স্বামী প্রণবানন্দ

দুই দেহধারী সাধু

-প্রণয় সেন

পিতাকে একদিন জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আচ্ছা বাবা! আমি যদি বিনা জোরজবরদস্তিতে বাড়ি ফেরার কথা দেই তাহলে কি একবার কাশী বেড়িয়ে আসতে পারি?’ পিতা অবশ্য আমার দেশভ্রমণের আকাঙ্ক্ষাকে কখনো বাঁধা দিতেন না। ছোটবেলা থেকেই তিনি আমায় নানা শহর, তীর্থস্থান প্রভৃতি বেড়াতে যাওয়ার অনুমতি দিতেন। প্রায়ই দু’চারজন বন্ধুও আমার সঙ্গে যেত। পিতারই দেওয়া প্রথম শ্রেণীর রেল পাসে আমরা আরামে বেড়াতাম। পিতা রেলের একজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী হওয়াতে আমাদের পরিবারের ভ্রমণবিলাসীদের খুবই সুবিধা হয়েছিল। পিতা আমার অনুরোধ যথোচিত বিবেচনা করে দেখবেন বলে অঙ্গীকার করলেন। তার পরদিন তিনি আমাকে ডেকে বেরিলী থেকে কাশী যাতায়াতের একখানি পাস, কিছু টাকা আর দু’খানি চিঠি দিয়ে বললেন, ‘কাশীতে গিয়ে আমার বন্ধু কেদারনাথবাবুকে একটি কাজের কথা বলতে হবে। দুর্ভাগ্যক্রমে আমি তাঁর ঠিকানাটা হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু আমার মনে হয়, আমাদের দু’জনেরই বন্ধু স্বামী প্রণবানন্দের মারফতে তুমি এই চিঠিখানা তাঁর কাছে পৌঁছে দিতে পারবে। স্বামীজী আমার গুরুভাই, খুব উচ্চকোটির আধ্যাত্মিক অবস্থা লাভ করেছেন। তাঁর সঙ্গলাভ করে তোমার উপকারই হবে। আর এই দ্বিতীয় চিঠিখানি হচ্ছে তোমার পরিচয়পত্র।’ তারপর পিতা একটু হাসি হাসি চোখে বললেন, ‘কিন্তু মনে থাকে যেন, বাড়ি থেকে তোমার আর পালানো চলবে না, বুঝলে?’

দ্বাদশ বৎসর বয়সের প্রবল উৎসাহ নিয়ে আমি বেরিয়ে পড়লাম (যদিও কোনোকালে আমার নতুন দৃশ্য, নতুন মুখ দেখবার আনন্দ ও উৎসাহ কিছুমাত্র হ্রাস পায নি)। বেনারসে পৌঁছেই আমি স্বামীজীর বাড়ির দিকে অগ্রসর হলাম। সামনের দরজা খোলাই ছিল; সেখান দিয়ে তেতলার একটি লম্বা হলঘরের মত ঘরে গিয়ে প্রবেশ করলাম। দেখলাম, কিঞ্চিৎ স্থূলকায়, কটিবাসপরিহিত স্বামীজী ঈষদুচ্চ এক চৌকির উপর পদ্মাসনে উপবিষ্ট। তাঁর মস্তক আর বলিরেখাহীন মুখমণ্ডল পরিষ্কারভাবে কামানো। দিব্য হাসি তাঁর ওষ্ঠপ্রান্তে খেলা করছে। আমার অনধিকার প্রবেশের সঙ্কোচ দূর করবার জন্য তিনি চিরপরিচিতের মত আমায় সাদর অভ্যর্থনা করে বললেন, ‘বাবা! আনন্দ।’ শিশুসুলভ স্বরে তাঁর আন্তরিক স্নেহসম্ভাষণ।

নতজানু হয়ে তাঁর পাদস্পর্শ করে প্রণামান্তে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনিই কি স্বামী প্রণবানন্দজী?’ তিনি মাথা নেড়ে বললেন, ‘হ্যাঁ।’ তারপর পকেট থেকে পিতার চিঠিখানি বার করবার পূর্বেই তিনি বললেন, ‘তুমি তো ভগবতীবাবুর ছেলে?’ অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে তাঁকে আমার পরিচয়পত্রটি দিলাম, যদিও তা তখন একেবারে নিরর্থক বলে বোধ হল। স্বামীজী তাঁর অতীন্দ্রিয় দর্শনশক্তির সাহায্যে আমাকে পুনরায় আশ্চর্যান্বিত করে বললেন, ‘দাঁড়াও! কেদারনাথবাবুকে তোমার জন্য খুঁজে বার করছি।’ তারপর চিঠিখানার দিকে একটিবারমাত্র দৃষ্টিপাত করে পিতার বিষয় কয়েকবার প্রীতিভরে উল্লেখ করে বললেন, ‘জানো, এখন আমি দু’টি পেনসন ভোগ করছি। একটি তোমার বাবার সুপারিশে, যাঁর জন্য এককালে আমি রেল অফিসে চাকরি পেয়েছিলেন; আর একটি বিশ্বেশ্বরের কৃপায়, যাঁর জন্য আমি সচেতনে এই পার্থিব জীবনের কর্তব্যসকল ঠিকভাবে শেষ করতে পেরেছি।’ আমার কাছে তাঁর এ উক্তি অত্যন্ত দুর্বোধ্য ঠেকল। জিজ্ঞাস করলাম, ‘আজ্ঞে! কি রকম পেনসন আপনি বিশ্বেশ্বরের কাছ থেকে পেয়ে থাকেন? তিনি কি আপনার কোলে টাকার তোড়া ফেলে দেন?’

শুনে তিনি হেসে উঠে বললেন, ‘আমার  পেনসন সুগভীর শান্তি। আমার বহুবছরের গভীর ধ্যানসাধনার পুরস্কার। এখন আমার অর্থের প্রতি আর কোনো লালসা নেই। আমার সাংসারিক প্রয়োজন অতি অল্পই, তা পর্যাপ্তভাবেই মিটে যায়। এখন নয়, পরে তুমি দ্বিতীয় পেনসেনের মানে বুঝতে পারবে।’ হঠাৎ কথাবার্তা বন্ধ করে দিয়ে স্বামীজী গম্ভীর ও নিস্পন্দ হয়ে পরলেন। একটা গূঢ় রহস্যময়ভাব যেন তাঁকে ঘিরে ধরলো। প্রথমে তাঁর চোখ দু’টি অত্যন্ত উজ্জ্বল হয়ে উঠল, যেন দূরে আগ্রহোদ্দীপক কোনো কিছু দেখছেন। তাঁরপরেই তা নিষ্প্রভ হয়ে পরলেন। আমি তাঁর বাকস্বল্পতাতে একটু যেন অপ্রতিভ হয়ে পড়লাম। এখন পর্যন্ত তিনি কিন্তু আমায় এমন কিছুই বলেননি, যাতে করে পিতার বন্ধুর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হতে পারে। ঈষৎ চঞ্চল হয়ে আমি ঐ ঘরের চারিদিকে চেয়ে দেখলাম, ঘরে আমরা দু’জন ছাড়া আর কেউ নেই। আমার অলস দৃষ্টি তক্তপোষের নিচে তাঁর খড়ম জোড়ার উপর গিয়ে নিবদ্ধ হল। বললেন, ‘ছোটো মহাশয়! কিচ্ছু ভেবো না। তুমি যাকে দেখতে চাও, তিনি আধঘণ্টার মধ্যেই তোমার কাছে এসে হাজির হবেন।’

যোগীবর আমার মনের কথা সব যেন পড়ে নিচ্ছিলেন, যদিও তা সে সময় বিশেষ কিছু কঠিন ছিল না। আবার তিনি এক দুর্জ্ঞেয় নীরবতার মধ্যে মগ্ন হয়ে গেলেন। ঘড়িতে দেখলাম তখন আধ ঘণ্টাটাক মাত্র কেটেছে। স্বামীজী জেগে উঠে বললেন, ‘কেদারনাথবাবু বুঝি দরজার কাছে এলেন!’ সিঁড়ি দিয়ে কেউ যেন উপরে উঠে আসছে শুনতে পেলাম। একটা অদ্ভুত অবিশ্বাসের ভাব হঠাৎ মনের মধ্যে উদিত হল। বিক্ষিপ্ত চিন্তাসকল মনের মধ্যে বিশৃঙ্খলভাবে ধাবিত হতে লাগল। ভাবলাম, ‘লোক না পাঠিয়ে পিতার বন্ধুকে এখানে কেমন করে ডেকে আনা সম্ভব হল?’ আমার আসার পর স্বামীজী তো আমি ছাড়া আর কাউকে কোন কথাই বলেন নি। কিছু না বলে সেই ঘর ছেড়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলাম। মাঝপথে এক ক্ষীণদেহ গৌরবর্ণ মধ্যমাকৃতি ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হল। দেখে বোধ হলো অতি দ্রুতবেগেই তিনি আসছেন।

‘আপনি কি কেদারনাথবাবু?’ উত্তেজনায় আমার স্বর তখন কাঁপছে। তিনি সস্নেহে হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ। তুমিই বুঝি ভগবতীবাবুর ছেলে, আমার সঙ্গে দেখা করবার জন্যে এখানে অপেক্ষা করছ?’


প্রণবানন্দজী বললেন, ‘ভগবতীবাবুর ছেলে তোমার জন্যে আমার ঘরে অপেক্ষা করছে। সঙ্গে আসবে না কি?’ আমি সানন্দে রাজী হলাম। হাত ধরাধরি করে চলেছি; খড়মপায়েই কিন্তু স্বামীজী আমায় অবাক করে এগিয়ে চললেন, যদিও পায়ে আমার তখন এই মজবুত জুতোজোড়াটা পরা।’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ; কিন্তু মশায়, আপনি এখানে এলেন কি করে?’ তাঁর রহস্যময় উপস্থিতিতে আমি একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিলাম। তিনি তখন বলতে লাগলেন, ‘আজ দেখছি যা ঘটছে সবই অদ্ভুত! ঘণ্টাখানেকও হয়নি, গঙ্গায় সবেমাত্র স্নানটি সেরে উঠেছি, এমন সময় স্বামী প্রণবানন্দজী আমার কাছে গিয়ে উপস্থিত! আমি তো কল্পনাই করতে পারিনি, আমি যে তখন সেখানে থাকবো, তা তিনি জানলেন কেমন করে? প্রণবানন্দজী বললেন, ‘ভগবতীবাবুর ছেলে তোমার জন্যে আমার ঘরে অপেক্ষা করছে। সঙ্গে আসবে না কি?’ আমি সানন্দে রাজী হলাম। হাত ধরাধরি করে চলেছি; খড়মপায়েই কিন্তু স্বামীজী আমায় অবাক করে এগিয়ে চললেন, যদিও পায়ে আমার তখন এই মজবুত জুতোজোড়াটা পরা।’

প্রণবানন্দজী হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমার ওখানে পৌঁছতে তোমার কতক্ষণ লাগবে?’

‘প্রায় আধঘণ্টা।’

‘আমার এখন একটু কাজ আছে’ বলে তিনি একটি রহস্যময় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, ‘তোমায় ফেলেই আমায় এখন এগোতে হবে। তুমি আমার বাড়িতে এসো, সেখানে ভগবতীবাবুর ছেলে আর আমি তোমার জন্যে অপেক্ষা করবো।’

আমি কোন আপত্তি তোলবার আগেই তিনি তাড়াতাড়ি আমাকে ছাড়িয়ে গিয়ে ভিড়ের মধ্যে একেবারে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আমি তারপর এখানে যত শীগির সম্ভব চলে এসেছি। এই কৈফিয়তে আমি তো আরও হতবুদ্ধি হয়ে গেলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি স্বামীজীকে কতদিন ধরে জানেন। বললেন, ‘গেল বছর বারকতক দেখা হয়েছিল মাত্র। সম্প্রতি নয়। যাইহোক, স্নানের ঘাটে তাঁকে আজ আবার দেখতে পেয়ে ভারি আনন্দ হলো।’

শুনে বললাম, ‘আমি তো নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছি না। আমার কি মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে? আপনি কি তাঁকে স্বপ্নে দেখেছিলেন, না কি সত্যি সত্যিই তাঁকে চাক্ষুষ করেছিলেন, তাঁর হাত ধরে ছিলেন বা পায়ের শব্দ শুনতে পেয়েছিলেন?’ তিনি এবার রেগে উঠে বললেন, ‘তুমি কি বলতে চাইছ, তা বুঝতে পারছিনা! তোমার কাছে মিথ্যা বলছি না, তা জেনো। আর এও কি তুমি বুঝতে পারছ না যে, একমাত্র স্বামীজী মারফৎ না হলে আমি কি কখনো জানতে পারতাম যে তুমি আমার জন্যে এখানে অপেক্ষা করছ?’

‘কি আশ্চর্য! উনি, মানে স্বামী প্রণবানন্দজী কিন্তু আমার এখানে ঘণ্টাখানেক আগে আসার পর থেকে এক মুহূর্তের জন্যও কোথাও নড়েননি বা আমার চোখের আড়ালও হননি।’ বলে তো আমি সব ব্যাপারটা এবং স্বামীজীর সঙ্গে আমার যাবতীয় কথাবার্তা তাঁকে জানালাম। তিনি চক্ষু বিস্ফারিত করে বললেন, ‘এ্যাঁ, আমরা কি এই মর্ত্যে বাস করছি, না স্বপ্ন দেখছি? জীবনে এমন অলৌকিক ঘটনা দেখব বলে তো কখনো কল্পনাই করিনি। ভেবেছিলাম স্বামীজী নিতান্তই একজন সাধারণ গোছের মানুষ মাত্র! এখন দেখতে পাচ্ছি যে, তিনি অন্য একটি স্বতন্ত্র দেহ ধারণ করতে আর তা দিয়ে কাজও করতে পারেন।’

দু’জনে আমরা স্বামীজীর ঘরে প্রবেশ করলাম। কেদারনাথবাবু তক্তপোষের তলায় খড়ম জোড়াটির দিকে আঙ্গুলি নির্দেশ করলেন। তারপর ফিসফিস করে বললেন, ‘দেখ! দেখ! ঐ খড়মজোড়াটাই পরে তিনি ঘাটে গিয়েছিলেন। আর এখন ওঁকে যেমন দেখছি, ঠিক অমনিই একটা কৌপীন তাঁর পরা ছিল।’ কেদারনাথবাবু তাঁর সামনে এসে প্রণাম করতেই তিনি একটু হেঁয়ালির হাসি হেসে আমায় বললেন, ‘তোমাদের এতে অবাক হয়ে যাবার কি আছে, বল তো? সত্যিকারের যোগীদের কাছে প্রত্যক্ষ আর অপ্রত্যক্ষ জগতের মধ্যে সূক্ষ্ম ঐক্যের সম্বন্ধ কিছুমাত্র লুকানো থাকে না। আমি এখান থেকে মুহূর্তমধ্যে সুদূর কলকাতায় গিয়ে আমার শিষ্যদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করে কথাবার্তা বলে আসতে পারি, আর তারাও তেমনি একইভাবে সবরকম জড়বাঁধা অতিক্রম করতে পারে।’

সম্ভবতঃ স্বামীজী আমার নবীন হৃদয়ে আধ্যাত্মিক উদ্দীপনা জাগিয়ে তোলবার জন্যেই তাঁর যোগবলে দূরদর্শন আর দূরশ্রবণের শক্তির বিষয় অনুগ্রহ করে প্রবেশ করলে বলেছিলেন। কিন্তু উৎসাহবোধের পরিবর্তে আমার ভক্তির সঙ্গে ভয়েরও সঞ্চার হল। যেহেতু আমার ভাগ্যে লেখা ছিল যে, আমার ঈশ্বরলাভের সাধনায় সহায় হবেন এক বিশেষ গুরু, শ্রীযুক্তেশ্বর গিরিজী মহারাজ, যাঁর দর্শনলাভ আমার তখনো ঘটেনি, যেইহেতু প্রণবানন্দজীকে গুরুরূপে বরণ করতে আমার তখন মনে কোনরূপ ইচ্ছার উদয় হয়নি। আমি সন্দিগ্ধনয়নে তাঁর দিকে চেয়ে দেখতে লাগলাম আর ভাবলাম, সত্যিসত্যিই তিনি স্বয়ং নাকি তাঁর প্রতিরূপ আমার সামনে রয়েছে। স্বামীজি তাঁর মর্মস্পর্শী দৃষ্টিতে আমার দিকে দেখে আর তাঁর গুরুর বিষয়ে উদ্দীপনাময়ী বিবরণ দিয়ে আমার অস্বস্তি দূর করবার চেষ্টায় বললেন, ‘লাহিড়ী মহাশয়ের চেয়ে উত্তম যোগী আমি আর দেখিনি। তিনি নরদেহে দেবতা।’ ভাবলাম, শিষ্যই যদি ইচ্ছামাত্র একটি স্বতন্ত্র রক্তমাংসের দেহ ধারণ করতে পারেন, তবে তাঁর গুরুর কাছে অলৌকিক ব্যাপারে সত্যিই কি কোনো সীমা-পরিসীমা থাকতে পারে?

তিনি বলতে লাগলেন, ‘গুরুর কৃপা যে কি অমূল্য, তা আর তোমায় কি বলব। তাঁর অন্য একটি শিষ্যের সঙ্গে রোজ রাতে আমি ধ্যানে বসতাম। ধ্যান চলত আটঘণ্টা ধরে। দিনের বেলায় রেল অফিসে আমরা কাজ করতাম। কেরাণীর কাজে আমার অসুবিধা হয় দেখে আমি সব সময়টাই ভাগবচ্চিন্তায় অতিবাহিত করব বলে মনস্থ করলাম। আট বছর ধরে খুব অধ্যবসায়ের সঙ্গে অর্ধেক রাত পর্যন্ত ধ্যান করতাম। ফল পেলাম অদ্ভুত! বিরাট আধ্যাত্মিক অনুভূতিতে মন উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। তবু সেই অখণ্ড সচ্চিদানন্দ আর আমার মাঝখানে বরাবরই একটা ছোট্ট আড়াল রয়ে গেল। এমন কি অতিমানবিক চেষ্টার পরও দেখলাম যে, সাযুজ্যলাভ আর আমার অদৃষ্টে ঘটে উঠল না।

‘একদিন সন্ধ্যাবেলা লাহিড়ী ম’শায়ের সঙ্গে দেখা করে তাঁর দৈবীকৃপা প্রার্থনা করলাম। সনির্বন্ধ অনুরোধ আমার সারারাত ধরেই চলল। বললাম, গুরুদেবতা! ঈশ্বরলাভের আকাঙ্ক্ষায় মনের যন্ত্রণা এত বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, সেই প্রাণের ঠাকুরকে চোখের সামনে দেখতে না পেলে আমি আর বাঁচতে পারব না!’

বললেন, ‘তা আমি তার কি করব বল?  তুমি আরও একমনে ধ্যান কর।’ বললাম, ‘তোমার চরণে নিবেদন করছি, হে মহাগুরু ভগবান, তুমিই যে জড়দেহে আমার সামনে বর্তমান; এই আশীর্বাদ কর ঠাকুর, যেন তোমাকেই আমি তোমার অনাদি অনন্তরূপে দেখতে পাই।’

লাহিড়ী মহাশয় প্রসন্নভাবে অভয় হস্ত প্রসারিত করে বললেন, ‘যাও, এখন ধ্যান কর গিয়ে। তোমার কথা আমি ব্রহ্মের ( ব্রহ্ম: সংস্কৃত বৃহ ধাতু, অর্থ ব্যাপ্তি; ঈশ্বরের স্রষ্টা রূপ) কাছে জানিয়েছি।


মাসকতক পরে আমি লাহিড়ী মশায়ের কাছে গিয়ে তাঁর অপরিসীম কৃপার কথা স্মরণ করে ধন্যবাদ দিতে গিয়েছিলাম। সেই সময় তাঁর কাছে অন্য একটি ব্যাপারের উল্লেখ করতে হল। গুরুদেব! আমি যে আর অফিসের কাজকর্ম করতে পারছি না। দয়া করে আমায় রেহাই দিন। ব্রহ্মানন্দপানে মন সদাই বিভোর।’

‘অপরিমেয় উচ্চ ভাবানুভূতি নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। ধ্যানে বসে সেই রাত্রে আমি সারাজীবনব্যাপি সাধনার চরম সিদ্ধি লাভ করলাম। এখন আমি আধ্যাত্মিক সাধনার নিরবচ্ছিন্ন পেনসন ভোগ করছি। সেই থেকে পরমানন্দময় জগৎস্বামী আমার চোখের আড়ালে আর কোন মায়ার আবরণে লুকিয়ে রইলেন না। প্রণবানন্দজীর বদনমন্ডল স্বর্গীয় দীপ্তিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। এক ভিন্ন জগতের শান্তি আমার অন্তরে প্রবেশ করল। সব ভয় দূর হয়ে গেল। প্রণবানন্দজী আর একটি গোপন কথা ব্যক্ত করেছিলেন। সেটি হলো এই, মাসকতক পরে আমি লাহিড়ী মশায়ের কাছে গিয়ে তাঁর অপরিসীম কৃপার কথা স্মরণ করে ধন্যবাদ দিতে গিয়েছিলাম। সেই সময় তাঁর কাছে অন্য একটি ব্যাপারের উল্লেখ করতে হল। গুরুদেব! আমি যে আর অফিসের কাজকর্ম করতে পারছি না। দয়া করে আমায় রেহাই দিন। ব্রহ্মানন্দপানে মন সদাই বিভোর।’

‘তোমার অফিস থেকে  পেনসন নাও।’

‘এত অল্পদিনের চাকরী, কি কারণ দেখাব বলুন।’

‘যা মনে হয়, তাই বোলো।’

তার পরদিন একটি দরখাস্ত করে দিলাম। ডাক্তার আমার অসময়ে অবসর গ্রহণ করার কারণ জিজ্ঞাসা করাতে বললাম, ‘কাজ করতে করতে মেরুদন্ডের ভেতর দিয়ে কেমন যেন একটা প্রচন্ড টান উপর দিকে ঠেলে উঠছে বলে মনে হয়, আর সেটা সারাশরীরে ছড়িয়ে পরে আমায় একেবারে অকেজো করে দেয়।’*

‘আমায় আর দ্বিতীয় প্রশ্ন না করে ডাক্তার খুব ভালভাবে আমার জন্য পেনসনের সুপারিশ করে দিলেন। আর তা শীঘ্রই পেয়ে গেলাম। আমি জানতাম, লাহিড়ী মহাশয়ের দৈব ইচ্ছাই ডাক্তারের ভেতর আর তোমার পিতা প্রভৃতি উচ্চপদস্থ রেল কর্মচারীদের ভেতর দিয়ে কাজ করেছিল। তাঁরা সেই মহাগুরুর দৈবনির্দেশ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে পালন করে সেই প্রাণের ঠাকুরের সঙ্গে অখন্ড মিলনানন্দ সম্ভোগের মাধ্যমে আমার জীবনে মুক্তি এনে দিলেন।’

এই অপূর্ব তথ্য প্রকাশ করবার পর স্বামী প্রণবানন্দজী সুদীর্ঘকাল তুষ্ণীভাব অবলম্বন করে বসে রইলেন। ভক্তিভরে তাঁর পাদস্পর্শ করে প্রণামান্তে বিদায় নেবার সময় তিনি আশীর্বাদ করে বললেন, ‘তোমার জীবন ত্যাগ ও যোগমাগ অবলম্বন করার জন্য। তোমার বাবা আর তোমার সঙ্গে পরে আবার আমার দেখা হবে। অনেকদিন পরে তাঁর দুটি ভবিষ্যৎবাণীই সফল হয়েছিল। কেদারনাথবাবু সন্ধ্যায় ঘনায়মান অন্ধকারে আমার পাশে পাশে চলতে লাগলেন। পিতার পত্রখানি তাঁর হাতে দিতে, তিনি সেটি রাস্তার আলোয় পরে বললেন, ‘তোমার বাবা প্রস্তাব করে পাঠিয়েছেন যে, তাঁদের রেল কোম্পানীর কলকাতার অফিসে আমি একটি পদ গ্রহণ করি। স্বামী প্রণবানন্দজী যে সব  পেনসন ভোগ করছেন, তার মধ্যে অন্ততঃ একটা পেলেও তা কত না আরামের হত, বল ত! কিন্তু তা আর হবার নয়, সে অসম্ভব; আমি বেনারস ছেড়ে যেতে পারি না। হায় রে, আমার তো আর দুটো শরীর এখনো হয় নি।’

………………………………………………..
*গভীর ধ্যানে প্রথম ব্রহ্মানুভূতির আবির্ভাব হয় মেরুদন্ডের বেদীতে, তারপর হয় মস্তিষ্কের ভিতর। সে অতুলানন্দের বেগ দূর্নিবার; কিন্তু যোগী তার বহিঃপ্রকাশের সংযম শিক্ষা করেন। আমাদের সাক্ষাতের সময় প্রণবানন্দজী প্রকৃতই একজন পূর্ণজ্ঞানী সদ্ গুরু ছিলেন; কিন্তু তাঁর কর্মজীবনের অবসান বহুবছর পূর্বেই ঘটেছিল। তখনও তিনি ‘নির্বিকল্প সমাধি’তে সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পারেননি। পূর্ণজ্ঞানের সেই শুদ্ধ অবিচলিত অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত থেকে যোগী তাঁর যে কোন জাগতিক কর্তব্যপালনে কোনই অসুবিধা ভোগ করেন না। অবসর গ্রহণের পর প্রণবানন্দজী ‘প্রণবগীতা’ নামে শ্রীমদ্ভগবদ্ গীতার একখানি গভীর পাণ্ডিত্যপূর্ণ টীকা রচনা করেন। বাংলা ও হিন্দিতে প্রাপ্তব্য একাধিক শরীরে আবির্ভূত হওয়া একপ্রকার সিদ্ধি (যোগ শক্তি) যা পতঞ্জলির ‘যোগসূত্রে’ উল্লিখিত হয়েছে। উভয়ত্র আত্মপ্রকাশের ঘটনা যুগযুগান্তর ধরে বহু সাধুসন্তদের জীবনেই প্রদর্শিত হতে দেখা গিয়েছে।

সূত্র:
যোগী-কথামৃত (Autobiography of a Yogi)
**শ্রী শ্রী পরমহংস যোগানন্দ বিরচিত পূজনীয় ও পরমারাধ্য আমার গুরুদেব শ্রী শ্রী স্বামী শ্রীযুক্তেশ্বর গিরি মহারাজের শ্রীকরকমলে অর্পিত।
**মৎপ্রণীত ইংরাজী ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ্ এ যোগী’র বঙ্গানুবাদে শ্রীমান ইন্দ্রনাথ শেঠের স্বেচ্ছা প্রণোদিত প্রয়াস ও অক্লান্ত প্রচেষ্টার জন্য আমি তাকে ধন্যবাদ ও আশির্বাদ জানাই। -শ্রী শ্রীপরমহংস যোগানন্দ

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!