মাই ডিভাইন জার্নি

-এস এস রুশদী

জয় হোক সাধু-গুরুর
ফকির লালন সাঁই ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে পালক পিতা-মাতা ও ভক্ত-অনুরাগীদের নিয়ে বাস করতেন। প্রায় দুইশত বছর আগে তিনি তাঁর এই আখড়াবাড়িতে দোল পূর্ণিমায় সাধুসঙ্গের সূচনা করেন। সেই সাধুসঙ্গে লালন সাঁইজির ভক্তবৃন্দসহ অন্য চার ঘরের (পাঞ্জু সাঁইয়ের ঘর, দেলবার সাঁইয়ের ঘর, চৌধুরীর ঘর ও সতীমার ঘর) সাধু-গুরু-বৈষ্ণব ও ভক্ত-অনুরাগীরা অংশ নিতো।

সেসময় অষ্টপ্রহর ব্যাপী এই সাধুসঙ্গে প্রত্যেক প্রহরের রাগ অনুযায়ী তত্ত্ব আলোচনা ও সঙ্গীত পরিবেশিত হতো। সাধুদের যথাযথ সেবা প্রদান করা হতো। এই আয়োজনে সাধু-ভক্ত-অনুরাগী ব্যতীত সাধারণ জনসাধারণের সমাগম হতো না। ফলে বিশেষ আয়োজন হিসাবে এই সাধুসঙ্গ একটা তপোবনিক পরিবেশে সাধু ভাবগাম্ভীর্যের মাধ্যমে উৎযাপিত হতো।

লালন ফকিরের তিরোধানের পর তাঁর ভক্ত ফকির ভোলাই সাঁই লালন আখড়াবাড়িতে এই ধারা অব্যাহত রাখেন। দোল পূর্ণিমার সাধুসঙ্গের পাশাপাশি পহেলা কার্তিক লালন তিরোধান দিবসে লালন স্মরণোৎসব সাধুসঙ্গ আয়োজিত করতে থাকে।

ফকির ভোলাই সাঁই-এর তিরোধানের পর তাঁর শিষ্য ফকির কোকিল সাঁই-এর তত্ত্বাবধানে বাৎসরিক এই দুই সাধুসঙ্গ আয়োজিত হতে থাকে। সেসময় ‘আখড়া কমিটি’ নামে ফকিরদের নিয়ে গঠিত একটি কমিটি সাধুসঙ্গ পরিচালনা করতো। সাধুসঙ্গের সময় ছাড়াও সারা বছর আখড়ায় সর্বদা সাধুভাব বিরাজ করতো।

কিন্তু এই ভাব বিনষ্ট হয় পাকিস্তান শাসনামলে। ১৯৫৬ সালে পূূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্ণর মোনায়েম খানের নির্দেশে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক লালন আখড়াকে ‘লালন মাজার’ নামকরণ করে। আখড়া কমিটি বাতিল করে গঠন করা হয় ‘লালন মাজার কমিটি’। লালন সমাধিতে সুফি মাজারের আদলে সৌধ নির্মাণ করা হয়। সমাধিতে পরানো হয় ভিনদেশী হরফের গিলাফ।

ফকির কোকিল সাঁইকে আখড়া থেকে বিতাড়িত করা হয়। যে লালন ফকির জাত-পাত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের জয়গান গেয়েছেন, সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন, সেই লালন ফকিরকে সাম্প্রদায়িক বন্ধনে আবদ্ধ করা হয়।

লালন আখড়ার সাধুভাব পরিবেশ বিনষ্ট করে তথাকথিত সুফি মাজারে রূপান্তরিত করার ব্যবস্থা চলতে থাকে। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হলো, পূর্ব-পাকিস্তান বাংলাদেশ হলো। কিন্তু লালন আখড়া মাজারের খপ্পর থেকে মুক্ত হলো না। বরং মাজার পরিচালনা এবং লালন চর্চার জন্য গঠিত হলো ‘লালন একাডেমী’।

পদাধিকার বলে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক এই একাডেমীর সভাপতি। সাধারণ সম্পাদক ও অন্যান্য পদে নির্বাচিত হন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ তাদেরই অনুগত লালন একাডেমীর ভোটার দ্বারা। এই একাডেমী উন্নয়নের নামে আখড়ার তপোবনিক পরিবেশ ধ্বংস করে লালন সমাধির পাশে গড়ে তোলা হয়েছে একাডেমী ভবন ও মিলনায়তন।

বর্তমানে লালন একাডেমীর উদ্যোগে ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় ১লা কার্তিক ও দোল পূর্ণিমার ‘সাধুসঙ্গ’-এর পরিবর্তে আয়োজিত হয় তিন দিনব্যাপী ‘লালন মেলা’। ফলে মেলার বৈশিষ্ট অনুযায়ী নানান রকমের কেনা-বেচা-বিনোদনের হাট বসে।

মেলার স্পন্সর কর্পোরেট কোম্পানীর ব্যানার, ফেস্টুনে ভরে যায় মেলা প্রাঙ্গন। একাডেমী মঞ্চে সাধক ফকির শিল্পীদের অগ্রাহ্য করে চটুল ভাবে বাজারি বাউল শিল্পীদের দিয়ে সঙ্গীত করানো হয়। আর এসবের আকর্ষণে হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসে মেলা প্রাঙ্গনে।

ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত মানুষের সমাগমে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয় তা বর্ণনা করা সম্ভব না। হাঁটাচলার মত অবস্থা থাকে না। ঠেলাঠেলি, ধাক্কা-ধাক্কি, হৈ-চৈ, সব মিলিয়ে এক বারোয়ারী পরিবেশ তৈরি হয়। প্রহরে প্রহরে রাগ-রাগিনী উধাও হয়ে কানে বাঁজতে থাকে অসুর।

এরকরম পরিস্থিতির মধ্যেও প্রতিবছর দেশ-বিদেশ থেকে হাজারো সাধু-গুরু-ভক্তের আগমন হয় আখড়ায়। তাঁরা তাঁদের মত করে আসন নিয়ে সাধুসঙ্গ উৎযাপনের চেষ্টা করেন। ভাব বিনিময় হয় সাধুদের। তত্ত্ব আলোচনা ও সঙ্গীত চলে নিজেদের মত করে। কিন্তু এই হট্টগোলের ভিড়ে তা হয়ে ওঠে যন্ত্রণাদায়ক।

বছরের বাকী সময়েও দেশ-বিদেশ থেকে হাজারো দর্শনার্থী আসে আখড়ায়। দর্শনার্থীদের প্রত্যাশা থাকে আখড়ায় সাধুদের সাথে আলাপ আলোচনা করা ও লালনের সঙ্গীতসুধা পান করা। কিন্তু আখড়ায় লালন একাডেমী সাধু-গুরু-ফকির শিল্পীদের সেভাবে মূল্যায়ন করা হয় না।

ফলে প্রকৃত সাধু-গুরু-ফকিররা একাডেমী কেন্দ্রীক তৎপরতা এড়িয়ে চলেন। কিছু বাউল নামধারী শিল্পীরা এখানে বিরাজ করে। যাদের উদ্দেশ্য থাকে লালনের কিছু তত্ত্ব চটকদারী কায়দায় আওড়ানো এবং চটুল সুরে পরিচিত কিছু গান করে দর্শনার্থীদের কাছ থেকে পয়সাকড়ি হাতিয়ে নেওয়া। ফলে লালন ধামের এইরূপ ধারণা নিয়ে দর্শনার্থীরা ফিরে যায়।

এক কথায় বলা যায় সময়ের পরিক্রমায় লালন “সাঁই” হয়েছে লালন “শাহ্” “লালন আখড়া” হয়েছে “লালন মাজার”, সাধুসংঘ হয়েছে “মেলা”, “ভাবসংগীত” হয়েছে চটুল “বাউল সংগীত”, আর আখড়া পরিচালনার দায়িত্ব ফকিরদের হাত থেকে এসেছে প্রশাসন ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হাতে।

মোদ্দা কথা লালন ধামকে এখন একটা বাণিজ্যিক কেন্দ্রে রূপান্তরিত করা হয়েছে। সরকারি অনুদান, স্পন্সরের অর্থ, মেলায় দোকান বরাদ্দের অর্থ, মাজারের সিন্দুকে ভক্তদের দেওয়া অর্থসহ বিভিন্ন উপায়ে কোটি কোটি টাকার কারবার হয় লালন মাজারকে ঘিরে।

ফলে এর ভাগ বাটোয়ারার জন্য একাডেমীকে কেন্দ্র করে প্রভাবশালীদের তৎপরতা চলে। লালন আখড়ার এই পরিণতি নিয়ে ফকিররা বহু বছর যাবৎ আপত্তি জানিয়ে আসছেন। বার বার প্রশ্ন উঠেছে, একটা গুরুবাদী প্রতিষ্ঠান যারা গুরুভক্ত নয় এমন মানুষদের দ্বারা কিভাবে পরিচালিত হতে পারে?

লালন আখড়ার পরিচালনার দায়িত্ব ফকিরদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবী তুলছেন তারা। ফকির লালন সাঁই ও সাধুসঙ্গ বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আন্তর্জাতিকভাবেও লালন ফকির বহুলভাবে চর্চিত। পৃথিবীর বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে লালন আজ পাঠ্য।

ইউনেস্কো বাউল সঙ্গীতকে বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণা করেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে লালন ভক্ত-অনুরাগী-গবেষকরা সারাবছর লালনধামে আসে। তারা লালনধামে এসে এমন পরিবেশ থেকে যে অভিজ্ঞতা নিয়ে যান তার সাথে লালন ফকিরের ভাবের কোন সঙ্গতি নেই।

তাই আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেশের জনগণ ও বিশ্ববাসীর কাছে সঠিকভাবে উপস্থাপিত হোক এমন দাবী ফকিরদের। ফকিরদের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দাবী এরূপ-

১. লালন স্মৃতি ধামকে ‘লালন মাজার’ নামকরণ বাতিল করে আনুষ্ঠানিক ভাবে ‘লালন আখড়া’ হিসাবে ঘোষণা করা।

২. ‘শাহ্’ শব্দ বাতিল করে ‘সাঁই’ শব্দ ব্যবহার নিশ্চিত করা।

৩. পহেলা কার্তিকে ও দোল পূর্ণিমায় ‘লালন মেলা’ বাতিল করে যথাক্রমে ‘লালন স্মরণোৎসব সাধুসঙ্গ’ ও ‘দোল পূর্ণিমা সাধুসঙ্গ’ আয়োজন করা। মেলা কেন্দ্রীক সকল কার্যক্রম বাতিল করে সাধুসঙ্গের ভাব ফিরিয়ে আনা।

৪. ‘সাধুসঙ্গে’ সাধক ও ফকির শিল্পীদের মাধ্যমে অষ্টপ্রহরের রাগরাগিনী অনুযায়ী তত্ত্ব আলোচলা ও সঙ্গীত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা। যথাযথ সাধুসেবার ব্যবস্থা করা।

৫. লালন সমাধি থেকে আরবি হরফের গিলাফ প্রত্যাহার করা। লালন আখড়াকে সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত করা।

৬. লালন আখড়ায় সাধুভাব ফিরিয়ে আনার জন্য সাধু-গুরু-ভক্তদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। যাতে করে আখড়াতে সার্বক্ষণিকভাবে সাধু-গুরু-ভক্তরা অবস্থান করতে পারে। ধ্যানযোগ, তত্ত্ব আলোচনা ও সঙ্গীত চর্চার জন্য পরিবেশ তৈরি করা। সাধুসঙ্গের সময় আগত সাধু ভক্তদের জন্য আসন ব্যবস্থা এমনভাবে করা যাতে ঝড়-বৃষ্টি বা যে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও সাধুরা নিরাপদে অবস্থান করতে পারে।

৭. সকল প্রকার কর্পোরেট স্পন্সরশীপ বাতিল করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে সাধুসঙ্গ আয়োজন করা।

৮. এই সাধুসঙ্গ পরিচালনার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে গুরু বা ফকিরদের হাতে হস্তান্তর করা।

৯. পদাধিকার বলে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক লালন একাডেমীর সভাপতি থাকবেন। কিন্তু সাধারণ সম্পাদকসহ সকল পদে গুরুধারী ফকিরদের মধ্য থেকে নির্বাচিত করা।

১০. কোন গুরুধারী ফকির ব্যতিত কেউ লালন একাডেমীর সদস্য বা ভোটার হতে পারবে না। বর্তমান ভোটার তালিকা বাতিল করে ফকিরদের সদস্য করে নতুন করে ভোটার তালিকা তৈরি করা। লালন একাডেমীর সদস্য ফকিররা তাদের মধ্য থেকে যোগ্য ফকিরদের নির্বাচিত করবেন।

১১. সর্বপরি লালন আখড়াকে দখলীকরণ, বাণিজ্যিকীকরণ, সাম্প্রদায়ীকরণ ও চটুলিকরণের খপ্পর থেকে মুক্ত করে সাধুভাব পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য যা যা করণীয় তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা।

………………………………….
এস এস রুশদী
লালন গবেষক
এশিয়া প্যাসিফিক এডুকেশন গ্রুপ, বাংলাদেশ।

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!