লালন সাঁইজির খোঁজে : দুই

লালন সাঁইজির খোঁজে : দুই

-মূর্শেদূল মেরাজ

‘লালন সাঁইজির খোঁজে’ লেখার প্রথম পর্বে ফকির লালনকে খুঁজে পাওয়ার প্রাথমিক কিছু বিষয় সম্পর্কে ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র। মূল কথায় আসাই হয়নি। পূর্বে আলোচিত বিষয়গুলোর প্রায় সবগুলোই ঘুরপথ। গোল গোল পথে ঘুরে কি করে লালন সাঁইজিকে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে তার কিছু সহজ উপায় নিয়ে আলোচনা মাত্র।

তবে প্রসন্নতার বিষয় হলো, অতশত অলিগলি না ঘুরে তাঁকে পাওয়ার সহজ একটা পথ স্বয়ং লালন সাঁইজিই রেখে গেছেন সকলের তরে। যে কেউই ইচ্ছে করলে এই পথে তাঁকে অনুসন্ধানে নামতে পারে। তবে কে তাকে পাবে সেটা নির্ভর করছে নিতান্তই তার ভক্তি কতটা-বিশ্বাস কতটা-শুদ্ধতার চর্চা কতটা-সেবা করার বাসনা কতটা তার উপর।

এই সব মেনে যে বা যারা এই পথে অনুসন্ধান করার মনস্থির করতে পারবে তার বা তাদের আর গোল গোল ঘোরার প্রয়োজন পরবে না। প্রয়োজন হবে না শত-হাজার-লক্ষ-কোটি গ্রন্থ পড়বার। জটিলতা নয়। সে পথ সহজ পথ। সহজ মানুষের সন্ধানের পথও সহজ হবে সেটাই স্বাভাবিক। তবে একথাও সত্য যে সহজ পথ বলতে যতটা সহজ; তা মেনে চলা মোটেও ততটা সহজ নয়; যতক্ষণ না নিজে সহজ হওয়া যায়।

আর এই নিজে সহজ হওয়ার সূচনা হয় শুদ্ধ বাক্য, শুদ্ধ দৃষ্টি, শুদ্ধ শ্রবণ, শুদ্ধ চিন্তা, শুদ্ধ মনন, শুদ্ধ খাদ্যাভাসের সমাহারে। শুদ্ধতা-সাত্ত্বিকতাই সহজ পথে হাঁটার প্রাথমিক প্রস্তুতি। অবশ্য তার জন্য চাই তপস্যা। যা একদিনে হয় না। এর জন্য নিজেকে যেভাবে প্রস্তুত করতে হয় তাতেই বেশিভাগ মানুষ মুখ থুবড়ে পরে।

আর শহুরে মানুষিকতা বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষিতজনদের জন্য এই পথ আরো দুরূহ। এই পথে এগুতে গেলে সামাজিক-পারিবারিক-পারিপার্শ্বিক প্রথা বা নিজস্ব সংস্কার থেকে বেরুনো মোটেও সহজ কাজ নয়। যে হাতিকে ছোটবেলা থেকেই শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রাখা হয়। বড় হয়ে সে বিশাল আকৃতি ধারণ করলেও সেই ছোট্ট শিকল ভেঙে আর সে পালাতে পারে না।

তার মাথায় সর্বদাই ভাবনা থাকে সে আবদ্ধ, চাইলেই সে মুক্ত হতে পারবে না। এমনি শহুরে মানুষিকতার আটপৌরে নাগরিক জীবন অদৃশ্য শৃঙ্খলে আটকে রাখে মুক্তির ভাবনা। আর মুক্তির ভাবনার কল্পনাজগৎ থেকে বাস্তবে রূপ দেয়ার ভাবনা জাগ্রত না হলে শৃঙ্খল ভাঙ্গার চেতনাও উদয় হয় না। সাধন পথে যাকে বলে বৈরাগ্য ভাব। সাধকের মনে বৈরাগ্যভাব জাগ্রত হওয়া জরুরী। আর বৈরাগ্য ভাবের উদয় হলেই সাধক সাধনার ধারা খুঁজে পায়।

একবার এক সাধক বলেছিল, ‘সহজ মানুষটারে বুঝতে গেলে একটা সহজ মানুষ খোঁজ করো বাপ। একটা সহজ মানুষই তোমারে সেই সহজ মানুষের সন্ধান দিতে পারবো। তবেই না বুঝতে পারবা ফকির লালনরে। নইলে গোলে পরবা।’

জ্বি হ্যা, একটা সহজ মানুষের কথাই বলার চেষ্টা করছিলাম এতোক্ষণ। আর এই সহজ মানুষটাকে এই ধারায় বলা হয় ‘গুরু’। ‘গু’ শব্দের সাধারণ অর্থ অন্ধকার। আর ‘রু’ শব্দের অর্থ আলো। সেই মতে সাধারণভাবে বলতে গেলে, যিনি অন্ধকার থেকে আলোর দিশা দেখান তিনিই গুরু।

ফকির লালনের মতাবাদ এগিয়ে চলছে গুরুশিষ্য পরম্পরায়। আর এই বিধি-বিধান-মতবাদকে বুঝতে গেলে তাই একজন গুরু অপরিহার্য। গুরুই পারে শিষ্যের মনে জ্ঞাত-অজ্ঞাত সকল প্রশ্নের উত্তরের সন্ধান দিতে। যখন কেউ পূর্ণভক্তিতে নিজেকে সমর্পণ করে গুরুর কাছে। তখন গুরু বাকিটা পথ শিষ্যকে নিয়ে চলেন আপন ছায়ায়। ফকির লালন সাঁইজি এই গুরুবাদই দিয়ে গেছেন তাঁকে সন্ধানের জন্য-নিজকে সন্ধানের জন্য।

ফকির লালন সাঁইজির মতবাদ গভীরভাবে বুঝতে গেলে বুঝতে হবে গুরুবাদ। আর এই ভাব বুঝতে গেলে স্মরণাপন্ন হতে হবে একজন গুরুর। যেতে হবে গুরুর দোড়গোড়ায়। গুরুর কাছে সমর্পিত হয়ে শিখতে হবে আদব-বিনয়-ভক্তি ভাব। আর এটুকু করতে পারলেই পরবর্তী যাত্রা হবে সহজ।

মনে রাখতে হবে, প্রতিটা মানুষই ভিন্ন। প্রায় প্রত্যেকের চিন্তা-চেতনা-চরিত্রেই থাকে ভিন্নতা। সকলের জন্য শিক্ষা যদিওবা এক হয়; কিন্তু শিক্ষা দেয়ার পদ্ধতি এক হতে পারে না। তাই এই যাত্রাপথে শিষ্যকে শিক্ষাদানের আগে উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে হয় স্বয়ং গুরুকে।

তারপর শুরু হয় শিক্ষাপাঠ। আর এই কাজটি গুরু সযত্নে করে থাকেন তার প্রতিটি শিষ্যের জন্য। আর প্রত্যেক শিষ্যকে আলাদা করে দেখতে পারার এই ক্ষমতা একজন গুরু অর্জন করে তাঁর সারাজীবনের আত্মশিক্ষার ভেতর দিয়ে। আর এই আনুষ্ঠানিকতার কাল শেষ হলে তবেই গুরু শিষ্যকে জানায় অজান খবর। যা জেনে সাধক সাধনায় রত হয়।

আমরা প্রত্যেকেই ব্যক্তিগত-সামাজিক-পারিবারিক-পারিপার্শ্বিক-আত্মিক ভাবে অর্জিত যে সংস্কার জন্মজন্মান্তর ধরে বহন করে চলি। তার ভিত্তিতেই আমরা নিজেরাই নিজেদের এক ধরনের শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলি। তার কতটা সঠিক-কতটা যুগোপযোগী সেটা অন্য হিসেব।

তবে এতে করে আমরা যে পরিমাণ আবর্জনা মননে-মস্তিষ্কে জমা করে রাখি, তাতে নতুন জ্ঞান গ্রহণে জটিলতা দেখা দেয়। শুরু হয়ে যায় বিচার-বিবেচনা। মজার বিষয় হলো, বিবেচনা বোধ জাগলেই মনে বৈরাগ্যভাগ জাগ্রত হয়। আর এই বিবেচনাবোধের আধিক্য হলে তা সাধনার অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

ভাব সাধনার এই শুদ্ধতার চর্চায় গুরু শিষ্যকে শিক্ষাদান শুরু করতে চায় শূন্য থেকে। ভাববাদী দর্শনে শূন্য থেকে শুরু করাটা অতীব জরুরী। এতে সাধকের সেই মতবাদের ধারাটা গোড়া থেকে বুঝতে সুবিধা হয়-সহজ হয়। তবে সকলের জন্যই নিয়ম এক নয়।

সংস্কারের বোঝা নিয়ে কেউ হয় আছে বিয়োগে, কেউ বা যোগে। আবার বহু ভাগ্যের ফলে কেউ থাকে শূন্যে। বিয়োগ আর যোগে যাতেই থাকুক না কেনো গুরু প্রথমে শিষ্যকে শূন্যে নিয়ে আসতে চায়। তারপর যাত্রা শুরু করে। তবে অনেকের যোগে থাকাটা যদি যৌক্তিক হয় তাহলে গুরু তাকে সেখানে থেকেও শুরু করতে পারেন। সেটা গুরুর অভিরুচি।

যখন কারো মানসপটে একজন গুরু অপরিহার্য হয়ে উঠে। তখন শুরু হয় গুরুর সন্ধান। অবশ্য সাধকরা বলেন অনেকেই জন্মজন্মান্তরের সৌভাগ্য নিয়ে জন্মায়। তাদের অনেকেই খোঁজার আগেই বা খুঁজতে শুরু করতে না করতেই গুরুর দরশন পেয়ে যায়। তাদের কথা ভিন্ন।

কিন্তু যারা জন্মজন্মন্তরের বাঁধা টপকে গুরুর সন্ধান শুরু করতে চায়। তারা পরে মহা বিপাকে। গুরু কোথায় পাই? কাকে গুরু মানবো? গুরুর সন্ধান কে দিবে? বেশিভাগ এরূপ নব্য সন্ধানী মানুষ এ সকল সংশয়ে জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়ে দেয়। তবে যারা প্রকৃত সন্ধানে নামে সংশয় ঝেড়ে ফেলে, তারাই তাঁর সন্ধান পায়।

এখানে একটা কথা স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে, প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ চরিত্রের গুরুর সন্ধান করে থাকে নিজের অজান্তেই। তবে সকলের নিজ চরিত্র আর কাল্পনিক আকাঙ্খা বেশিভাগ সময়ই এক হয় না। তাই বেশিভাগ সন্ধানীর আকাঙ্খা থাকে এক রকম গুরু; কিন্তু জীবনভর সঙ্গ করে ভিন্ন চরিত্রের গুরুর সঙ্গে।

আসলে বেশি ভাগ লোকই আকাঙ্খার ভিত্তিতে কাল্পনিক গুরুর চিত্র তৈরি করে নেয় মনের মাঝে। আর সেই মতো গুরু খুঁজতে থাকে। তবে নিজ চরিত্রকে সঠিক ভাবে চিনতে না পেরে এভাবে কাল্পনিকতার পেছনে ছুটতে গিয়ে বাঁধায় বিপত্তি।

দেখা যায় সবচেয়ে কৃপন লোকটাও নিজেকে উদার ভাবে। স্বার্থপর ব্যক্তিরাও মনে করে সে সকলের কল্যাণে নিয়োজিত। নিজের সম্পর্কে এমন ভুল ধারণা নিজকে চেনার প্রথম অন্তরায়। আর নিজকে এই এক আনাও না চিনতে পারলে চোখের সামনে থাকলেও গুরুকে চেনা দায়। তবে একথা সত্য যে, নিজ চরিত্র-স্বভাবকে খানিকটা বুঝতে পারলেও গুরুর সন্ধান পাওয়া অনেকটাই সহজ হয়ে যায়।

অনেকে তো গুরুর অবয়ব পর্যন্ত কল্পনায় ভেবে রাখে। সেই মোতাবেক গুরুর সন্ধানে বের হয় পথে। অনেকে অবশ্য অমুক গুরু ভালো; তমুক গুরু খারাপ এই আলাপেই জীবন পার করে দেয়। আর কিছু তথাকথিত পণ্ডিতমনস্ক সন্ধানী তো গুরুদের খুঁজে খুঁজে তর্কে হারানোর খেলায় মত্ত থাকতেই পছন্দ করে।

তারা নতুন নতুন গুরুর সন্ধানে যায়। সেখানে গুরুদের নানাবিধ জ্ঞানগর্ভ তর্কে হারিয়ে নিজেকে জ্ঞানী প্রমাণে ব্যস্ত সময় কাটায়। আর চতুর শ্রেণী তো আরো এক কাঠি উপরে। তারা বিভিন্ন গুরুদের সাথে সঙ্গ করে চালাকির মাধ্যমে গুপ্ততত্ত্ব জেনে নেয়ার চাতুরিতে মত্ত থাকে।

তবে মূল কথা হলো শুদ্ধ সাধনার পথে চালাকি চলে না। যে নিজে শুদ্ধ হওয়ার চর্চা করে না; তার পক্ষে শুদ্ধ গুরুর সন্ধান পাওয়া বা গুরুর সন্ধান পাওয়ার পরও তাঁর থেকে শুদ্ধতার জ্ঞান লাভ করা সম্ভব হয় না। আসলে অন্যান্য ভাববাদের মতো লালন সাঁইজির ধারাতেও নিজেকে শুদ্ধ করাই এ পথে যাত্রা করার মূল শর্ত।

এ পথে নিজের বিচার শুদ্ধ হলে, তবেই গুরুর শুদ্ধতা চোখে পরে। বা এমন করে বলা যায় নিজেকে শুদ্ধ করে গড়ে তুলতে পারলেই গুরুর কাছ থেকে শুদ্ধতার সাধনার পথ পাওয়া যাবে। লালন সাঁইজি বলেছেন-

গুরুর চরণ অমূল্য ধন
বাঁধো ভক্তি রসে,
মানব জনম সফল হবে
গুরুর উপদেশে।।

হিংসা নিন্দা তমঃ ছাড়ো
মরার আগেতে মরো,
তবে যাবে ভবপারে
ঘুচবে মনের দিশে।।

ষোলকলা পূর্ণশশী
হতে হবে ভাবপ্রকৃতি,
গুরু দেবেন পূর্ণরতি
হৃদকমলে বসে।।

পারাপারের খবর জানো
মহর গুরুকে মানো,
লালন কয় ভাবছো কেন
পড়ে মায়ার ফাঁসে।।

এই রহস্য ঘেরা অন্ধকার জগতে জ্ঞানের আলোর দিশা নিয়ে যিনি আগে আগে পথ দেখিয়ে এগিয়ে চলেন তিনিই গুরু। আর এই গুরুর চরণে সর্বভক্তিতে-সর্ববিশ্বাসে-সর্বশ্রদ্ধায় নিজেকে সমর্পণ করতে পারলেই সেই আলো দেখে দেখে শিষ্য সাধনায় এগিয়ে যেতে পারে।

মুশকিল হলো পাশ্চাত্য শিক্ষার যে ধারাটি আমরা অধিক হারে গ্রহণ করেছি। তাতে সমর্পণ ভাবের বদলে বিদ্রোহকে গুরুত্ব দিয়েছে। অবশ্য একে ছোট করে দেখবারও উপায় নেই। কারণ আমরা এমন একটা ক্রান্তিকালে পাশ্চাত্য শিক্ষার সাথে পরিচিত হয়েছি তখন সংগ্রামই ছিল আমাদের মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকবার একমাত্র পথ।

কিন্তু বিপত্তিটা হলো আমরা আজো সেই ধারা থেকে বের হতে পারিনি। সেই শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আমরা মানুষকে নিয়ে কাজ করতে গিয়েও মানুষকে প্রকৃত অর্থে ভালোবাসতে শিখিনি। সকল কিছুতেই দুই পক্ষ দাঁড় করিয়ে ফেলি। যার এক পক্ষকে ভালোবাসি আরেক পক্ষকে ঘৃণা করি।

আর মানুষের প্রতি এই ঘৃণা মনে পুষে রেখে প্রকৃত প্রেমিক হয়ে উঠতে ভুলে গেছি আমরা। এই পক্ষ-বিপক্ষ করতে গিয়ে মনে বাসা বেঁধেছে ভয়-সন্দেহ-সংশয়। তবে একথাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সন্দেহ-সংশয়ের বেড়া জ্বাল টপকে যে বিশ্বাস মনে স্থান পায় তা অনেক বেশি পাকাপোক্ত হয়। না বুঝে-না জেনে কোনো কিছুতে ঝুঁকে পড়ার থেকে বুঝে-শুনে গ্রহণ করাই উত্তম। এ প্রসঙ্গে ফকির লালন সাঁইজি বলেছেন-

আগে বোঝ পরে মজো
নৈলে দলিল মিথ্যা হয়।।

তবে একথাও ঠিক যে, গুরুর গুণ পর্যালোচনা বা গুরুর জ্ঞান নিয়ে যে ভক্ত দ্বিধাবিভক্ত-সন্দেহপ্রবণ হয় তার দ্বারা সাধন ভজন একটু কঠিনই হয়ে পরে। লালন মতে কেনো কোনো মতেই তার দ্বারা সাধন-ভজন সহজ হয় না। নিজের গুরুকে যিনি অন্য গুরুর সাথে তুলনায় মত্ত থেকে সময় নষ্ট করে; তার ভেতরে ভক্তিভাব জন্মাতে বেশ সময় লেগে যায়। আর ভক্তি না জন্মালে শ্রদ্ধা পোক্ত হয় না। বিনয়-সেবা ভাব জাগে না। আর ভক্তি-শ্রদ্ধা-বিনয়-সেবা বিহীন কেবল জ্ঞান দিয়ে নিজেকে বা ব্রহ্মাণ্ড জানা প্রায় অসম্ভব।

আবার এই প্রশ্নটাও জাগতেই পারে, সন্দেহ না করে অন্ধরূপে কাউকে অনুসরণ করলেও তো ভুল হওয়ার সম্ভবনা থেকেই যায়। কথা মিথ্যা না। সমাজে তো তাই চলছে। অন্ধ অনুকরণেই তো এতো ভ্রান্তি। সাধারণে এভাবেই ভাববে বা বিশেষ করে বলতে গেলে তর্ক করবে।

কিন্তু ভাববাদ বুঝতে গেলে আরো এক ধাপ গভীরে প্রবেশ করে বিষয়টা বুঝতে হবে। ভাববাদ যে বুঝতে চায় শুদ্ধজ্ঞানে তাকে বিশ্বাস নিয়েই এগুতে হবে। যদি সাধন পথে কখনো স্মরণ হয় গুরু নির্বাচন যথাযথ হয়নি। তাতেও আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। ততদিনে সাধক নিশ্চিত যথাযথ গুরুর সন্ধান পেয়েই যাবে। যদি তার মধ্যে শুদ্ধতা থাকে তবে সে উপযুক্ত সময় তা টের পাবেই। এটাই ভাববাদের শক্তি।

আসলে সাধকের প্রকৃত গুরু প্রত্যেকে স্বয়ং নিজেই। নিজেকে জানার এই লীলায় নিজেই আসলে নিজের প্রকৃত গুরু। কিন্তু এই নিজ গুরুকে চিনবার-জানবার-বুঝবার জন্য যে জ্ঞান-দৃঢ়তা-স্থিরতা-প্রজ্ঞা প্রয়োজন। তার জন্য চাই একজন দেহধারী গুরু। যিনি শিষ্যকে নিজের মুখোমুখি দাঁড়ানোর উপযোগী করে গড়ে তোলেন।

তবে প্রশ্ন একটা থেকেই যাচ্ছে। এই কলিকালে, যে সময়ে কেউ বিশ্বাস ধরে রাখতে পারছে না। সে সময়কালে যথাযথ গুরুর সন্ধান পাওয়াও তো চাট্টিখানি কথা না। আসলে বিষয়টা কোনোকালেই সহজ ছিল না। চিরকালই মানুষ এই দ্বিধা-দ্বন্দ্বেই ছিল। হয়তো থাকবেও। তার ভেতর দিয়েই প্রকৃত সাধক খুঁজে পাবে তার কাঙ্খিত গুরুকে।

প্রসঙ্গক্রমে গুরু শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের কথা বলা যায়, “তাঁহাকে [রামকৃষ্ণ] একজন সাধারণ লোকের মতো বোধ হইল, কিছু অসাধারণত্ব দেখিলাম না। অতি সরল ভাষায় তিনি কথা কহিতেছিলেন, আমি ভাবিলাম, এ ব্যক্তি কি একজন বড় ধর্মাচার্য হইতে পারেন? আমি সারা জীবন অপরকে যাহা জিজ্ঞাসা করিয়াছি, তাঁহার নিকটে গিয়া তাঁহাকেও সেই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘মহাশয়, আপনি কি ঈশ্বর বিশ্বাস করেন?’

তিনি উত্তর দিলেন- ‘হাঁ’। ‘মহাশয়, আপনি কি তাঁহার অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে পারেন?’ ‘হাঁ’। ‘কি প্রমাণ?’ ‘আমি তোমাকে যেমন আমার সম্মুখে দেখিতেছি, তাঁহাকেও ঠিক সেইরূপ দেখি, বরং আরও স্পষ্টতর, আরও উজ্জ্বলতররূপে দেখি।’

আমি একেবারে মুগ্ধ হইলাম। আমি দিনের পর দিন এই ব্যক্তির নিকট যাইতে লাগিলাম। ধর্ম যে দেওয়া যাইতে পারে, তাহা আমি বাস্তবিক প্রত্যক্ষ করিলাম। একবার স্পর্শে, একবার দৃষ্টিতে একটা সমগ্র জীবন পরিবর্তিত হইতে পারে। আমি এইরূপ ব্যাপার বারবার হইতে দেখিয়াছি।”

বিবেকানন্দ শ্রীরামকৃষ্ণকে প্রথমে নিজের গুরু রূপে স্বীকার করতে সম্মত ছিলেন না। তবু রামকৃষ্ণের কাছে বার বার ছুটে যেতেন। রামকৃষ্ণের ভাব ও দর্শনকে মনগড়া কল্পনা বলে ভাবতেন। ব্রাহ্মসমাজের সদস্য হিসেবে তিনি মূর্তিপূজা ও বহুদেববাদের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করতেন।

শ্রীরামকৃষ্ণ ছিলেন কালীর উপাসক। তাঁর ধ্যানধারণা গ্রহণ করতে না পারলেও তা উড়িয়ে দিতে পারতেন না। কোনো মত গ্রহণ করার আগে তা যাচাই করে নেওয়াই ছিল বিবেকানন্দের স্বভাব। তিনি রামকৃষ্ণকে পরীক্ষা করেন। রামকৃষ্ণও তাকে কোনোদিন যুক্তিবর্জনের কথা বলেন নি। তিনি ধৈর্য সহকারে তার তর্ক ও পরীক্ষার সম্মুখীন হতেন এবং তাকে সকল দৃষ্টিকোণ থেকেই সত্য পরীক্ষা করতে বলতেন।

পাঁচ বছর রামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে থেকে বিবেকানন্দ অশান্ত-বিভ্রান্ত-অধৈর্য যুবক থেকে এক পরিণত ব্যক্তিতে রূপান্তরিত হন। স্রষ্টা উপলব্ধির জন্য তিনি সর্বস্ব ত্যাগে স্বীকৃত হন এবং শ্রীরামকৃষ্ণকে গুরু রূপে স্বীকার করে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেন।

অন্যদিকে বাল্মীকির অভিশপ্তপ্রাপ্ত নিষাদ সম্প্রদায়ের নিষাদরাজ হিরণ্যধনুর পুত্র একলব্যর কথা বলা যায়। তীরন্দাজী শেখার জন্য একলব্য গুরু দ্রোণাচার্যের কাছে দীক্ষা নিতে চাইলে, রাজপরিবারের বিধিনিষেধের কারণে দ্রোণাচার্য তাকে শিষ্য করে নিতে অসম্মত হন।

দ্রোণাচার্য শিষ্য করে না নিলেও একলব্য থেমে থাকেনি। সে হস্তিনাপুরের কাছেই এক বনে আশ্রয় নিয়ে দ্রোণাচার্যকে গুরু মেনে সাধনা শুরু করে। একদিন সাধনায় বিঘ্ন ঘটায় একলব্য একটা কুকুরটির মুখে সাতটি তীর এমন দক্ষতার সাথে বিদ্ধ করেন যে, সম্পূর্ণ সুস্থ্য থাকার পরও শোরগোল করার অবস্থা কুকুরটির ছিল না।

পোষা কুকুরের এ অবস্থা দেখে রাজবংশের লোকেরা বুঝতে পারে, এ কাজ সাধারণ কোনো তীরন্দাজের হতেই পারে না। তারা জানাতে পারে এই তীরন্দাজ যুবক নিজেকে দ্রোণাচার্যের শিষ্য হিসেবে পরিচয় দেয়। একথা জেনে গুরু দ্রোণাচার্য একলব্যের কুটিরে এসে উপস্থিত হয়।

গুরুর কাছ থেকে প্রত্যক্ষ কোনোরূপ শিক্ষা না নিলেও গুরুর প্রতি কেবল ভক্তি-শ্রদ্ধার জোরে একলব্য যে জগৎশ্রেষ্ঠ তীরন্দাজে পরিণত হয়েছে। তার দক্ষতা দেখে দ্রোণাচার্যের সন্দেহ থাকে না।

নিয়মানুযায়ী কাউকে গুরুজ্ঞান করলে গুরুদক্ষিণা দিয়েই তা করতে হয়। দ্রোণাচার্যও যখন একলব্যের কাছে গুরুদক্ষিণা চাইলেন। তখন বিন্দুমাত্র সময় অপচয় করে একলব্য তার সর্বস্ব দেয়ার অঙ্গিকার করে। অর্জুনকে জগৎশ্রেষ্ঠ তীরন্দাজ প্রমাণ করতে দ্রোণাচার্য একলব্যের দক্ষিণ হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি গুরুদক্ষিণা রূপে দাবী করেন।

অনার্য একলব্য ভালো করেই জানতো তীরন্দাজের কাছে বৃদ্ধাঙ্গুলি গুরুত্ব কতটা। কিন্তু গুরুর আদেশ সবার আগে। তাই একলব্য সময় ক্ষেপন না করে গুরুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি উপহার দেন।

এ ঘটনার সামাজিক-রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট যাই হোক না কেনো। গুরুর প্রতি শিষ্যের এই ভক্তি জগৎ জুড়ে অবিশ্বরণীয় ঘটনারূপেই স্বীকৃত। লালন সাঁইজি বলেছেন-

যদি ত্বরিতে বাসনা থাকে
ধর রে মন সাধুর সঙ্গ,
ভজরে আনন্দের গৌরাঙ্গ।।

সাধুর গুণ যায় না বলা
শুদ্ধ চিত্ত অন্তর খোলা,
সাধুর দরশনে যায় মনের ময়লা
পরশে প্রেমতরঙ্গ।।

সাধুজনার প্রেম হিল্লোলে
কত মানিক মুক্তা ফলে,
সাধু যারে কৃপা করে
প্রেমময় দেয় প্রেমঅঙ্গ।।

এক রসে হয় প্রতিবাদী
এক রসে ঘুরছে নদী,
এক রসে নৃত্য করে
নিত্যরসের গৌরাঙ্গ।।

সাধুর সঙ্গগুণে রং ধরিবে
পূর্ব স্বভাব দূরে যাবে,
লালন বলে পাবে প্রাণের গোবিন্দ
কররে সৎসঙ্গ।।

অন্যের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে যদি কোনো গুরুকে মনে ধরে তাহলে তার স্মরণে যত দ্রুত যাওয়া যায় ততই উত্তম। কিন্তু মনে না ধরলেও গুরু একজন ধরতেই হবে বলে কারো কাছে দীক্ষা নেয়া বোকামি। আবার এমন কোনো পরিস্থিতি যদি সৃষ্টি হয় যে দীক্ষা নিতেই হবে অর্থাৎ যদি কেউ বাধ্য করে তাতেও কোনো ফল পাওয়া যায় না।

গুরুবাদীরা বলেন গুরুর সান্নিধ্য হলো জন্মজন্মন্তরের বন্ধন। এই বন্ধন দৃঢ় করতে চাই উচ্চকটির প্রেম। সেই প্রেম উদয় না হলে কারো দারস্থ্য হওয়া সমীচীন নয়। এতে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভবনাই থাকে। মনের সাথে মন মিললে তবেই না প্রেম। তবেই না ভাবের উদয়।

নিজের মন মতো গুরু না হলে সবকিছুতেই গুরুর দোষ খোঁজাই সারা হয়। না হয় চরিত্র গঠন, না হয় সাধনা। তাই গুরুর সাথে প্রেম হওয়াটা আবশ্যক। নইলেই বিপদ। গুরুর সাথে জনম জনম সম্পর্ক হয়। তাই গুরু নির্বাচন অতীব গুরুত্বপূর্ণ। একবার ভুল হয়ে গেলে তার শুধরে নেয়ার পথ সহজে পাওয়া যায় না।

তাই গুরু নির্বাচনের আগেই যত ভাবনা তা ভাবা ভালো। নির্বাচনের পর নিমজ্জিত হওয়াই উত্তম। তখন ভাবতে শুরু করলে দু’কুল হারিয়ে কলঙ্কিনীই হতে হয়। সাঁইজি বলেছেন-

কোন কূলেতে যাবি মনরায়
গুরু কূলে যেতে হলে
লোক কূল ছাড়তে হয়।।

দু-কুল ঠিক রয় না গাঙে
এক কূল ভাঙেতো এক কূল গড়ে,
তেমনি জেনো সাধুসঙ্গে
বেধ বিধির কূল দূরে যায়।।

রোযা পূজা বেদের আচার
তাই যদি মন করো এবার,
নির্বোধের কাম বেদ-বেদান্তর
মায়াবাদীর কার্জ নয়।।

তবে বুঝে একূল ধরো
দোটানায় ক্যান ঘুরে মরো,
সিরাজ সাই কয় লালন রে তোর
কাজ ফুরাবে কোন সময়।।

তবে শত কথার এক কথা। যে জন এর স্বাদ পেয়েছে সেই বুঝবে এর মর্ম। শিষ্য ভিন্ন গুরুর মর্ম কে বোঝে সংসারে। যার মধ্যে লালন সাঁইজির ভাববাদ বোঝার জন্য গুরুবাদী চিন্তাধারা গুরুত্ব পায় সেই জানতে পারার সুযোগ পায় ফকির লালনের মতবাদের ধারা।

নয়তো ফকির লালন সাঁইজির পদের শাব্দিক অর্থ খুঁজতে খুঁজতে; কে ভুল করলো কে শুদ্ধ করলো, কোন গুরু ভালো-কোন গুরু খারাপ ইত্যাদি ইত্যাদি ভাবতে ভাবতেই সময় চলে যায়। টেবিল চেয়ারে বসে গবেষণা করা সহজ, লালন ফকিরের গান করা সহজ। কিন্তু গুরুবাদী ভাবধারাকে গ্রহণ করা সহজ নয়।

তবে কি ফকির লালন সাঁইজিকে বুঝতে গুরুবাদই একমাত্র পথ? নাকি এর বাইরেও কিছু আছে, তা নিয়ে পরবর্তী কোনো সময় লিখবো। আজ যেজন শিষ্য হয়ে গুরুর সন্ধানে রত আছে তাদের ভালোবেসে সাঁইজির পদ দিয়েই শেষ করছি। তার আগে সাধুগুরুবৈষ্ণবপাগল সকলের কাছে ভুল-ত্রুটি মার্জনীয়-

যে জন শিষ্য হয়, গুরুর মনের খবর লয়।
এক হাতে যদি বাজতো তালি
তবে দুই হাত কেন লাগায়।।

গুরু-শিষ্য এমনি ধারা
চাঁদের কোলে থাকে তারা,
খাঁচা বাঁশে ঘুণে জ্বরা
গুরু না চিনলে ঘটে তাই।।

গুরু লোভী শিষ্য কামী
প্রেম করা তার সেচা পানি,
উলুখড়ে জ্বলছে অগ্নি
জ্বলতে জ্বলতে নিভে যায়।।

গুরু-শিষ্যে প্রেম করা
মুঠের মধ্যে ছায়া ধরা,
সিরাজ সাঁই কয়, লালন তেরা
এমনই প্রেম করা চাই।।

জয়গুরু
আলেকসাঁই

……………………………………….
আরো পড়ুন:
লালন সাঁইজির খোঁজে : এক

ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া যাতায়াতের বিস্তারিত জানতে…

…………………………………..
চিত্র:
ফকির লালন সাঁইজির প্রকৃত কোনো ছবি নেই। লেখাতে ব্যবহৃত ছবিটি লালন ফকিরের কাল্পনিক একটি ছবি মাত্র। বহুল ব্যবহৃত হলেও এই ছবির সাথে লালন সাঁইজির আদৌ কোনো যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায় না।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!