শেখ বাহাউদ্দীন নকশবন্দী: দুই

শেখ বাহাউদ্দীন নকশবন্দী: দুই

-মূর্শেদূল মেরাজ

নকশবন্দীয়া তরিকা
তাসাউফের শিক্ষা যেসব তরিকা রয়েছে তার মধ্যে নক্শবন্দীয়া একটি। যতদূর জানা যায়, বায়জিদ বোস্তামীর পর আবদুল খালিক গাযদাওয়ানী এই তরিকা এগিয়ে নিয়ে যান। তবে বাহাউদ্দীন নক্শবন্দীয়ার হাতেই এই তরিকা পূর্ণতা পায়।

সম্রাট আকবরের শাসনামলে ভারতবর্ষে এই তরিকা নিয়ে আসেন খাজা বাকীবিল্লাহ। তারপর এর হাল ধরেন তারই প্রধান মুরিদ শায়খ আহমদ সিরহিন্দি। তার সময়ই ভারতবর্ষে এই তারিকা ব্যাপক প্রসার ঘটে। জানা যায়, সম্রাট জাহাঙ্গীর তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।

আহমদ সিরহিন্দিকে বলা হতো ‘মুজাদ্দিদে আলফে সানি’ যার অর্থ ‘দ্বিতীয় সহস্রাব্দের সংস্কারক’। তার সময়কালে ভারতে এই তরিকা ‘নক্শবন্দীয়া মুজাদ্দিদীয়া আলীয়া’ নামে পরিচিত পায়। পরবর্তীতে মুজাদ্দিদীয়া একটি স্বতন্ত্র তরিকা হিসাবে পরিচিত লাভ করে।

নকশবন্দী নামকরণ
‘নক্শবন্দ’ শব্দের অর্থ ‘চিত্রকর’। জানা যায়, শেখ বাহাউদ্দীন তার মুরিদদের বুকে ইশারায় ‘আল্লাহ’ শব্দের নকশা লিখে দিতেন। যাতে তারা ধ্যানের মাধ্যমে এ নাম পাকের নকশা স্বীয় কলবে প্রতিফলিত করতে পারে। আল্লাহর মহিমার চিত্র হৃদয়ে ধারণ করেন বলে তিনি ও তার অনুসারিরা নক্শবন্দী নামে পরিচিত পায়।

উজবেকিস্তানের শিল্প ও স্থাপত্যে ঐতিহ্যবাহী সূক্ষ্ম নকশার কারুকাজ দেখে অনেকে ধারণা করেন শেখ বাহাউদ্দীন হয়তো নকশাকর ছিলেন। কিংবা নকশার কারুকাজ করে এমন সম্প্রদায়ের বা নকশার কারুকাজ করে এমন অঞ্চলে বাস করতেন বলে তিনি নকশবন্দী নামে পরিচিত ছিলেন।

নকশবন্দী তরিকার মূলনীতি-

নিজ পীরকে সকলের শ্রেষ্ঠ মানা।
পীরের প্রতি অঘাত ভক্তি-শ্রদ্ধা রাখা।
তরিকার মুর্শিদ আবু বকর সিদ্দিককে নবীদের পর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ মানা।
সুন্নতের নিদের্শনা পালন ও বেদাত পরিত্যাগ করা।

নকশবন্দী তরিকার বুনিয়াদ-

১. সর্বদা যিকিরের খেয়াল রাখা।
২. সর্বদা সামনে দৃষ্টি দেয়া। অর্থাৎ সাধনায় ধাপে ধানে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
৩. নিজ সত্ত্বার মধ্যে ভ্রমণ করা।
৪. সকলের মধ্যে থেকেও নির্জনাতা পালন করা।

নকশবন্দী তরিকার সুফি-

১. বায়জিদ বোস্তামী।
২. শায়খ বুআলী।
৩. শায়খ বুআলী ফারমাদী।
৪. খাজা ইউসুফ হামদান।
৫. শায়খ আবদুল খালিক গাযদাওয়ানী।
৬. খাজা আরিফ বিওগরী।
৭. খাজা মাহমুদ আঞ্জীর ফাগ্নাবী।
৮. খাজা আযীযানে আলী রামীতনী।
৯. খাজা মুহম্মদ বাবা সাম্মাসী।
১০. সৈয়দ শামসুদ্দীন আমীর কালাল।
১২. খাজা বাহাউদ্দীন নক্শবন্দী।

নকশবন্দী সিলসিলার ক্রম-

১. নবী মুহাম্মদ (স)।
২. আবু বকর।
৩. সালমান আল-ফারসি।
৪. কাসিম ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর।
৫. জাফর আল-সাদিক।
৬. বায়েজিদ বোস্তামি।
৭. আবু আল হাসান আল-খারকানী।
৮. আবু আলী আল ফরমাদি।
৯. ইউসুফ হামাদান।
১০. আবুল আব্বাস আল-খাদর।
১১. আবদুল খালিক গাযদাওয়ানী।
১২. আরিফ বিওগরী।
১৩. মাহমুদ ফাগ্নাবী।
১৪. আলী রামীতনী।
১৫. বাবা সাম্মাসী।
১৬. আমীর কালাল।
১৭. শেখ বাহাউদ্দীন নকশবন্দী বুখারী।

ওফাত
১৩৮৯ সালে ৭৩ বছর বয়সে বাহাউদ্দীন নকশবন্দী নিজ শহর কাসরে আরেফানে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয়। ১৫৪৪ সালে খান আবদুল আজিজ তার কবরের উপরে একটি সমাধি এবং আশেপাশের ইমারত নির্মাণ করে দেন।

শেখ বাহাউদ্দীনের থেকে নকশবন্দী তরিকার যে প্রসার ঘটে তা ৭০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান। বর্তমান বিশ্বের বহু দেশে তার অগনতি অনুসারী।

পুনশ্চ
শেখ বাহাউদ্দীন নকশবন্দীর তরিকা সম্পর্কে যতটা জানা যায় ততটা তার জীবন সম্পর্কে সেভাবে বিস্তারিত কিছু জানা যায় না। বেশিভাগই ধারণা প্রসূত এবং অন্যদের বলা কাহিনী থেকে উদ্ধৃত। তবে তার বেশ কিছু কারামত বা আশ্চর্যকীর্তির কথা ও কাহিনী প্রচলিত আছে। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য-

এক:
‘আগের কালের অলিদের মধ্যে অনেক আশ্চর্য বিষয় ও কারামত প্রকাশ পেত, কিন্তু এখন তেমন কোন অলির দেখা পাওয়া যায় না।’ এ কথার উত্তরে বাহাউদ্দীন বললেন, ‘এখনো এমন অলি আছে, যিনি নদীর স্রোতকে ইশারা করলে নদীর স্রোত বিপরীত দিকে বইতে শুরু করে।’ তার কথা বলার সাথে সাথেই নদীর স্রোত বিপরীত দিকে প্রবাহিত হতে শুরু করলো।

দুই:
বাহাউদ্দীন নকশবন্দী একবার হজ্জ পালনের সময় ঈদুল আজহার দিনে পশু কোরবানী না বললেন, আমি আজ আমার ছোট ছেলেকে আল্লাহর রাস্তায় কোরবানী দিলাম। পরে জানা গেল, তার এক পুত্র সেই ঈদের দিনই মারা গিয়েছিল।

তিন:
বলা হয়ে থাকে, তিনি যে মাজারেই যেতেন দেখতেন সেখানের বাতিগুলো নিভু নিভু করছে। তার হাতের স্পর্শেই সেগুলো আবার উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে উঠত। এভাবে মাজারে মাজারে ঘুরতে ঘুরতে এক পর্যায়ে তিনি ওয়ায়েসের মাজার হতে আজকার নওবীর মাজার জিয়ারত করার নির্দেশ পান।

সেখানে যাওয়ার পর থেকে জনৈক ব্যক্তি তাকে কোমরে তলোয়ার বেঁধে ঘোড়ায় সাওয়ার করিয়ে রওনা করিয়ে দেয়। ঘোড়ায় করে চলতে চলতে রাতের শেষ ভাগে বাহাউদ্দীন নকশবন্দী শামুসল আওলিয়া মজদে আখন্দের মাজারে পৌঁছান।

মাজারের নিভু নিভু বাতিগুলো তার স্পর্শে পূর্ণভাবে জ্বলতে শুরু করে। সেখানে ফাতেহা আদায় করে মোরাকাবায় বসেন। মোরাকাবা অবস্থায় দেখতে পান একজন বিদগ্ধ মানুষ উচ্চাসনে বসে আছেন এবং তার সামনে বহু অলি আউলিয়া উপস্থিত। তাদের মধ্যে তিনি কেবল মোহাম্মদ সাম্মাসীকে চিনতে পারলেন।

সকলের পরিচয় জানার ইচ্ছা হওয়া মাত্র একজন বললেন, উচ্চাসনে উপবিষ্ট আছেন আরিফ বিল্লাহ মাহবুবে সামদানী আব্দুল খালেক গাজদাওয়ানী এবং অন্য সকলে হলেন তোমার পীরান সিলসিলার পীর।

(সমাপ্ত)

………………………
আরো পড়ুন:
শেখ বাহাউদ্দীন নকশবন্দী: এক
শেখ বাহাউদ্দীন নকশবন্দী: দুই

…………………
তথ্যসূত্র
উইকিডিয়াসমূহ

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!