো জীবনের সর্বোচ্চ আদর্শ। সকল করুণা ও পুণ্যের আধার।

প্রেমিকের একটিই কাজ- উপাসনা করা। অর্থাৎ, জীবনযাপনে সেই পরম আদর্শের লালন-পালন।

জীবনের সব পুরস্কার ও তিরস্কার, সব চাওয়া ও পাওয়া, প্রাণের সব ব্যাকুলতা যদি সেই সর্বোচ্চ আদর্শ ঘিরে সর্বদা বর্তিত হয়, তবেই ঈশ্বর হয় প্রেম; আর, প্রেম হয় ঈশ্বর।

১৬৯
গতকাল এক আলাপনে বলছিলাম- ‘মানুষের চরিত্র স্থায়ী কিছু না। চরিত্র বদলানো সম্ভব’। আমার কথা শেষ না হতেই উপস্থিত মোল্লা সাহেব একটি হাদিস ছুঁড়ে দিলেন, হাম্বলী মাযহাবের ইমাম আহমাদ সাহেবের হাদিস- “তোমরা যদি শোনো যে, কোনো পাহাড় নিজের জায়গা থেকে সরে গেছে তাতে বিশ্বাস করতে পারো। কিন্তু যদি শোনো যে, কোনো মানুষের চরিত্রের পরিবর্তন ঘটেছে তাতে বিশ্বাস করবে না। কেননা মানুষ তাই করে, যা করার জন্য তার সৃষ্টি হয়েছে।”

হাদিসটি আগেও বহুবার শুনেছি। এবার মাথা ঘুরে গেলো। আমিও তা-ই বলতে শুরু করলাম, যা বলার জন্য আমার সৃষ্টি হয়েছে:

এর অর্থ কি? সে ভুল করেছে, আজীবন ভুল করতেই থাকবে? ভুল করার জন্যই যদি কারো সৃষ্টি হয়ে থাকে, তবে ভুলের শাস্তি থাকবে কেন? চরিত্র পরিবর্তন করা যদি অসম্ভবই হবে, তবে নবি-রসুল প্রেরণের উদ্দেশ্য কি?

শুনেছি- দস্যু অঙ্গুলিমাল ৯৯টি খুন করেও নিজেকে পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। দস্যু বাল্মিকি রচনা করেছিলেন ‘রামায়ণ‘। আমাদের হাসন রাজাও নাকি যৌবনে ছিলেন ভোগবিলাসে মত্ত, রমণী সম্ভোগে অক্লান্ত।

‘নিজাম নামে বাটপার সেতো,
পাপেতে ডুবিয়া রইত
তার মনে সুমতি দিলে,
কুমতি তার গেল চলে।’

তার মানে চরিত্রের পরিবর্তন সম্ভব।

চরিত্র কি? কিছু অভ্যাসের সমষ্টি।

অভ্যাস পরিবর্তন করা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব না। অভ্যাস নিয়তি নির্ধারিত নয়, বরং অভ্যাসই গড়ে তুলে নিয়তি। মানুষকে অভ্যাসের দাস রূপে সৃজন করা হয়নি। অভ্যাস গড়ে উঠে জীবনযাপনের মাধ্যমে এবং অভ্যাস পরিবর্তন করতে প্রত্যেকেই সক্ষম।

নবি মোহাম্মদ সা-এঁর সাহচর্যে অসংখ্য মানুষের অভ্যাস ও চরিত্র বদলে গিয়েছিল। এবং পৃথিবীতে তাঁর আগমনের উদ্দেশ্যই ছিল মানুষকে বদলে দেওয়া।

সুতরাং নবী (সা)-এঁর নামে বহুল প্রচারিত উক্ত উদ্ধৃতিটি পরিত্যাজ্য। এধরনের ভিত্তিহীন কথা আত্মবিকাশ, চরিত্র গঠন ও পবিত্রতা অর্জনের অন্তরায়।

(চলবে…)

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!