শাহ্ আব্দুল করিম

শাহ্ আব্দুল করিম : জীবনী ও গান

-দিগন্ত সৌরভ

এই সবুজ-শ্যামল ভুখন্ডের উত্তর সীমান্তে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে মেঘালয় পর্বত; এই মেঘালয় পর্বতের পাদদেশে সিলেটের বিস্তৃর্ণ জলরাশি পরিচিত টাঙ্গুয়া হাওর নামে। সুনামগঞ্জের এই টাঙ্গুয়া হাওরের বৈচিত্র্য সমস্ত অঞ্চলের শিল্প-সাহিত্যে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলের মনমাতানো গান ও সুরের জাদু এই অঞ্চলকে ভিন্নভাবে পরিচিতি দিয়েছে।

আর এই সুনামগঞ্জ জেলার ধিরাই উপজেলার কালনী নদীর তীর ঘেঁষা এক গ্রাম উজানধল। সেই গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯১৬ সালের মঙ্গলবার জন্মগ্রহণ করেন শাহ আব্দুল করিম। ভাটি অঞ্চলের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী নিয়মিত পালাগান, ঘাটুগান, গাজীরপালা ও বাউল গানের আসর দেখে দেখেই বড় হয়ে উঠতে থাকেন আব্দুল করিম।

শিশুকাল থেকেই গানের জগতের সাথে করিমের সখ্যতা। গ্রামে গ্রামে ঘুরে পালাগানের অনুষ্ঠান দেখে ছোটকাল থেকেই গানবাজনার প্রতি ঝোঁক তৈরি হয় তার। কিন্তু পারিবারিক কারণে এতটুকুন বয়সেই তাকে হাওরে গরু চরানোর কাজে যোগ দিতে হয়। গরু রাখার ফাঁকে ফাঁকে নৈশ বিদ্যালয়ে কিছুদিন লেখাপড়া করে কোনোমতে অক্ষরজ্ঞান অর্জন করেছিলেন আব্দুল করিম।

সারাদিন হাওরে গরু চড়াতে গিয়ে বিস্তৃর্ণ হাওরের বিশালতা কিশোর আব্দুল করিমের মনে সুরের রেখাপাত করে। রাখালিয়া একাকিত্বের মাঝে গানের সুর আব্দুল করিমকে প্রভাবিত করে। সুরের মায়ায় জড়িয়ে পরেন। সুযোগ পেলেই মাঠেঘাটে, বটতলায়,  গ্রামের আকাঁবাঁকা পথে রাখালদের সাথে দল বেঁধে গান গাইতেন তিনি। সহজ-সরল গ্রাম্য সাধারণ মানুষ ও রাখাল দল ছিল তার গানের শ্রোতা-দর্শক।

এভাবেই সুরের জ্বাল আব্দুল করিমকে শক্ত হাতে ধরে ফেলে, যার বাধঁন থেকে তিনি আর বের হতে পারেন নি। অল্প বয়সেই হাতে তুলে নেন একতারা, এরপর নিরুদ্দেশ যাত্রা, একস্থান থেকে অন্যস্থানে, গ্রাম থেকে শহর, শহর থেকে গ্রামে। সেই যে বেরিয়ে পরলেন সুরের টানে। তারপর আর নিজের দিকে তাকাবার সময় পর্যন্ত পেলেন না। শুরু হলো তার সুরের সাধনা। তিনি তার গানে তার পারিবারিক পরিচয় তুলে ধরেছেন এভাবে-

পিতা ইব্রাহীম আলী, মাতা নাইওরজান,
ওস্তাদ সমরু মিয়া মুন্সি পড়াইলেন কোরান।
একতারা সম্বল, সরলা­­ সঙ্গীনি নিয়ে থাকি উজানধল।।

শাহ্ আব্দুল করিমের সংগীত

গুরুমুখী সংগীত জীবনের প্রথমে আব্দুর করিম বাউল সাধক রশিদউদ্দিনের দলে যোগ দেন, এরপর শাহ ইব্রাহীম মাস্তানের কাছে গানের শিক্ষা নেন। যিনি মাওলা বখসের অনুসারী ছিলেন। এরপর আব্দুল করিম শরিয়তি, মারফতি, দেহতত্ত্ব, গণসংগীতসহ বাউল গান ও গানের অন্যান্য শাখার চর্চাও করেছেন।

তার এই সুর ও সংগীতের সাধনায় পরিবার থেকে বাঁধা না দেয়ায় আব্দুল করিম মনেপ্রাণে আঁকড়ে ধরে গানের সাধনা চালিয়ে যেতে লাগলেন। তিনি গানের অনুপ্রেরণা পেয়েছেন বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ, পাঞ্জু শাহ,দুদ্দু শাহ-এর ভাব দর্শন থেকে। এভাবেই কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে উপনীত হন আব্দুল করিম। তার গানেও যৌবনের ছোঁয়া স্পষ্ট হয়ে উঠে-

‘বসন্ত বাতাসে  সইগো বসন্ত বাতাসে,
বন্ধুর বাড়ীর ফুলের গন্দ আমার বাড়ি আসে…’

এই সংগীত সাধনায় তিনি জীবনকে দেখতে শুরু করেন ভিন্ন চোখে। জীবনের গভীর-সূক্ষ্ম অনুভুতিগুলো তার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করে। তিনি বুঝতে শুরু করেন, আমাদের পরিচিত এই জগৎটা মায়ার জগৎ।

মানব হৃদয় সহজে মায়ার জ্বালে আটকা পরে অথচ সে মায়া দেখা যায় না, ছোয়া যায় না। শুধু অনুভব করা যায়। সে মায়ার আগুনে যে পুড়ে সেই জানে এ কেমন জাদুর খেলা। মায়া ও দয়ামাখা সেই জাদুকরি সুরের মুর্ছনা ফুঁটে উঠে তার অনেক বিখ্যাত গানে-

‘বন্দে মায়া লাগাইছে পিরিতি শিখাইছে
কি জাদু করিয়া বন্দে মায়া লাগাইছে…’

‘কেমনে ভুলিব আমি বাচিনা তারে ছাড়া
আমি ফুল বন্দু ফুলের ভ্রমরা, সখি গো…’

‘তুমি বিনে আকুল পরান থাকতে চায় না ঘরেরে
সোনা বন্ধু ভুইল না আমারে, আমি এই মিনতি করিরে…’

ছেলের এমন মতিগতি দেখে কৃষক পিতা ইব্রাহীম আলী আব্দুল করিমকে ঘরমুখি করার জন্য অল্প বয়সেই বিয়ে করিয়ে দিলেন। এ সময় সংসার চালানোর জন্য আব্দুল করিমকে কৃষিকাজ ব্যস্ত থাকতে হলেও সুর সৃষ্টি করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি নিজেকে। সংসার জীবন সুখের হলেও দারিদ্রতা তার জীবনে যে প্রভাব ফেলেছিল তাও তার গানে উঠে এসেছে-

‘টাকাপয়সা না জমাইয়া বিয়া করে কোন বেয়াক্কলে
আমি মরলাম নিজের আক্কলে,
ভাই বন্দু সবাই মিলিয়া দিল আমায় বিয়া করাইয়া
আমার গলায় ফাঁসি দিয়া হাসে তারা সক্কলে।।’

ছোটকাল থেকেই তিনি দেখে এসেছেন গ্রামের সরল-সহজ সাধারণ মানুষ সারিন্দা বাজিয়ে গান গাইত। সন্ধ্যা হলে ঘরের মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে সুরে সুরে পুথিঁ পড়ত, গাজির গান গাইত। এইসব গান শুনতে অসংখ্য দর্শক শ্রোতার আগমন ঘটত। হিন্দু মুসলমান এক সারিতে বসে গান শুনতো, কোনো প্রকার হিংসা-বিদ্বেষ, রেষা-রেষি ছিল না, বাংলার এসব সহজাত কথাও তার গানে তিনি তুলে ধরেছেন-

‘গ্রামের নজোয়ান হিন্দু মোসলমান,
জারি-সারি মুরশিদি আর বাউলাগান গাইতাম,
আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম….’

বাংলার লোকসংস্কৃতির আকাশে বাউল সংগীত বিশাল জায়গা দখল করে আছে। ধারণা করা হয়, সংস্কৃতিতে ‘বাউরা’ শব্দ থেকে ‘বাঊল’ শব্দের উৎপত্তি। আবার কোনো কোনো গবেষক মনে করেন, ‘বাউ’ মানে বাতাস, আর ‘উল’ মানে সন্ধান অর্থাৎ সাধনা সিদ্ধির জন্য বাউলরা যে পরমাত্মার সন্ধান করে থাকে তাতে দেহের ভেতরে বাতাস বা দমের যে সাধন করে তার থেকে বাউল শব্দের উৎপত্তি।

সাধকবাউলরা গৃহত্যাগী স্বভাবের হলেও করিম এখানে ব্যতিক্রম। শাহ আব্দুল করিম তার বিভিন্ন গানে নিজেকে বাউল আখ্যায়িত করলেও প্রথাগত বাউল থেকে তিনি ছিলেন আলাদা। তিনি একি সাথে গান-সংসার দুটিই চালিয়ে গেছেন।

আব্দুল করিমে স্ত্রীর নাম ছিল আপ্তাবুন্নেসা। যাকে তিনি আদর করে ‘সরলা’ নামে ডাকতেন। তিনি তার স্ত্রীকে অত্যন্ত ভালবাসতেন। তার এই সঙ্গীত সাধনায় স্ত্রীরও অনেক প্রেরণা ছিল, তাই আব্দুল করিম তার প্রথম গানের বইয়ের নাম দিয়েছেন ‘আপ্তাব সংগীত’।

‘আপ্তাব সংগীত’ ছাড়াও তার আরো  টি গানের বই প্রকাশিত হয়েছে- ‘গণ সংগীত’ (১৯৫৭), এর পরে কালিনীর ঢেউ (১৯৮১), ধল মেলা (১৯৯০), ভাটির চিঠি (১৯৯৮) এবং কালিনীর কূলে ইত্যাদি।

অভাব অনটনে দিন কাটলেও সংসার জীবন সুখের ছিল আব্দুল করিমের। হঠাৎ অসুখে স্ত্রীর অকাল মৃত্যু শাহ আব্দুল করিমকে প্রচণ্ড ব্যথিত করে। আদরের স্ত্রী সরলাকে হারিয়ে আব্দুল করিম দিশেহারা হয়ে হয়ে পরেন। প্রিয়তমা স্ত্রীর শোক কাঠিয়ে উঠতে পারেননি। তাই প্রিয়তমা স্ত্রীর সমাধি দিয়েছেন বসত ঘরের উঠানের উঠানে। স্ত্রীকে নিয়ে লিখেছেন-

‘কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু ছেড়ে যাইবা যদি,
কেমনে রাখিব তোর মন আমার আপন ঘরে বাধিঁরে বন্ধু
ছেড়ে যাইবা যদি…’

আব্দুল করিম লোকজ, আধুনিক, প্রেম, বিরহ ও বিচ্ছেদধর্মী বহু গানও রচনা করেছেন। তার গানে যেমন আধ্যাত্বিকতার ছোঁয়া রয়েছে তেমনি দেহতত্ত্বের কথাও রয়েছে-

চন্দ্র-সুর্য বান্ধা আছে নায়েরই আগায়
দূরবীনে দেখিয়া পথ মাঝি-মাল্লায় বায়
ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নায়।

নাড়ীর টান কিংবা মাটির ঘ্রাণ ফুঁটে উঠেঁছে তার গানে। বাঙ্গালীর শিকড়ের সন্ধান পাওয়া যায় তার অতি আশ্চর্য প্রানর্স্পষী সুরের মূর্ছনায়। চমকপ্রদ সুরের হাতছানি ও নতুনত্বের ছোঁয়া লক্ষ্য করা যায় তার গানের মধ্যে। কোনো অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার পর তিনি নিজেকে সার্থক ও সফল মনে করতেন। তিনি মনে করতেন গান ছাড়া তিনি অসর্ম্পূ মানুষ।

তার ধ্যান, সাধনা, জীবন, সবই তার গান। তার ইচ্ছা-আকাংঙ্খা, চাওয়া-পাওয়া সবকিছুই তার গানের মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায়। তিনি গানের মধ্যেই তার প্রিয় মানুষকে খুঁজে পান। আবার এ গানের একাগ্রতায় তার প্রিয় মানুষ অনাদরে অবহেলায় হারিয়ে যায়। এক সময় গান তার মনের প্রিয়সীতে রুপান্তরিত হয়। গানের মাঝে তিনি তার প্রিয় সখি ও পরম স্রষ্টাকে খুঁজে বেড়ান। তার মনের এ আকুতি তার একটি গানের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে-

“গান গাই আমার মনরে বুঝাই
মনটা কি পাগল পারা,
আর কিছু চায় না মনে গান ছাড়া।।”

এদেশে বিশেষ একটি শ্রেণী সব সময় বাউল শিল্পীদের সামাজিকভাবে চাপের মধ্যে রাখে। জারি করে নানা ফতোয়া। সাধক আব্দুল করিমের ক্ষেত্রেও এর ব্যাতিক্রম হয়নি। গান গাওয়ার অপরাধে যৌবনে স্থানীয় ধর্মান্ধ মোল্লা-মৌলভীরা তার সুর কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করলেও তিনি বীরত্বেও সাথে তা মোকাবেলা করেছেন।

এসকল বাঁধাবিপত্তিকে চ্যালেঞ্জ হিসাবে গ্রহণ করে তার সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে জবাব দিয়েছেন। তিনি তাদের সাথে এক ধরনের যুদ্ধ করলেও আপন সৃষ্টিকর্ম থেকে পিছু হটেন নি। যারা তাকে গান গাইতে বাঁধা দিয়েছিল তাদেরই সন্তানরা যখন জীবদ্ধশায় তাকে গুণীজন হিসাবে সংবর্ধনা দিয়েছির তখন আব্দুল করিমের মনের তৃপ্তি কিছুটা মিটেছিল।

দেড় হাজারেরও বেশি গানের লেখক, সুরকার ও শিল্পী শাহ আব্দুল করিম জীবনের গোড়া থেকেই যেমন গান লিখতেন তেমনি নিজেই তার গানের সুর দিতেন।

তার গান ও মননে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রকাশ স্পষ্ট। তিনি বিশ্বাস করতেন আপন আদর্শ ও খেয়ালে নিজস্ব একটা জগৎ সৃৃৃৃষ্টি করা সম্ভব। তার সৃষ্টি দিয়ে শ্রোতার মন জয় করে তার প্রমাণ রেখেছেন। আমাদের দেশের বাউল সাধক ও মরমী কবি হাসন রাজা, লালন শাহ, মজনুশাহ, আরকুমশাহ, শিতালংশাহ ও রাধারমনদের জীবন ধারায় প্রভাবিত তার শিল্পী জীবন।

তার গান যেমন সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল তেমনি বুদ্ধিজীবি ও শিক্ষিত মহলে ও আলোড়ন তুলেছিল। জীবনে কোনোদিনই তার ধন সম্পদের প্রতি আকর্ষণ ছিল না। অবশিষ্ট রাখার চিন্তা ও কোনোদিন করেননি। জমার খাতা শূণ্য থাক এ নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন বাউল করিম।

আরাম-আয়শের জীবন কোনোদিনই চিন্তা করেননি। গ্রাম্য জীবন ত্যাগ করে শহর জীবনের অনেক প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন অকপটে। গান গেয়ে তিনি বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন কোনোদিন দেখেননি। তিনি সবসময় নিজ সৃষ্টিকর্ম দিয়েই অমর হতে চাইতেন। এ স্বপ্ন তার সার্থক হয়েছে।

তিনি মনে করতেন একজন বাউলের জীর্ণ কুটিরই তার উপযুক্ত স্থান। অফুরন্ত প্রাণপ্রাচুর্য্যে উদ্দামী এক বাউল যার দুটি চোখের গভীরতা প্রমাণ করে তিনি কতটা উদার ও প্রাণবন্ত এক শিল্পী। অপরাজিত সৃজনী শক্তির পরিচয় ছড়িয়ে রয়েছে তার গানের সুরের বৈচিত্রতায়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১১শত টাকা দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমার মতো শিল্পীকে উপযুক্ত মর্যাদা দেয়া হবে।’ গ্রাম বাংলার মানুষের হৃদয় জয়করা গানের মধ্যদিয়েই শাহ আব্দুল করিম বেঁচে থাকবেন।

১৯৫২’এর ভাষা আন্দোলন, ৬৯’এর গনআন্দোলন, ৭১এর মুক্তিযুদ্ধ, ৯০’এর গণ অভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন সময় স্বরচিত গণসংগীত পরিবেশন করে যেমন সাধারষ মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তেমনি জনসাধরণকে দেশ মাতৃকার টানে উদ্বুদ্ধ করেছেন। গণসংগীতে মুগ্ধ মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানি তার পিঠে হাত রেখে বলেছিলেন, ‘বেঠা গানের একাগ্রতা ছাড়িও না; তুমি একদিন গণমানুষের শিল্পী হবে।’

হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী তার গণসংগীত শুনে খুশি হয়ে একশত পঞ্চাশ টাকা পুরস্কার দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১১শত টাকা দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমার মতো শিল্পীকে উপযুক্ত মর্যাদা দেয়া হবে।’ গ্রাম বাংলার মানুষের হৃদয় জয়করা গানের মধ্যদিয়েই শাহ আব্দুল করিম বেঁচে থাকবেন। যুগ যুগ ধরে মানুষের কণ্ঠে অনুরণিত হবে তার অমর সৃষ্টি গানগুলি-

‘তুমি আমায় যা দিয়েছো
কি দেব তার প্রতিদান,
মন মজালে ওরে বাউলা গান…’

তার এরকম অসংখ্য গান আছে যার আবেদন যুগ যুগ ধরে শ্রোতাদের হৃদয় নাড়া দেবে। কালিনী নদীর স্বচ্ছ পানির মতো তার প্রশান্ত দুই চোখের মায়াবী ভাষা, তার সাম্যবাদী মনোভাব, মানবতাবোধ উজ্ব্বল নক্ষত্র হয়ে জলজল করবেন হাজার হাজার সংগীত প্রেমী-গণমানুষের হৃদয়ে। শাহ আব্দুল করিমের গান ভাটিঅঞ্চলে জনপ্রিয় হলেও শহরের মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পায় তার দেহত্যাগের মাত্র কয়েকবছর আগে।

আব্দুল করিম জীবনের শেষ সময়টুকু নিজ গ্রাম উজান ধল গ্রামে কাটিয়েছেন। শেষ বয়সে এসেও শাহ আব্দুল করিম ভাঙ্গা গলায় বাড়ির পাশে খোলা ময়দানে তার ভক্ত সঙ্গীদের নিয়ে আসর জমাতেন। তার এই গানে তিনি বলে গিয়েছেন-

‘তুমি আমায় যা দিয়েছো
কি দেব তার প্রতিদান,
মন মজালে ওরে বাউলা গানভভ’

সাদা ধুতির মতো লুঙ্গি ও পাঞ্জাবী পরা লম্বা-চওড়া দেহের এক মরমী কবি শাহ্ আব্দুল করিম। বয়সের ভারে শরীর ভাঙ্গলেও মন ভাঙ্গার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি কখনো। তীক্ষ্ম অর্ন্তভেদী, উজ্জল দুটি চোখ, চিরাচরিত সহজসরল হাস্যমুখ। ক্লিন সেইভ। বুকের দিকে তাকালে মনে হতো জীবনে অসংখ্য ঝড়-ঝঞ্জা বুকের খাদ দিয়ে বয়ে গেছে। কাঁধ পর্যন্ত ঝুলে পরা গুটিকতক সাদা চুল।

দেখলেই মনে হতো যৌবনের ঝাকড়া চুলের এক উদ্দ্যামী সুপুরুষ। শেষ বয়সে স্মৃৃৃৃতিশক্তি ও বাকশক্তি দুটিই একসঙ্গে হারিয়ে ছিলেন। ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর শাহ আবদুল করিম পৃথিবীর সকল মায়া ছেড়ে দেহত্যাগ করেন।

তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী উজান ধল গ্রামে স্ত্রী সরলা বিবির কবরের পাশে সমাহিত করা হয়। গ্রাম বাংলার মানুষের হৃদয় জয়করা শাহ আব্দুল করিম আজীবন বেঁচে থাকবেন তার সৃষ্টির মাধ্যমে। কালনির ঢেউয়ের মতো শাহ আব্দুল করিমের গানের মর্মবাণী বেঁচে থাকবে মানুষের অন্তরে অন্তরে।   

শাহ্ আব্দুল করিমের সৃষ্টিকর্ম

স্বশিক্ষিত বাউল শাহ আব্দুল করিম এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ শতাধিক গান লিখেছেন এবং সুরারোপ করেছেন। বাংলা একাডেমীর উদ্যোগে তাঁর ১০টি গান ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময় তার সাহায্যার্থে এগিয়ে এলেও তা তিনি কখনোই গ্রহণ করেননি।

উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে সাউন্ড মেশিন নামের একটি অডিও প্রকাশনা সংস্থা তার সম্মানে জীবন্ত কিংবদন্তীঃ বাউল শাহ আবদুল করিম নামে বিভিন্ন শিল্পীর গাওয়া তার জনপ্রিয় ১২টি গানের একটি অ্যালবাম প্রকাশ করে। এই অ্যালবামের বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ তাঁর বার্ধক্যজনিত রোগের চিকিৎসার জন্য তার পরিবারের কাছে তুলে দেয়া হয়।

২০০৭ সালে বাউলের জীবদ্দশায় শাহ আবদুল করিমের জীবন ও কর্মভিত্তিক একটি বই প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হয়, ‘শাহ আবদুল করিম সংবর্ধন-গ্রন্থ’ (উৎস প্রকাশন) নামের এই বইটি সম্পাদনা করেন লোকসংস্কৃতি গবেষক ও প্রাবন্ধিক সুমনকুমার দাশ।

শিল্পীর চাওয়া অনুযায়ী ২০০৯ সালের ২২ মে সিলেট বিভাগীয় কমিশনার ও খান বাহাদুর এহিয়া ওয়াকফ এস্টেটের মোতাওয়াল্লি ড. জাফর আহমেদ খানের উদ্যোগে বাউল আব্দুল করিমের সমগ্র সৃষ্টিকর্ম নিয়ে গ্রন্থ ‘শাহ আবদুল করিম রচনাসমগ্র’ প্রকাশিত হয়। বইটির পরিবেশক বইপত্র। শাহ আবদুল করিমের জনপ্রিয় কিছু গান।

শাহ্ আব্দুল করিমের প্রকাশিত বই

বাউল শাহ আবদুল করিমের এ পর্যন্ত ৭টি গানের বই প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন আগে সিলেট জেলা পরিষদ মিলনায়তনে তাঁর রচনাসমগ্র (অমনিবাস)-এর মোড়ক উন্মোচিত হয়েছে।

এছাড়াও সুমনকুমার দাশ সম্পাদিত শাহ আব্দুল করিম স্মারকগ্রন্থ (অন্বেষা প্রকাশন) তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। এর আগে-পরে শাহ আবদুল করিমকে নিয়ে সুমনকুমার দাশের ‘বাংলা মায়ের ছেলে : শাহ আবদুল করিম জীবনী’ (অন্বেষা প্রকাশন), ‘সাক্ষাৎকথায় শাহ আবদুল করিম’ (অন্বেষা প্রকাশন), ‘শাহ আবদুল করিম’ (অন্বেষা প্রকাশন), ‘বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিম’ (উৎস প্রকাশন), ‘গণগীতিকার শাহ আবদুল করিম’ (উৎস প্রকাশন) প্রকাশিত হয়।

সর্বশেষ ২০১৬ সালে ঢাকার প্রখ্যাত প্রকাশনাসংস্থা প্রথমা থেকে প্রকাশিত হয় সুমনকুমার দশের ‘শাহ আবদুল করিম : জীবন ও গান’ বইটি। এ বইটি ইতোমধ্যেই একটি প্রামণ্য জীবনী হিসেবে বোদ্ধামহলে স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছে। এ বইটিতে করিমের নির্বাচিত বেশ কিছু গানও সংকলিত হয়েছে। শাহ আবদুল করিমের জীবনভিত্তিক প্রথম উপন্যাস সাইমন জাকারিয়া রচিত ‘কূলহারা কলঙ্কিনী’ প্রকাশিত হয়েছে ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে।

শাহ্ আব্দুল করিমের বইয়ের তালিকা

  • আফতাব সঙ্গীত (১৩৫৫ বাংলা; আনুমানিক ১৯৪৮)
  • গণ সঙ্গীত (১৯৫৭)
  • কালনীর ঢেউ (১৩৮৮ বঙ্গাব্দের আশ্বিন; ১৯৮১ সালের সেপ্টেম্বর)
  • ধলমেলা (১৩৯৬ বঙ্গাব্দের ১ ফাল্গুন; ১৯৯০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি)
  • ভাটির চিঠি (১১ বৈশাখ ১৪০৫; ২৪ এপ্রিল ১৯৯৮)
  • কালনীর কূলে (নভেম্বর ২০০১)
  • শাহ আব্দুল করিম রচনাসমগ্র (সংকলন ও গ্রন্থন: শুভেন্দু ইমাম, ২২ মে ২০০০)

শাহ্ আব্দুল করিমের প্রাপ্ত সম্মাননা

বাউল শাহ আব্দুল করিম ২০০১ সালে একুশে পদক লাভ করেন। বাংলা একাডেমি তার দশটি গানের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করে। শাকুর মজিদ তাকে নিয়ে নির্মাণ করেছেন ভাটির পুরুষ নামে একটি প্রামাণ্য চিত্র। এছাড়াও সুবচন নাট্য সংসদ তাকে নিয়ে শাকুর মজিদের লেখা মহাজনের নাও নাটকের ৮৮টি প্রদর্শনী করেছে।

  • একুশে পদক (২০০১)
  • কথা সাহিত্যিক আবদুর রউফ চৌধুরি পদক (২০০০)
  • রাগীব-রাবেয়া সাহিত্য পুরস্কার (২০০০)
  • লেবাক এ্যাওয়ার্ড (২০০৩)
  • মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার আজীবন সম্মাননা (২০০৪)
  • সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস আজীবন সম্মাননা (২০০৫)
  • বাংলাদেশ জাতিসংঘ সমিতি সম্মাননা (২০০৬)
  • খান বাহাদুর এহিয়া পদক (২০০৮)
  • বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী সম্মাননা (২০০৮)
  • হাতিল এ্যাওয়ার্ড (২০০৯)
  • এনসিসি ব্যাংক এনএ সম্মাননা (২০০৯)

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

…………………..
আরও পড়ুন-
সাধক ভবা পাগলা
শাহ্ আব্দুল করিম : জীবনী ও গান
সাধক রাধারমণ দত্ত
মহর্ষি মনোমোহন ও মলয়া সঙ্গীত
মোহন চাঁন বাউল
হাসন রাজা: বাংলার এক রাজর্ষি বাউলের মর্মপাঠ: এক
হাসন রাজা: বাংলার এক রাজর্ষি বাউলের মর্মপাঠ: দুই
হাসন রাজা: বাংলার এক রাজর্ষি বাউলের মর্মপাঠ: তিন
জালাল উদ্দীন খাঁর তত্ত্বদর্শন : পর্ব-১

জালাল উদ্দীন খাঁর তত্ত্বদর্শন : পর্ব-২
জালাল উদ্দীন খাঁর তত্ত্বদর্শন : পর্ব-৩
জালাল উদ্দীন খাঁর তত্ত্বদর্শন : পর্ব-৪
জালাল উদ্দীন খাঁর তত্ত্বদর্শন : পর্ব-৫
জালাল উদ্দীন খাঁর তত্ত্বদর্শন : পর্ব-৬
জালাল উদ্দীন খাঁর তত্ত্বদর্শন : পর্ব-৭

প্রাসঙ্গিক লেখা

1 Comment

  • sohel ahmad , শনিবার ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২০ @ ৮:৫৫ অপরাহ্ন

    বাউল শাহ আব্দুল করিম তার গানের মধ্যে বেঁচে থাকবেন। তার গানের ধরন, দর্শন ব্যতিক্রম ধর্মী বলতে হবে। কেউ একজন কত টাকা দিল তা দিয়ে তাকে মাপার অবকাশ নাই। শাহ আব্দুল করিম একজনই। এ ধরণের কোটেশন অবান্তর।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!