ব্রাহ্মসামাজ

স্তুতি

হে মঙ্গলময় বিশ্ব-বিধাতা পরমপুরুষ, তোমার চরণে আমরা সপরিবারে বসিয়াছি। যদিও জানি তুমি আমাদের স্তুতির অপেক্ষা কর না এবং আমাদের এই ক্ষুদ্র রসনা এমন কিছুব লিতে পারে না, যাহা তোমার মহিমাকে আংশিক রূপেও প্রকাশ করিতে পারে, তথাপি, হে বিভো, তোমার স্মরণে ও মননে আমাদের আনন্দ। আমরা ইচ্ছা করিয়া এ জগতে আসি নাই, তুমি আমাদিগকে জন্ম দিয়াছ বলিয়া আমরা জীবন লাভ করিয়াছি।

যদ্দারা আমাদের জীবন রক্ষা পাইয়াছে, যে সকল বস্তু আমরা সৃষ্টি করি নাই ; তোমার মঙ্গলবিধানেই আমরা সে সকল পাইয়াছি। তুমি আমাদিগকে তোমার এই সুন্দর জগতে রাখিয়া আমাদের দেহ মন ও আত্মাকে পালন করিতেছ। আমাদিগকে যেমন চক্ষু কর্ণ ইন্দ্রিয় সকল দিয়াছ, তেমনি সে ইন্দ্রিয়গণকে পরিতৃপ্ত করিবার জন্য কত রূপ কত রস কত গন্ধে জগৎকে পূর্ণ করিয়াছ।

যেমন আমাদিগকে জ্ঞানের ও বিচারের শক্তি দিয়াছ, তেমনি জ্ঞানের সামগ্রী সকলকে জলে স্থলে শূণ্যে সর্ব্বত্র প্রসারিত রাখিয়াছ। যেমন আমাদিগকে হৃদয় দিয়াছ, তেমনি স্নেহ দয়া দাম্পত্য-প্রেম বন্ধুতা প্রভৃতি নানা সদ্ভাবে মানবসমাজকে পূর্ণ করিয়াছ। সর্ব্বোপরি, আমাদিগকে যেমন অমর আত্মা দিয়াছ, তেমনি নিজে সেই আত্মার ক্ষুধার অন্ন ও পিপাসার বারি হইয়া রহিয়াছ।

এই যে আমরা তোমাকে জানিতে ও প্রীতি করিতে পরিতেছি, ইহাতেই আমাদের মনুষ্যত্ব ও মহত্ব। ইহাতেই আমাদের আত্মার জীবন। সন্তানগণ যেমন জনক-জননীর নিকট যায়, তেমনি আমরা যে আমাদের দু:খকষ্টের বোঝা লইয়া তোমার চরণে আসিতে পারিতেছি, ইহা আমাদের অমূল্য অধিকার। তুমি আমাদের প্রতি কত প্রকারে কৃপা করিয়াছ ; এই কৃপা তাহার মধ্যে সর্ব্বশ্রেষ্ঠ কৃপা যে আমরা তোমার সহিত প্রীতির যোগ নিবদ্ধ করিতে পারি।

আমরা তোমাকে কত ধন্যবাদ করিব? তুমি আমাদিগকে এত সুখের সামগ্রী দিয়া অবশেষে সুখের ভরা পূর্ণ করিবার জন্য আপনাকে জানিতে দিয়াছ। আমাদের এই গৃহ পরিবারে তোমার পবিত্র আসন ; আমাদের সকল সম্বন্ধের মধ্যে তোমার হাত ; আমরা যে একত্রে বসিয়াছি, তাহা তুমি আমাদিগকে একত্রে বাঁধিয়াছ বলিয়া। তোমাকে আর দূরে অন্বেষণ করিতে হইবে না, তুমি আমাদের গৃহে, আমাদের হৃদয়ে।

জ্ঞানে গভীরতা, প্রেমে বিশালতা, চরিত্রে সংযম, কর্ত্তব্যজ্ঞানে দৃঢ়তা ও নরসেবা-এই যে পূর্ণাঙ্গ সাধু চরিত্রের আদর্শ, ইহা যেন আমাদের গৃহ পরিবারে আমরা সাধন করিতে পারি। তুমি আমাদিগকে যে সুখ সম্পদ দিয়াছ তাহা কেবলমাত্র আমাদের নিজের জন্য নহে, তাহা অপরেরও জন্য, ইহা যেন সর্ব্বদা স্মরণ রাখিতে পারি। আমাদিগকে সর্ব্ববিধ পাপ হইতে রক্ষা কর এবং দিন দিন তোমার পথে অগ্রসর কর।

আর্শীব্বাদ কর আমরা তোমার মঙ্গল ছায়া যেন গৃহের মধ্যেই দেখিতে পাই ; তোমার প্রসাদ যেন এই জীবনেই অনুভব করি ; তোমার প্রতি যেন আমাদের প্রীতি অর্পিত থাকে এবং সেই প্রীতি যেন আমাদের দাম্পত্য প্রেম, স্নেহ, বাৎসল্য, বন্ধুতা, সকলকে পবিত্র ও মধুময় করে। আমরা যেন বিমল হৃদয়ে তোমার প্রিয় কার্য্য অনুষ্ঠান করিতে পারি এবং পরস্পরের সাহায্যে তোমাকে আরও উজ্জ্বল রূপে জানিতে ও প্রীতি করিতে পারি।

হে বিভো, আমাদের মৌখিক পূজা কিছুই নয়; আমরা যেন আমাদের সমগ্র জীবন ও চরিত্রের দ্বারা তোমার পূজার উপযুক্ত হইতে পারি ; যেন হৃদয় মনকে নির্ম্মল রাখিয়া এবং জীবনের কর্ত্তব্য সকল সুচারু রূপে সম্পন্ন করিয়া, তোমার চরণে বসিবার উপযুক্ত হই।

জ্ঞানে গভীরতা, প্রেমে বিশালতা, চরিত্রে সংযম, কর্ত্তব্যজ্ঞানে দৃঢ়তা ও নরসেবা-এই যে পূর্ণাঙ্গ সাধু চরিত্রের আদর্শ, ইহা যেন আমাদের গৃহ পরিবারে আমরা সাধন করিতে পারি। তুমি আমাদিগকে যে সুখ সম্পদ দিয়াছ তাহা কেবলমাত্র আমাদের নিজের জন্য নহে, তাহা অপরেরও জন্য, ইহা যেন সর্ব্বদা স্মরণ রাখিতে পারি। আমাদিগকে সর্ব্ববিধ পাপ হইতে রক্ষা কর এবং দিন দিন তোমার পথে অগ্রসর কর।

পূর্ব্বোক্ত স্তুতির পর সেই দিনের উপযোগী প্রার্থনা হইবে। সর্ব্বশেষ সকলে সমস্বরে একটি বন্দনা সঙ্গীত গান করিলে ভাল হয়। অধব নিম্নলিখিত স্তোত্র দুইটির মধ্যে কোনও একটি পাঠ পূর্ব্বক উপাসনা সাঙ্গ করিবেন।

স্তোত্র (১)
ওঁ নমস্তে সতে, তে জগৎকারণায়,
নমস্তে চিতে, সর্ব্বলোকাশ্রয়ায়।

নমোহদ্বৈততত্ত্বায়, মুক্তিপ্রদায়,
নমো ব্রহ্মণে ব্যাপিনে শাশ্বতায়।

ত্বমেকং শরণ্যং, ত্বমেকং বরেণ্যং,
ত্বমেকং জগৎপালং, স্বপ্রকাশম্।

ত্বমেকং জগৎকৃর্ত্তৃ-পাতৃ-প্রহর্ত্তৃ,
ত্বমেকং পরং নিশ্চলং নির্ব্বিকল্পম্।

ভযানাং ভয়ং, ভীষণং ভীষণং,
পতি: প্রাণিনাং, পাবনং পাবনানাম্।

মহোচ্চৈ: পদানাং নিয়ন্তৃত্বমেকং,
পরেষাং পরং, রক্ষণং রক্ষণানাম্।

বয়ন্ত্বাং স্মরামো বয়ন্ত্বাজামো
বয়ন্ত্বাং জগৎ সাক্ষিরূপং নমাম:,

সদেকং নিধানং নিরালম্বশশিং
ভবান্ভোধিপোতং শরণ্যং ব্রজাম:।

তুমি সংস্বরূপ ও জগতের কারণ এবং জ্ঞানস্বরূপ ও সকলের আশ্রয়, তোমাকে নমস্কার ; তুমি মুক্তিদাতা, অদ্বিতীয়, নিত্য ও সর্ব্বব্যাপী ব্রহ্ম তোমাকে নমস্কার। তুমিই সকলের আশ্রয়স্তান, তুমিই কেবল বরণীয়, তুমিই এক এই জগতের পালক ও স্বপ্রকাশ, তুমিই জগতের সৃষ্টিস্থিতি প্রলয়কর্ত্তা ; তুমিই সকলের শ্রেষ্ঠ, নিশ্চল ও দ্বিধাশূন্য।

তুমিই সকল ভয়ের ভয় ও ভয়ানকের ভয়ানক ; তুমিই প্রাণিগণের গতি ও পাবনের পাবন ; তুমিই মহোচ্চ পদ সকলেই ননিয়ন্তা, শ্রেষ্ঠ হইতেও শ্রেষ্ঠ এবং রক্ষকদিগের রক্ষক। আমরা তোমাকে স্মরণ করি, আমরা তোমাকে ভজনা করি, তুমি জগতের সাক্ষী, আমরা তোমাকে নমস্কার করি। সত্যস্বরূপ, আশ্রয়স্বরূপ, অবলম্বরহিত, সংসার সাগরের তরণী, অদ্বিতীয় ঈশ্বরের শরণাপন্ন হই।

অথবা এই স্তোত্র পাঠ করিবেন-
স্তোত্র (২)

নমো নমস্তে ভগবন্, দীনানাং শরণ প্রভো!
নমস্তে করুণাসিন্ধো! নমস্তে মোক্ষদায়ক!

পিতা পাতা পবিত্রতা তমেকং শরণং সুহৃৎ,
গতির্মুক্তি: পরা সম্পৎ, ত্বমেব জগতাং পতি:।

পাপগ্রাহ-সমাকীর্ণে, মোহ-নীহার-সংবৃতে
ভবাব্ধৌ দুস্তরে, নাথ, নৌরেকা ভবত: কৃপা।

ত্বৎ-কৃপা-তরণিং দেহি, দেহি নাথ বরাভয়ং,
মৃত্যুমায়াময়ে ঘোরে সংসারে দেহি মেহমৃতং!

ক্ষিপ্রং ভবতু শান্তাত্মা ভক্তস্তে, ভক্ত-বৎসল,
নির্ব্বাণং যাতু পাপাগ্নি স্ত্বৎপ্রাসাৎ, পরেশ্বর!

হে ভগবন্! হে দীন শরণ। হে প্রভো! তোমাকে বার বার প্রণাম। হে করুণাসিন্ধো, হে মুক্তিদাতা, তোমাকে প্রণাম! তুমি পিতা, পাতা, পরিত্রাতা একমাত্র আশ্রয় ও সুহৃৎ ; তুমি গতি, মুক্তি, পরম সম্পত্তি, তুমিই জগতের পতি।

এই পাপসংকুল ও মোহকুঝ্ঝটিকাবৃত সংসার সাগরে তোমারে কৃপাই তরণিস্বরূপ। হে নাথ সেই তরণি আমাদিগকে দাও। আমাদিগকে বরাভয় দান কর। মৃত্যুমায়াময় এই ঘোর সংসারে আমাদিগকে অমৃতধাম দেখাও। হে ভখ্তবৎসল, তোমার প্রসাদে পাপাগ্নি নির্ব্বাণ হউক ও তোমার ভক্ত ত্বরায় শান্তি লাভ করুক।

…………………………
ব্রাহ্মধর্ম্ম ও ব্রাহ্মসমাজ

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

………
আরও পড়ুন-
ব্রাহ্মসমাজ
সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের সভ্য হইবার যোগ্যতা
ব্রাহ্ম ধর্মের মূল সত্য
ব্রহ্ম মন্দিরের ট্রাস্টডিড
ব্রাহ্মধর্ম্মের মূল সত্য
আত্মা
মানুষের ভ্রাতৃত্ব
উপাসনা ও প্রার্থনা
শাস্ত্র
গুরু
মধ্যবর্ত্তী ও প্রেরিত
সুখ-দু:খ : দু:খবাদ ও আনন্দবাদ
পাপ ও পুণ্য
পুনর্জ্জন্ম
পরকাল
স্বর্গ ও নরক
ধর্ম্ম রক্ষা
পরিবারে পুরুষ ও নারীর অধিকার-সাম্য
ব্রাহ্মসমাজের প্রতি ব্রাহ্মদিগের কর্ত্তব্য
সমবেত উপাসনা
পূর্ণাঙ্গ উপাসনার আদর্শ 
স্তুতি
বিবিধ অবস্থায় প্রার্থনা
নৈমিত্তিক অনুষ্ঠান
সন্তান জন্ম
ব্রাহ্মধর্ম্ম গ্রহণ ও ব্রাহ্মসমাজে প্রবেশ
ধর্ম্মসাধন ব্রতে দীক্ষা
ব্রাহ্মধর্ম্ম গ্রহণ ও ধর্ম্মদীক্ষা
বিবাহ ও তাহার আনুসঙ্গিক অনুষ্ঠান
বিবাহের বাগদান
বিবাহ
মৃত্যু ও অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া
শ্রাদ্ধ
গৃহ প্রবেশ
ব্রহ্ম ও ব্রহ্মের স্বরূপ
ব্রহ্ম ধ্যান
ব্রাহ্মধর্ম
সকলেই কি ব্রাহ্ম?
ব্রাহ্মোপসনা প্রচলন ও পদ্ধতি
আদি ব্রাহ্ম সমাজ ও “নব হিন্দু সম্প্রদায়”
পূর্ণাঙ্গ উপাসনার আদর্শ

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!