যোগীবর শ্রীশ্রী অমল বিকাশ চৌধুরী

যোগীবর শ্রীশ্রী অমল বিকাশ চৌধুরী: এক

-ড. সৌরভ মণ্ডল

পরাধীন ভারতবর্ষের ধর্ম ও সমাজ জীবনের এক সন্ধিক্ষণে পরমারাধ‍্য পূজ‍্যপাদ গুরুদেব যোগাচার্য ডা. শ্রীশ্রী অমল বিকাশ চৌধুরী মহাশয় আবির্ভূত হইয়া; আপন সাধনা সিদ্ধি ও আত্মিক আদর্শের মধ‍্য দিয়া এক প্রেমময় আচার্য রূপে এদেশের ধর্ম ও সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ সংবাহক হইয়া সমকালীন সমাজ ব‍্যবস্থাকে প্রভাবিত করিয়াছিলেন।

পরম পরাৎপর পরমারাধ‍্য পূজ‍্যপাদ গুরুদেব যোগাচার্য ডা. শ্রীশ্রী অমল বিকাশ চৌধুরী মহাশয় ছিলেন শ্রীশ্রী যোগীরাজ শ‍্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়ের গুরু পরম্পরায় এক অন‍্যতম মহান আচার্য।

আবির্ভাব
তিনি পরাধীন ভারতবর্ষে অধুনা বাংলাদেশের চট্টগ্রামের চেচুরিয়া গ্রামে ১৩২০ বঙ্গাব্দের ৩রা আষাঢ় (১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই জুন) পূর্ণিমা তিথির এক শুভ মূহুর্তে নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ শ্রীযুক্ত চন্দ্রমাধব চৌধুরী ও মাতা শ্রীমতী বিশ্বেশ্বরী দেবীর অষ্টম গর্ভে আবির্ভূত হইয়াছিলেন। তাঁহার পিতামহ শ্রীযুক্ত নীলকমল চৌধুরী মহাশয় বিশাল ভূ-সম্পত্তির জমিদার ছিলেন।

বাল‍্যকাল হইতেই তিনি আধ‍্যাত্মিক পরিবেশে মানুষ হইয়াছিলেন। তাঁহার পিতা ও পরিবারের সকলেই বাংলাদেশের পঞ্চানন ধামের প্রতিষ্ঠাতা যোগীবর শ্রীশ্রী নগেন্দ্রনাথ চৌধুরী মহাশয়ের শিষ্য ছিলেন। সেই সূত্রে তিনি নগেনবাবার প্রভূত স্নেহাশীর্বাদ লাভ করিয়াছিলেন এবং বড়ই আদরের ছিলেন।

তাঁহার পিতৃদেব শ্রীযুক্ত চন্দ্রমাধব চৌধুরী মহাশয় ছিলেন মহান যোগী। শ্রীযুক্ত চন্দ্রমাধব চৌধুরী মহাশয় সর্বসমক্ষে পূর্ব নির্ধারিত সময়ে যোগবলে দেহত‍্যাগ করিয়াছিলেন।

শৈশব ও কর্মজীবন
বাল‍্যকালেই তাঁহার মধ‍্যে পূর্বজন্মের সৎ সংস্কার প্রকাশিত হইতে দেখা যায়। আর পাঁচটা বালক যখন খেলাধুলায় মত্ত তখন এই দেবশিশু চট্টগ্রামের উঁচু টিলায় উঠিয়া ধ্যানস্থ হইয়া থাকিত, এবং সেই সময় দেখা যাইত ছোট্ট ছোট্ট হরিণ শাবকেরা নির্ভয়ে তাঁহার অঙ্গ লেহন করিতেছে।

বিদ‍্যালয়ে প্রবেশের পর তাঁহার মেধা ও প্রতিভা দেখিয়া শিক্ষকগণ মুগ্ধ হইয়া যাইতেন। তৎকালীন সময়ে আট আনা সংস্করণে প্রকাশিত বহু ধর্মীয় পুস্তকের মধ‍্যে ‘জড়ভরত’ নামক পুস্তকের কাহিনী তাঁহাকে এতোটাই অনুপ্রাণিত করিয়াছিল যে গ্রীষ্মের ছুটিতে তিনি একমাস যাবৎ মৌনব্রত অবলম্বন করিতেন।

যোগাচার্য ডা. শ্রীশ্রী অমল বিকাশ চৌধুরী মহাশয় তৎকালীন সময়ে Matriculation পরীক্ষায় প্রথম হইয়া ইংরেজি ও সংস্কৃত ভাষায় প্রভূত দক্ষতা অর্জন করিয়া ছিলেন। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে যখন সমগ্রদেশে স্বাধীনতা সংগ্রামের তীব্র আন্দোলন বহমান ছিল তখন তিনি গান্ধিজীর লবণ আইন ভঙ্গ ও আইন অমান্য আন্দোলনে অনুপ্রাণিত হইয়া স্বহস্তে লবণ তৈরি শুরু করিয়াছিলেন।

স্বদেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হইয়া রচনা করিয়াছিলেন বহু দেশাত্মবোধক প্রবন্ধ ও সংগীত। কিন্তু পরবর্তীতে একসময় তৎকালীন ইংরেজ সরকারের প্রখর দৃষ্টি হইতে রক্ষা পাইতে তাঁহার সমস্ত রচনা সমুদ্রে নিক্ষেপ করিতে বাধ‍্য হইয়াছিলেন।

১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগদান করিয়া ‘সমরপদক’ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। দেশ স্বাধীন হইবার পর তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্ম করিয়া ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে অবসর গ্রহণ করেন।

এর মধ‍্যেই তিনি হোমিওপ্যাথি লইয়া পড়াশুনা করিয়া ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ২রা জুন কাউন্সিল অফ হোমিওপ্যাথিক মেডিসিন হইতে সসম্মানে উত্তীর্ণ হন এবং অসাধারণ ভাবে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় সুচিকিৎসক হিসাবে পরিচিত লাভ করেন।

গুরুদর্শন ও দীক্ষালাভ
বাল‍্যকাল হইতেই তিনি আধ‍্যাত্মিক পরিবেশেই মানুষ হইয়াছিলেন। নিয়মিতভাবে প্রতিদিন সন্ধ্যায় তাঁহার গৃহের বৈঠকখানায় শাস্ত্রালোচনা ও যোগসংগীতের আসর বসিত। ফলত পিতৃদেবের নিকটে শ্রীশ্রী পঞ্চানন ভট্টাচার্য মহাশয় রচিত ‘ধর্ম ও পূজাদি মীমাংসা’ এবং ‘জগত ও আমি’ গ্রন্থ দুইটির আলোচনা তিনি এতো বার শুনিয়াছিলেন যে ইহার আদ‍্যোপান্ত তাঁহার কণ্ঠস্থ ছিল।

১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে ভারত সরকারের ইন্ডিয়ান পোষ্ট এন্ড টেলিগ্রাফ ডিপার্টমেন্টে চাকুরীকালীন এক সহকর্মীকে ‘ধর্ম ও পূজাদি মীমাংসা’ -এর আলোচনা করিতে দেখিয়া তিনি আশ্চর্যান্বিত হন এবং তাহার মাধ‍্যমে যোগীবর শ্রীশ্রী নিতাইচরণ বন্ধ‍্যোপাধ‍্যায় মহাশয়ের সন্ধান পান।

যোগীবর শ্রীশ্রী নিতাইচরণ বন্ধ‍্যোপাধ‍্যায় মহাশয় যোগীরাজ শ্রীশ্রী শ‍্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়ের প্রধান শিষ‍্য শ্রীশ্রী পঞ্চানন ভট্টাচার্য মহাশয়ের শিষ‍্যগণের মধ‍্যে এক অন‍্যতম মহান আচার্য ছিলেন।

ফলত তিনি তাঁহার সহকর্মী শ্রীযুক্ত প্রভাত বাবুর সহিত এক শনিবার অফিস ছুটির পর শ্রীশ্রী নিতাইচরণ বন্ধ‍্যোপাধ‍্যায় মহাশয়ের দর্শন মানসে তাঁহার শিবপুরের গৃহে উপস্থিত হন।

সেই দিনকার বর্নণা তিনি প্রায়ই করিতেন। তাহার নিজের ভাষায় ‘প্রভাত বাবুর প্রণাম সারা হইলে আমি প্রণাম করিলাম। তৎক্ষণাৎ মাথা হইতে মেরুদণ্ডের শেষ সীমা অর্থাৎ মূলাধার পর্যন্ত একটা বিদ‍্যুত তরঙ্গ খুব ভালোভাবে অনুভব করিলাম। দেহ-মন হালকা হইয়া গেল। অভূতপূর্ব অনুভূতি প্রাণেনে আনন্দ আনিয়া দিল।’

তিনি অনুভব করিলেন ইনিই তাঁহার জন্ম-জন্মান্তরের একমাত্র আপনজন ও ভবসাগরের কাণ্ডারী। তিনি ক্রিয়া প্রার্থনা করিলেন এবং পরের বৃহস্পতিবার ক্রিয়াযোগে দীক্ষিত হইয়া ধন‍্য হইলেন।

সাধনা ও সিদ্ধিলাভ
মূলত গুরুকৃপায় গভীর বিশ্বাসী হইবার সত্ত্বেও সাধনক্ষেত্রে পুরুষাকারের উপর তিনি বিশেষ জোর দিতেন। তিনি অত্যন্ত কঠোরতার সহিত নিয়ম ও নিষ্ঠা মানিয়া সাধন করিতেন এবং কোনও মতেই সময়ের অপব্যবহার হইতে দিতেন না। এমনকি অফিসের জলযোগ সময়েও তিনি নিকটবর্তী নির্জনস্থানে যাইয়া আত্মমগ্ন রহিতেন।

প্রতিদিন ব্রাহ্ম মূহুর্তে উঠিয়া ক্রিয়া সমাপনান্তে অফিস যাইতেন এবং পরিবারের সকল দায়িত্ব পালন করিয়া পুনরায় সন্ধ্যায় সাধনে প্রবৃত্ত হইতেন। এই সময়ে তাঁহার সাধনার প্রতি অনুরাগ এতটাই ছিল যে তাঁহার স্ত্রীর মরণাপন্ন অসুস্থতাও পর্যন্ত তাঁহাকে বিচলিত করিতে পারে নাই।

প্রতি সপ্তাহের শেষ দিন অর্থাৎ শনিবার অফিস ছুটির পর তিনি তাঁহার গুরুদেবের শ্রীচরণে উপস্থিত হইয়া সাধনার কুশলাদি ব‍্যক্ত করিতেন এবং যথোপযুক্ত উপদেশ লাভ করিতেন। এইরূপে ক্রমে ক্রমে তিনি অতিশীঘ্রই সাধনার অতি উচ্চতর অবস্থা লাভ করেন। এই সময়ে তাঁহার জীবনে বহু অভূতপূর্ব ও অলৌকিক ঘটনার প্রকাশ ঘটে।

প্রতিদিনই ব্রাহ্ম মূহুর্তে ক্রিয়াভ‍্যাসের সময় তাঁহার গুরুদেব সূক্ষ্ম শরীরে তাহার সম্মুখে উপস্থিত হইতেন এবং ক্রিয়া শেষ হইলে অদৃশ্য হইয়া যাইতেন। যোগসাধনার একের পর এক উচ্চতর সোপান অতিক্রমকালে তিনি স্থিরাবস্থায় এতটাই মগ্ন হইয়া পরিতেন যে ক্রিয়া সমাপনের পরেও বহুক্ষণ নেশাগ্রস্ত থাকিতেন এবং বাহ‍্যজ্ঞান ফিরিতে বহু সময় লাগিত।

প্রভাতে তিনি নির্ণয় করিতে পারিতেন না যে কোনটি দুগ্ধপূর্ণ পাত্র, কোনটি জলপূর্ণ। বহুবার ভুল করিয়া দুগ্ধপূর্ণ পাত্র লইয়া প্রাতকৃত‍্যে চলিয়া যাইতেন। পরবর্তীতে মাঝে মধ্যেই তিনি সমগ্র রাত্রি সমাধিস্থ অবস্থায় কাটাইতেন এবং এই সময়ে তাঁহার মনে যাহাই উদয় হইত তাহাই বাস্তবে ঘটিয়া যাইত।

এইভাবে ক্রমান্বয়ে সাধনার শেষ ক্রম অতিক্রান্ত হইবার পর তিনি অধিকাংশ সময় বাহ‍্য জ্ঞান রহিত অবস্থায় কাটাইতেন।

সৎসঙ্গ ও তীর্থভ্রমণ
তীব্র সাধনার গুণে তিনি তাঁহার গুরুর নিকট এতটাই প্রিয় পাত্র হইয়াছিলেন যে মধ‍্যে মধ‍্যেই গুরুদেব শ্রী নিতাইচরণ বন্ধ‍্যোপাধ‍্যায় মহাশয় তাঁহার গৃহে উপস্থিত হইতেন এবং মাসাধিক কাল অবস্থান করিতেন। কেবলমাত্র তাহাই নহে প্রয়োজনে প্রিয় শিষ‍্যও সপরিবারে গুরুগৃহে যাইয়া থাকিতেন।

ওই সময় ঐ অঞ্চলের স্থানীয় বহু ব‍্যক্তি যোগীবর শ্রীশ্রী নিতাইচরণ বন্ধ‍্যোপাধ‍্যায় মহাশয়ের নিকট হইতে ক্রিয়াযোগ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। এই সময় তিনি তাঁহার গুরুদেবের সহিত বেনারস, দেওঘর, পুরীধাম, মথুরা এলাহাবাদ, আগ্রা, হরিদ্বার, মোগলসরাই, রাজস্থানের চম্বল, হরিপাটি, ইন্দারা, জৌনপুর, অমরগড়, প্রতাপগড়, দয়ালবাগ, সুলতানপুর, কুমিল্লা প্রভৃতি বহু তীর্থস্থান ভ্রমন করিয়াছিলেন।

এই বিষয়ে তিনি পরবর্তীকালে বলিতেন, ‘গুরুদেবের সহিত তীর্থভ্রমণ জন্ম জন্মান্তরের সুকৃতি না থাকিলে হয় না। গুরুদেবের সহিত ভ্রমণকালে তাঁহার বহু অলৌকিক লীলা দর্শন করেছি এবং উপলব্ধি করেছি তাঁর পরম পাবনী শক্তিকে।’

শুধুমাত্র তাহাই নহে, তিনি তাঁহার জীবনে বহু মহাত্মার সাক্ষাৎ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন এবং তাঁহাদের আশীর্বাদ ও সহচর্য তাঁহার সাধন জীবনকে আরও সুদৃঢ় করিয়াছিল। তাঁহাদের মধ‍্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হইলেন-

• পূর্বেই উল্লেখ করিয়াছি, চট্টগ্রামের পঞ্চানন ধামের প্রতিষ্ঠাতা যোগীবর শ্রীশ্রী নগেন্দ্রনাথ চৌধুরী মহাশয়ের কথা। যোগাচার্য ডা. শ্রীশ্রী অমল বিকাশ চৌধুরী মহাশয়ের পিতামাতা সহ প্রায় পরিবারের সকলেই যোগীবর শ্রীশ্রী নগেন্দ্রনাথ চৌধুরী মহাশয়ের শিষ‍্য ছিলেন।

ফলত পঞ্চানন ধামে তাঁর অবাধ যাতায়াত ছিল। মহাযোগী নগেন বাবা তাঁকে আপন ক্রোড়ে বসাইয়া পুত্র স্নেহে আদর করিতেন ও নিজ হস্তে মিষ্টান্ন ভোজন করাইতেন।

(চলবে…)

………………………………
আরো পড়ুন:
যোগীবর শ্রীশ্রী অমল বিকাশ চৌধুরী: এক

যোগীবর শ্রীশ্রী অমল বিকাশ চৌধুরী: দুই
যোগীবর শ্রীশ্রী অমল বিকাশ চৌধুরী: তিন

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!