ফকির লালন শাহ্

-জহির আহমেদ

লালন গীতি বাংলা সঙ্গীত ভাণ্ডারের এক অমূল্য সম্পদ। তার গান মারেফতি তত্ত্ব ও মরমিয়া ভাবে সমৃদ্ধ। বাঙালির অসাম্প্রদায়িক মনোজগত গঠনে লালনের জীবন ও গানের বিপুল প্রভাব রয়েছে।

ইংরেজ কবি অ্যালেন্স গিন্সবার্গ, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ, বিদ্রোহী কবি নজরুল, পল্লী কবি জসীম উদ্দীনসহ অনেকের মধ্যেই ফকির লালন সাঁইজির ব্যাপক প্রভাব লক্ষণীয়। তিনিই বাঙালির অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির পুরোধা। গিন্সবার্গ ‘আফটার লালন’ নামে একটি কবিতাও লিখেছিলেন।

বর্তমানে অনেক বিদেশীকে লালন সাঁইজিয়ের তত্ত্ব ও দর্শনের চর্চা করতে দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথ ইংল্যাণ্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে লালনের ভূয়সী প্রশংসা করে বক্তব্য দিয়েছিলেন। তিনি অনেকগুলো বাউল আঙ্গিকের গানও লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথ সরাসরি বলেছেন, ‘আমি বাউলের দলে।’

রবীন্দ্রনাথ লালন সম্পর্কে বলেছেন, ‘লালন ফকির নামে একজন বাউল সাধক হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, জৈন ধর্মের সমন্বয় করে কী যেন একটা বলতে চেয়েছেন আমাদের সবারই সেদিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত।’

কাজী নজরুল ইসলাম শ্রেষ্ঠ অসাম্প্রদায়িক আধুনিক বাঙালি কবি। তিনি বলেছেন, ‘যার নিজের ধর্মের প্রতি বিশ্বাস আছে, সে অন্যের ধর্মকে ঘৃণা করতে পারে না।’ তিনিও বেশ কিছু বাউল ঘরানার গান লিখেছেন। তার এক গানে আছে-

আমি এক ক্ষ্যাপা বাউল,
আমার দেউল আমারই এই আপন দেহ।

জসীম উদদীনও অনেক গান লিখেছেন-

মদীনায় রাসুল নামে
কে এলোরে ভাই,
কায়াধারী হয়ে কেন
তারই ছায়া নাই।

লালনের উপরের গানটির অনুকরণে পল্লীকবি লিখেছেন-

‘রাসুল নামে কে এলো রে মদীনায়, ওরে আকাশেরো চন্দ্র কেড়ে ও কে আনলো দুনিয়ায়।’ এই গানটি।

শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য পৃথিবীতে ধর্ম এসেছে। ধর্মের মূল বিষয় হলো সর্বশক্তিমানে বিশ্বাস স্থাপন করা ও সে বিশ্বাসে অটল থেকে শান্তি লাভ করা। অন্যকে বিশ্বাস ও শান্তির পথে আহবান করা।

কিন্তু প্রেমহীনতা, স্বার্থপরতা, চিন্তাশূন্যতা, অশিক্ষা ও গোঁড়ামির কারণে অধিকাংশ মানুষ ধর্মের মৌলিক বিষয়গুলো বুঝতে পারে না। তারা সার্বজনীন ঐশ্বরিক ধর্মে ব্যক্তিগত সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যা বা মতবাদ ঢুকিয়ে দেয়।

সেজন্যই বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় হানাহানি বেড়ে চলছে। কিন্তু মহামানবগণ যুগে-যুগে ভক্তি-প্রেমের যে বাণী প্রচার করছেন, তা জাতিধর্ম নির্বিশেষেই। ফকির লালন সাঁইজি তাঁর এক গানে বলেছেন-

সহজ মানুষ ভজে দেখ নারে মন দিব্যজ্ঞানে।
পাবিরে অমূল্য নিধি বর্তমানে।।
ভজ মানুষের চরণ দুটি
নিত্য বস্তু হবে খাঁটি।।

ফকির লালন সাঁইজির জন্ম ১৭৭৪ সালে ও মৃত্যু ১৮৯০ সালে। ১১৬ বছরের দীর্ঘায়ু জীবনে তিনি লিখেছেন অসংখ্য গভীর তত্ত্বপূর্ণ ও অমূল্য ভাবের সঙ্গীত। কালের আবর্তে তার অনেক গান হারিয়ে গেছে। তারপরও টিকে থাকা প্রায় এক হাজার গান বাংলা ভাষার সঙ্গীত ভণ্ডারের এক অমূল্য সম্পদ।

লালনের জন্ম সালের ব্যাপারে তেমন দ্বিমত না থাকলেও জন্মের অন্যান্য বৃত্তান্ত নিয়ে রয়েছে এক অমোচনীয় রহস্য। তিনি কোথায়, কোন জেলায়, কোন ধর্মের ঘরে জন্ম নিয়েছেন; এসব বিষয়ে সাধারণ মানুষের কাছে তিনি কখনো মুখ খুলেননি।তার একান্ত ভক্ত বা সাধুসন্তরাও নিষেধাজ্ঞা বা অজ্ঞতার কারণে সব তথ্য প্রকাশ করেন নি। তাঁর জন্মস্থান নিয়ে মোটামুটি তিনটি মত প্রচলিত আছে-

এক: বর্তমান বাংলাদেশের ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুন্ডু উপজেলার হরিশপুর গ্রাম।

দুই: কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী থানার চাপড়া ইউনিয়নের অন্তর্গত ভাড়ারা গ্রাম।

তিন: যশোর জেলার ফুলবাড়ি গ্রাম।

যাহোক, লালনের জীবন নিয়ে অধিক প্রচলিত ও কিংবদন্তী হয়ে যাওয়া কাহিনীটি এমন-

“লালন এক হিন্দু কায়স্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। যুবক বয়সেই এলাকার কিছু লোকের সাথে তীর্থযাত্রায় যাওয়ার পথে তার শরীরে গুটিবসন্ত দেখা দেয়। কথিত আছে, সফরসঙ্গীরা তাকে মৃত ভেবে কলার ভেলায় চড়িয়ে কালীগঙ্গা নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে চলে যায়।

ভেলা ভাসতে ভাসতে কিনারে গিয়ে ভিড়লে তাকে উদ্ধার করেন মলম শাহ্। মলম শাহ‌ ও তার স্ত্রী মতিজান পিতৃমাতৃ স্নেহে পরিচর্যা করে তাকে সুস্থ করে তোলেন। তবে গুটিবসন্তে তার একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়। এক সময় তিনি কুষ্টিয়ার ছেওড়িয়ায় দার্শনিক ও দরবেশ সিরাজ সাঁইয়ের সাক্ষাতে আসেন ও তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।

শোনা যায়, তীর্থযাত্রার পূর্বে তিনি বিয়েও করেছিলেন। লালন একবার তার পরিবারের কাছে গেলে যবনের ঘরে অন্ন খেয়ে জাতধর্ম নষ্ট করেছে বলে সমাজ ও পরিবার তাকে গ্রহণ করেনি। অবশেষে ছেওড়িয়ায় ফিরে এসে তিনি পুনরায় শরণ নেন গুরুজী সিরাজ সাঁইয়ের চরণে। তারপর তিনি সেখানেই বসবাস শুরু করেন।”

এই মানব জনমের চাওয়া-পাওয়ার বঞ্চনা ও যন্ত্রণায় কাতর হয়ে লালন এক গানে গেয়ে উঠেন-

এই দেশেতে এই সুখ হলো
আবার কোথায় যাই না জানি,
পেয়েছি এক ভাঙ্গা তরী
জনম গেল সেচতে পানি।।

আর কিরে এই পাপীর ভাগ্যে
দয়াল চাঁদের দয়া হবে,
আমার দিন এই হালে যাবে
বহি তে পাপের তরণী।।

আমি বা কার কে বা আমার
প্রাপ্ত বস্তু ঠিক নাহি তার,
বৈদিক মেঘে ঘোর অন্ধকার
উদয় হয় না দিনমণি।।

কার দোষ দিবো এই ভুবনে
হীন হয়েছি ভজন বিনে,
লালন বলে কতদিনে
পাবো সাঁইয়ের চরণ দু’খানি।।

লালন একদিন সাংসারিক পিছুটান বিসর্জন দিয়ে গুরুজী সিরাজ সাঁইয়ের কাছে মারেফাতের তালিম নেন। গুরুকেই পরম জেনে তার প্রতি নিষ্ঠাবান হয়ে সাধনা করতে থাকেন। সাধনায় সিদ্ধি লাভ করে সিরাজ সাঁইয়ের পরম শিষ্য ‘লালন’ হয়ে উঠেন বাংলার শ্রেষ্ঠ বাউল ফকির লালন সাঁই। মানুষ গুরুর ভজনা বিষয়ে লালনের একটি জনপ্রিয় গান-

ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার।
সর্বসাধন সিদ্ধ হয় তার।।

নদী কিংবা বিল বাওড় খাল
সর্বস্থলে একই এক জল,
একা মেরে সাঁই ফেরে সর্ব ঠাঁই
মানুষে মিশিয়ে হয় বেদান্তর।।

নিরাকারে জ্যোতির্ময় যে
আকার সাকার হইল সে,
যেজন দিব্যজ্ঞানী হয়, সেহি জানতে পায়
কলি যুগে হলো মানুষ অবতার।।

বহুতর্কে দিন বয়ে যায়
বিশ্বাসে ধন নিকটে পায়,
সিরাজ সাঁই ডেকে বলে লালনকে
কুতর্কের দোকান সে করে না আর।।

সৃষ্টি বহুপ্রজাতিতে বিভক্ত ও নশ্বর হলেও স্রষ্টা অবিনশ্বর। সকল জীবের আত্মা অবিনশ্বর এক পরমাত্মা থেকেই এসেছে। তাই সৃষ্টি জগতে সবাই পরস্পর আত্মার আত্মীয়। কায়াধারী হয়ে জন্ম নিয়ে মানুষ পরম থেকে আলাদা হয়ে যায়। ভাবুকের কাছে দুনিয়াটা তখন কেবল ঝকমারি হিসেবে দেখা দেয়। জীবনের অসারতা বুঝতে পেরে লালন ভাবনায় আকুল হন। তিনি ক্ষণস্থায়ী সংসার জীবনকে উপলব্ধি করেন এভাবে-

দেখ না মন ঝাঁকমারী এই দুনিয়াদারি।
পরিয়ে কপনি ধ্বজা মজা উড়াল ফকিরি।।
…যা কর তাই কর রে মন
পিছের কর রেখ স্মরণ
বরাবরই;
দরবেশ সিরাজ সাঁই কয় শোন রে লালন
হোসনে কারো ইন্তেজারি।।

স্বার্থপর দুনিয়ার মিছে মায়া বুঝতে পেরে লালন আবার গেয়ে উঠেন-

আল্লা বল মন রে পাখি।
ভবে কেউ কারো নয় দুঃখের দুখী।।

ভুলো না রে ভব ভ্রান্ত কাজে
আখেরে এসব কাণ্ড মিছে,
ভবে আসতে একা যেতে একা
এ ভব পিরিতের ফল আছে কি।।

হওয়া বন্ধ হলে সুবাদ কিছুই নাই
বাড়ির বাহির করেন সবাই,
মনরে কেবা আপন পর কে তখন
দেখে শুনে খেদে ঝরে আঁখি।।

গোরের কিনারে যখন লয়ে যায়
কাঁদিয়ে সবায় জীবন ত্যেজতে চায়,
লালন কয় কারো গোরে কেউ না যায়
থাকতে হয় একাকি।।

আত্মতত্ত্ব জানলে বা নিজেকে চিনলেই প্রকৃত সত্য জানা যায়। প্রকৃত সত্য জানলে মানুষে-মানুষে আর কোন ভেদাভেদ থাকে না। অহংকার ও হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে প্রকৃত মানুষ হতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়- আধ্যাত্মিক শিক্ষা বা এলমে তাসাউফ আবশ্যক।

আধ্যাত্মিক শিক্ষা গুরুমুখী। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় যেমন শিক্ষাগুরুর প্রয়োজন, আধ্যাত্মিক শিক্ষায়ও তেমন দীক্ষাগুরু দরকার। মানুষ রূপে আল্লাহ বা পরমেশ্বরই মানুষের আসল গুরু বা মুর্শিদ। সাধককে সদগুরু বা কামেল মুর্শিদের বাতলে দেয়া পথে বর্জক বা একনিষ্ঠতা রেখে আত্মতত্ত্ব জানার পথে এগিয়ে যেতে হয়।

সাধক সাধনায় সিদ্ধিলাভ করে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সর্বমানবের কল্যাণে নিয়োজিত থাকেন। তারপরেও ভেদবুদ্ধির কূটিলতায় ও স্বার্থপর মানুষে জগত আজ ভরপুর। এ বিষয়ে ফকির লালনের মর্মান্তিক গানের কথা-

বেদ বিধির পর শাস্ত্র কানা।
আর এক কানা মন আমার
এসব দেখি কানার হাটবাজার।।

এক কানা কয় আর এক কানারে
চল এবার ভব পারে,
নিজে কানা পথ চেনে না
পরকে ডাকে বারং বার।।

ধর্মান্ধ মানুষের মধ্যে মানবিক সহজ-সরলতা ও মনুষ্যত্ব থাকে না। তারা জাতিধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রতি দয়াবান হতে পারে না। স্রষ্টাও এদের থেকে দূরে সরে যান। সাম্প্রদায়িক মানুষ কখনো পরম অসাম্প্রদায়িক জগত সাঁইকে চিনতে পারে না।

মানুষ সামাজিক জীব। নিঃসঙ্গতা মানুষের কাম্য নয়। ধর্ম-বর্ণ-জাতি-বংশ নির্বিশেষে মানুষের জন্য মানুষের প্রাণ টানে। মানুষের প্রতি মানুষের এ টান বা ভালোবাসা হলো তাদের সহজাত বৈশিষ্ট্য বা স্বভাব। এই স্বভাব বা প্রকৃতিকে ইসলামী পরিভাষায় বলে ‘ফিতরাত’। আর স্বভাব ধর্মই হলো সত্যধর্ম।

এই স্বভাব বাঁকা না করে সরল পথে রাখাই হলো উপাসনা বা ইবাদতের উদ্দেশ্য। আর সেটাই হলো সিরাতুল মুস্তাকিমের পথ। মানুষের মনে যখন মানবিক স্বভাব জাগ্রত থাকে, তখনই তার মনে শান্তি বিরাজ করে। ভালোবাসায় পরিপূর্ণ অন্তরই পরম শান্তিময় আল্লাহর আরশ বা সিংহাসন।

যার মধ্যে শান্তি নেই, সে যতই বেশধারী কিংবা আচারনিষ্ঠ হোক না কেন, তার কোন ধর্ম নেই। ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান ইত্যাদি নামে যেসব ধর্ম বর্তমানে প্রচলিত আছে, তার প্রায় প্রতিটিই সত্য বাণী নিয়ে শান্তি প্রচারের জন্য প্রেরিত। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ সে সব সত্য ধর্মের মর্ম না বুঝে হয়ে যায় সাম্প্রদায়িক মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ কিংবা খ্রিস্টান।

(চলবে…)

………………………..
আরো পড়ুন:
মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজি: এক
মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজি: দুই
মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজি: তিন


লালন ফকিরের নববিধান: এক
লালন ফকিরের নববিধান: দুই

লালন ফকিরের নববিধান: তিন

লালন সাঁইজির খোঁজে: এক
লালন সাঁইজির খোঁজে: দুই


মহাত্মা লালন সাঁইজির দোলপূর্ণিমা
মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজির স্মরণে বিশ্ব লালন দিবস
লালন গানের বাজার বেড়েছে গুরুবাদ গুরুত্ব পায়নি
লালন আখড়ায় মেলা নয় হোক সাধুসঙ্গ
কে বলে রে আমি আমি
ফকির লালন সাঁই
ফকির লালনের ফকিরি
ফকির লালন সাঁই


বিশ্ববাঙালি লালন শাহ্
ফকির লালন সাঁইজির শ্রীরূপ
গুরুপূর্ণিমা ও ফকির লালন
বিকৃত হচ্ছে লালনের বাণী?

লালন অক্ষ কিংবা দ্রাঘিমা বিচ্ছিন্ন এক নক্ষত্র

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!