বিকৃত হচ্ছে লালনের বাণী?

বিকৃত হচ্ছে লালনের বাণী?

-ফকির সামসুল সাঁইজি

ভবঘুরে কথা : কি করে, কেমন করে বিকৃত হচ্ছে লালন সাঁইজির বাণী?

ফকির সামসুল সাঁইজি : এইটাতো আমাদের কাছে খুব একটা কষ্টকর বিষয়। যেমন আমার সাঁইজির কাছে অনেকে এসে বসতেন যে, লালন সাঁইজির আদি সুর কেমন ছিল? যেহেতু ‍শিল্পিরাতো বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে সংগীত পরিবেশন করেন; রংচং দিয়ে। আমার সাঁইজি একতারা দিয়ে লালন সাঁইজির সুরটা বেশ ইয়ে করলেন, রপ্ত করলেন। তো উনারা জিজ্ঞাস করছিলেন যে, আপনি সাঁইজির সুরটা কিভাবে পাইলেন?

সাঁইজির ভক্ত আমার গুরুর দাদা; দাদা গুরু। উনাদের মুখে বসে বসে, সাঁইজির কালামগুলো শুনে শুনে তুলে ফেলেন। ঐ সুরে আমার সাঁইজি গাইতেন। যার জন্য সাঁইজি খুব কষ্ট পেতেন বিকৃত এ সুরগুলো। তাতে আমি চেষ্টা করি, আমার সাঁইজির সুরে আমি আবার গেতে পারি।

তাহলে কিছুটা লালন সাঁইজির সুরটা হয়তো আমি ধারণ করতে পারবো। এটা আমাদের অনুভুতিকে, বাবা একটু কাতর করে, কাতর করে আমাদের অনুভুতিকে। সাঁইজির এ সুর, সাঁইজির শব্দগুলো-কথাগুলো যারা বিকৃত করে, একটা অক্ষর যদি রদবদল করা হয় তাহলে গোটা ঐ কালামটা অর্থই পরিবর্তন হয়ে যাবে। ঠিক আছে!

তাহলে কেন শব্দ পরিবর্তন শিল্পিরা করছে বা অনেক সাধুরা না জেনে, যেহেতু অধিকাংশ সাধুরা তো আমাদের মত অশিক্ষিতই। শব্দগুলোকে বিভিন্নভাবে তারা পরিবর্তন করে। তাতে সাঁইজির মান ক্ষুন্ন হচ্ছে। সাঁইজির মান ক্ষুন্ন হওয়া মানে জগতের মানুষের মূল কথাটা পাওয়ার ব্যঘাত ঘটছে বাবা।

যার জন্য এটা কোন ক্রমেই মনের কাছে মেনে নেওয়া যায় না। তবুও নিরুপায় হয়ে আমাদেরকে চলতে হয়, কয়জনকে আমরা এ ব্যপারে সর্তক করে দেবো বলো। তো চেষ্টা করি আমার অনুগত যারা; তাদেরকে সাঁইজির কালামের শব্দগুলো যতটুকু সম্ভব যেন সঠিক হয়। সেটাই বলার একটু চেষ্টা করি। এ আর কি।

ভবঘুরে কথা : আমরা যারা একেবারে বাইরে থেকে শুনি, প্রকৃত সাধকদের কাছে যাওয়াতো আমাদের পক্ষে ভাগ্যের ব্যাপার। তাহলে আমরা যারা বাইরে থেকে শুনে, আমরা তো প্রথমেই শুনি শিল্পির মুখের গান; সেখান থেকে আমরা শুদ্ধ ভাবটা বুঝবো কি করে, যে কোনটা আসলে সাঁইজির কালাম কোনটা কালাম না, বা শব্দের চয়ন যে কোনটা ভুল হচ্ছে?

ফকির সামসুল সাঁইজি: তোমরা ও ভাবে তো বুঝতে পারবে না। যেমন এই যে যারা সিডি বিক্রি করছে সাঁইজির ধামে। আমি বললাম যে, দেখেন যে পদগুলো আপনারা লিখে রাখছেন, যেটা সাঁইজির বাণী। কিন্তু এগুলোতো সাঁইজির বাণী না। এগুলোতো বিভিন্নজন রচনা করেছে।

অথচ সাঁইজির বাণী বলে আপনারা যে অবিহিত করছেন, এই যে সিডিতে তুলে রাখছেন, এটাতো বাবা ঠিক হচ্ছে না। তো উনারা বললেন, দেখেন সাঁইজি আমরা কি করবো? আমরাতো আর জানি না যে, সাঁইজির কালামটা কেমন! কোনটা সাঁইজির কালাম, এগুলা সবাই মনে করে যে, এগুলোই বুঝি সাঁইজির কালাম। যে না!! অধিকাংশটাই যে লালনের কথার বাইরে, লালনের গানের বাইরে, পদাবলীর বাইরে।

এখন এখানে করার কি আছে, আসলে ওরাও তো জানে না। এখন যতটুকু সম্ভব সাধকদের কাছ থেকে কারেকশন হতে হতে যতটুকু সম্ভব হয়। ততটুকু হয়তো শুদ্ধ করা যাচ্ছে। সে কেন বললেন, “বাড়ির কাছে আরশি নগর, সেথায় এক ঘর পড়শি বসত করে।” এ ঘরতো এখানে হবে না, তাহলে একটা ঘরে অনেকে বসবাস করে।

তো এখানে আমার সাঁইজি কারেকশন করে দিয়েছেন, সাধু গুরুদের মুখ থেকে নিয়ে, “বাড়ির কাছে আরশি নগর, সেথায় এক পড়শি বসত করে।” এক পরশি বসত করে, যেন ওখানে এক ঘর, ও ঘর শব্দটা ওখানে হবে না। গোটা পৃথিবীটা ঘর হয়ে গেছে।

এটাকে রদবদল করা এখন কত কষ্ট হচ্ছে এখন চিন্তা করো। এভাবে কয়টা শব্দ আমরা কারেকশন করবো। “বড় সংকটে পরিয়ে এবার” ফরিদা গেয়েছে সংকট বলে। গোটা পৃথিবী হয়ে আছে সংকট। কিন্তু সাঁইজি বলেছেন, “বড় তুফানে পরি এবার” তুফান হবে। ‘তুফান’ শব্দটাকে কয়জনের কাছে কারেকশন করা যাবে বলো।

ভবঘুরে কথা : হ্যাঁ, এটা কষ্ট হয়ে যাবে এখন।

ফকির সামসুল সাঁইজি: ঠিক না। সবাই তুফানের কাছে সংকট বলছে। এ রকম বিষয় আর কি। বহু শব্দ নড়চড় হয়ে গেছে। “ষোল কলায় পূর্ণ রতি” বলছে, ওখানে হবে পূর্ণ শশী। ষোলতে শশী, মানে চন্দ্র পূর্ণ হয়। তেমনি যাদের ঈমানটা সম্পূর্ণ শশীর ন্যায় হলো। তখন গুরু হৃদকমলে বসে মূল বাণীটা দেয়।

তা ওখানে বলছে তারা, “ষোল কলায় পূর্ণ রতি, হতে হবে ভাব প্রকৃতি, গুরু দিবে পূর্ণ রতি হৃদকমলে বসে”। আবার এখানে রতি, তবে রতি শব্দটা এখানে হবে। আর ঐ যায়গাটায় হবে, “ষোল কলায় পূর্ণ শশী, হতে হবে ভাব প্রকৃতি, গুরু দিবে পূর্ণ রতি হৃদমলে বসে”। এবার অর্থটা মিলবে।

তাহলে এ শব্দগুলো এভাবে কারেকশন না করা পর্যন্ত সাঁইজির মূল ভাবটা উদ্ধার হচ্ছে না। তাহলে শব্দ বিকৃত হওয়াতে কত ক্ষতি হচ্ছে এখন; বোঝা যাচ্ছে।

ভবঘুরে কথা : অর্থটা চেঞ্জ হয়ে গেলো।

ফকির সামসুল সাঁইজি: গোটা পদদেরই অর্থটা চেঞ্জ হয়ে গেলো।

ভবঘুরে কথা : তো কি মনে করেন, সাঁইজির বাণী করার আগে সাঁইজিকে বোঝাটা জরুরী?

ফকির সামসুল সাঁইজি: বোঝাটা জরুরী, না বুঝলে তো বাণীও বোঝা যাবে না। সাঁইজি কি বলতে চাচ্ছেন, কোথায় দাড়িঁয়ে একটা পদ রচনা করেছেন, ঐ জায়গাতে আগে নিজেকে দাড়াঁইতে হবে। অর্থাৎ বুঝতে হবে।

তবেই পদটা মূল্যায়ন হবে যে, হ্যাঁ; কেন রচনা করলেন, তাহলে, আমাকে এবং জগতকে কিভাবে সাঁইজি অবগত করলেন। তাহলে ঐ জায়গাতে না দাড়াঁলে কি হবে? তবে সেই জায়গাতে দাড়াঁতে হলে বাবা সাধনার প্রয়োজন। সাধনা ছাড়া মূল ভাব অর্থ কিন্তু উদ্ধার করা যাবে না।

সামসুল সাইজির সাথে আলোচনার ভিডিও দেখতে ক্লিক করুন…

……………………….
ফকির সামসুল সাঁইজি, সাঁইনগর, রাজশাহী
শ্রুতি লেখক : মাশফিক মাহমুদ

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!