যুগজাগরণে যুগাচার্য স্বামী প্রণবানন্দজি মহারাজ

যুগজাগরণে যুগাচার্য স্বামী প্রণবানন্দজি মহারাজ

এ জাগরণ মানব জীবনের উন্নয়ন উদ্বোধনের আকাশবার্তা। ১৯১৬ সনের পুণ্যময়ী মাঘী পূর্ণিমার শুভলগ্নে এক সাধক সাধন সমাহিত অবস্থা থেকে উত্থিত হয়েই জগৎবাসীর কল্যাণে উৎসর্গ করলেন এক মহাআশ্বাস বাণী, এ যুগ মহাজাগরণের তথা মহাসমন্বয়ের।

এ যুগ মহামিলন তথা মহামুক্তির যুগ। যুগে যুগে ভগবান কোনো এক বিশেষ কারণকে উপলক্ষ্য করে কোনো মাধ্যমের দ্বারা তাঁর ঐশী নির্দেশ মানবের কল্যাণে প্রেরণ করে থাকেন। ওই মাধ্যমকে অবতার, আচার্য, মহাপুরুষ, গুরু সাধক যে নামেই অবিহিত করা হোক না কেন। ভগবানের উক্তি, ‘অবজানন্তি মূঢ়া মানুষিং তনুমাশ্রিতম পরম ভাবমজানন্তো মম ভূত মহেশ্বরম’।

তাঁর উক্তি, আমি স্বয়ং না জানালে বা না ধরা দিলে বা না বললে কেউই আমাকে দর্শন করতে বা আমার কথা শ্রবণ করতে বা আমার আদেশ নির্দেশ অবগত হতে পারে না। যুগে যুগে কত সাধক মহাপুরুষ অবতারগণকে অবলম্বন করেই আমার ভক্ত কল্যাণের বাণীর প্রচার ও প্রসার ঘটেছে। অকল্পনীয় কৃচ্ছ্রসাধন ত্যাগ তিতিক্ষা শ্রদ্ধা ভক্তির বিচ্ছুরণে বিবেক বৈরাগ্যের তীব্রতায় জগৎ জেনেছে নিরাকার আমিকে।

দেখেছে নিরাকারের সাকার রূপকে। আমি সাড়া দিয়ে থাকি যুগসন্ধিক্ষণে। আমি যে ভক্তির ডোরে বাঁধা। ভক্ত হৃদয়ে যে কত আর্তি জাগে তা জেনে আমি বিচলিত হই। নিরাকার আমি তখন সাকার হওয়ার তাগিদ অনুভব করি। আমার ভক্তই কেবল বলে, ঠাকুর তুমি আছো, আছো আমার হৃদয়গুহায়। কত ধ্রুব কত প্রহ্লাদ কত রামপ্রসাদ কত বামাক্ষ্যাপা অঝোরে কাঁদে আমার তরে।

তখন আর স্থির থাকতে না পেরে আবির্ভূত হই। তখন ভক্তকুল ছুটে আসে আমাকে স্পর্শ করতে। এ যুগও তার ব্যতিক্রম নয়। তাই আমি এবার আসি ভক্তযুগলের গৃহে, নাম তাদের বিষ্ণুচরণ ও সারদা। ধাম তাদের বাজিতপুর। আমি আসি বিনোদ সাধু নামে। এরূপ শরীর হয় আমার শিব শরীর। শিশুকাল থেকে সদা তাই শিব শরীরধারী শিবভাবে আত্মভাবে সমাহিত থাকে বিনোদ।

শিব শরীরধারী বিনোদ কথা বলতে থাকে গুনে গুনে, কেবল প্রয়োজনে। বিনোদ বলতেন অতি কথা বাজে কথা বলায়। শিব পূজা ইন্দ্রিয় সংযম, বাক সংযম, দৃষ্টি সংযম, আহার সংযম সত্য রক্ষাই আদর্শ মানব জীবনের চাবিকাঠি। এ চাবি দিয়েই জীবনের এক স্তর থেকে স্তরান্তরে এগিয়ে যাওয়া। শরীর রক্ষায় তিনি যোগ যাগ ব্যায়াম চর্চা কঠোরভাবে পালন করে অন্যদের সেভাবে থাকতে পরামর্শ দিতেন।

বিদ্যালয়ে বিদ্যাভ্যাস কালে আত্মচিন্তায় মগ্ন থাকতেন। কখনও উৎসাহী বিদ্যার্থীদের আত্মজীবন ও শরীর গঠনের আলোচনায় একটু সময় দিতেন। অতঃপর গুরু গ্রহণের বাতাবরণ তৈরি করেন স্বীয় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের মধ্যে এতদ্‌ বিষয়ে প্রেরণা সঞ্চারের মাধ্যমে। এক দিকে শিক্ষক মহোদয়ের অন্তরে স্বীয় আদর্শমুখী করার উদ্যোগ, অন্য দিকে স্বীয় গুরু গ্রহণের উদ্যোগ আয়োজনের দায়িত্ব অর্পণ করা।

সঙ্গে সমাজে সেবার বাতাবরণ তৈরি করা। সেবার প্রথম প্রয়াস শুরু হয় শিক্ষার প্রসারে হাত বাড়িয়ে দেওয়া। এই সেবাভাবের প্রচারে জনসাধারণ তাঁর ভাবে দ্রুত আকর্ষিত হতে থাকেন। তিনি হয়ে উঠলেন একজন দরদি অতি আপনজন। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এবার গুরু গম্ভীরানন্দজির সংস্পর্শে পৌঁছে গেলেন। কারণ গুরু ব্যতীত শিক্ষা অসম্পূর্ণ। গুরুই পারেন শিষ্যের অন্তরে জ্ঞানাগ্নি জ্বালাতে।

আবার গুরু অপেক্ষায় থাকেন চিহ্নিত শিষ্যের অপেক্ষায়। তাই গুরু চিহ্নিত সন্তানকে পেয়েই স্বীয় যোগআধার এক-এক করে অর্পণ করতে থাকেন শিষ্যের হৃদয়ে। এ সময় চলে ব্রহ্মচর্য্য জীবন। কালের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পর্যায়ক্রমে অজ্ঞাত পরিচয়ের সন্ন্যাসীগুরু স্বামী গোবিন্দানন্দজির থেকে সন্ন্যাস নিয়ে হলেন তিনি স্বামী প্রণবানন্দ।

এবার চলে কঠোর যোগযাগ, যার দ্বারা অভিষ্ট পথে চলা শুরু। এবার সমাজের তীর্থস্থানগুলির সংস্কার সাধনে তৎপর হলেন স্বামী প্রণবানন্দজি মহারাজ। কারণ তীর্থস্থানই হল মানবের ধর্ম ও সদাচারে যুক্ত করার স্থান। তাই গয়াধামকে দিয়েই এ সংস্কারের তরী ভাসিয়ে দিলেন। এ তরি অতি দ্রুত পৌঁছল একে একে কাশীধাম, প্রয়াগধাম, পুরীধাম, হরিদ্বার, বৃন্দাবনধাম, নবদ্বীপ।

কুরুক্ষেত্র থেকে সংস্কারের দিক ও গতি পরিবর্তন করলেন। নব নব ভাবে, নব চেতনায় এ সংস্কার প্রক্রিয়া ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকে। আজ তা ভারতের প্রাদেশিক গণ্ডি অতিক্রম করে চারদিকে অতিদ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। দিল্লি, মুম্বই, চেন্নাই, হায়দ্রাবাদ, রামেশ্বরম, কন্যাকুমারী, তারাপীঠ, দ্বারকা, কেদার, বদ্রী, গঙ্গাসাগর, ব্যাঙ্গালোর অতিক্রম করে তা অদূর কেন্দ্রসমূহের প্রতি ধাবমান।

এই সব আশ্রমে বছরে একবার সব শ্রেণীর মানুষকে একত্রিত করতে নানা দেব-দেবীর পূজা উৎসবের আয়োজন হয়। স্থানে স্থানে মানবের মহামিলনের উদ্দেশে মানবজীবনে ধর্মভিত্তিক নৈতিক আদর্শমূলক আলোচনাসভাকেও প্রাধান্য দেওয়া হয়। উৎসবে উপস্থিত ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণের আয়োজন করা হয়, সেইসঙ্গে মানব প্রাণে ধর্মসাধনার বীজ বপন করা হতে থাকে।

এভাবে তিনি মানবের মধ্যে মহাজাগরণ, মহাসমন্বয়, মহামিলনের সঙ্গে সঙ্গে উৎসুক ভক্তদের ধর্ম বিষয়ে শিক্ষা-দীক্ষা দেওয়ার আয়োজন ও তারমাধ্যমে মহামুক্তির পথে পরিচালিত করতে থাকেন।

তাই তিনি বারবার বলছেন,
‘মানুষ চাই, প্রকৃত মানুষ চাই’।

আজ বহু মানুষ বিপথগামী, তারা যেন ভোগ লালসায় সতত ডুবে যাচ্ছে। কে কী করবে তা বুঝতে পারছে না, কারণ সে তো তার নিজস্ব সত্তাকে ভুলতে বসেছে। কেন সে পৃথিবীতে এসেছে, কী করতে এসেছে, কত দিন এই ধরাধামে থাকবে, সে কিছুই বুঝতে পারছে না। কেবল দাও দাও আর ভাবছে বুঝি আমিই চারকাল থাকব ও এই ভাবে ভোগ-সমুদ্রে ভেসে বেড়াব।

তা হয় না, এই পথ থেকে মুক্তি দেবার জন্য স্বামী প্রণবানন্দ মানুষের মধ্যে মহাজাগরণ চেয়েছেন, চেয়েছেন মানুষ নিজেকে জানুক, তার নিজের আত্মসত্তার জাগরণ ঘটুক। তবে সে প্রকৃত মানুষ হবে। তাহলে এই মানবজাতির মধ্যে মারামারি, হানাহানি, হিংসা, দ্বেষ, বিদ্বেষ দূরীভূত হবে। সে প্রকৃত শান্তি ও সুস্থিতি লাভ করবে।

ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা যুগাবতার স্বামীর মহান বাণী ‘এ যুগ মহাজাগরণের যুগ, এ যুগ মহাসমন্বয়ের যুগ, এ যুগ মহামিলনের যুগ, এ যুগ মহামুক্তির যুগ।’ তিনি মহাসমন্বয় চেয়েছেন, কেবল অনেক কিছু দিলেই কিছু হবে না। দেশ নেতারা তো প্রচুর দিয়েছেন বা দিচ্ছেন। কিন্তু কী হল? কেন এই জগৎবাসীর এত অবক্ষয় অধঃপতন।

তা দেখলে দুঃখ-কষ্ট হয়। তাই আজ স্বামী প্রণবানন্দজির মহাজাগরণ চাই। মানুষের অন্তরসত্তার মহাজাগরণ ঘটলে সে প্রকৃত মানুষ হবে। তখন সে তার আত্মিক মানবসত্তাকে বুঝবে এবং সে প্রকৃত অমৃত তত্ত্ব লাভ করবে।

সেই মহাভারতের যুগে ধ্বনিত হয়ে ছিল ‘যদা ধর্মস্তথা জয়’। কালের প্রবাহে পড়ে ধর্মের পাশাপাশি কখন যেন গজিয়ে গেছে অধর্মের শিকড়। আমাদের মনন আর সমাজ যত স্বার্থকেন্দ্রিকতায় জড়িয়েছে ততই এই ব্যাধি গেঁথে বসেছে সমাজের বুকে। তা না হলে এদেশে ধর্মস্থানে কেনই বা ধর্মের পাশাপাশি অধর্মের রমরমা। আর কেনই বা পুণ্যস্থানে নানান পাপের বিরম্বনা! এই প্রথা স্থানকাল মানে না।

ধর্মপ্রাণ ও ধর্মভীরু তীর্থযাত্রীদের উপর পাণ্ডারা এমন অত্যাচার ও শোষণ চলত যে, তীর্থের নামে সাধারণ মানুষ অত্যন্ত আতঙ্কিত হতেন। ভারতের প্রায় প্রত্যেক বড় তীর্থক্ষেত্রগুলিতে পাণ্ডাদের এই জুলুম বজায় ছিল।

একালে কোনো কোনো তীর্থক্ষেত্রে ভক্তদের যেমন বিরম্বনায় পড়তে হয় সেকালের ছবিটাও সেরকম ছিল। আজও কোনো কোনো তীর্থক্ষেত্রে তীর্থযাত্রীদের উপর অত্যাচার চালায় ক্ষমতাধর পাণ্ডারা। সেকালের ছবিটা ছিল আরও ভয়ংকর।

তীর্থযাত্রীদের কাছে সেসব অভিজ্ঞতা ছিল মারাত্মক করুন। ধর্মপ্রাণ ও ধর্মভীরু তীর্থযাত্রীদের উপর পাণ্ডারা এমন অত্যাচার ও শোষণ চলত যে, তীর্থের নামে সাধারণ মানুষ অত্যন্ত আতঙ্কিত হতেন। ভারতের প্রায় প্রত্যেক বড় তীর্থক্ষেত্রগুলিতে পাণ্ডাদের এই জুলুম বজায় ছিল।

পাণ্ডাদের অত্যাচার ও জুলুম অমানুষিক রূপ নেয় গয়াধামে। হিন্দুদের পক্ষে অবশ্যপালনীয় পিতৃপুরুষের পিণ্ডদান করতে গয়ায় এসে লক্ষ লক্ষ হিন্দু তীর্থযাত্রী পাণ্ডাদের শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হতেন। নানান ভাবে অত্যাচার ও জুলুমে তীর্থযাত্রীরা সেখানে পিণ্ডদান এবং শাস্ত্রাদি ক্রিয়া করতে গিয়ে নাকাল হতেন, সর্বস্বান্ত হতেন। ভারতের, বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মানুষ নানাবিধ কু-সংস্কারের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকতেন তখন।

সেই বেড়াজাল ছিন্ন করে তীর্থক্ষেত্রে পৌঁছেও রেহাই মিলত না তাদের। তীর্থক্ষেত্রে পাণ্ডারা সংস্কারের নামে তাদেরই সৃষ্ট কুসংস্কারকে পুণ্যার্থীদের উপর চাপিয়ে দিত। গয়াধামে পিণ্ড দানের পর ‘সুফল নেওয়া’ নামে চাপিয়ে দেওয়া কুসংস্কারে নাকাল হয়ে উঠতেন পুণ্যার্থীরা। তীর্থগুরু পাণ্ডারা ‘সুফল পাবে’ এমন কথা বললে তবেই পুণ্যার্থীদের সুফল মিলত পিণ্ডদানের।

কিন্তু পাণ্ডাদের খুশি করতে গিয়ে হতো সর্বস্বান্ত। ভক্তিকে পূর্ণতীর্থক্ষেত্রে পাণ্ডারা ভয়ের পর্যায়ে টেনে নামাত। পাণ্ডাদের কারণে পবিত্র তীর্থক্ষেত্র গুলি কলুষিত হতো, আর পুণ্যার্থীরা ভীত-সন্ত্রস্ত ও অত্যাচারিত হতেন। পাণ্ডাত্রাস! প্রবল ক্ষমতাধর পাণ্ডারাজের অত্যাচারে তীর্থভূমি বিষিয়ে উঠত।

পণ্ডিত জয়চন্দ্র সিদ্ধান্তভূষণ অযোধ্যায় গিয়ে ভয়ানক বলদেও পাণ্ডার খপ্পরে পড়েছিলেন। এলাহাবাদ সঙ্গমে এক তীর্থযাত্রী দলকে নৌকায় তুলে ত্রিবেণী সঙ্গমে নিয়ে গিয়ে ডুবিয়ে মারার চক্রান্তকারী ছিল অক্ষয় পাণ্ডা।

ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের মহান প্রতিষ্ঠাতা যুগাচার্য স্বামী প্রণবানন্দজি মহারাজ শিবাবতাররূপে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর সল্পায়ু জীবন নানান মহান কর্মে উৎসর্গ করেন তিনি। তীর্থযাত্রা, তীর্থে শাস্ত্রবিহিত স্নান-পূজা  তর্পণ কে ধর্মপ্রাণ হিন্দুরা ধর্মের অঙ্গ বলে মনে করেন। মহান সব ঋষি ও মহাপুরুষ বহু তীর্থ ভ্রমণ করেছেন।

কিন্তু তীর্থক্ষেত্রগুলিকে পুণ্যার্থীদের কাছে আনন্দময়, কলুষমুক্ত করার জন্য তীর্থসংস্কারের কর্ম কেউ করেননি। স্বামীজি মহারাজ সেই দুরূহ কর্ম, তীর্থসংস্কার করেছিলেন অনমনীয় জেদ ও দৃঢ়তায়।

১৯১৩ সালে যখন তিনি মাত্র ১৭/১৮ বছরের তরুণ ব্রহ্মচারী, তখন গোরক্ষপুরে গুরুর কাছে দীক্ষা নিতে যাওয়ার পথে মা ও ভাইদের ইচ্ছা অনুসারে পরলোকগত পিতৃদেবের শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদানের উদ্দেশ্যে নামলেন গয়াধামে। স্টেশনে নামতেই পাণ্ডার ছড়িদারদের টানাটানি শুরু হল তাঁকে নিয়ে।

দীর্ঘ ১৪ বছর এই চুক্তি মেনে চলার পর ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে প্রদেশিকতার বিষবাষ্পে বাঙালি ও বিহারিদের মধ্যে একটা বিদ্বেষের সৃষ্টি হলে, পাণ্ডারা পুনরায় স্বৈরাচারী হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু স্বামীজি মহারাজ ছাড়বার পাত্র নন

তাঁদের অভদ্র আচরণের প্রতিবাদ করতেই দল বেঁধে আক্রমণ করতে এলে তিনি ত্রিশূল হাতে রুদ্ররূপ ধারণ করে রুখে দাঁড়ালেন। তাঁর ভয়াল মূর্তি দর্শনে ভীত হয়ে পাণ্ডারা পলায়ন করল। পরবর্তীতে তিনি বলেছিলেন, ‘সেই দিনই আমার মনে সংকল্প জাগল, ‘গয়াতীর্থ সংস্কার করব।’

মানবদরদি স্বামী প্রণবানন্দজি মহারাজ ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে গয়া সেবাশ্রম সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠিত করে শত বাঁধাবিপত্তি উপেক্ষা করে, অসীম সাহসিকতায় এবং কর্তব্যে ও অবিচলিত সংকল্পে পাণ্ডা দমনে তীর্থ সংস্কার আন্দোলন শুরু করেন।  তাঁর সংকল্প ছিল যুগ যুগ ধরে সঞ্চিত অনাচার, অত্যাচার থেকে তীর্থক্ষেত্রগুলিকে মুক্ত করে একটা নিষ্কলুষ ভয়শূণ্য আনন্দময় পবিত্র ধর্মীয় পরিবেশ সৃষ্টি করা। তাঁর ভয়ডরহীন কার্যকলাপে পণ্ডাদের তিনি ব্যতিব্যস্ত করে তুললেন।

তাঁর নিরলস সংগ্রামের কাছে পাণ্ডারা বারবার নতি স্বীকার করে। শেষে ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে সঙ্ঘের সঙ্গে গয়ালি পণ্ডাদের চুক্তি হয় যে, পিণ্ড দান ও শ্রাদ্ধাদি ক্রিয়াকর্মের জন্য তীর্থযাত্রীদের স্বেচ্ছাকৃত ব্যয়ের ওপর পাণ্ডারা আর কোনও দাবি বা জুলুম করতে পারবে না।

দীর্ঘ ১৪ বছর এই চুক্তি মেনে চলার পর ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে প্রদেশিকতার বিষবাষ্পে বাঙালি ও বিহারিদের মধ্যে একটা বিদ্বেষের সৃষ্টি হলে, পাণ্ডারা পুনরায় স্বৈরাচারী হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু স্বামীজি মহারাজ ছাড়বার পাত্র নন।

তাঁরই অনমনীয় জেদ ও সংকল্পের কার্যকলাপের কাছে পরাস্ত হয়ে পাণ্ডারা ১৯২৪ সালের চুক্তি পুনরায় মানতে বাধ্য হল। স্বামী প্রণবানন্দজির এই তীর্থ সংস্কার আন্দোলনের ফলেই ভারতের প্রায় সকল তীর্থস্থানে তীর্থযাত্রীরা পাণ্ডা-ভীতি মুক্ত হয়ে নির্বিঘ্নে তীর্থভ্রমণ কার্য করতে সক্ষম হন।

তীর্থক্ষেত্র সাধনার ক্ষেত্র। সেই সাধনাক্ষেত্রকে স্বামীজি মহারাজ কলুষমুক্ত, ভীতিমুক্ত, এবং শান্তিময় করে তুলেছিলেন। তাঁর এই সুমহান অক্ষয়কীর্তি তীর্থসংস্কার কার্য, তীর্থযাত্রীদের হৃদয়-মন্দিরে তাকে গৌরবময় আসন দান করেছে। তাঁর শ্রীচরণে প্রার্থনা করি, হে আচার্য, হে জগৎ গুরু তোমার আশীর্বাদে জগতের সমস্ত ধনী, নির্ধন, জ্ঞানী, মূর্খ, হীন, দরিদ্র, শিক্ষক, ছাত্র, দেশনেতা, স্বামী-স্ত্রী সকলে যেন এই প্রকৃত তত্ত্ব জেনে শান্তি ও সুস্থিতি লাভ করতে পারে।

…………………………
ঋণস্বীকার : সাপ্তাহিক বর্তমান – স্বামী নীলেশ্বরানন্দস্বা, স্বামী বিশ্বাত্মানন্দ ও গুঞ্জন ঘোষ।

………………….
পুনপ্রচারে বিনীত: প্রণয় সেন

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

………………….
আরও পড়ুন-
স্বামী অড়গড়ানন্দজী
ভোলানাথ চট্টোপাধ্যায়
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেব
শিরডি সাই বাবা
পণ্ডিত মিশ্রীলাল মিশ্র
নীলাচলে মহাপ্রভুর অন্ত্যলীলার অন্যতম পার্ষদ ছিলেন রায় রামানন্দ
ভক্তজ্ঞানী ধর্মপ্রচারক দার্শনিক রামানুজ
সাধক ভোলানন্দ গিরি
ভক্ত লালাবাবু
লাটু মহারাজ শ্রীরামকৃষ্ণের অদ্ভুত সৃষ্টি
কমলাকান্ত ভট্টাচার্য
ব্রাহ্মনেতা কেশবচন্দ্র সেন
পরিব্রাজকাচার্য্যবর শ্রীশ্রীমৎ দূর্গাপ্রসন্ন পরমহংসদেব
আর্যভট্ট কাহিনী – এক অজানা কথা
গিরিশচন্দ্র ঘোষ
কঠিয়াবাবা রামদাস
সাধু নাগ মহাশয়
লঘিমাসিদ্ধ সাধু’র কথা
ঋষি অরবিন্দ’র কথা
অরবিন্দ ঘোষ
মহাত্মাজির পুণ্যব্রত
দুই দেহধারী সাধু
যুগজাগরণে যুগাচার্য স্বামী প্রণবানন্দজি মহারাজ
শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর
বাচস্পতি অশোক কুমার চট্টোপাধ্যায়ের লেখা থেকে
মুসলমানে রহিম বলে হিন্দু পড়ে রামনাম
শ্রীশ্রীঠাকুর রামচন্দ্র দেব : প্রথম খণ্ড
শ্রীশ্রীঠাকুর রামচন্দ্র দেব: দ্বিতীয় খণ্ড
শ্রীশ্রীঠাকুর রামচন্দ্র দেব : অন্তিম খণ্ড
মহামহোপাধ্যায় কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ
শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর
শ্রীশ্রী ঠাকুর সত্যানন্দদেব
মহাতাপস বালানন্দ ব্রহ্মচারী: এক
মহাতাপস বালানন্দ ব্রহ্মচারী: দুই
মহাতাপস বালানন্দ ব্রহ্মচারী: তিন
সাধক তুকারাম
সাধক তুলসীদাস: এক
সাধক তুলসীদাস: দুই
সাধক তুলসীদাস: তিন
শ্রীশ্রী মোহনানন্দ স্বামী: এক
শ্রীশ্রী মোহনানন্দ স্বামী: দুই
শ্রীশ্রী মোহনানন্দ স্বামী: তিন

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!