চৈতন্য মহাপ্রভু গৌরাঙ্গ গোরা বৈষ্ণব

গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ভুক্ত ভক্তদের বিশ্বাস

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে জগন্নাথ বিগ্রহের সাথে মিশে গিয়ে অন্তর্ধান করেছেন, তবে এ বিষয়ে অনেকেই দ্বিমত পােষণ করেন, কারণ তিনি অন্তর্ধান করে থাকলে পঞ্চভৌতিক দেহ থেকে পরমাত্মা মন্দিরের বিগ্রহের সাথে মিশে লীন হয়ে গেল।

কিন্তু জাগতিক নিয়মে পিতা-মাতার মাধ্যমে ভূমিষ্ঠ হওয়া পঞ্চভৌতিক (রক্ত, মাংস, হাড়) দেহ তাে কাঠ-পাথর দ্বারা নির্মিত বিগ্রহের সাথে মিশতে পারে না, আর আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে একথা মানুষ কে বােঝানাে যাবেনা, তাহলে তার দেহটি হল কি?

তাছাড়া গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ভুক্ত ভক্তগণ মহাপ্রভুর জন্মদিন বিশেষভাবে পালন করে থাকে কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্ধান দিবসটি পালন করে না কেন?

বৈষ্ণবগণ এর কোন সদুত্তর দিতে পারে না। গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর পর্ষদগণ যদি ঐ অন্তর্ধান দিবসের তারিখটি জানতেন তাহলে নিশ্চয় প্রতি বছর ঐ দিবসটি গুরুত্ব সহকারে পালন করে আসতেন, আর যদি মহাপ্রভুর পর্ষদগণ ঐ তারিখ সম্মন্ধে সঠিক তথ্য না জেনে থাকেন তাহলে শ্রীচৈতন্যদেবের অন্তর্ধান বিষয়ে মহাপ্রভুর সহচরগণ কিছুই জানতেন না।

বিভিন্ন ধর্মীয় মতাদর্শের প্রবর্তকেরা ছিল কিছুটা হলেও আত্মকেন্দ্রিক, তারা নিজ-নিজ মতাদর্শ ও নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলে দাবী করেছে এবং অন্যের মতাদর্শকে শ্রদ্ধা করার পরিবর্তে কিছুটা হলেও খাট করে দেখেছে, যার কারণে বিশ্বব্যাপী আজ ধর্মে ধর্মে ধর্মযুদ্ধ হচ্ছে এবং নির্বিচারে মানুষ মারা যাচ্ছে কিন্তু ‘ঠাকুর আউলচাঁদ’ ছিলেন এর সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।

জগন্নাথ মন্দিরের (পুরোহিত) ব্রাহ্মণগণ সেদিন যে ঘোষণা দিয়েছিলেন সেটাই গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ভুক্ত ভক্তগণের বিশ্বাস। কর্তাভজা সম্প্রদায়ভুক্ত ভক্তদের বিশ্বাস- গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর আদর্শ-উদ্দেশ্য সমাজে প্রতিফলিত না হওয়ায় এবং অদ্বৈত আচার্য্য কর্তৃক প্রহেলিকার মাধ্যমে আজ্ঞা পেয়ে সংসারে থেকে কিভাবে ঈশ্বরের উপাসনা করা যায় তার বিধি-বিধান প্রচারের জন্য তিনি আত্মগােপন করেছিলেন এবং পুনরায় ফকির বেশে আউলচাঁদ রূপে নিত্যধাম কল্যাণী ঘােষপাড়ায় উদয় হয়ে কর্তাভজা ধর্ম প্রচার করেন।

তবে এ ধারণার সাথেও অনেকে দ্বিমত পােষণ করেন কারণ- গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর অন্তর্ধান হতে আউলচাঁদ মহাপ্রভুর আবির্ভাব কাল দুই শতাধিক বছর- (১৫৩৩ – ১৭৫২/৫৫ ইং) এতদিন শ্রীচৈতন্যদেবের মত একজন জ্যোতির্ময়ী মহাপুরুষ আত্মগােপন করে থাকল, আর দুই শতাধিক বছরের মধ্যে কোথাও তার জ্যোতি ফুটে উঠল না -একথা বিশ্বাস করা যায় না।

তবে কর্তাভজা সম্প্রদায়ভুক্ত ভক্তরা মনে করেন গােরাচাঁদ-ই আউলচাঁদ, এইভাবে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর খোঁজ না পাওয়া সম্মন্ধে বিভিন্ন জনের বিভিন্ন ধারণা প্রচলিত আছে, গােরাচাঁদ আর আউলচাঁদ এক-ই জন এটা কোন প্রামাণ্য তথ্য নয়। তবে গোরাচাঁদ আর ঠাকুর আউলচাঁদ এক-ই জন হােক আর নাই বা হােক এটা মুখ্য বিষয় নয়।

মুখ্য বিষয় হচ্ছে ‘ঠাকুর আউলচাঁদ সংসারাবদ্ধ মানুষের জন্য কি রেখে গেছেন, ভেবে দেখতে হবে তার প্রবর্তিত কর্তাভজা ধর্ম, তার উপদেশ বাণী, সাধন-ভজন, উপাসনা-প্রার্থনার পদ্ধতি, একেশ্বেরবাদী ঈশ্বরানুভূতি এ সব ধর্মীয় বিষয়গুলাে ঈশ্বর প্রেমিক ভগবৎ ভক্তের কাছে গ্রহণ যােগ্য কিনা।

প্রতিবেশীর সাথে সৌহার্দ্য পূর্ণ সহবস্থান, এক-ই ঈশ্বর পরমাত্মা রূপে সকলের মধ্যে বিরাজমান, সকল মনুষ-ই আমার নমস্য, এই যে বিশ্বভাতৃত্ব বােধের আদর্শ গুলাে বিশ্বমানব কল্যাণের পরিপন্থী কিনা, ঠাকুর আউলচাঁদ মহাপ্রভু প্রবর্তিত কর্তাভজা ধর্মের আদর্শ, উদ্দেশ্য সম্মন্ধে অবগত হলে তবেই বুঝা যাবে পৃথিবীতে যতগুলি ধর্মীয় মতাদর্শ প্রচলিত আছে তা থেকে কর্তাভজা ধর্ম আরও বেশী উদার ও পরমত সহিষ্ণুতার উজ্জল দৃষ্টান্ত এবং পারমার্থিক মুক্তির পথ স্বরূপ।

বিভিন্ন ধর্মীয় মতাদর্শের প্রবর্তকেরা ছিল কিছুটা হলেও আত্মকেন্দ্রিক, তারা নিজ-নিজ মতাদর্শ ও নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলে দাবী করেছে এবং অন্যের মতাদর্শকে শ্রদ্ধা করার পরিবর্তে কিছুটা হলেও খাট করে দেখেছে, যার কারণে বিশ্বব্যাপী আজ ধর্মে ধর্মে ধর্মযুদ্ধ হচ্ছে এবং নির্বিচারে মানুষ মারা যাচ্ছে কিন্তু ‘ঠাকুর আউলচাঁদ’ ছিলেন এর সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।

তিনি নিজ ধর্মমত ও নিজেকে কখনও শ্রেষ্ঠ বলে দাবী করেননি, তিনি ছিলেন সম্পূর্ণরূপে অহংভাব বর্জিত, আমার মতাদর্শ সত্য অন্যেরটা ভ্রান্ত, আমি তােমাদের রক্ষাকর্তা এ জাতীয় আমিত্ববােধ ‘ঠাকুর আউলচাঁদ’ মহাপ্রভুর মধ্যে ছিল না।

তিনি বলেছেন-

গুরুভক্তি অভিলাষে, থাকবি তক্তে বসে,
নাম ধরে ডাকবি ওরে ভােলামন,
‘মিলবে তাের মনের মানুষ যা বলি তাই শােন।
(ভাবেরগীত, গীত নং- ৩২৭, কলি-২)

ভাবার্থ- তােমরা গুরুর আশ্রিত হও, গুরুবাক্য পালন কর, গুরুকে শ্রদ্ধাভক্তি কর, একমাত্র চেতন গুরু-ই পারে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের মাধ্যমে পারমার্থিক মুক্তির সন্ধান দিতে, গুরুর কূপা বিনে পারমার্থিক মুক্তি কোন ভাবেই সম্ভব নয়। তিনি অন্যান্য ধর্মমত সম্মন্ধে বলেছেন-

দেখ পারের প্রকার আছে হে সুগম,
অধিকারাে সংসার সবার,
আছে যার যে নিময়।
ভার কি রে পার হতে এ ভবে।
(ভাবেরগীত, গীত নং-২, কলি-৩)

ভাবার্থ- জাতি, ধর্ম, বর্ণ-গােত্র নির্বিশেষে ঈশ্বর উপাসনায় সকলের সমান অধিকার, এবং ধর্মপথ সবার জন্য সুগম অর্থাৎ উন্মুক্ত, তাই যে, যে ধর্মের মানুষ হন না কেন, যার যে নিয়ম আছে সে, সেই নিয়ম যথাযথ ভাবে পালন করলে-ই ঈশ্বর প্রাপ্তি হতে পারে এতে কোন সন্দেহ নেই, কারণ সকলের এক-ই উদ্দেশ্য পরম সত্যকে ধারণ করা বা ঈশ্বর প্রাপ্তি।

মাঝি এসব কথায় কর্ণপাত না করে আপন মনে নৌকা বেয়ে মাঝ নদীতে চলে যেতে লাগল। তখন ঠাকুর আউলচাঁদ হস্তস্থিত একটি মাটির পাত্র গঙ্গানদীতে নিক্ষেপ করে বললেন, মা গঙ্গা তুমি এই কমুণ্ডলের ভিতর এস।

ঠাকুর আউলচাঁদ আত্মপ্রকাশ করার পর অতি অল্প দিন (১৭৫২/৫৫ – ১৭৬৯) ১৫/১৭ বছর, এই ধরাধমে ছিলেন।

তিনি ছিলেন ইহ জাগতিক ভােগ বিলাসে উদাসীন, অহংভাব বর্জিত এক মহামানব, তাই তার জীবন চরিত্র ছিল উজ্জল নক্ষত্রের মত কলুষ মুক্ত। ঠাকুর আউলচাঁদ মহাপ্রভু তার ধর্মীয় মতাদর্শ প্রচার করার জন্য সমাজের উঁচুতলার মানুষ অথবা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপােষকতা বা দল গঠন করার প্রয়ােজন হয়নি।

শুধুমাত্র তার অতিমানবীয় গুণাবলী ও তাঁর নীতি-আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে, তৎকালীন সময়ে অগণিত মানুষ দলে দলে কর্তাভজা ধর্ম গ্রহণ করেছিল এবং অতি অল্পদিনের মধ্যে তার ধর্মমত বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। ঠাকুর আউলচাঁদ তার ভক্তদের জন্য ধর্মের বিধি-নিষেধ, আচার-অনুষ্ঠানসহ বহু অমূল্য উপদেশ দান করেছিলেন, পরবর্তী কালে ঠাকুর দুলালচাঁদ পবিত্র ‘ভাবেরগীত’ নামক গ্রন্থে তা লিপিবদ্ধ করেন।

দীনহীন ফকির বেশে ঘােষপাড়ার অপর পাড়ে গঙ্গানদীর তীরে তার প্রথম আবির্ভাব, তবে এর পূর্বে ঠাকুর আউলচাঁদ ভারতের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করলেও কোথাও নিজেকে প্রকাশ করেছেন ঐতিহাসিক ভাবে তার কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না।

এবার ঠাকুর তাঁর উদ্দেশ্য, আদর্শ ও অপার মহিমা প্রকাশের জন্য মনস্থ করলেন তৎকালীন ডুবােপাড়ার গহীন অরণ্য, যা বর্তমানে কল্যানী ঘােষপাড়া নামে খ্যাত। ঘােষপাড়ায় আসার উদ্দেশ্যে গঙ্গানদীর তীরে এসে তিনি এক অলৌকিক মহিমা প্রকাশ করেন।

গঙ্গানদী পারাপারের জন্য তখন ছিল খেয়া নৌকার ব্যবস্থা, শঙ্কর পাল নামে এক মাঝি তখন ঐ দায়িত্বে নিযুক্ত ছিল। ফকির ঠাকুর ওপারে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করে মাঝিকে বললেন, আমাকে পার করে দাও আমি ওপারে যাবাে।

দীনহীন ফকির বেশ দেখে পারাপারের পর পারের পয়সা না পাওয়ার আশঙ্কায় মাঝি আগেই পারের পয়সা দাবী করল, তখন ঠাকুর বললেন আমি দীনহীন কাঙাল ফকির মানুষ, আমি পয়সা কোথায় পাব, আর আমিতাে জীবনে পয়সা স্পর্শ করিনি তুমি আমাকে ধর্ম খেয়ায় পার করে দাও।

মাঝি এসব কথায় কর্ণপাত না করে আপন মনে নৌকা বেয়ে মাঝ নদীতে চলে যেতে লাগল। তখন ঠাকুর আউলচাঁদ হস্তস্থিত একটি মাটির পাত্র গঙ্গানদীতে নিক্ষেপ করে বললেন, মা গঙ্গা তুমি এই কমুণ্ডলের ভিতর এস।

শঙ্কর আবার বিফল মনােরথ হয়ে বাড়ির দিকে রওনা হলেন। ডুবােপাড়া গহীন অরণ্যের অনতি দূরেই ছিল শঙ্করের বসত বাড়ি, শঙ্কর বাড়ি ফেরার পথে ঐ বনের নিকটে আসলে বনের মধ্য হতে দৈব বাণীর ন্যায় একটা শব্দ শুনতে পেলেন কে যেন বলছে ‘আমি বেটুয়ার মধ্যে যে সত্যরত্ন এনেছি এ দেশে তার প্রকৃত গ্রাহক খুঁজে পেলাম না, এ দেশে গ্রাহকের বড়-ই অভাব।’

তখন-ই ঘটিল এক অলৌকিক ঘটনা, শঙ্কর মাঝি দেখলেন গঙ্গার জলরাশি প্রবল বেগে ঐ মাটির পাত্রে ঢুকতে লাগল আর গঙ্গার বুকে তৈরী হল সুন্দর একটা পথ, আর ফকির পদব্রজে গঙ্গা পার হয়ে চলে গেলেন, ঐ দৃশ্য দেখে শঙ্কর মাঝি কিছুক্ষণ জ্ঞানশূন্য ছিল।

সম্বিৎ ফিরে পেয়ে তিনি ভাবলেন এ কোন সাধারণ ভিখারি ফকির নয়, নিশ্চয় কোন সিদ্ধপুরুষ হবে। ফকিরকে ধরার জন্য শঙ্কর মাঝি ফকিরের পিছূ ছুটলেন কিন্তু ঠাকুর যদি কৃপা করে ধরা না দেন তবে কার সাধ্য তাকে ধরে, অকস্মাৎ শুরু হল প্রবল ঝড় বৃষ্টি, সেই ঝড়বৃষ্টির মাঝে ফকির হারিয়ে গেলেন তৎকলীন ডুবােপাড়া বর্তমানে ঘােষপাড়ার গহীন অরণ্যে।

শঙ্কর মাঝি বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে আসলেন বাড়িতে, বাড়িতে গিয়ে উক্ত অলৌকিক ঘটনা ব্যক্ত করলে কেহ বলল এটা অসম্ভব কথা বিশ্বাস করা যায় না, কেহ বলল হয়তাে কোন এক ভেল্কিবাজ যাদুকরের কাণ্ড, আবার কেহ বলল হয়তাে হতে পারে কোন সিদ্ধপুরুষের অলৌকিক কীর্তি কিন্তু লােকে যে যাই বলুক না কেন।

শঙ্কর নিজে যা স্বচক্ষে দেখেছে নিজের চোখে দেখাকে পরের কথায় অবিশ্বাস করে কি করে, তাই ফকির বেশী ঐ সিদ্ধপুরুষের পুনরায় দর্শনের চিন্তায় অর্ধ জাগত, অর্ধ নিদ্রায় তার রাত কাটতে লাগল,

ঐ সিদ্ধপুরুষের পুনরায় দর্শন পাওয়ার আশায় মন উদগ্রীব হওয়ায় ঠাকুরের কৃপা হল, শঙ্কর স্বপ্ন দেখলেন ফকির বেশী ঐ সিদ্ধপুরুষ পার্শ্ববর্তী এক গ্রামে কৃষ্ণ দাসের বাড়ি সাধুসঙ্গ করছেন। জাগ্রত হয়ে শঙ্করের মনটা যেন অনাবিল এক আনন্দে ভরে গেল এবং ভাবলেন নিশ্চয় ঠাকুরের দর্শন মিলবে।

ভাের হওয়ার সাথে সাথে শঙ্কর পাল কৃষ্ণদাসের বাড়িতে উপস্থিত হল কিন্তু শঙ্করের আশা পূর্ণ হল না, ফকির বেশী ঐ সিদ্ধপুরুষের কথা জিজ্ঞাসা করলে কৃষ্ণদাস বললেন একজন সাধুপুরুষ গত রাত্রে এখানে এসেছিলেন, তার সাথে সারারাত সাধুসঙ্গ করেছি কিন্তু তিনি কিছুক্ষণ আগে এখান থেকে চলে গেছেন, তবে কোথায় গেছেন তাত জানি না।

শঙ্কর আবার বিফল মনােরথ হয়ে বাড়ির দিকে রওনা হলেন। ডুবােপাড়া গহীন অরণ্যের অনতি দূরেই ছিল শঙ্করের বসত বাড়ি, শঙ্কর বাড়ি ফেরার পথে ঐ বনের নিকটে আসলে বনের মধ্য হতে দৈব বাণীর ন্যায় একটা শব্দ শুনতে পেলেন কে যেন বলছে ‘আমি বেটুয়ার মধ্যে যে সত্যরত্ন এনেছি এ দেশে তার প্রকৃত গ্রাহক খুঁজে পেলাম না, এ দেশে গ্রাহকের বড়-ই অভাব।’

একটা শব্দ শুনে জবানে শূন্যে শূন্যেতে,
কি হল সেই ধ্বণিটি ভাল লাগলো কানেতে।
(ভাবেরগীত, গীত নং- ৮৬, কলি-১)

ঐ শব্দ শুনে শঙ্কর কিছুটা ভয়ে কিছুটা সাহসে ভর করে বনের মধ্যে প্রবেশ করলেন এবং দেখতে পেলেন সেই দিব্য কান্তি সৌম্য শান্ত মহাপুরুষ যার দর্শনের আশায় আহার নিদ্রা কাজ কর্মত্যাগ করে বিরহী উদাসীনির ন্যায় ঘুরে বেরাচ্ছেন।

ফকির ঠাকুর বললেন আমি একজন পাগল, দীনহীন ফকির আমাকে গৃহে নেওয়ার জন্য এত উৎসাহিত হচ্ছ কেন? আমি কত পাগলামি করব কত দৌরাত্ম করব এসব সহ্য হবে কি? শঙ্কর বললেন- সব কিছুই ঠাকুরের অনুগ্রহ মাত্র, ঠাকুর যদি সব কিছু সইবার শক্তি যােগায় তাহলে সব কিছুই সইতে পারব বৈকী।

শঙ্কর দীনহীন ফকির বেশী ঠাকুরের দর্শন পাওয়া মাত্র-ই কাঁদতে কাঁদতে ঠাকুরের চরণে লুটায়ে পড়ল এবং অনুতপ্ত বেদনায় শঙ্করের ক্রন্দনরত অশ্রধারায় ঠাকুরের চরণ সিক্ত হতে লাগল, ঠাকুর শঙ্করের হাত ধরে তুলে বসালেন এবং বললেন এত কাঁদছিস, কেন, শান্ত ‘হ’ বল না তাের কি হয়েছে?

শঙ্কর বললেন, আমি অজ্ঞান বালক না জেনে না বুঝে সাধারণ ফকির মনে করে গতকাল তােমাকে খেয়া নৌকায় পার করিনি, এ জন্য আমি অপরাধী অনুতপ্ত, বেদনা হত আমাকে ক্ষমা কর ঠাকুর। তুমি তাে শুধু শুধু-ই ফকির নও তুমি তাে জগতের ঠাকুর, তুমি নিজ গুণে কূপা করে আমাকে ক্ষমা কর ঠাকুর, এ কথা বলতে বলতে শঙ্কর পুনরায় ফকির ঠাকুরের চরণ ধরে কাঁদতে লাগল।

ফকির ঠাকুর শঙ্করকে শান্তনা করে বললেন মানুষ যতক্ষণ মায়া মােহরূপ অজ্ঞানতার অন্ধকারে থাকে ততক্ষণ সে তার নিজেকে চিনতে পারে না আর নিজেকে চিনতে না পারলে অপরকেও চেনা যায় না। মানুষের যখন জ্ঞানের উদয় হয় তখন সে তার স্বরূপকে চিনতে পারে তার ইহ জগতের স্বপ্নময় মােহ দূর হয়।

তখন সে তার পূর্বকৃত্য সকল ভুলক্রটির জন্য অনুতপ্ত হয়, নিজেকে অপরাধী জ্ঞান করে এবং নিজের পূর্বকৃত্য সকল ভুলক্রটির জন্য শুধু মালিকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে, মনে যদি সত্যি-ই সেই ভাবের উদয় হয় তাহলে মালিক তার সকল অপরাধ ক্ষমা করে।

তাের যখন মনে সেই ভাবের উদয় হয়েছে আর চিন্তা করিসনে মালিক তাের সকল অপরাধ ক্ষমা করবেন এখন হাসি মুখে গৃহে ফিরে যা। ফকির ঠাকুরের এই কথা গুনে শঙ্কর কিছুটা শান্তনা মনে ঠাকুরকে বললেন ওগাে ঠাকুর কৃপা করে এ অধমকে যখন পুনরায় দর্শন দিয়েছ, তখন এ অধমের জীর্ণ কুটিরে একটু চরণধুলি দিতেই হবে।

ফকির ঠাকুর বললেন আমি একজন পাগল, দীনহীন ফকির আমাকে গৃহে নেওয়ার জন্য এত উৎসাহিত হচ্ছ কেন? আমি কত পাগলামি করব কত দৌরাত্ম করব এসব সহ্য হবে কি? শঙ্কর বললেন- সব কিছুই ঠাকুরের অনুগ্রহ মাত্র, ঠাকুর যদি সব কিছু সইবার শক্তি যােগায় তাহলে সব কিছুই সইতে পারব বৈকী।

কাঙালের ঠাকুর দেখলেন শঙ্করের মনে যে ভাবের উদয় হয়েছে তাকে আর কোন কথায় ভােলানাে যাবে না, অবশেষে ফকির ঠাকুর শঙ্করের গৃহে যেতে রাজী হলেন। তবে ফকির ঠাকুর শঙ্করকে বললেন- আমি মাত্র দুই-এক দিনের জন্য থাকব, আমি চলে যেতে চাইলে কোন ক্রমেই আপত্তি করবে না।

আমাকে যদি রাখতে চাস তাহলে তাের গৃহে নয় ঐ বনের মধ্যে (বর্তমান ঘােষপাড়া) একটি কুঁড়ে ঘর বেঁধে দে আমি ওখানে থাকবাে, তবে আমি চলে যেতে চাইলে বাধা দিবি না, রামশরণ বললেন সে তাে ঠাকুরের কৃপা মাত্র। এই ভাবে ঠাকুরের ইচ্ছামত রামশরণ বনের মধ্যে ছােট্ট একটি তালপাতার কুঁড়ে ঘর বেঁধেদিলেন, ফকির ঠাকুর ঐ নির্জনে একাকী থাকতে লাগলেন।

 

শঙ্কর বললেন- সেটাও প্রভুর কৃপা মাত্র, অতপর ফকির ঠাকুর শঙ্করের সাথে শঙ্করের গৃহে গমন করলেন। ফকিরকে গৃহে পেয়ে শঙ্করের বাড়ির সকলেই অতিশয় আনন্দিত হলেন এবং সাধ্যমত ফকিরের সেবা যত্ন, শ্রদ্ধা ভক্তি করলেন, শঙ্করের ছােট ভাই সদানন্দ কঠিন দুরারােগ্য কুষ্ঠ ব্যাধিতে দীর্ঘদিন ভুগতে ভুগতে মরণাপন্ন অবস্থায় শয্যাশায়িত ছিল।

সদানন্দ ঐ ফকিরের ঐশ্বরিক ক্ষমতার কথা শুনতে পেরে, রােগ মুক্তির আশায় ফকিরের চরণ ধরে কাঁদতে লাগল, কাঙালের ঠাকুর তাে এসেছেন দীন-দুঃখী, পাপী-তাপী, মানুষের মুক্তির পথ দেখাতে, তাই ফকিরের কৃপা হল, ফকির সদানন্দের জীবনের সকল পাপ কর্মের নিকাশ গ্রহণ করলেন এবং ভবিষ্যতে সত্যবলা সৎপথে চলার অঙ্গীকার করতঃ মুহূর্তের মধ্যে সম্পূর্ণ রুপে সদানন্দের রােগমুক্তি করলেন।

সদানন্দের দুরারােগ্য কঠিন ব্যাধি হতে মুহূর্তের মধ্যেই আশ্চর্যজনক ভাবে মুক্তি পাওয়া দেখে শঙ্করের বাড়ির সকলে ও প্রতিবেশীরা হতবাক হয়ে গেলেন। জনসমক্ষে ঠাকুরের ঐশ্বরিক ক্ষমতার প্রকাশ হল, সকলে ভাবতে লাগল এ ফকির সাধারণ ফকির নয় এ নিশ্চয় ঐশ্বরিক ক্ষমতার অধিকারী ফকির বেশী এক মহাপুরুষ।

ফকির রূপী ঠাকুর। তখন থেকে-ই ঐ মহামানব ‘ফকির ঠাকুর’ নামে পরিচিত হল। ফকির ঠাকুরের অলৌকিক ক্ষমতা দেখে শঙ্করের কনিষ্ঠ পুত্র রামশরণ ও পুত্রবধু সরস্বতী বিস্মিত হয়ে ভাবতে লাগলেন এ মানুষ সাধারণ মানুষ নন, এ নিশ্চয় সেই সহজ মানুষ যার চরণ স্পর্শে জ্বরাব্যাধি মুক্তি হয়, মায়ামােহ ছিন্ন হয়ে দিব্যজ্ঞানের উদয় হয়, যার চরণ স্পর্শে জীবমুক্তি হয়ে পরম করুণাময় মালিকের শ্রীচরণ কমলে স্থান হয়।

এভাবে মনের অজান্তেই রামশরণ ও সরস্বতীর ফকির ঠাকুরের প্রতি বিশ্বাস ভক্তির উদয় হল। ঠাকুরকে আরও কিছু দিন নিজ গৃহে রাখার জন্য অনুরােধ করল, কিন্তু ফকির ঠাকুর কিছুতেই রাজী হলেন না, তবে রামশরণের অনুরােধে ফকির ঠাকুর বললেন-

আমাকে যদি রাখতে চাস তাহলে তাের গৃহে নয় ঐ বনের মধ্যে (বর্তমান ঘােষপাড়া) একটি কুঁড়ে ঘর বেঁধে দে আমি ওখানে থাকবাে, তবে আমি চলে যেতে চাইলে বাধা দিবি না, রামশরণ বললেন সে তাে ঠাকুরের কৃপা মাত্র। এই ভাবে ঠাকুরের ইচ্ছামত রামশরণ বনের মধ্যে ছােট্ট একটি তালপাতার কুঁড়ে ঘর বেঁধেদিলেন, ফকির ঠাকুর ঐ নির্জনে একাকী থাকতে লাগলেন।

রামশরণ ও সতীমার দীক্ষা গ্রহণ>>

……………..
‘সতীমা ও সত্যদর্শন’ বই থেকে সংগৃহীত

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

……………..
আরও পড়ুন-
কর্তাভজা ধর্মের ইতিহাস
ঠাকুর আউলচাঁদের আবির্ভাব
গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ভুক্ত ভক্তদের বিশ্বাস
রামশরণ ও সতীমার দীক্ষা গ্রহণ
কর্তাভজা সম্প্রদায়ের দশ আজ্ঞা
সতীমা কে?
শূদ্র কারা?
ঘোষপাড়ার ডালিম তলা ও হিমসাগরের মাহাত্ম্য
কর্তাভজার বাইশ ফকির
আউলচাঁদের তিরােধান
দুলালচাঁদ
সতীমায়ের উপদেশ বাণী
ঘোষপাড়ার রথযাত্রা উৎসব
সতীমার তিরােধান
কর্তাভজা ধর্মের মূলস্তম্ভ

ত্রিশ ধারা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!