পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব

পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব তেরো

-মূর্শেদূল মেরাজ

পঞ্চভূতে পঞ্চপাণ্ডব –

ব্রহ্মতালুর সহস্রাচক্র দিয়ে যে জীবনী উর্যা দেহে প্রবেশ করে, তা দ্বিতীয় চক্র আজ্ঞাতে অর্থাৎ মস্তিষ্কের মেডুলা পয়েন্টে অবস্থান করে। দেহে-মনে কামের ভাব জাগ্রত হলে সেই উর্যা ক্রমশ নিম্নগামী হতে থাকে।

তখন তা মেডুলা পয়েন্ট থেকে একে একে চক্র থেকে চক্র বেয়ে নামতে নামতে সপ্তচক্রের শেষ চক্র মূলাধারে পৌঁছায়। আর এই কণ্ঠ থেকে মেরুদণ্ডের শেষ পর্যন্ত যে পাঁচ চক্রের অবস্থান এই পাঁচ চক্রকেই পঞ্চপাণ্ডব বলা হয়।

সূক্ষ্মতার বিচারে দেহের ধর্মক্ষেত্রের এই পঞ্চচক্রকেও অনেকে চিহ্নিত করে পঞ্চপাণ্ডব হিসেবে। আর এই পঞ্চ পাণ্ডব শব্দটা এসেছে মহাভারত থেকে। মহাভারতের পাণ্ডবদের পাঁচ ভাই পঞ্চপাণ্ডব নামে পরিচিত। এই পঞ্চপাণ্ডব হলো- যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, সহদেব ও নকুল।

বিশ্লেষকদের অনেকে অন্তনিহিত অর্থ খুঁজতে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সেই অবিস্মরণীয় পঞ্চপাণ্ডবকে তুলনা করেছেন ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির পঞ্চভূতের রূপক হিসেবে।

এই হিসেবে ব্রহ্মাণ্ডের তত্ত্বের মতো দেহের পঞ্চতত্ত্বে অবস্থানের প্রেক্ষিতে পঞ্চপাণ্ডবের অবস্থানও চিহ্নিত করা হয়েছে। মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রারম্ভে পঞ্চপাণ্ডবের শঙ্খধ্বনি করার ভিত্তিতে, দেহের পঞ্চচক্রে পঞ্চপাণ্ডবের অবস্থান চিহ্নায়ন করা হয়েছে এই রূপে-

  • মূলাধার চক্র
    [সমর্পণ ভাব; আত্মিক অনুভূতি]

    • পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে সর্বপ্রথম শঙ্খ বাজায় সহদেব।
    • সহদেব মনিপুস্পক নামক শঙ্খ বাজায়।
    • মূলাধার চক্র সহদেবের প্রতীক।
    • গুহ্যমূল, যেখান থেকে মেরুদণ্ড আরম্ভ হয়েছে।
    • চারদল বিশিষ্ট পদ্মের স্থিতি।
    • মূলাধার চক্র সক্রিয় হয়ে বিকশিত হতে শুরু করলে স্ববির্তক সমাধি অনুভূত হবে।
    • সহদেব-
      • যে সবসময় সমর্পণ ভাব নিয়ে থাকে।
      • সর্মপনের প্রতীক।
  • সাধিষ্ঠান চক্র
    [শান্তি ভাব; স্বীকার করার অনুভূতি; গুণ বিকাশ]

    • পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে দ্বিতীয় শঙ্খ বাজায় নকুল।
    • নকুল সুঘোষ নামক শঙ্খ বাজায়।
    • সাধিষ্ঠান চক্র নকুলের প্রতীক।
    • লিঙ্গমূল, ছয়দল বিশিষ্ট পদ্মের স্থিতি।
    • সাধিষ্ঠান চক্র সক্রিয় হয়ে বিকশিত হতে শুরু করলে অন্য সকল চক্র অনুভূত হতে শুরু করবে।
    • নকুল-
      • শান্তির প্রতীক।
      • কোনো পরিস্থিতিতে যার ভেতরে আকুলতা আসে না।
  • মণিপুর চক্র
    [আনন্দ ভাব; ভেদ ভাব বিলিীন হয়]

    • পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে তৃতীয় শঙ্খ বাজায় অর্জুন।
    • অর্জুন দেবদত্ত নামক শঙ্খ বাজায়।
    • মণিপুর চক্র অর্জুনের প্রতীক।
    • নাভিমূল, দশদল বিশিষ্ট পদ্মের স্থিতি।
    • মণিপুর চক্র জাগ্রত হলে অর্থাৎ অর্জুনের বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয় অর্থাৎ আহারে যদি সাধক নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তাহলে অর্জুনের মতো একাগ্র হয়ে উঠে সাধক।
    • অর্জুন-
      • বিচারশীলতার প্রতীক।
      • প্রতি কর্মের আগে বিচার শক্তি।
  • অনাহত চক্র
    [অন্তর সাহস ভাব; সব কিছুতেই পরমে দেখে, নিজ আর পরমের চিন্তায় লীন হয়ে যায়]

    • চতুর্থ শঙ্খ বাজায় ভীম।
    • পৌণ্ড্র নামক ভয়ঙ্কর নামক শঙ্খ বাজায়।
    • অনাহত চক্র ভীমের প্রতীক।
    • বক্ষমূল, বারােদল বিশিষ্ট পদ্মের স্থিতি।
    • পদ্মফুল তথা কমল দিব্যজ্ঞানের প্রতীক।
    • ভীম-
      • সাহসের প্রতীক।
      • যে কোনো গলদ প্রথাকে ভেঙ্গে সঠিক প্রথাকে বলবদ করার সাহস।
  • বিষ্যুদ চক্র
    [নিষ্কাম ভাব; নিজ আর পরমের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না]

    • পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে পঞ্চম শঙ্খ বাজায় যুধিষ্ঠির।
    • যুধিষ্ঠিরের বিষ্যুদ চক্রের প্রতীক।
    • কণ্ঠমূল, যােলােদল বিশিষ্ট পদ্মের স্থিতি।
    • যুধিষ্ঠির অনন্ত বিজয় নামক শঙ্খ বাজায়।
    • যুধিষ্ঠির-
      • নিষ্কাম কর্মে স্থির।
      • কামনা রহিত।

পঞ্চভূত লিঙ্গম ও পঞ্চভূত স্থলম-

দৃষ্ট সকল কিছুই যেমন পঞ্চভূতে সৃষ্ট। ভারতবর্ষের তামিলনাড়ু ও অন্ধ্রপ্রদেশে এই পঞ্চভূতের প্রত্যেকটির একজন করে অধীশ্বর শিবলিঙ্গের কথা জানা যায়। এদের বলা হয় পঞ্চভূত লিঙ্গম। এই লিঙ্গম অবস্থিত জায়গাগুলিকে বলা হয় ‘পঞ্চভূত স্থলম’।

এই পঞ্চভূত স্থলমগুলো কেবল স্থাপত্যশৈলীতেই নয়। এগুলো অবস্থানগত ভাবেও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। পঞ্চভূত স্থলের পাঁচটির মধ্যে চারটির অবস্থানই ৭৯ ডিগ্রী ইস্ট লঙ্গিচ্যুডের উপরে এবং বাকিটি অর্থাৎ জম্বুকেশ্বরের অবস্থান ঠিক ৭৯ ডিগ্রী ইস্ট লঙ্গিচ্যুডে না হলেও তার খুব কাছাকাছি, ৭৮.৪ ডিগ্রী ইস্ট লঙ্গিচ্যুডে।

আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়ের ‘পঞ্চভূত স্থলম ও পঞ্চভূত লিঙ্গম- দেবাদিদেব শিবঠাকুরের খোঁজে’ লেখা থেকে এ সম্পর্কে জানা যায়। পঞ্চভূত স্থলমগুলো হলো-

১. ক্ষিতি বা পূথ্বী লিঙ্গ একাম্বরেশ্বর
তামিলনাড়ুর কাঞ্চীপুরমের কাছে ভারতবর্ষের অন্যতম প্রাচীন মন্দির একাম্বরেশ্বর। প্রাচীন তামিল ‘সঙ্গম’ সাহিত্যে খৃষ্টপূর্ব ৩০০ সালেই এই মন্দিরটির কথা উল্লেখ রয়েছে। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে দেবী পার্বতী এখানে একটি আমগাছের তলায় কঠোর তপস্যা করে শিবের দর্শন পেয়েছিলেন। এই মন্দিরের ‘মন্দির-বৃক্ষ’ হল একটি ৩৫০০ বছরের পুরোনো আমগাছ।

২. অপ্ বা জল লিঙ্গ জম্বুকেশ্বর
তামিলনাড়ুর ত্রিচি বা তিরুচিরাপল্লীর কাছে থিরুভনাইকাভালে অবস্থিত জম্বুকেশ্বর মন্দির। জম্বু অর্থাৎ জাম গাছের নীচে অবস্থিত বলে শিবের নাম জম্বুকেশ্বর। চোল রাজাদের আমলে তৈরি সাতটি গোপুরম ও পাঁচটি দেওয়াল ঘেরা মন্দিরে মূল শিবলিঙ্গ একটি প্রাকৃতিক ঝর্ণার জলে ঘেরা (অপ্ বা অপ্পু লিঙ্গ)।

৩. তেজ বা অগ্নি লিঙ্গ অরুণাচলেশ্বর বা আন্নামালাইয়ার
তামিলনাডুর থিরুভন্নামালাই শহরে অরুণাচল পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত অরুণাচলেশ্বর মন্দিরে আছেন তেজ বা অগ্নি লিঙ্গ। এখানে শিবের সঙ্গে পার্বতী আছেন উন্নামালাই আম্মান নামে। চোল আমলে খৃষ্টীয় ৯ম শতাব্দিতে তৈরি। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে শিব আন্নামালাই পর্বতের শিখরে আগুনের স্তম্ভ রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন।

৪. মরুৎ বা বায়ু লিঙ্গ- শ্রীকালহস্তিশ্বর
অন্ধ্র প্রদেশে তিরুপতি থেকে ৩৬ কিলোমিটার দূরে শ্রীকালহস্তিতে মরুৎ বা বায়ু লিঙ্গ শ্রীকালহস্তিশ্বর অবস্থিত। এই মন্দিরকে ‘রাহু-কেতু ক্ষেত্র’ এবং ‘দক্ষিণ কৈলাস’-ও বলা হয়। মন্দিরটির ভিতরের অংশটি আনুমানিক খৃষ্টীয় ৫ম শতাব্দিতে প্রতিষ্ঠিত। এই মন্দিরে শিবকে বায়ু রূপে পূজা করা হয়।

৫. ব্যোম বা আকাশ লিঙ্গ চিদাম্বরম নটরাজ
থিল্লাই নটরাজা মন্দির তামিলনাড়ুর কুদ্দালোর জেলার চিদাম্বরমে অবস্থিত। নৃত্যের অধীশ্বর নটরাজ রূপী শিবের উদ্দেশ্যে নির্মিত বর্তমান মন্দিরটি চোল রাজাদের দ্বারা খৃষ্টীয় ১০ম শতাব্দিতে প্রতিষ্ঠিত। এই মন্দিরে শিবের নিরাকার, লিঙ্গরূপ ও মনুষ্যাকৃতি তিনরূপেরই পূজা হয়। নটরাজ রূপী শিব এখানে ‘আনন্দ তাণ্ডব’ নৃত্যরত।

পঞ্চভূত সম্পর্কে জাগ্গু বাসুদেব সদগুরু বলেন, “প্রায় ১৫ হাজার বছর আগে আদিযোগী তাঁর প্রথম সাতজন শিষ্যকে দেখিয়েছিলেন- সমগ্র বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড কেবল পাঁচটি উপাদানেরই খেলা এবং এটি আমাদের দেহের মধ্যে রয়েছে এবং যদি কেউ এইগুলি আয়ত্তে আনতে পার তবে সৃষ্টির উপরেও একধরনের কর্তৃত্ব অর্জন করতে সক্ষম।

ভৌতিক যা কিছু আছে তা মূলত চারটি উপাদান দিয়ে তৈরি। বেশিরভাগ সময়েই পঞ্চমটিকে অনুভব করা যায় না। হয় এই সমস্ত বিষয় আয়ত্ত করতে পারবেন অথবা আপনি কেবল এই বুদ্ধিমত্তার কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারেন।

আপনি যদি লক্ষ বছরও বেঁচে থাকেন এবং কীভাবে সমস্ত কিছু প্রকাশ পেয়েছে তার নিগূঢ় তত্ত্ব কেবল অধ্যয়নই করতে থাকেন- তবে এটি একটি অন্তহীন প্রক্রিয়া হবে। অথবা এই সমস্ত কিছুর উৎস যে মাত্রা তাকে স্পর্শ করুন। এই খেলাটি খেলতে চাইলে নিজেকে সৃষ্টির উপাদানগুলির সাথে জড়িত রাখুন।”

(চলবে…)

<<পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব বারো ।। পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব চোদ্দ>>

………………….
কৃতজ্ঞতা স্বীকার-
পুরোহিত দর্পন।
উইকিপিডিয়া।
বাংলাপিডিয়া।
শশাঙ্ক শেখর পিস ফাউন্ডেশন।
পঞ্চভূত – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
বাতাসের শেষ কোথায় : ইমরুল ইউসুফ।
ন্যায় পরিচয় -মহামহোপাধ্যায় ফনিভূষণ তর্কবাগীশ।
পঞ্চভূত স্থলম ও পঞ্চভূত লিঙ্গম- দেবাদিদেব শিবঠাকুরের খোঁজে: আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়ের।

…………………………..
আরো পড়ুন-
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব এক
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব দুই
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব তিন
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব চার
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব পাঁচ
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব ছয়
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব সাত
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব আট
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব নয়
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব দশ
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব এগারো
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব বারো
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব তেরো
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব চোদ্দ
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব পনের

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!