মেরাজতত্ত্ব

মেরাজতত্ত্ব

-আবুতালেব পলাশ আল্লী

মেরাজ শব্দের সাধারণ আভিধানিক অর্থ হল ঊর্ধ্বলোকে গমন। যার আরেক ভাবার্থ হল, ‘স্রষ্টার সাথে সাক্ষাৎ’; এটাকে কোরানে ‘ইসরা’ও বলা হয়েছে। সাধারণভাবে আমরা মেরাজ বলতে বুঝি নবীজী পঞ্চম হিজরীতে যেই রাতে সপ্তম আকাশে পরিভ্রমণ করেছিলেন এবং আল্লাহর সাথে দেখা সাক্ষাৎ করেছিলেন।

বলা হয় মেরাজের রাতে সেই ঊর্দ্ধলোকে যাত্রার সময়সীমা ছিল ২৭ বছর। যদিও নবীজী ফিরে আসার পরও দেখা গেছে যে তার ওজুর পানি এখনও নিচে বেয়ে পরছে এবং দরজার শিকল তখনো নড়ছে। অনেকটা পলকে ঝলকের মত সময়।

মেরাজে গমনের সাথে যে বিষয়গুলো জড়িত ছিল তা হল- বোরাকে চড়ে প্রথম আসমান থেকে চৌঠা আসমানে পৌঁছানো। তারপর চৌঠা আসমান থেকে রফরফ নামক নতুন বাহনে করে সপ্তম আসমানে সিদরাতুল মুনতাহায় পৌঁছানো।

রফরফের গতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, এটা মুহূর্তের মধ্যে সপ্ত আসমান-জমিন ভেদ করতে পারে। তবে রফরফের কোনো চিত্র অংকিত না হলেও বোরাকের কিছু কাল্পনিক চিত্র অংকিত করা হয়েছে তাফসীরের আলোকে।

যেখানে বোরাকের চেহারা নারীর প্রতিরূপ। পা ঘোড়ার পায়ের মত। দুই পাশে দুইটি বাজ পাখির বা পরীর পাখা। সিনা বাঘের সীনার মত। আর পিছনের অংশটা ময়ূর পেখমের মত।

আরেকটা বিশেষ বিষয় মনে করা হয় মেরাজের ক্ষেত্রে, সেটা হল সেই দিন নবীজী উম্মে হানীর গৃহে ছিলেন। বিষয়টা তেমন গুরুত্ব বহন না করলেও ভ্রান্ততত্ত্ব জ্ঞান সম্পন্নরা এটা নিয়ে অধিক বারাবারি করে থাকে।

মূলত সেই দিন নবীজী যে ঘরেই থাকতেন বা কেনো, একাও যদি থাকতেন তাহলেও সেই ভাবেই মেরাজ হত। যেভাবে মেরাজ হয়েছিল, সেভাবেই হতো। মূলত তখনো নবীজী একাই ছিলেন। তখন তার সঙ্গী ছিল শুধু স্রষ্টার বার্তাবাহক জিব্রাইল।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল মেরাজের রাতে নবীজীর মক্কা থেকে মসজিদুল আকসায় গমন। মক্কা থেকে মসজিদুল আকসার দূরত্ব সম্পর্কে নবীজী বলছেন, সেখানে যেতে ‘চল্লিশ বছর সময় লাগবে’। এখানেও অনেক গভীর ভেদ রয়েছে।

কারণ হেঁটে গেলেও চল্লিশ বছর লাগার কথা না। আর আজকাল তো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আরো অনেক কম সময় লাগবার কথা। তাই এই দূরত্বেরও রয়েছে গভীর ভেদ, যা নবীজী রূপকভাবে বুঝিয়েছেন।

এখন প্রশ্ন হল আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য নবীজীকে কেন সপ্তম আকাশে যেতে হল? দুনিয়ায় কি তাহলে আল্লাহ নেই? যে আল্লাহ আকাশে দেখা দিতে সক্ষম, তিনি কি দুনিয়ায় দেখা দিতে পারতেন না? আর বোরাক কি এমন বাহন যা কি না চতুর্থ আসমান পর্যন্তই যেতে পারল?

সপ্তম আসমানে যেতে কেনই বা রফরফের প্রয়োজন হল? নবীজী কি আসলেই বোরাক নামক কোনো জন্তুর পিঠে চরে আসমানে গিয়েছিলেন? নাকি সেটাও ছিল রূপক? বোরাকের আকৃতি কেনইবা এমন করা হল? ২৭ বছর অতিক্রম হল অথচ দুনিয়ার কোনো কিছুর পরিবর্তন কেন হল না?

মনে রাখতে হবে, নবীজী তার জীবদ্দশায় সাহাবীদেরকে শরিয়ত, তরকিত, হাকিকত ও মারফত এ চার বিদ্যার শিক্ষায় দিয়েছেন। এর মধ্যে মারফত বা তাসাউফ চর্চায় মোরাকাবার গুরুত্ব অপরিসীম। তরিকতে মোরাকাবা ছাড়া সাধনার স্তর অতিক্রম করার অন্য কোন বিধান নাই।

মোরাকাবার মাধ্যমে মোর্শেদের দেলে, দেল মিশিয়ে আপন হৃদয়ে ফায়েজ ধারণ করতে হয়। মোরাকাবা করলে হৃদয়ের কালিমা বিদূরিত হয়, হৃদয় আলোকিত হয়।

মোরাকাবার নিয়ম হল প্রতি ওয়াক্ত নামাজ শেষে ও রাত্রির তৃতীয় অংশে(রহমতরে সময়) জেগে বা অন্য যে কোন সময় আপন মুর্শিদেরে কদম ধরে সাধনা করা। নিজের জীবনের ভুল-ত্রুটি, বেয়াদবি ক্ষমা চাওয়ার জন্য প্রথমে মোর্শেদ ও পরে নবীজীর উসিলা ধরে আল্লাহর নিকট হাজির হয়ে কাকুতি মিনতি করে প্রার্থনা করা।

অতঃপর আল্লাহর জাত পাক থেকে নবীজীর সিনা হয়ে এবং আপন মুর্শিদের দেল হয়ে বিভিন্ন ওয়াক্তে ফায়েজ নিজ দেলে এসে পড়ে। এতে দেলের সমস্ত খারাপ স্বভাব দূর হয়; দেল পবিত্র হয়।

এভাবে অধিককাল মোরাকাবা করলে দেলের চোখ খুলে যায়। আর ঐ চোখেই কেবল মমিন বান্দার নামাজের মেরাজ হয়ে থাকে। সেকারণেই মোরাকাবা বা আল্লাহর ধ্যানে নিমগ্ন হওয়ার জন্য আল্লাহর বন্ধুর বায়াত গ্রহণ করে দিকনির্দেশনা ও ফায়েজ হাসিল করতে হয়।

মোরাকাবা হল নফল ইবাদত। নফল ইবাদত হল আল্লাহর নৈকট্য লাভের উত্তম পন্থা। তাই মোরাকাবা সাধকের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। নবীজী বলেছেন ১ ঘণ্টা সময় মোরাকাবা করা হাজার বছরের ইবাদত করার চেয়ে উত্তম। নবীজী অন্যত্র বলেছেন, কিছু সময় মোরাকাবা করা ৬০ বছর ইবাদতের চেয়ে উত্তম।

জানা যায়, সাহাবীরাও প্রথমে মোরাকাবা করতেন। পরে আল্লাহর পক্ষ থেকে পর্যায়ক্রমে নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত ইত্যাদি ইবাদত নির্দেশিত হয়েছে। আর এর মধ্যে সবচেয়ে উত্তম নেয়ামত হচ্ছে নামাজ।

নামাজ পড়লে দেল নরম হয়। আল্লাহর সমিপে ও নবীর দোয়া ও মোনাজাত করলে মমিন বান্দার চোখ ভরে পানি পড়ে। মোরাকাবা অন্তরের কালিমাকে পরিষ্কার করে দেয়। শরিয়ত হলো ইসলামের সমূহ আচার আচরণ বা কর্মসূচী।

আর মারফত হলো সেই আচার আচরণ বাস্তবায়নের ফল। অর্থাৎ আত্মিক উপলব্ধি। বলা হয়ে থাকে, যারা শরিয়ত ও মারফত উভয় পালন করে, তারাই নবীজীর প্রকৃত উত্তরাধিকারী ও সিরাতুল মোস্তাকমি পথের যাত্রী হতে পারে।

আত্মশুদ্ধরি জন্য খাঁটি পীর মুর্শিদের সহবত নেওয়া ফরজ। কোরানে বলে হয়েছে, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহর রাসূলকে মান্য কর এবং সাদেকীনদের(অলী-আউলিয়া) সঙ্গ লাভ কর। মারফত ছাড়া বাতেনী রাস্তার অনুসন্ধানী হওয়া যায় না।

মোরাকাবার মাধ্যমে স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে নিগূঢ় ভেদ ও রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব। এই ধারায় সুফিবাদই একমাত্র নিষ্ঠা-বিনয়-আদবের শিক্ষা দেয়। সুফিবাদের পথে আসলে মানুষ হিংসা বিদ্বেষ ভুলে যায়। তারা ভাবুক ও প্রেমিক হয়। তারা স্রষ্টামুখী হয়।

অন্যের দোষ তালাশ করার আগে নিজের দোষ তালাশ করে। মা ও বাবাকে ভক্তি করে। গুরু ও গুরুজনকে ভক্তি ও তাজমি করে। বে-নামাজী নামাজ পড়ে। বে-রোজাদার রোজা রাখে। বে-জিকিরিুল্লাহ, জিকির করে।

তারা মানবসেবা করে। ক্ষুদার্থ মানুষকে আহার করায়। বস্ত্রহীনকে বস্ত্র দান করে। তাই সকল মানুষকে এই সুফিবাদের সুশীতল ছায়াতলে আসার জন্য আহবান জানাই।

……………………………
পুনপ্রচারে বিনীত: আবুতালেব পলাশ আল্লী
মা শাহে সেতারার রওজা বা দরবার শরিফ
খুলনা, বাংলাদেশ।

……………………
আরো পড়ুন:
মেরাজতত্ত্ব
শবে মেরাজ : ঊর্দ্ধোলোকের রহস্য যাত্রা

মেরাজ

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!