লালন গানের ‘বাজার বেড়েছে গুরুবাদ গুরুত্ব পায়নি’

লালন গানের ‘বাজার বেড়েছে গুরুবাদ গুরুত্ব পায়নি’

-এস এস রুশদী

এক সময় লালনের আখড়ায় সংখ্যার গণনায় এবং পরিধির বিবেচনায় অনুষ্ঠান ছোট ছিল কিন্তু গুরত্বের দিক থেকে, মর্যাদার দিক থেকে ছিল বড়। উপস্থিতির বেলায়ও সাধু-বাউল, ফকির-দরবেশদেরই প্রাধান্য ছিল। তখন আখড়াবাড়ি ছিল দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ফকির-দরবেশ, পাগলদের মিলন কেন্দ্র। বাউল, ফকির, পাগল প্রেমিকদের ভাব বিনিময়ের, সাধুসঙ্গের, নৃত্যগীতের, আনন্দের মুক্তাঞ্চল ছিল লালন চত্বর।

বর্তমানে লোক সমাগম বেড়েছে, সামাজিক মানুষের ভিড় বেড়েছে, আনন্দের নামে হই হুল্লোড় বেড়েছে। বিরাট বাজার বসেছে, হাট মিলেছে। সাধুদের মিলনমেলা ছাপিয়ে উঠেছে সামাজিক মানুষের ভিড় ও হট্টগোল। ফকির দরবেশদের মিলনমেলা আজ বাণিজ্যমেলার রূপ নিয়েছে। বিকিকিনির ধুম লেগেছে। অবাধ বাণিজ্য হচ্ছে।

সর্বগ্রাসী বাজার অর্থনীতি লালনকেও পণ্য বানাবার চেষ্টায় মেতেছে। দেশি-বিদেশী অনেক ক্রেতা-বিক্রেতা জুটেছে এই বাজারে। বড় মঞ্চ হয়েছে। বাউলদের বদলে সেখান দখল নিয়েছে সাময়িক গেরুয়া সজ্জিত শিল্পীগণ। সে মঞ্চের গোটা অনুষ্ঠানের কর্তৃত্ব দখল করছে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং প্রশাসনিক কর্তা ব্যক্তিরা আর প্রাতিষ্ঠানিক লেবেল আটা সনদধারী বিদ্বান পণ্ডিতেরা।

বাউলদের বদনে যে পোশাকি, পেশাদার লালন গানের নব্য শিল্পীগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে, হচ্ছে, কারা মঞ্চে ওঠার আগে গেরুয়া সজ্জিত হয়ে গলায়, বাহুতে, কব্জিতে এবং খোপায় রুদ্রাক্ষের মালা পড়ে, মাথায় পাগড়ি এটে দৃষ্টিনন্দন সাধুবেশ ধারণ করে। এই সকল লালন গানের শিল্পীরা মঞ্চে নেচে-গেয়ে আসর মাত করছে।

বিভিন্ন মিডিয়ার আলোকচিত্রীরাও ওদেরকেই বাউল ভেবে ক্যামেরায় ধারণ করছে। এই বাউল বেশধারীর মঞ্চ ছেড়ে নেমে এসেই নকল পোশাক খুলে ফেলে আবার সেই পূর্বের পোশাকে ভদ্রলোকের সমাজে ফিরে আসে। “ঝাঁকের কই ঝাঁকে মিশে যায়!!” সাধারণেরা ওদেরকেই বাউল মনে করে। রসিকজনেরা ঠিকই বুঝতে পারে এবং হাসে। কিন্তু দুর্ভাগা জনগণের আসল বাউল ফকির দর্শন হয় না।

লালন যে গুরুবাদের তত্ত্ব দিয়ে গেলেন সেই গুরুবাদের ধারায় জীবনাদর্শ, জীবনবোধ, জীবনাচরণের চর্চা, সাধনা এই বাউলবেশী গানের শিল্পীদের নাই। ওদের বেশির ভাগের তো গুরুই নাই। ওরা অবশ্য ওদের গানের ওস্তাদকেই গুরু মনে করে, গুরু বলে। জানা দরকার লালনের নিজের গুরুও তার গানের গুরু ছিলেন না। গুরুর গুরুত্ব বুঝতে হয়।

এ লেখার উদ্দেশ্য লালনের ভাবগানের বিরোধিতা নয় মোটেও। এই সব শিল্পীদের অনেকের কণ্ঠ এবং গায়কী বেশ ভালো। এই লেখা এই প্রচার প্রসারের বিপক্ষেও নয়। কেবল চটক দিয়ে যেনো লালনের আতল তত্ত্বকে চাপা দিয়ে দেয়া না হয়, সেই সংশয়ের কথা বলছি।

এই সব বাউল বেশধারী শিল্পীরা বড় মঞ্চে যাবার জন্য লালায়িত। সেটা লালনের দর্শন প্রচার প্রসারের জন্য যতটা নয় তারচে’ বেশি নিজেদের পরিচিতির জন্য। তাতে কাজও হয়। অনেক সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ছোট বড় গানের আসরে এসব শিল্পীদের ডাক পড়ে।

কারো কারো টেলিভিশনেও ডাক পড়ে। কখনো কখনো প্রভাশালী ভদ্রলোকের বৈঠকখানায় অথবা আঙিনায় কিংবা অন্য কোন বিনোদনের আসরে তাদের মনোরঞ্জনের জন্য ডাকা হয়। তাদের বিভিন্ন প্রকার বিনোদনের সাথে লালনের গান ভিন্নমাত্রায় যোগ করে। তাদের অনুষ্ঠানের বৈচিত্র বাড়ায়।

প্রশ্ন হচ্ছে কি হয় ঐসব জলসায়?

“মিলন হবে কত দিনে আমার মনের মানুষের সনে।”

“করি মানা কাম ছাড়ে না মদনে।”

“আমার সাদ মেটে না লাঙ্গল চাষে।”

লালনের এই সকল গানের সাথে শিল্পী নিজে এবং ভদ্রলোকেরা আর তাদের ছেলেমেয়েরা যে উদ্যম নৃত্য করে, নৃত্য করার দোষ ধরছি না, আনন্দ করা ভাল, সাধুরাও নিরস, নিরানন্দ মানুষ নয়। কিন্তু নৃত্যের ধরণ দেখে জানতে ইচ্ছা করে ওরা কি বুঝে নাচছে?

ওরা যা বুঝে নাচছে লালন কি তাই বোঝাতে চেয়েছিল? যা বুঝে পুলকিত হচ্ছে তাতে মনে হয় লালন আর পাঁচজন গীতিকারের মত একজন গীতিকার মাত্র। লালনের ভাবগান “লালন সঙ্গীত” নামে প্রায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।

তাতে ঠকার কথাতো ভাবেই না বরং পুলক বোধ করে এই ভেবে যে, লালনকে ওরা জাতে তুলে ফেলেছে। কিন্তু মনে রাখবেন লালন কোনদিন জাতে উঠতে চায় নি। ভদ্রলোকের জাতে তো নায়ই। বরং লালন হলো সকল জাতিকুলের বাইরের মানুষ। লালনের তত্ত্ব দর্শনই হলো জাতিকুলের উর্ধ্বে ওঠার।

তবে লালনের যাই হোক এই সব শিল্পীদের দু-পয়সা রোজগার হচ্ছে, ভদ্রলোকদের হাতে পিঠচাপড়ানী আর প্রশংসা জুটছে, তাতে খুব পুলক আর গৌরব বোধ করছে। অনেককে শুনি ভদ্রলোকদের বাজারে তাদের যে কদর তার গালভরা গল্প করতে।

ভদ্রলোকদের পিঠচাপড়ানীতে উনারা মোহিত, বিমোহিত, আহ্লাদিত। কিন্তু একটা কথা জেনে রাখা দরকার কোনকালেই ভদ্রলোকেরা কোন বাউল ফকিরকেই ভালবাসে নাই, ভাল নজরে দেখে নাই। ঘৃণা করেছে, প্রত্যাখ্যান করেছে।

আর সত্যিকার সাধু-বাউলরা কোন ভদ্রলোকের কাছে ঘেঁষতেও যায় নাই। যারা ভদ্রলোকের জলসায় লালনকে ফেরি করে বেড়াচ্ছেন তাদের ভেবে দেখতে হবে সেই ভদ্রলোকেরা কি লালনের তত্ত্বদর্শনকে গ্রহণ করেছে? নাকি আপনারাই উল্টে ভদ্রলোকের লেবেল গায়ে এঁটে পুলকবোধ করছেন?

আপনার কোন দিকটি ভদ্রলোকের পছন্দ? আপনি যেখানে বাউল সেখানে ভদ্রলোকেরা আপনাকে নেয় না, নেবে না। আপনি যেখানে শিল্পী, যেখানে ওদের মনোরঞ্জনের জন্য বিনোদন বিতরণকারী, বিনোদিনী, সেইখানে আপনার কদর। নাইলে হিসাব মিলিয়ে দেখবেন ওদের বাজারে বুড়ো বাউলদের কখনো ডাক পড়ে না। মহিন সাঁই, করিম সাঁইর মত বাউলদের কাছে ভদ্রলোকেরা ভেড়ে নাই।

যাই হোক এই শিল্পীরা গান গেয়ে আনন্দ পাচ্ছে, আনন্দ দিচ্ছে, সাথে দু’পয়সা রোজগার হচ্ছে, এটা দোষে নয়। কিন্তু অনকে শিল্পী বকশিস আর করতালিতে মতোয়ারা হয়ে লালনের গানে তরজমা তফসির করতে শুরু করে, ভয়টা সেখানেই। তাতে হাজার হাজার লোকের কাছে লালন ফকিরের তত্ত্ব বিষয়ে কি তথ্য যাচ্ছে? তা যারা শুনছেন তারাই ভালো জানেন।

তাছাড়া গানে যত লোক নাঁচে তত্ত্বে তত লোক নাচে না। আর গানের আসল তত্ত্ব যাদি জানতো তাহলে অল্প লোকেই নাচতো, অল্প লোকই নাঁচে, রসিকজন সংখ্যায় অল্পই হয়। তাদের ভাব আলাদা।

তবে এ কথাটা আমাদের জানা দরকার সম্যকরূপে তত্ত্ব জেনে বলতে গেলে দু’রকমের ক্ষতি হয়। প্রথমতঃ মানুষ তত্ত্বের চেয়ে গান বেশি পছন্দ করে সেই কারণে বিরক্ত হয়। দ্বিতীয়তঃ মহতের বাণীর সামান্যও ভুল ব্যাখ্যা যদি জনতার মাঝে প্রচারিত হয় তাহলে মহা অপরাধ হয়। সেইটে হলো বড় ক্ষতি।

অনেক মহাপুরুষের অনেক সূক্ষ্ম বাণীর প্রচুর মোটা দাগের ব্যাখ্যা হয়েছে মোটা বুদ্ধির মানুষের দ্বারা। তাতে জগৎবাসীর ভ্রান্তি দূর হবার বদলে আরো বেড়েছে। গুরু কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত না হয়ে তত্ত্ব আলোচনা অনধিকার চর্চা। গুরুবাদী দৃষ্টিতে সেটা সীমা লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়ে।

সীমালঙ্ঘনকারী শাস্তি পায়। কারণ সকল কথা সর্বত্র ব্যাখ্যাত হবার নয়। সেই কারণে লালনের গান সকল মহতের বাণীর অনেক কথায় ইঙ্গিতপূর্বক এবং রূপকাশ্রয়ী। যদি সব কথাই খোলামেলা বলার হতো তাহলে ওনাদেরই সেটা বলার যথেষ্ট যোগ্যতা ছিল।

তবুও কেন উনারা খোলামেলা করলেন না? করলেন না এই জন্য যে সকল মানুষ সেটা জানবার যোগ্য নয়। সেই কারণে জানলে ক্ষতি হবার সম্ভাবনা থাকে। তাহলে না বললেও তো হতো। ইঙ্গিতে বলার দরকার কি ছিল? দরকার ছিল কারণ সমাজে সব সময়ই সত্যসন্ধানী অগ্রসর চিন্তার কিছু মানুষ থাকে, তাদেরকে আগ্রহী করে তোলার জন্য।

সেই আগ্রহী মানুষদের কাছে কে দেবে ব্যাখ্যা? ব্যাখ্যা দেবে যার কথা সেই, না হলে তার অনুগত ভক্ত। নইলে মারাত্মক ভুল হবার সম্ভাবনা থাকে। ভুল হচ্ছেও। সেই ভুলের খেসারত দিতে হচ্ছে। মহতের সকল বাণীর ব্যাখ্যা গুরু ছাড়া কেঊ দেবার অধিকারী নয়।

আজকে লালনের উৎসবে লোক সমাগম দেখে মনে করার কারণ যেই যে এরা সত্যিকারের লালন প্রেমী। এর অধিকাংশ লালন প্রেমিকতো নয়ই বরং এরা লালনের দর্শন ও অনুসারীদের অপছন্দ করে। যদি পছন্দ করতো তাহলে বাউলদের উপর যখন চক্রান্তকারী হামলা করে, তখন মেলায় ভিড় করা এই লক্ষ জনতা কোথায় থাকে?

লালন গানের শিল্পী এবং গবেষক, পণ্ডিত ভদ্রলোকেরাই বা তখন কোথায় থাকেন? ঢালাওভাবে সকলের বিরুদ্ধে বলতে চাই না। ব্যতিক্রমও আছে। সেই ব্যতিক্রমী সাহসীদের সাধুবাদ জানাই। ওদের পছন্দ করি, ভালবাসি। ওরা যারা প্রাণের দ্বায় থেকে অনেক পরিশ্রম করে গেয়ে, লিখে, নিগৃহীত বাউলদের পাশে দাঁড়িয়ে মানুষকে সংগঠিত করে লালনের তত্ত্বদর্শনকে এগিয়ে নেবার চেষ্টা করছে। তাদেরকে সতর্ক থাকতে বলি।

আর বিশ্বাস করি যে, তারাও বুঝতে পারে। তবুও আপন মনে করে বলছি যেখানে দেশী-বিদেশী অনেক লোক ঝোঁকে সেখানে খ্যাত-অখ্যাত অনেকেই অনেক ফিকিরে ঘোরে? বেশ কয়েক বছর আগে লালনের এই মঞ্চেই একজন খ্যাতিমান গায়িকাকে হাজার হাজার লোকের সামনে অহংকার করে বলতে শুনেছিলাম- “লালনকে কেউ চিনতো না, আমিই লালনকে পরিচিত করিয়েছি।”

অনেক প্রভাবশালী ভদ্রলোকই সেই মঞ্চে ছিলেন, কেউ কোন মন্তব্য করেনি। ওনার অহংকারী বাক্য সাধু-বাউল-ফকিররা পছন্দ করেনি। আমার মত অনেকেই ওনাকে নতুন করে চিনেছিল। আমরা জানি উনি এবং উনার মত অনেকেরই খ্যাতি এবং পসার বেড়েছে লালন গানকে পুঁজি করে।

যা হোক সত্যিকার লালন প্রেমী, লালন সাধক সাহসী তরুণ-তরুণীদেরকে বলি এমন কিছু খ্যাতিমান পণ্ডিতও থাকতে পারে যারা লালনকে উদ্ধারের কাজে লেগেছে। যুগে যুগেই দেখা গেছে যখন কোন মহাপুরুষের দিকে অনেক লোক ঝোকে তখন বিরোধীপক্ষের অনেক প্রভাবশালী রাতারাতি পোশাক পাল্টে, ভোল পাল্টে অধিক দরদীর ভান করে।

ঐ চতুরজনেরা জানে পক্ষে থেকেই মওকা জোটে আর ক্ষতি করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এজিদও কিন্তু মুসলমান ছিল এবং বেশি বেশি মুসল্লিগিরি দেখাতো। খন্দকার মুশতাক ও মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ এবং শেখ মুজিবের প্রতি তাজউদ্দিনের চেয়েও বেশি ভালবাসা প্রদর্শন করতো। কাফেরদের চেয়েও মোনাফেকরা ইসলামের বেশি ক্ষতি করেছে এবং করে যাচ্ছে।

কাফেরদেকের চেনা যায় কিন্তু সাধারণ মানুষ মোনাফেকদের চিনতে পারে না। কারণ মোনাফেকরা আউলিয়াদের চেয়ে বেশি মুসলমান্ত প্রদর্শন করে। আজকে লালনকে পুঁজি করে কে কোন্ ধান্ধায় আছে সেটা খেয়াল রাখতে হবে সকল শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সত্যিকার লালন প্রেমিকদেরকে। লালনের সত্যিকার প্রেমী হতে হলে লালনকে সম্যকরূপে জানতে বুঝতে হয়, সেজন্য গুরু প্রয়োজন।

আজকে ছেঁউড়িয়াতে যে মেলা হয় লালন এই মেলা মেলাতে চান নাই। ভিড় বাড়লেই সেটা মেলা নয়। হাট-বাজারেও মানুষের ভিড় হয় তাই বলে তাকে মেলা বলে না। বাজারে ভিড়ে মানুষের মনুষেরা মেলে না। কারণ সমদৃষ্টির, সমভাবের মানুষ ছাড়া মিলতে পারে না।

সমাজ হলো বহু শ্রেণীর, বহু দৃষ্টিভঙ্গির, বহুকুলের, বহুভাবের এবং অভাবের মানুষে পূর্ণ। বিভেদ পূর্ণ সমাজের মানুষরা মিলতে পারে না। সেই কারণে সমাজের মানুষরা যেখানেই ভিড় করে সেখানে বাজার বসে। বাজারে মানুষ মিলিত হয় না। সমাজের লোকরা তো ঘরের মানুষের সাথেই মিলতে পারে না।

লালন চেয়েছিল সমভাবে সাধু-ফকির, বাউল-দরবেশ, পাগলদের মেলা মেলাতে। সেই মেলাই মিলতো। সেখানে বসতো পাগল প্রেমিকদের, ভাবুকদের প্রাণের মেলা, মিলন মেলা। আজ সেখানে অভাবী ভদ্রলোকরা ভিড় বাড়িয়ে তুলছে।

কেউ হইতো বলবেন ভদ্রলোকরা কি সাধু হতে পারে না? হ্যা, পারে কিন্তু অভাবী ভদ্রলোকরা পারে না। বরং ভাবের মানুষ হলে পারে। ভাব কেনা-বেচার পণ্য নয়। ভাবের আদান-প্রদানের জন্য ভাবের হাট-বাজার আছে। ভবের হাট আর ভাবের হাটে বিস্তর ব্যবধান।

লালনের সেই মিলনমেলা গৌড় প্রেমের হাট, সাধুর হাট, আলাদা রকম। সেটা চিনতে হয়। কিন্তু ভাবুক ছাড়া, রসিক ছাড়া চিনতে পারবে না। বুদ্ধি-জ্ঞান-পাণ্ডিত্য খাঁটিয়ে বাইরে থেকে যা ভাবা যায় আসলে তা নয়। ভদ্রলোকদের সাধু হবার সুযোগ আছে কিন্তু সাধুকে ভদ্রলোক বানানো যায় না।

সাধুর ভদ্রলোক হবার ইচ্ছেও নেই মোটে। কারণ ভদ্রলোক হতে চায় অভদ্রলোকরা। ভদ্রলোক-অভদ্রলোক সমাজে থাকে। সাধু সামাজিক নয়, তাই ভদ্র বা অভদ্র নয়, সাধু আলাদা মানুষ। তার ধর্মের-কর্মের মর্ম আলাদা, তার মর্মের ধর্ম আলাদা রকম।

তার ধরণ ভিন্ন, তার কারণ ভিন্ন। সে সমাজের বাইরে চলা অন্যরকম ভাবের মানুষ, খাপছাড়া মানুষ। খাপটা যেহেতু সমাজে তৈরি। সমাজের খাপের মাপে সাধু হয় না। তাছাড়া সমাজে তো সমাজের মানুষই খাপ খায় না। কেন না বিভেদাত্মক সমাজের খাপের মাপও একরম নয়।

বাউল ফকিরদের ঢোল-খোল-একতারা ভেঙে, চুল-দাঁড়ি-জঁটা কেটে ভদ্রলোক বানাবার চেষ্টা অনেক হয়েছে, কিন্তু সে চেষ্টা সফল হয় নাই। অবশ্য চুল-দাঁড়ি-জঁটা-একতারা, আঁচলা-ঝোলা, খেরকা-কোপনি, গেঁরুয়াই সাধুত্ব নয়। যদিও গুরুর দেয়া খেরকা-কোপনি, আচলা-ঝোলা অবজ্ঞার নয়। যথেষ্ট সম্মানের, এর বিরাট প্রতীকীমূল্য আছে।

কিন্তু সাধু যখন একবারে মুক্ত হয়ে যায় সে তখন আর বেশভূষণ, আচার-বিচার কোন কিছুতেই বাঁধা থাকে না। সে থাকে ভাবে, স্বভাবে, মহাভাবে। কাজেই সাধুকে সামাজিক ভদ্রলোক বানাবার চেষ্টা করে লাভ নাই। বরং সমাজ যদি সাধুকে মান্য করে, তার তত্ত্বকে গ্রহণ করে তাহলে সমাজ উপকৃত হবে, প্রভূত উপকৃত হবে।

সাধুকে গ্রহণ করা সহজ নয়। সাধুর তত্ত্বকে গ্রহণ করলে ভদ্রলোকদের, বিশেষ করে প্রভাবশালীদের প্রভুত্ব এবং কর্তৃত্ব লোপ পায়। কাজেই সমাজকে সাধু প্রভাবিত হতে দেবে না প্রভাবশালীরা। আর বিদ্বান ভদ্রলোকরা ব্যক্তিগতভাবে সাধুকে গ্রহণ করতে পারে না মানসম্মান আর পাণ্ডিত্যের অহংকারে। “লালন বলে উচ্চমনের কার্য নয়”। সে কারণে ধন-মান, প্রভাব-প্রতিপত্তি আর পাণ্ডিত্যের অহংকারীদের গুরু নাই।

পণ্ডিতরা লালনকে নিয়ে গবেষণায় মেতেছে, লালনকে তরজমা-তফসির কারবার চেষ্টা করছে। লালনকে গবেষণায় জানা যাবে সামান্যই। ভেদের কথা জানা যাবে না মোটেই। লালনের মত মহাসাগরের তল খুঁজে পাওয়া, তার ভাবরাজ্যের রহস্য জানাতো দূরের কথা; নিজের অন্তর রহস্যই জানা যাবে না সামান্যও।

এত বড় মহাবিজ্ঞানী, মহাভাবের মানুষ লালন নিজেও সামাজিক বিবেচনায় তুচ্ছ একজন পালকি বাহকের কাছে অবনত হয়ে, সমর্পিত হয়ে গুরুবাদের যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছে সেই গুরুবাদ না মেনে, গুরুতে সমর্পিত না হয়ে লালনকে বুঝবে কি করে!

লালনকে গবেষণা ছাড়াই যেটুকু সহজে বোঝা যায় গুরুর গুরুত্ব “গুরু তুমি পতিত পরম ঈশ্বর”। গুরুকে জ্ঞানের পথে পাবে না। তাকে পেতে ভক্তির পথে, সমর্পণের ধারায়। ভক্তি শূন্য জ্ঞানের পুরানো পাপের পথ।

বিভিন্ন মহাপুরুষকে এবং শাস্ত্রকে নিয়ে গবেষণা তো কম হয়নি। তাকে প্রাপ্তিটা হয়েছে কি? ভক্তি ভিন্ন গবেষণায় যদি হতো তাহলে এত দিনে এই পণ্ডিতদের এবং পণ্ডিত্যমন্য সমাজের ভেতরের বাইরের চেহারা পাল্টে যেত। পাণ্ডিত্য চলে বস্তুজগৎ নিয়ে কিন্তু সাধুর ভাবকে, ভাবের ভূবনকে, সাধুর বাণীর নিগুঢ় তত্ত্বকে নির্ভূল জানতে হলে আত্মসমর্পণের ধারায় আসতে হয়, গুরুবাদ মানতে হয়।

………………………………….
এস এস রুশদী
লালন গবেষক
এশিয়া প্যাসিফিক এডুকেশন গ্রুপ, বাংলাদেশ।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!