ভবঘুরে কথা
ফকির লালন শাহ্

-মূর্শেদূল মেরাজ

বহুকাল ধরেই ভাবছি ফকির লালন সাঁইজিকে নিয়ে একটা লেখা লিখবো। এদিক-সেদিক থেকে টুকে বা লালন সাঁইজিকে নিয়ে কে কি বললো সেসব জুড়ে দিয়ে অথবা লালন মতের তাত্ত্বিক দর্শন ব্যাখ্যার ভারি ভারি শব্দ মিলিয়ে কোনো লেখা নয়। এমন একটা লেখা যে লেখাটায় লালন সাঁইজির জাত-পাত-ধর্ম-গোত্র নয় বরং লালন ফকিরকে খুঁজে পাওয়ার একটা দিশা পাওয়া যাবে। এর বেশি কিছু নয়। সাদামাটা একটা লেখা। কিন্তু চাইলেই কি ফকির লালন সম্পর্কে এমন একটা লেখা লিখে ফেলা সম্ভব? এই প্রশ্নটা জাগে বলেই লেখাটা শুরু করি করি করেও করা হয়নি কখনো।

বহুকাল ধরে লেখাটার খণ্ড খণ্ড চিত্র মাথার ভেতর নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি; কিন্তু লিখে ফেলবার সাহস পাইনি কখনো। ফকির লালনকে নিয়ে লিখতে হবে ভাবলেই যেন সুনশান নিরবতা নেমে আসে চারপাশে। শরীর হিম হয়ে উঠে। শিরদাড়ায় শীতল স্রোত দিগ্বিদিক ছুটাছুটি করতে শুরু করে দেয়। দেহের পাখিটা খাঁচা ছাড়া হয়ে যায়।

তবে এই হাহাকার ধ্বনিটা যেমন তীব্রতা বাড়ায়; তেমনি একটা প্রশান্তির বারতাও দিয়ে যায়। মনের মাঝে ভয় যেমন কাজ করে তেমনি তাঁকে নিয়ে লিখবার একটা শিহরণও যে গোপনে অনুভব করিনি তা কিন্তু নয়। মজার বিষয় হলো, যাকে নিয়ে এতো আয়োজন তাঁর সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানি না-কিছুই বুঝি না। আর তাঁকে নিয়েই কিনা লিখবার দুঃসাহস করছি; ভাবা যায়?

কিছুদিন আগে শেষরাতের দিকে এক মাজারের আঙিনায় বসে কাওয়ালী শুনেছিলাম। তার একটা লাইন খুব মনে পরছে লেখার শুরুতেই। লাইনটার বাংলা অর্থ করলে মোটামুটি এমন দাঁড়ায়- “তুমি মনের মাঝে (হৃদয়ে) তো আসো; কিন্তু বুঝের মাঝে আসো না।” লালন সাঁইজি আমার কাছে তেমনি একটা চরিত্র। ভাবলেই মনে হয় কতো কাছের… কতো পরিচিত… কতো আপন কেউ। কিন্তু বুঝতে গেলে টের পাওয়া যায়, তাকে বোঝা কি পরিমাণ দুঃসাধ্য।

তবে কি লালন সাঁইজি দূর্বোধ্য কেউ? এমন কেউ যাকে বোঝা অসম্ভব? যাকে হৃদয়ে লালন করা যায় কিন্তু ধারণ করা যায় না; এমন কেউ! তবে যে শুনি তিনি সহজ মানুষ? সহজ মানুষ তৈরির মতই লালন সাঁইজির মত… লালন সাঁইজির পথ…!! তবে কি ভুল জেনেছি? ভুল শুনেছি? নাকি আমিই ভুল বুঝছি?

বলতে দ্বিধা নাই প্রশ্নটা বহুদিন ধরে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। তারপর জেনেছি, নিজে সহজ মানুষ না হলে, সহজ মানুষকে বোঝা সহজ নয়। নিজে সহজ হতে পারলেই বোধ-বুদ্ধি-বিবেচনা সহজ হয়… দৃষ্টি সহজ হয়… তাতেই ধরা দেয় সহজ মানুষ। লালনকে বুঝতে গেলেও হতে হবে সহজ মানুষ। নিজে সহজ না হলে তাঁকে বোঝা বড় দায়। কুটিল-জটিল মানসিকতা নিয়ে মহতকে বুঝতে চাওয়াটাই আসলে বোকামি।

অনেক অলি-গলি-মেঠোপথ ঘুরে এটুকু বুঝতে পেরেছি- নিজে সহজ মানুষ হয়ে, সহজ মানুষ ভজনের সাধনা করলে; তবেই দৃশ্যমান হন স্বয়ং সহজ মানুষ; নচেৎ নয়। এটাই ধ্রুব সত্য। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। এটাই লালন সাঁইজিকে আপনরূপে চিনবার উপায়। সহজকে বুঝতে হবে সহজ হয়ে; এটাই স্বাভাবিক প্রকৃয়া। বিশ্বভ্রহ্মাণ্ড এই নিয়মেই চলে। প্রকৃতিতে এর ব্যার্তয় ঘটে না। প্রকৃতি তার আপন খেয়ালে চলে। শুনতে একটু খটকা লাগলেও এটাই সূত্র… এটাই নিয়ম…।

‘তাঁকে চিনতে পারলেই তিনি দৃশ্যমান হবেন’ কথাটি শুনলে আপাতদৃষ্টিতে খেয়ালি পোলাও খাওয়ার গল্প মনে হতেই পারে। কারণ ফকির লালন দেহত্যাগ করেছেন তাও নাই নাই করে সোয়া শ’ বছরের বেশি হতে চললো। চাইলেই কি আর তাকে দেখবার উপায় আছে? তিনি কোথায় দৃশ্যমান হবেন? হৃদমন্দিরে? নাকি দৃষ্টির সামনে? এসব মারফতি বিষয়ে না প্রবেশ করে বরং দৃষ্টিভঙ্গী একটু পরিবর্তন করে ভাবলে কেমন হয়?

এই যেমন কথায় বলে ‘মানুষ তার সৃষ্টির মাঝে বেঁচে থাকে’। যদি তাই হয় এবং যদি ধরেই নেই মানুষ তার সৃষ্টির মাঝেই বাঁচে। তাহলে মানুষকে খুঁজে পাওয়ার একটা পথ হতে পারে তার সৃষ্টিকর্ম বা শিল্পকর্ম। তবে এজন্য একটা শর্ত কিন্তু কথাটার মাঝেই জুড়ে দেয়া হয়েছে, সৃষ্টিকর্মের মাঝে বেঁচে থাকতে চাইলে তাকে অবশ্যই ‘মানুষ’ হতে হবে। মনে রাখতে হবে, মানুষ হওয়াও কিন্তু সকলের কর্ম্ম নয়। মানুষের গর্ভে জন্মালেই সকলে মানুষ হয় না। রীতিমতো তপস্যা করে ‘মানুষ’ হয়ে উঠতে হয়।

যারা কেবল নিজের জন্যই বাঁচে না বরঞ্চ নিজেকে জানার ভেতর দিয়ে সমগ্র সৃষ্টির কল্যাণে রত থাকে তারাই মানুষ হিসেবে নিজেকে দাবী করতে পারে। বাকিরা তো জনতা মাত্র। তারা কেবল সংখ্যা বাড়ায়। মানব ভ্রূণকে টিকিয়ে রাখার জন্য নিজেরা টিকে থাকে। যাতে করে ‘মানুষ’ সৃষ্টির সম্ভবনা বজায় থাকে।

সেই বিবেচনায় বলা যেতেই পারে ফকির লালন বেঁচে আছেন তার সৃষ্টির মাঝে; তাঁর গানে-জ্ঞানে। আর তাঁর এই গান-জ্ঞান শুদ্ধরূপে বুঝতে পারলে অর্থাৎ এই গানের জ্ঞান দর্শন করতে পারলে লালন ফকিরের দর্শনও লাভ করা যাবে। একথা মিথ্যা নয়; কথা সত্য।

অন্যদিকে লালনকে নিয়ে ভাবনার একটু গভীরে প্রবেশ করলে সবচেয়ে আগে যে প্রশ্নটা আসে তা হলো ফকির লালন আসলে কে? কেবল কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার বাংলাভাষী একজন সাধক? নাকি তাঁর মাঝে লুকায়িত আছে অনন্ত জগৎ? যুগে যুগে যারা আবির্ভূত হন মানব মুক্তি দিশারী হিসবে? এই প্রশ্নেরধারা অনন্ত। এর শুরু আছে শেষ নেই। যারা লালনকে মানেন… বিশ্বাস করেন… তাঁর ধারা অনুসরণ করেন তারাই বুঝবে এ কথা মর্ম।

মানুষের মাঝে বসবাস করে, মানুষের মাঝেই সাধনা-ভজন করে নিজেকে এমনভাবে আড়াল করে রাখার অসাধারণ এক ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছিলেন ফকির লালন। সকল সাধকের মাঝেই গুপ্ত অনেক বিষয় থাকে। কিন্তু আগাগোড়া নিজেকে আড়ালে করে রাখার মতো ক্ষমতা লালন ভিন্ন অন্য কোনো সাধকের মাঝে দেখা যায় না। ভারতবর্ষের গুটিকয়েক সাধকের সাথে এমন কাহিনী যুক্ত থাকলেও; দেখা যায় তাদের প্রায় প্রত্যেকেই ছিলেন জনবিচ্ছিন্ন বা নির্জনবাসী। কিন্তু ফকির লালন প্রায় সমগ্র জীবন সকলের সম্মুখেই ছিলেন। মানুষের মাঝেই করেছেন সাধন-ভজন। আবার নিজেকে রেখেছেন সম্পূর্ণ রহস্যে মুড়ে।

ফকির লালন এমনই একজন সাধক যিনি তাঁর প্রকৃত নাম-ধাম-জাত-গোত্রসহ একজন মানুষ সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে যেসব প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মনে জাগে তার সবই আড়াল করে রাখতে পেরেছেন। যা তাঁর দেহত্যাগের প্রায় ১৩০ বছর পরও বলবৎ আছে। এমন একজন রহস্যময় মানুষকে নিয়ে কিছু লেখা আরো জটিল হয়ে উঠে যখন তাঁর সৃষ্টিকর্ম হয় তাঁর নিজের চেয়েও রহস্যময়।

আসলে রহস্যময়তার আরেকনাম ‘লালন ফকির’ বললেই হয়তো সেই নামের যর্থাথ মূল্যায়ন হয়। এই রহস্যের মায়াজ্বাল নিংড়ে কি করে যে তাঁর কাছাকাছি পৌঁছানো যাবে তার দিকদিগন্ত খুঁজে পাওয়া মোটেও সহজ নয়। কারণ তাঁর সৃষ্টিকর্ম ধরে এগুনোর পথটা আরো দুর্গম। ভাববাদ-মরমীবাদের গুপ্ত মতবাদের ভাষার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকে হাজার রকমের অর্থ; যা গুরুর কাছে সমর্পন করে স্তরে স্তরে সাধনায় এগিয়ে না গেলে স্পষ্ট হয় না। এই মত প্রকৃতপক্ষে জীবনবোধ। তাই তাতে জীবনযাপন না করলে তার অর্থ ধরা সহজ নয়।

চেয়ার-টেবিলে বসে গবেষণা করে ‘লালন গান’-এর যে অর্থ পাওয়া যায় তা সাধনপথের প্রকৃত অর্থ থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করে। লালন সাঁইজির সৃষ্টিকর্ম অর্থাৎ ‘লালন মত’ বোঝা সাধারণের কর্ম নয়। আর যৎকিঞ্চিৎ বোঝা যদিওবা যায় তা প্রকাশ করা আরো মুশকিল।

ভাববাদ-মরমীবাদের গুপ্ত জ্ঞান বোঝার জন্য সাধন-ভজনের যে পরিমাণ গভীরে ডুবতে হয়; সে পরিমাণ না ডুবলে সেই ভেদের কথা কেউ অনুধাবনই করতে পারবে না। আবার কেউ যদি প্রকাশ্যে সেই ভেদের কথা ব্যক্তও করে; তা শুনেও যে এই জলে ডুব দেয়নি তার আদৌ কোনো উপকারও আসবে না এই ভেদজ্ঞান। আদৌতে এই জ্ঞান নিজের সাথে নানা পরীক্ষানিরীক্ষা-গবেষণা ত্যাগ-তপস্যা করে তবেই বুঝতে হয়। নোট বইয়ের মতো পড়ে এই জ্ঞান লাভ করার কোনো বিকল্প পথ নেই।

অনেকেই লালনকে বুঝতে তাঁর গানের শাব্দিক অর্থ ধরে এগিয়েছেন। লালন তত্ত্বের অতলে পূর্ণরূপে ডুবতে না পারলেও এটুকু জেনেছি লালনের গানের শাব্দিক অর্থে লালন মত খুঁজতে গেলে শুধু গোলে নয় মহাগোলে পরতে হবে। কারণ তাঁর পদে প্রতিটি শব্দের সাধারণ যে অর্থ তার অন্তরালে রয়েছে গূঢ় রহস্য। প্রতিটি শব্দ কেবল নয়, প্রতিটি অক্ষরের মাঝে, প্রতিটি সংখ্যার মানে ইঙ্গিত দেয়া আছে বিশ্বভ্রহ্মাণ্ডের অন্তনির্হিত জ্ঞান। তাই আধ্যাত্মিকতা ও সাধন-ভজনের নিগূঢ় রহস্য না জানলে কেবল শাব্দিক অর্থে লালন ফকিরের গান থেকে জ্ঞান অনুসন্ধান করা প্রায় অসম্ভব। লালন ফকির তাঁর গানে নিজের সম্পর্কে কিছুই প্রকাশ করেন নি। তাই শাব্দিক অর্থে অনুপ্রবেশ করে লালন ফকির সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যাবে তাও কিন্তু নয়।

তবে তাঁর গানের মাঝে যে সকল মহাপুরুষের কথা তিনি উল্লেখ করছেন। তাদের সম্পর্কে যদি ভাবা যায় বা তাদের কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে এবং কেনো তিনি গানের মাঝে এনেছেন। এই অনুসন্ধান যদি করা যায়। তাহলে হয়তো ফকির লালন সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণা পাওয়া গেলেও যেতে পারে। পৃথিবীর ইতিহাসে এতো মহাজন-মহাপুরুষ-মহাত্মা থাকতে ফকির লালন তাঁর পদে কাকে কাকে স্থান দিলেন? কেনোই বা দিলেন? এটা তাঁকে অনুসন্ধানের একটা যৌক্তিক পথ হতেই পারে।

যেমন বুদ্ধের সহজিয়া মতের সাথে অনেকটা মিল থাকলেও ফকির লালন আশ্চর্যজনকভাবে গৌতম বুদ্ধের কথা তাঁর কোনো গানে উল্লেখ করেন নাই। যদিও বৌদ্ধধর্মের কথা দুই একটা পদে এসেছে। আবার উপমহাদেশের প্রভাবশালী সাধক খাজা মইনুদ্দীন চিশতীর নাম না আসলেও তাঁর গানে এসেছে খাজা নিজামুদ্দীন চিশতীর নাম। এই যে কেনো তিনি একজন মহাপুরুষের নাম উল্লেখ করেছেন আবার আরেকজনকে বাদ দিয়েছেন। বা একজন মহামানবের জীবনের একটা অংশ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন; আবার অন্য একটা অংশকে পুরোপুরি অবজ্ঞা করে গেছেন। এই ভেদটা বুঝতে পারলে হয়তো সেই অধর চাঁদকে ধরা গেলেও যেতে পারে।

লালন ফকির তাঁর পদে যেসকল মহাপুরুষের নাম উল্লেখ করছেন তারমধ্যে নবী মোহাম্মদ, শ্রীকৃষ্ণ, নিত্যানন্দ মহাপ্রভু, গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর নাম উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও ঘটনা প্রসঙ্গে এসেছে আরো অনেক মহতের নাম। তবে ঘটনা বিচারে দেখা যায় লালন ফকির তাঁর গানের জ্ঞানে বহু মহাপুরুষের কথা উল্লেখ করলেও গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুকে রেখেছেন অনন্য উচ্চতায়।

নদীয়ায় যে বাংলা রেনেসা শুরু হয়েছিল গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর হাত ধরে ফকির লালন তাকে দেখেছিলেন মানব মুক্তির অন্যতম দিশা হিসেবে। লালন সাঁইজি এক জায়গায় বলছেন-

“সে কি আমার কবার কথা
আপন বেগে আপনি মরি।
গৌর এসে হৃদয়ে বসে
করলো আমার মন-চুরি।।”

ব্রাহ্মাণ্যবাদীদের বারাবারির বিপরীতে গৌরঙ্গ মহাপ্রভু যেভাবে প্রচলিত নিয়ম ভেঙ্গে সকলের সম অধিকারের জন্য লড়ছিলেন প্রেমের ভেতর দিয়ে; তা হয়তো মুগ্ধ করেছিল ফকির লালনকে। তিনি লিখছেন-

এনেছে এক নবীন গোরা
নতুন আইন নদিয়াতে।
বেদ পুরাণ সব দিচ্ছে দুষে
সে আইনের বিচার মতে॥

সাতবার খেয়ে একবার স্নান
নাই পূজা তার পাপ পূণ্যি জ্ঞান
অসাধ্যের সাধ্য বিধান
শিখাচ্ছে সব ঘাটে পথে॥

করে না সে জাতের বিচার
কেবল শুদ্ধ প্রেমের আচার
সত্য মিথ্যা জানব এবার
সাঙ্গ পাঙ্গ জাত অজাতে॥

পেয়ে ঈশ্বরের রচনা
তাই বলে সে বেদ মানে না
লালন কয় ভেদ-উপাসনা
কর দেখি মন দোষ কি তাতে॥

ঘটনা বিচারে দেখা যায়, লালন ফকির ধারিত্রীর যে বিষয়বস্তুকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন সাধন-ভজনের জন্য, জীবনবোধের জন্য, বেঁচে থাকবার জন্য, মুক্তির জন্য তা আর কিছু নয়; কেবল ‘প্রেম’। প্রেম ভিন্ন আর কিছুই তিনি সম্ভবত খোঁজেনও নি, দেখেনও নি এমনকি বলেনও নি। কথাটার সত্যতা কতটা তা নিয়ে সন্দিহান হওয়ার আগে লালন ফকিরের পদে মহাপুরুষদের উপস্থিতি দেখলেই স্পষ্ট হয়ে যায়।

নবীমোহাম্মদ ও শ্রীকৃষ্ণের বৈচিত্রময় জীবনে বেশ কয়েকটি ভাগ আছে যেখানে যুদ্ধ আছে, বিদ্রোহ আছে, সামাজিক জীবন আছে, পারিবারিক জীবন আছে, ধর্ম-দর্শন আছে, গুরু-শিষ্যের গূঢ় রহস্য আলোচনা আছে। কিন্তু লালন ফকির তাদের জীবনের সেসব কিছু নিয়ে টু শব্দটি পর্যন্ত করেন নি। তিনি তাদের জীবনের প্রেম পর্বটাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। কখনো-সখনো অন্য প্রসঙ্গ চলে আসলেও তা মূলত এসেছে প্রেমকে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যেই। মায়ের সাথে পুত্রের প্রেম, প্রেমিকার সাথে প্রেম, প্রকৃতির সাথে প্রেম, স্বজনের সাথে প্রেম ইত্যাদি ইত্যাদি। মোদ্দা কথা জগতের যত রকমের প্রেম আছে, যত ধরণের প্রেম আছে তাই তিনি ব্যক্ত করেছেন তাঁর গানের মাঝে, তাঁর জ্ঞানের মাঝে।

ফকির লালন তার পদে নবী মোহাম্মদকে ‘শুদ্ধ সংস্কারের প্রেম’-এর প্রতীকরূপে উপস্থাপন করেছেন। সাধনার গুজ্জ্যাতিগুজ্জ বিষয়গুলোকে তিনি নবীতত্ত্বরসুলতত্ত্বের ভেতর দিয়ে সহজবধ্য ভাষায় অবলীলায় উপস্থাপন করেছেন। স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির যে মিলন… সেই মিলনের যে প্রেম… সেখানে মানুষের প্রতি যে প্রেম… প্রেমের ভেতরে যে আশ্রয় আর সেই আশ্রয়ের ভেতরেই যে মুক্তি তা স্পষ্ট করেছেন।

স্রষ্টার সাথে নবীর যে সাক্ষাৎ সেই অংশটাকেই গুরুত্ব দিয়েছেন ফকির লালন। এবং এর জন্য নবী মানবজাতিকে যে সংস্কার দিয়েছেন; একাত্মবাদ দিয়েছেন, যে বাতেনী মতবাদ দিয়েছেন সমগ্র মানবকুলকে ভালোবেসে ফকির লালন সেই শুদ্ধ সংস্কারের কথাই তুলে এনেছেন তাঁর পদে। লালন বলেছেন-

কুল গেল কলঙ্ক হ’ল
আর কিবা আছে বাকি
দরবেশ সিরাজ সাই কয় অবোধ লালন
রাসুল চিনলে আখের পাবি।।

ঘৃণা-মারামারি-লোভ-কাম-ক্রোধ এসবকে দূরে ঠেলে দিয়ে ফকির লালন বিশ্ব মানবের কাছে মানবতার যে পত্র দিয়ে গেছেন তা কালের বিবর্তনে কখনো পুরানো হবার নয়। প্রতিনিয়তই সেই পত্র সুরের ভেতর দিয়ে নতুন নতুন রূপে নতুন নতুন পাঠকের কাছে ধরা দেয়। সাধারণে হয়তো তার গূঢ় অর্থ বুঝতে পারে না; কিন্তু পত্রের যে প্রেমময় আবেদন তা অস্বীকারও করতে পারে না। ভক্তকুল তার নিজের আধ্যাত্মিক জ্ঞানের পরিধির ভেতর থেকে নিজেই নিজের মতো করে এর অর্থ বুঝে নেয়। আর সাধককুল সেই প্রেমে ভেসে বেড়ায়। কেউ সেই জ্ঞান পানে ডুব দেয় গভীর জলে। কেউ আবার অল্প বুঝে অধিক জ্ঞান জাহির করতে গিয়ে হাপুরহুপুর ডুব পারে।

লালন ফকিরের গানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এসেছে ‘মধুর প্রেমের মূর্তি’ রূপে। কৃষ্ণলীলা পদে ফকির লালন সাঁই মধুর প্রেমের ভেতর বর্ণনা করতে গিয়ে দেহতত্ত্বের সাধন-ভজনের যে ধারা; তা এতো বেশি সহজ ভাষায় ব্যক্ত করেছেন যে প্রকৃতপক্ষে সহজ না হলে সেই ভাষা উদ্ধার করা সাধারণের পক্ষে অসম্ভব। এর জন্য চাই দীর্ঘ সাধনা। চাই ফকিরি। আর ফকিরি নিলেই এই অজান খবারের সন্ধান পাওয়া সম্ভব। উপরি উপরি ভেসে এই জ্ঞান আহরোণের চেষ্টা করাও বৃথা। শ্রীকৃষ্ণের জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব মহাভারতের গীতা অংশ; যা কিনা গুরু-শিষ্য পরম্পরার অত্যন্ত মূল্যবান দলিল। কিন্তু লালন সাঁইজি সেসব স্পর্শ করেন নি। করেন নি কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের দামামায় কর্ণপাত। কেবল মা যশদা ও গোপীদের সাথে কাটানো কৃষ্ণের লীলা নিয়ে রচনা করে গেছেন কৃষ্ণলীলা আর গোষ্ঠপদ। সাঁইজি বলছেন-

অনাদির আদি শ্রীকৃষ্ণ নিধি
তাঁর কি আছে কভু গোষ্ঠখেলা।
ব্রহ্মরূপে সে অটলে বসে
লীলাকারী তাঁর অংশকলা।।

লালন ফকিরের পদে আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলেন নিত্যানন্দ মহাপ্রভু। তিনি তাঁর গানে এসেছেন ‘প্রেমের বিশ্বস্থতা বা দায়িত্ববোধের স্বরূপ’ হিসেবে। যে প্রেম কখনো ছেড়ে যায় না। কোনো পরিস্থিতিতেই যে প্রেম দূরে যায় না… দূরে ঠেলে দেয় না। শত ঝড়ঝঞ্জাটেও যে, প্রেমের মূল্য দিতে সদা প্রস্তুত। লালন ফকিরের গানে প্রেমের দায়িত্ববোধের উপমারূপে প্রকাশ পেয়েছে নিতাই রূপে। নিতাইলীলা গানের পদে পদে প্রেমের দায়িত্ববোধের উচ্চকোটির বার্তা দৃশ্যমান হয়। সাঁইজি নিতাইলীলায় বলছেন-

দৃঢ় বিশ্বাস করে রে মন
ধর নিতাইচাঁদের চরণ,
পার হবি তুফান
এপারে কেউ থাকবে না।।

লালন ফকিরের গানের জ্ঞানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু এসেছেন ‘সংগ্রামী প্রেমিক রূপে’। যে প্রেমের জন্য প্রথা ভাঙ্গতে জানে। প্রেমের সমতা আনতে খুলে দিতে পারে জগন্নাথ মন্দিরের দ্বার। অবতারের ভেতর ভগবান আর ভগবানের ভেতর অবতারের দর্শন করতে পারে। প্রেমের প্রতিষ্ঠার জন্য হাজার বছরের শাস্ত্রীয় বিশ্বাসকে ভেঙ্গে বলতে পারে মানুষ হয়ে মানুষের ভজনা করো। গৌরকে নিয়ে সাঁইজি লিখেছেন-

ও গৌরের প্রেম রাখিতে
সামান্যে কি পারবি তোরা
কুলশীলে ইস্তফা দিয়ে
হইতে হবে জ্যান্তে মরা।।

থেকে থেকে গোরার হৃদয়
কত না ভাব হয় গো উদয়
ভাব জেনে ভাব দিতে সদাই
জানবি কঠিন কেমন ধারা।।

পুরুষ নারীর ভাব থাকিতে
পারবি নে সে ভাব রাখিতে
আপনার আপনি হয় ভুলিতে
যে জন গৌররূপ নিহারা।।

গৃহে ছিলি ভালই ছিলি
গৌরহাটায় কেন মরতে এলি
লালন বলে কি আর বলি
দুকূল যেন হোসনে হারা।।

ফকির লালনকে বুঝতে গেলে, ফকির লালনের মতকে বুঝতে গেলে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর বৈষ্ণব মতকে বুঝতে হবে। বুঝতে হবে নবী মোহাম্মাদের স্রষ্টার সাথে সাক্ষাতের গূঢ় তত্ত্ব। বুঝতে হবে কৃষ্ণের প্রেমলীলাকে। বুঝতে হবে ভারতবর্ষের অন্যতম শাস্ত্র বেদ-এর মাঝে কি সত্য লুকায়িত আছে। বুঝতে হবে দেলকোরাআনের ব্যাখ্যা। বুঝতে হবে দায়েমী নামাজ। জানতে হবে আদম ছফির আদ্য কথা। আসলে এসবই আধ্যাত্মবাদের নিগূঢ় তত্ত্ব। এসকল তত্ত্ব সম্পর্কে ধারণা না থাকলে লালন ফকিরকে বোঝা অসম্ভব।

এছাড়া স্থূলপ্রবর্তসাধকসিদ্ধি পর্যায়ের পদে ফকির লালন অনেক মহাজনের নামই উল্লেখ করেছেন ঘটনা-কাহিনী ও রূপকের প্রয়োজনে। ফকির লালন তার গানের জ্ঞানে শুদ্ধপ্রেমের প্রেমিক হিসেবে নবী মোহাম্মদ, দায়িত্বসম্পন্ন প্রেমের প্রেমিক হিসেবে নিত্যানন্দ মহাপ্রভু, সংগ্রামী প্রেমের প্রেমিক হিসেবে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু, মধুর প্রেমের প্রেমিক হিসেবে শ্রীকৃষ্ণকে উপস্থিত করেছেন। আবার ভক্তিমার্গের উদাহরণে এসেছে রামদাস মুচির নাম। কখনো এসেছে শ্রীরাম কখনো লক্ষণ। আসলে একটা নিগূঢ় সত্যকে বলতে যেয়ে ফকির লালন অনেক চরিত্রকে ব্যবহার করে গল্পের ছলে বলে গেছেন বহু অজান খবর। এই পদটা তার একটা উদাহরণ হতেই পারে-

ওরে মন আমার গেল জানা।
কারো রবে না এ ধন
জীবন যৌবন
তবে রে কেন এত বাসনা।।

একবার সবুরের দেশে
বয় দেখি দম কষে
উঠিস নেরে ভেসে পেয়ে যাতনা।।

যে করিল কালার চরণেরি আশা,
জান না রে মন তাহার কি দশা,
ভক্ত বলি রাজা ছিল
রাজত্ব তার নিল
বামন রূপে প্রভু করে ছলনা।।

কর্ণ রাজা ভবে বড় দাতা ছিল
অতিথি রূপে তার সবংশ নাশিল,
তবু না হৈল দুখি
রইল না অনুরাগী
অতিথির মন করল সান্ত্বনা।।

প্রহ্লাদ চরিত্র দেখ চিত্রধামে,
কত কষ্ট হল তার কৃষ্ণ নামে,
তারে অগ্নিতে ফেলিল
জলে ডুবাইল
তবু না ছাড়িল শ্রীনাম সাধনা।।

রামের ভক্ত লক্ষ্মণ ছিল সর্বকালে,
শক্তিশেল হানিল তাহার বক্ষঃস্থলে,
তবু রামচন্দ্র প্রতি
না ভুলিল ভক্তি
লালন বলে, কর এ বিবেচনা।।

গুরু-শিষ্য পরম্পরা ধারা বস্তুনিষ্ঠভাবে ধাপে ধাপে উপমহাদেশের কোনো সাধকই ফকির লালনের মতো এতো বিস্তৃত করে বলেছেন বলে তেমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। অনেক সাধকই সাধকের গূঢ় তত্ত্ব নিয়ে কথা বলেছেন। বিশ্বভ্রহ্মাণ্ডকে জানবার জন্য নিজেকে জানার যে সাধন পদ্ধতি তার বিবরণ অনেক সাধকের সাধনতত্ত্বে পুঙ্গানুপুঙ্খরূপে থাকলেও ফকির লালন সাঁইজি তার পূর্ণাঙ্গরূপ দিয়েছেন।

ফকির লালন খুব কায়দা করে বলেছেন, ‘পাগলের সঙ্গে যাবি পাগল হবি বুঝবি শেষে।’ আসলে ঘটনা তাই পাগলকে বুঝতে গেলে পাগল হয়েই বুঝতে হয়। পাগল না হলে পাগলের ভেদ বোঝা দায়। যে পাগলকে বুঝতে চায় সে ধীরে ধীরে পাগল হয়ে উঠে; নাকি পাগল তাকে পাগল করে তোলে সেটা অন্য বিতর্ক। কিন্তু মোদ্দ কথা একটাই ফকির লালনকে বুঝতে গেলে ফকির হতে হবে। এর অন্যথা হলে চলবে না। আর এই ফকির মানে নয় ভিখারি। যে ভিক্ষা করে পেটের খুদা মেটায়। ফকির হলো সেই চরিত্র; যে তার নিজের সমস্ত কিছু; স্থাবর-অস্থাবর বলতে যা বোঝায় অর্থাৎ নিজের যা কিছু আছে সকল কিছুকে বিলিয়ে দিয়ে জগৎ মুক্তির জন্য সত্যজ্ঞানকে ধারণ করে তা প্রচারে নামতে পারে; সেই পায় এই ফকির উপাধি। আর সবকিছু ছেড়ে যে ফকির হতে পারে সেই বুঝতে পারার সক্ষমতা অর্জন করে ফকির লালনকে বুঝবার। আমার মতো মানুষের পক্ষে ফকির লালনকে ব্যক্ত করা একটা ধৃষ্টতা মাত্র।

মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে শিষ্য অর্জুন যখন সখা শ্রীকৃষ্ণকে ভগবানরূপে দৃষ্ট করলেন। তখনকার যে বর্ণনা সাধারণ অনুবাদগুলোতে পাওয়া যায়; মুসা যখন তুর পবর্তে ঈশ্বরকে দৃষ্ট করলেন তার যে বর্ণনা দিয়েছেন। সেগুলোর কোনটা থেকেই সুস্পষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া যায় না স্রষ্টার। কারণ সৃষ্টির কি সাধ্য স্রষ্টাকে বর্ণনার ভেতর আবদ্ধ করে। এই বর্ণনা কি আসলেই করা যায়? করা কি সম্ভব? ফকির লালন নিজেই বলছেন-

যখন ঐ রূপ স্বরণ হয়
থাকেনা লোক লজ্জার ভয়।
লালন ফকির ভেবে বলে সদাই
ও প্রেম যে করে সেই জানে।।

তাই পরিশেষে আমি কেবল এটুকুই বলতে পারি আমার পক্ষেও ফকির লালন সাঁইজির ভেদ-বর্ণনা করা সম্ভব নয়। এ আমার সাধ্যের বাইরে। তারপরও চেষ্টা করলাম। সকল ভক্তি সেই চরণে দিয়ে এই ধৃষ্টতা করার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি সকল সাধু-গুরু-বৈষ্ণব-পাগলের কাছে।

প্রতিবছরের ন্যায় ফকির লালন সাঁইজির তিরোধান উপলক্ষ্যে সাধুসঙ্গ হবে সাঁইজির ধামে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায়। কার্তিকের ১ তারিখ সন্ধ্যায় অধিবাস পর্বের মধ্যে দিয়ে ২৪ঘণ্টা ব্যাপী সাধুসঙ্গ শুরু হবে পরদিন দুপুরে পূর্ণসেবা নিয়ে সাধুসঙ্গ শেষ হলেও মেলা চলবে ৩ তারিখ পর্যন্ত। সকলকে সাঁইজির ধামের সাধুসঙ্গে আমন্ত্রণ জানিয়ে আজ এখানেই বিদায়।

জয়গুরু
আলেকসাঁই

ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া যাতায়াতের বিস্তারিত জানতে…

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!