ফকির লালন সাঁই

ফকির লালন সাঁই

দেশ-বিদেশের বহু ভক্ত গবেষণা করছেন, কীভাবে একজন অক্ষর জ্ঞানহীন ব্যক্তি এমন কালজয়ী গান লিখে গেলেন? স্বশিক্ষিত লালন সাঁই আজ গবেষকদের কাছে এক বিস্ময়ের নাম। লালন সাঁই দার্শনিক সিরাজ সাঁইয়ের সহচার্যে এসেছিলেন, যদিও সিরাজ সাঁইয়ের পরিচয় জানা যায়নি।

লালন সাঁইয়ের ক্ষেত্রেও এ নিয়ে বিতর্ক লক্ষ্য করা যায়। তিনি নিজেও যে জন্ম পরিচয় প্রদান করতে উৎসাহবোধ করেননি তা তার গানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি গেয়েছেন-

‘সব লোকে কয়
লালন কি জাত সংসারে
লালন কয় জাতের কি রূপ
দেখলাম না এই নজরে।’

সত্যিই তাই, জাতপাতের উর্দ্ধে উঠে লালন নিজেকে শুধু মানুষ হিসেবেই পরিচয় দিয়ে গেছেন।

ফকির লালন সাঁইয়ের ধর্মীয় মতবাদ গুরুবাদী মানব ধর্ম। তার মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গুরুকে বিশ্বাস করা। গুরুবাক্য বলবান, আর সব বাহ্যজ্ঞান- গুরুবাক্যই শিষ্য ভক্তের আরাধনা। গুরুবাদী মানবধর্মের পাঁচটি স্তম্ভ। যথা : সত্য কথা, সৎ উদ্দেশ্য, মানুষকে ভালোবাসা এবং জীবের প্রতি সদয় হওয়া। গুরুর প্রতি নিষ্ঠাই হচ্ছে সকল সাধনার শ্রেষ্ঠ সাধনা। এই গুরু হচ্ছেন মানব গুরু। তাইতো তিনি লিখেছেন-

‘ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার
সর্ব সাধন সিদ্ধ হয় তার।’

লালন অনুসারীদের অধিকাংশই মুসলমান। দলমত নির্বিশেষে সকল লালন অনুসারী মানবতাবাদী গুরুবাদ অবলম্বন করেছেন। লালন অনুসারীগণ মুসলমানদের মধ্যে আলাদা বাউল সম্প্রদায়ের লোক। যারা হাওয়া বা বাতাসের সাধনা করে তারা বাউল।

‘বাও’ মানে বাতাস, ‘উল’ মানে সন্ধান। বাউলরা সকাল-সন্ধ্যায় গুরুর বর্জোখ নিরিখ করে মহপ্রভুর সন্ধানে মনোনিবেশ করেন। এ কারণেই লালন গেয়েছেন-

‘ধর চোর হাওয়ার ঘরে ফাঁদ পেতে।’

আউল, বাউল, দরবেশ, সাঁই এবং ফকির হচ্ছে সাধন স্তরের পাঁচটি পর্যায়ের নাম। আউল হচ্ছে সাধারণ মানুষ। বাউল হচ্ছে দীক্ষাপ্রাপ্ত মুরিদ। দরবেশ হচ্ছেন একজন আত্মসংযমী আদর্শ মানব। আধ্যাত্মজ্ঞানে যিনি শিক্ষিত তিনি সাঁই। আত্মতত্ত্বে যিনি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছেন তিনি ফকির। ফকির লালন সাঁইয়ের ভাষায়-

‘এলমে লাদুন্নী হয় যার
সর্বভেদ মালুম হয় তার।’

ফকির লালন সাঁইয়ের তরিকার নাম ‘ওয়াহাদানিয়াত’ অর্থাৎ লা-শরীক আল্লাহর খাস তরিকা। লালন ভক্তদের বিশ্বাস এই ওয়াহাদানিয়াত তরিকায় প্রথম খিলাফতপ্রাপ্ত হন হযরত ওয়ায়েস করণী। সেহেতু ওয়ায়েস করণী প্রথম ফকির।

১৭৯০ খ্রিস্টাব্দে গুরুবাদী লৌকিক সাধন মতের পূর্ণস্বরূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেন লালন ফকির। লালন অনুসারী ভক্ত যখন গুরুর কাছে দীক্ষা নেন বা মুরিদ হন তখন তাকে কালেমা হক (আল্লাহর সত্য বাণী) পাঠ করিয়ে লালন তত্ত্বের পাঁচটি মূল শপথ করানো হয়।

গুরু নবদীক্ষিত মুরিদ করার আগে তিনবার কালেমা হক পাঠ করান। এরপর গুরু শিষ্যকে সাধন পদ্ধতি শিক্ষা দেন। সাধনার স্তর চারটি। এটি পর্যায়ক্রমে হয়ে থাকে। একটি বাদ দিয়ে অন্যটি হয় না।

ফকির লালন সাঁইয়ের মতাদর্শে সন্তান উৎপাদন নিষিদ্ধ। কারণ আত্মা থেকে যেহেতু সন্তান উৎপন্ন হয়, ফলে আত্মা খণ্ডিত হয়। এই মতবাদের ভাবার্থ হচ্ছে, খণ্ডিত আত্মা নিয়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায় না। পুনর্জন্মের ফ্যারে পড়ে দুনিয়াতেই অবস্থান করতে হয়। ফকির লালন সাঁই জন্মান্তরবাদী। লালন তাই লিখেছেন-

‘পিতার বীজে পুত্রের সৃজন
তাইতে পিতার পুনর্জনম।’

গুরুর নিকট থেকে দীক্ষাপ্রাপ্ত হওয়ার পর বিশেষ স্তরে পৌঁছালে তাকে খিলাফত প্রদান করা হয়। যোগ্য ভক্তকে আনুষ্ঠানিকভাবে সাদা রংয়ের কাপড়ে সাজিয়ে খিলাফত প্রদান করা হয়। এই সময় সত্যের বাণী পাঠ করানো হয়। প্রথমে দেয়া হয় তহবন, এর পর কোপনী, তারপর খিলকা, তারপর আচলা, তসবিহ, পাগড়ি, পেয়ালা এবং শেষে দেয়া হয় ছড়ি।

সবশেষে গুরু ভক্তের কানে গুরু বাক্য দান করেন। চোখ বেঁধে সাতবার লালন সাঁইজীর মাজারের চতুর্দিকে ঘোরানো হয়। মাজার থেকে দূরবর্তী স্থানে সাঁইজীর সত্য বাণী শোনানোর পর সাধু-গুরু-বাউল-ফকির-দরবেশের মাঝে সাত পাক ঘোরানো হয়। গুরু ভক্তিটাই এখানে আসল।

সাধনার স্তরে কাকে কোন বিষয়ে কী দেয়া হবে তা কেবল গুরুই জানেন। যে বিষয়ে যে যোগ্য তাকে সেই বিষয়ের তত্ত্বজ্ঞান প্রদান করা হয়। যারা গুরুর কাছে খিলাফত পান তারা পশুপাখি হত্যা করতে পারেন না। সেটি মহাপাপ হিসেবে বিবেচিত হয়।

ডিম, মাংস খাওয়া তাদের জন্য নিষিদ্ধ। তারা বিশ্বাস করেন, জীব তিন প্রকার- মুক্তজীব, বদ্ধজীব এবং তটস্থজীব। মানুষ হচ্ছে মুক্তজীব, পশু বদ্ধজীব এবং পাখি তটস্থজীব। এই তিন প্রকার জীবের মধ্যে আত্মা ভ্রমণ করে। যে পশুপাখি হত্যা করবে না এবং ডিম-মাংস খাবে না সে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারবে। শুধু তাই নয়, তাদের আর পুনর্জন্ম হবে না।

আজ থেকে প্রায় সোয়া দুইশ বছর আগের একদিন ভোরবেলা ষোল-সতের বছর বয়সের অচেতন লালন ভাসতে ভাসতে কালিগঙ্গা নদীর তীরে এসে ভেড়েন। কুষ্টিয়া শহরের অদূরে অবস্থিত ছেঁউড়িয়া একটি ছায়াঘেরা নিবিড় গ্রাম। একপাশে গড়াই অন্য পাশে কালিগঙ্গা দুটি বহমান নদী।

ছেঁউড়িয়া গ্রামের মাওলানা মলম কারিকর নামাজি লোক। সেদিন ভোরবেলা মাওলানা মলম ফজরের নামাজ পরে কালিগঙ্গা নদীর দিকে এলে হঠাৎই দেখতে পান এক অচেনা সংজ্ঞাহীন তরুণ অর্ধজলমগ্ন অবস্থায় পড়ে আছে। সদ্য তরুণের মুখ ও শরীরে বসন্ত রোগের দাগ বিদ্যমান।

তিনি কাছে গিয়ে দেখলেন ছেলেটি বেঁচে আছে, খুব ধীরলয়ে চলছে শ্বাস-প্রশ্বাস। নিঃসন্তান হাফেজ মলমের বুকের ভেতর হু হু করে ওঠে। তিনি অচেতন তরুণকে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসেন। তার স্ত্রীর সেবায় তরুণের নিভু নিভু জীবন প্রদীপ পুনরায় জ্বলে উঠল। মোটামুটি এই হলো লালনের নবজন্মের কাহিনী।

মৃত্যুর পর এই ছেঁউড়িয়াতেই লালনের সমাধি নির্মিত হয়। ছেঁউড়িয়াভিত্তিক লালনের জীবন বৃত্তান্ত বিস্তারিতভাবে পাওয়া যায় ফকির আনোয়ার হোসেন মন্টু শাহের সম্পাদিত ‘লালন সংগীত’ গ্রন্থে। যদিও লালনের জন্ম আসলে কবে কোথায় তা আজো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ধারণা করা হয়, তাঁর জন্ম ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে।

অনেক লালন গবেষক মনে করেন, লালন কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানার চাপড়া ইউনিয়নের অন্তর্গত ভাড়ারা গ্রামে জন্মেছিলেন। এই মতের সঙ্গে অনেকেই দ্বিমত পোষণ করেন এই বলে যে, ছেঁউড়িয়া থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে ভাড়ারা গ্রামের এক তরুণ নিখোঁজ হলো, অথচ তার দীর্ঘ জীবদ্দশায় তাকে কোন আত্মীয়-স্বজন কিংবা পরিচিতজন কেউ চিহ্নিত করতে পারলো না, তা কতটা যুক্তিসঙ্গত?

অন্যদিকে পাঞ্জু শাহের ছেলে খোন্দকার রফিউদ্দিন ‘ভাবসংগীত’ গ্রন্থে ফকির লালনের জন্মবৃত্তান্ত বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘ফকির লালন শাহের জন্মভূমি যশোর জেলার হরিণাকুন্ডু থানার অধীন হরিশপুর গ্রামেই ছিল, ইহাতে সন্দেহের অবকাশ নেই।’

লালন হিন্দু কি মুসলমান এ নিয়েও বিস্তর মতামত পাওয়া যায়। কারো মতে লালন কায়স্থ পরিবারের সন্তান যার পিতা মাধব এবং মাতা পদ্মাবতী; পরে লালন ধর্মান্তরিত হন। আবার অনেকে মনে করেন, লালন মুসলিম তন্তুবায়ী পরিবারের সন্তান।

যাই হোক, কালিগঙ্গা নদীর তীরে শ্যামল বৃক্ষশোভিত মলমের বাগানে তৈরি করা হয় চৌচালা ঘর। এই চৌচালা ঘরটি লালন সাধনকক্ষ হিসেবে ব্যবহার করতেন। কালের নিয়মে ঘরটি বিলীন হয়ে গেলেও মহান সাধক লালনের পরশমাখা সাধনকক্ষের কপাটজোড়া এবং জলচৌকি এখনো লালন একাডেমির যাদুঘরে রাখা আছে।

ফজরের নামাজের পর মাওলানা মলম কোরআন তেলাওয়াত করতেন। লালন মনোযোগ দিয়ে শুনতেন এবং এর মানে জিজ্ঞাসা করতেন। তিনি এ সময় কোরআনের কিছু কিছু আয়াতের আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা করতেন। ব্যাখ্যা শুনে মাওলানা মলম অভিভূত হয়ে যেতেন। লালনের প্রতি অপরিসীম ভক্তির কারণে এক সময় মলম ও মতিজান লালনের কাছে দীক্ষা নেন।

ফলে মলম কারিকর হয়ে যান মলম শাহ, অন্যদিকে মতিজান হয়ে যান মতিজান ফকিরানী। ফকির মলম শাহ ছিলেন সর্বাপেক্ষা বয়োজ্যেষ্ঠ শিষ্য। মলমের অপর দুই ভাই কলম ও তিলম সস্ত্রীক পর্যায়ক্রমে লালনের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।

লালনের মুখে বসন্তের দাগ ছিল, তার হাত দুটো এতো লম্বা ছিল যে দাঁড়ালে আঙ্গুলগুলো হাঁটুর নিচে পড়ত। উঁচু নাক, উন্নত কপাল আর গৌরবর্ণের লালনের ছিল গভীর দৃষ্টিসম্পন্ন চোখ। কাঁধ বরাবর চুল, লম্বা দাড়ি, হাতে ছড়ি, পায়ে খড়ম, গায়ে খিলকা, পাগড়ী, আঁচলা, তহবন- সব মিলিয়ে লালন যেন সিদ্ধপুরুষ, পরিপূর্ণ সাধক।

লালন মুখে মুখেই পদ রচনা করতেন। তার মনে নতুন গান উদয় হলে শিষ্যদের ডেকে বলতেন, ‘পোনা মাছের ঝাঁক এসেছে’। লালন গেয়ে শোনাতেন, ফকির মানিক শাহ ও মনিরুদ্দিন শাহ সেই গান লিখে নিতেন। লালনের জীবদ্দশাতেই তাঁর গান বহুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

লালনের শিষ্যদের ধারণা তাঁর গানের সংখ্যা দশ হাজারেরও বেশি। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে এতো বিপুলসংখ্যক গান পাওয়া যায় না। শোনা যায়, লালনের কোন কোন শিষ্যের মৃত্যুর পর গানের খাতা তাদের কবরে পুঁতে দেয়া হয়। এছাড়াও অনেক ভক্ত গানের খাতা নিয়ে গিয়ে আর ফেরত দেননি।

ছেঁউড়িয়ায় কয়েক বছর থাকার পর লালন শিষ্যদের ডেকে বললেন, আমি কয়েক দিনের জন্য বাইরে যাচ্ছি, তোমরা আমার সাধনঘর দেখাশুনা করো। সপ্তাহ তিনেক পর তিনি একটি অল্পবয়স্কা সুশ্রী মেয়েকে নিয়ে ফিরলেন। মতিজান ফকিরানী জিজ্ঞাসা করলেন, মেয়েটা কে বাবা? লালন বললেন, ‘তোমাদের গুরুমা।’ একথা শোনার পর আঁখড়াবাড়ির সকলেই গুরুমাকে ভক্তি করলেন।

বিশাখা নামের এই মেয়েটি আমৃত্যু লালনের সঙ্গে ছিলেন। লালনের মৃত্যুর তিন মাস পর মেয়েটিও মারা যায়। বিশাখা ফকিরানী প্রায় একশ বছর ধরে ছেঁউড়িয়ায় ছিলেন কিন্তু তার প্রকৃত নাম পরিচয় জানা যায়নি। এমনকি মৃত্যুর পরও তার কোন আত্মীয় বা পরিচিতজন খুঁজে পাওয়া যায়নি। অচিন মানুষ ফকির লালনের মতোই বিশাখা ফকিরানী আজো এক অচিন নারী।

ফকির লালনকে নিয়ে বেশ কিছু কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। একবার লালন শিষ্যদের নিয়ে গঙ্গানদী পার হয়ে নবদ্বীপ গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর ধামে পৌঁছলেন। মন্দিরের লোকজন আগন্তুকদের বেশভূষা দেখে তাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে, লালনশিষ্য শীতল শাহ বললেন, আমরা কুষ্টিয়া থেকে এসেছি, সকলেই ফকির মতবাদের সাধক।

তখন মহাপ্রভুর কাছে গিয়ে এ কথা বলতেই তিনি তাদের বসার ব্যবস্থা করতে বললেন। আঙিনার একপাশে বড় নিমগাছের তলায় তাদের জায়গা করে দেয়া হলো। সারারাতের অনুষ্ঠান শেষে সাধুগুরু এবং বোষ্টমিদের সেবা দেয়ার পর যুবকরা পিতলের থালায় করে সোয়া সের চুন নিয়ে এলো এবং সবাইকে বলা হলো হাত পাতুন, মহাপ্রভুর প্রসাদ গ্রহণ করুন।

চুনে মুখ পুড়ে যাবে এই ভয়ে শিষ্যরা কেউ হাত পাতল না। বরং একযোগে ক্ষমা চাইল। যুবকরা বলল, আপনারা কেমন সাধু! চুনে মুখ পুড়ে যাবার ভয়ে কেউ হাত পাতলেন না। প্রকৃত সাধুদের তো মুখ পোড়ার কথা নয়! লালন এক কোণায় বসেছিলেন। যুবকদের এই কথা শুনে বললেন, ‘তোমরা কি চাও?’

তারা বলল, ‘কেমন সাধু হয়েছ দেখতে চাই।’ লালন যুবকদের কলার পাতা এবং একটি চাড়ি আনতে বললেন। তারপর তিনি খানিক চুন কলার পাতায় রেখে বাকিটুকু চাড়ি ভর্তি পানিতে গুলিয়ে দিলেন। এবার তিনি নিজেই কলারপাতার চুনগুলো খেয়ে শিষ্যদের চাড়ি থেকে গ্লাসে করে চুন গোলানো শরবত খাওয়ালেন। তারা সকলেই শরবত পানের তৃপ্তি লাভ করলো। এই শরবত ‘পান চুন সেবা’ নামে পরিচিত।

লালন ফকির মাঝে মাঝে গভীর রাতে চাঁদের আলোয় ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়াতেন। কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে যেতেন শিষ্যরা বলতে পারত না। শোনা যায়, দোল পূর্ণিমার তিথিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে লালন জীবদ্দশায় ফাগুন মাসের এই তিথিতে খোলা মাঠে শিষ্যদের নিয়ে সারারাত গান বাজনা করতেন।

সেই ধারাবাহিকতায় এখনো লালন একাডেমি প্রতি বছর ফাল্গুন মাসের দোল পূর্ণিমার রাতে তিন দিনব্যাপী লালন স্মরণোৎসবের আয়োজন করে থাকে। এ ছাড়াও প্রতি বছর ১লা কার্তিক লালনের তিরোধান দিবস উপলক্ষে অনুরূপ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। দেশ বিদেশের হাজার হাজার বাউল যোগ দেন এই উৎসবে।

লালন দর্শনের অন্যতম দিক হলো গুরুবাদ। গুরুর প্রতি ভক্তি নিষ্ঠাই হলো তাদের শ্রেষ্ঠ সাধনা। ধ্যান ছাড়া যেমন গুরুকে ধারণ করা যায় না, তেমনি গুরুর প্রতি অসামান্য ভক্তি ছাড়া অন্তরাত্মা পরিশুদ্ধ হয় না। লালন অসংখ্য গানে পরিশুদ্ধ আত্মার অনুসন্ধান করেছেন, তার গানে ও ভাবাদর্শে সুফিবাদের ভাবধারা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

লালনের ভাবশিষ্যরা বিশ্বাস করেন যে, শারীরিক প্রেম-ভালোবাসার মধ্যে প্রকৃত শান্তি নেই; প্রকৃত শান্তি আছে স্বর্গীয় ভালোবাসায়। গুরুর নিকট দীক্ষাগ্রহণের পর সাধনার বিশেষ স্তরে পৌঁছুলেই কেবল শিষ্যকে খেলাফত প্রদান করা যায়। খেলাফতের ধারণাটি ইসলামী সুফিজম থেকে এসেছে। এর মূলকথা আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে খোদার নৈকট্য লাভ করা।

সুফিবাদে সাধনার দুটি পর্যায় হলো বাকাবিল্লাহ এবং ফানাফিল্লাহ। বাকাবিল্লাহ মানে খোদার অপার ভালোবাসা, অন্যদিকে ফানাফিল্লাহ হলো আত্মার ভিতর খোদাকে ধারণ করা। বাকাবিল্লাহ ও ফানাফিল্লাহ অর্জন করার জন্য প্রয়োজন আত্মার পরিশুদ্ধি।

খেলাফত অর্জনের পর একজন সাধক সকল পার্থিব বিষয় থেকে নির্মোহ হয়ে ওঠেন। পুরুষরা সাদা আলখেল্লা এবং সাদা লুঙ্গি পরে, অন্যদিকে মেয়েরা সাদা শাড়ি পরে, যাকে তারা বলে খিলকা। খিলকা হলো কাফন সদৃশ্য পোষাক। তাদের ভাষায় জিন্দাদেহে মুর্দার পোষাক।

লালন ফকিরের বয়স তখন ১১৬ বছর। একদিন তিনি শিষ্যদের ডেকে বললেন, এই আশ্বিন মাসের শেষের দিকে তোমরা কোথাও যেও না। কারণ পহেলা কার্তিকে গজব হবে। গজবের বিষয়টি শিষ্যরা কেউ সঠিকভাবে অনুমান করতে না পারলেও তারা আসন্ন বিপদের আশঙ্কা করতে লাগলন।

তিরোধানের প্রায় একমাস আগে লালন সাঁইয়ের পেটের অসুখ হয়, হাত পায়ের গ্রন্থিতে পানি জমে। পীড়িতকালেও তিনি পরমেশ্বরের সাধনা করতেন, মাঝে মাঝেই গানে উন্মত্ত হতেন। ধর্মের আলাপ পেলে নববলে বলীয়ান হয়ে রোগের যাতনা ভুলে যেতেন।

এ সময় দুধ ভিন্ন অন্য কিছু খেতেন না তিনি, তবে ইলিশ মাছ খেতে চাইলে শিষ্যরা ব্যবস্থা করতেন। সেদিনও বাজার থেকে ইলিশ মাছ নিয়ে আসা হয়েছিল। রাতে আলোচনা শেষ করে লালন সাধন ঘরে ফিরে গিয়ে চাদর মুড়ি দিয়ে বিশ্রাম নিতে লাগলেন।

শিষ্যরা মেঝেতে বসে রাইলেন তাকে ঘিরে। এক সময় লালন মুখ থেকে চাদর সরিয়ে বললেন, তোমাদের আমি শেষ গান শোনাব। লালন গাইলেন গভীর অপরূপ সুন্দর গান-

‘পার কর হে দয়াল চাঁদ আমারে
ক্ষম হে অপরাধ আমার
এই ভবকারাগারে।’

গান শেষ হলো। পুনরায় চাদর মুড়ি দিয়ে চিরদিনের জন্য নীরব হয়ে গেলেন ফকির লালন সাঁই। এই মহান সাধকের প্রতি রইল প্রাণের গভীর প্রণতি।

…………………………………………
পুনপ্রচারে- প্রণয় সেন

…………………………………..
চিত্র:
ফকির লালন সাঁইজির প্রকৃত কোনো ছবি নেই। লেখাতে ব্যবহৃত ছবিটি লালন ফকিরের কাল্পনিক একটি ছবি মাত্র। বহুল ব্যবহৃত হলেও এই ছবির সাথে লালন সাঁইজির আদৌ কোনো যোগসূত্র খুজে পাওয়া যায় না।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!