সনাতনী অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া

সনাতনী অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া

-মূর্শেদূল মেরাজ

সনাতন ধর্মমতে শবদাহ এবং সমাধি দুই বিধানই আছে। তবে সাধারণভাবে দাহ’ই করা হয়। সনাতন মতে, মৃত্যুর পরে শবদাহ ক্রিয়াকে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বলে। ‘অন্ত’ শব্দের অর্থ শেষ বা অস্তিম, ‘ইষ্টি’ শব্দের অর্থ সংস্কার বা যজ্ঞ। অর্থাৎ শেষ যাত্রার কৃত্য বা শেষ যজ্ঞ।

বার্হিক দৃষ্টিতে আগুনে পোড়ানোর মধ্য দিয়ে যে পঞ্চতত্ত্বে মানবদেহের গঠন সেই পঞ্চতত্ত্ব আপন আপন তত্ত্বে দ্রুত ফিরিয়ে দিতেই এই মহাযজ্ঞ। বৈদিক মতে, দেহ আর আত্মা ভিন্ন। দেহের মৃত্যু হয়। আত্মা চলে যায় তার কর্মফল অনুযায়ী দেবলোক বা অসুরলোকে। কিন্তু দেহ পরে থাকে। মৃত্যুর পরও যদি দেহের প্রতি আত্মার মায়া জন্মায় তাই দ্রুত দেহকে দাহ করার বিধান।

কর্মফলের সংস্কারের বোঝা থেকে মুক্ত হতে পারলে জন্মান্তরের বাঁধা পটকে আত্মা আদি উৎসমূলে মিলিত হয়। বৈদিক মত হলো, ‘অস্থি মাংসের জড় পিণ্ড এই দেহ নষ্ট হইলেই আত্মার নাশ হইতে পারে না।’ পরলোকে জীবের গতির প্রধানত পথ দুটি-

১. দেবযান গতি: স্বগুণ ব্রহ্মের উপাসক, বানপ্রস্থী, নিষ্ঠাবান, ব্রহ্মচারী ও পঞ্চাগ্নির জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ মৃত্যুর পর দেবযান বা উত্তরমার্গ প্রাপ্ত হয়। এই প্রাপ্তিতে আত্মা প্রথমে অগ্নিলোকে গমন করে। সেখান থেকে শুক্লপক্ষ, উত্তরায়ণ, দেবতা, বায়ু, সূর্য ইত্যাদি লোক ভ্রমণ করে সবশেষে ব্রহ্মলোকে বা সত্যলোকে উপস্থিত হয়।

সেখানে আত্মজ্ঞান লাভ করে শেষে আত্মা মুক্তি লাভ করার যোগ্যতা অর্জন করে। এই মার্গে গমন করলে মানুষের আর জন্ম হয় না। ব্রহ্মলোক প্রাপ্তি হয়ে যায়। এর নাম ক্রমমুক্তি।

২. পিতৃযান গতি: যারা অগ্নিহোত্রাদি যজ্ঞ, ঈষ্ট পূজা ও পূণ্যকর্মের অনুষ্ঠান করে তারা পিতৃযান বা দক্ষিণমার্গে যান। সেখান থেকে চন্দ্রলোকে উপস্থিত হন। চন্দ্রলোকে তারা পূর্বজন্মের পূণ্যকর্মের ফল ভোগ করে। ভোগশেষে সমস্ত পূণ্যকর্ম শেষ হলে আবার এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেন। এভাবে তাদের পৃথিবীতে জন্মান্তর চলতে থাকে।

শবদাহ:
দাহের পূর্বে সাধ্য অনুযায়ী ঘি বা তেল মাখিয়ে শবদেহ গোসল করিয়ে নতুন বস্ত্র পরানো হয়। ব্রাহ্মণ হলে পৈতা দেয়ার নিয়ম। মৃত দেহকে কখনও বস্ত্রশূন্য করার নিয়ম নেই। এরপর চন্দন মাখিয়ে কান, নাকের ছিদ্র, চোখ ও মুখে মোট সাত টুকরো সোনা বা কাঁসা দিয়ে মৃতের উদ্দেশ্যে পিণ্ড দান করা হয়।

এরপর শব চিতায় তোলা হয়। উত্তর দক্ষিণে দীর্ঘ করে চিতার কাঠ সাজানোর নিয়ম। চিতার ওপর বস্ত্র দিয়ে মৃতদেহকে উত্তর দিকে মাথা দিয়ে (সামবেদী হলে দক্ষিণ দিকে) নর হলে উপুড় করে আর নারী হলে চিত করে শোয়ানো হয়। 

সামর্থবান অনেকে দাহের কাজে চন্দনকাঠ বা চন্দনগুঁড়া ব্যবহার করে। তবে এরজন্য কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। শব চিতায় তোলার করার পর তা তিনবার প্রদক্ষিণ করে জ্যেষ্ঠপুত্র, অভাবে অন্যপুত্র, তা না হলে শাস্ত্র নির্দেশিত অন্য কোন ব্যক্তি মুখাগ্নি করার বিধান। পিণ্ডদাতা মন্ত্র পাঠ করে নিজে দক্ষিণ মুখ হয়ে শবের মুখে আগুন দিয়ে থাকে। 

বৈদিক যুগে দেবলোকে প্রার্থনা জানাবার একমাত্র উপায় ছিল যজ্ঞ। আগুন হলো দেবতাদের পুরোহিত। আর এই পুরোহিতের কাছে অর্থাৎ আগুনে দেবতার নাম করে কোন কিছু আহুতি দিলে তা তা দেবলোকে পৌঁছে যাবে এমন বিশ্বাস থেকে দাহে মুখাগ্নির বিধান। অর্থাৎ আত্মাকে আগুনে আহুতি বা সমর্পণের অনুষ্ঠানিকতা হলো মুখাগ্নি। 

মুখাগ্নি মন্ত্র- 

‘এই মৃত ব্যাক্তি জীবিত অবস্থায় জেনে বা না জেনে লোভে এবং মোহে অনেক অপকর্ম করতে পারন। তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন কারণ মানুষ মরণশীল এবং মৃত্যুর বশ বলেই পঞ্চ মহাভূতে দেহত্যাগ করেছেন। এই মানব জীবন ধর্ম, অধর্ম এবং লোভেও মোহযুক্ত। এই ব্যক্তির সর্বগাত্র দহন করে দিব্যলোকে নিয়ে যান।’

দাহকার্য শেষ হলে চিতার আগুন এক এক করে সাত টুকরা ছোট কাঠ দিয়ে জ্বলন্ত চিতার উপর সাতবার আঘাত করার নিয়ম। যিনি মুখাগ্নি করেন তিনি সাত কলস এবং অন্যরা এক এক কলস জল দিয়ে চিতার আগুন নিভিয়ে থাকে।

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সমাপ্তি অনুষ্ঠানে বৈদিক মন্ত্র-

যং ত্বমগ্নে সমদহঃ তমূ নির্বাপয়া পুনঃ।
কিয়াম্বু অত্র রোহতু পাকদুর্বা ব্যল্কশা।। 

-হে আগুন! দাহকার্য্যের জন্য যে শিখা প্রজ্জ্বলিত হল তা পুনরায় নিভিয়ে দাও। জলসিঞ্চন অন্তে দাহস্থলে দুর্ব্বা ও শাখাসমন্বিত বিবিধ উদ্ভিদ গজিয়ে উঠুক। 

আগুন সংস্কারের পর চিতার আগুন জল দিয়ে সম্পূর্ণরূপে নিভিয়ে ফেলতে হয়। এ কাজে শ্মশানবন্ধু( শাবদাহে অংশগ্রহণকারী) সকলে মিলে ১০৮কলস জল ঢালার প্রথা থাকলেও বর্তমানে এই সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছে। 

আগুন নিভিয়ে ফেরার পর একটি জলপূর্ণ কলস চিতার স্থানে রাখা হয়। শবের অদগ্ধ দেহাংশ, ভস্ম ইত্যাদি অপর একটি মাটির পাত্রে সংগ্রহ করে জলে ভাসানো হয়। শেষে কুঠার বা মাটির ঢেলা দিয়ে চিতার কলসটি ভেঙ্গে শ্মশান ত্যাগ করার বিধান। 

শ্মশানযাত্রীদের গোসল করে বাড়ি ফিরে নিমপাতা দাঁতে কেটে আগুন, লোহা, মটর ডাল ইত্যাদি (মতান্তরে পাথর, আগুন, জল, গোবর, সাদা সরষে) স্পর্শ করে বাড়িতে ঢুকতে হয়। দাহ শেষে গোসলের সময় একটি ডুব দিয়ে প্রেতের উদ্দেশ্যে তর্পণ করার বিধান আছে।

শ্রাদ্ধ:
মৃত পিতৃপুরুষের আত্মার শান্তির উদ্দেশ্যে এবং তাদের আশীর্বাদ কামনায় ব্রাহ্মণকে দান-ধ্যান ও অতিথিভোজনে আয়োজিত অনুষ্ঠানের নাম হলো ‘শ্রাদ্ধ’। সাধারণত মৃতের সন্তান কিংবা আত্মীয়-স্বজন এ অনুষ্ঠান পালন করে। ব্যক্তি নিজেও মৃত্যুর আগে শ্রাদ্ধ করে যেতে পারে। তিথি অনুসারে একই ব্যক্তির শ্রাদ্ধ প্রতি বছরই ফিরে ফিরে আসে ও প্রতি বছরই প্রেতকে উদ্ধার করা হয়। 

শ্রাদ্ধানুষ্ঠান একটি অবশ্য পালনীয় অনুষ্ঠান। বিশ্বাস মতে, এই অনুষ্ঠানের ফলেই মৃতের আত্মা স্বর্গে প্রবেশাধিকার পায়। মার্কেণ্ডেয় পুরাণে বলা হয়েছে, পিতৃগণ শ্রাদ্ধে তুষ্ট হলে স্বাস্থ্য, ধন, জ্ঞান ও দীর্ঘায়ু এবং পরিশেষে উত্তরপুরুষকে স্বর্গ ও মোক্ষ প্রদান করে। 

মৃতের পুত্র (একাধিক পুত্র হলে জ্যেষ্ঠপুত্র) বা পিতৃকুলের কোনো পুরুষ আত্মীয় শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের অধিকারী হন। এ প্রসঙ্গে গরুড় পুরাণে বলা হয়েছে, ‘পুত্র বিনা মুক্তি নাই।’ তবে পরিবারে পুরুষ সদস্য না থাকলে সর্বপিতৃ অমাবস্যায় দৌহিত্র মাতামহের শ্রাদ্ধ করতে পারে। 

শ্রাদ্ধ প্রধানত তিন প্রকার- 

১. আদ্যশ্রাদ্ধ: অশৌচান্তে মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে এ শ্রাদ্ধ পালন করা হয়। বর্ণভেদে মৃত্যু দিনের ৭, ১১, ১৫ বা ৩০ দিন পর সামর্থ্য অনুযায়ী আত্মীয়-স্বজনসহ পাড়া-প্রতিবেশীদের নিমন্ত্রণ করে নানা রীতিনীতির মধ্য দিয়ে এটি অনুষ্ঠিত পালন করা হয়।

মৃতের পরিবারের সদস্যদের শ্রাদ্ধের আগ পর্যন্ত নিরামিষ ও লবণ ছাড়া আতপ চালের ভাত খেতে হয়। শ্রাদ্ধের আগের দিন মৃতের পুত্র সন্তানদের মাথার চুল ফেলে দেয়ার নিয়ম রয়েছে।

২. আভ্যুদয়িক শ্রাদ্ধ: উপনয়ন, বিয়ে ইত্যাদি শুভকাজের আগে পিতৃপুরুষের আশীর্বাদ কামনায় যে শ্রাদ্ধ করা হয় তাকে আভ্যুদয়িক শ্রাদ্ধ বা বৃদ্ধিশ্রাদ্ধ বলে।

৩. সপিণ্ডীকরণ শ্রাদ্ধ: মৃত্যুর এক বছর পর এই শ্রাদ্ধ করা হয়।

মহালয়া ও বিশেষ তিথিতে কারও মৃত্যু হলে তার উদ্দেশ্যে পার্বণশ্রাদ্ধ। গয়া তীর্থে বিষ্ণুপাদপদ্ম শ্রাদ্ধ। এছাড়াও 

একোদ্দিষ্ট এবং অম্বষ্টকা নামেও শ্রাদ্ধের কথা জানা যায়। কিন্তু এর প্রচলন কম।

শ্রাদ্ধকর্তাকে গোসল করে শুদ্ধ হয়ে খালি গায়ে শুধু ধুতি পরে শ্রাদ্ধ ক্রিয়া করতে হয়। শ্রাদ্ধ ক্রিয়ার আগে তাকে কুশ ঘাসের আঙটি ‘কুশাঙ্গুরী’ আঙ্গুলে পরতে হয়। সেই আঙটিতে পূর্বপুরুষদের আবাহন করা হয়। শ্রাদ্ধের সময় সিদ্ধ অন্ন, ময়দা, ঘি ও তিল দিয়ে মাখিয়ে পিণ্ডের আকারে উৎসর্গ করা হয়।

এরপর দুর্বাঘাস, শালগ্রাম শিলা বা স্বর্ণমূর্তিতে বিষ্ণু এবং যমের পূজা করা হয়। এরপর মৃত পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে খাবার সাজিয়ে উঁচু স্থানে বা ছাদে রাখা হয়। যদি কাক এসে সেই খেয়ে নেয়, তাহলে ধরা হয় মৃত পূর্বপুরুষ তা গ্রহণ করেছে। ক্ষেত্র বিশেষে এই খাবার গরু বা কুকুরকেও খাওয়ানোর বিধান আছে।

এরপর উপস্থিত ব্রাহ্মণদের খাবার প্রদান করা হয়। কাক বেশে পূর্বপুরুষ ও ব্রাহ্মণরা আহার গ্রহণ করলে তবেই পরিবারের এবং উপস্থিত মানুষজন অন্নগ্রহণ করার অনুমতি পায়।

পুরাণ অনুযায়ী, স্বর্গ ও মর্ত্যের মাঝামাঝি স্থানে পিতৃলোক অবস্থিত। পিতৃলোকের শাসক মৃত্যুদেবতা যম। যম মৃতের আত্মাকে মর্ত্য থেকে পিতৃলোকে নিয়ে যান। পিতৃলোকে তিন পুরুষ পর্যন্ত অবস্থান করে। চতুর্থ প্রজন্মের কেউ মারা গেলে পূর্ব প্রজন্মের একজন পিতৃলোক ছেড়ে পরমাত্মায় বিলীন হন অর্থাৎ তিনি শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের ঊর্ধ্বে উঠে যান।

এ কারণে পূর্ববর্তী তিন প্রজন্মেরই শ্রাদ্ধানুষ্ঠান হয়ে থাকে। তবে কোনো কোনো বর্ণ-সম্প্রদায়-গোত্রে কেবলমাত্র পূর্ববর্তী এক পুরুষেরই শ্রাদ্ধ করা হয়।

সাধারণভাবে যে তিথিতে মানুষ মারা যান, সেই তিথিতে তাঁর শ্রাদ্ধানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। তবে এই নিয়মের কিছু ব্যতিক্রমও রয়েছে। পূর্ববর্তী বছরে মৃত ব্যক্তির শ্রাদ্ধ হয় চতুর্থী (চৌথা ভরণী) বা পঞ্চমী (ভরণী পঞ্চমী) তিথিতে। সধবা নারীর মৃত্যু হলে, তাঁর শ্রাদ্ধ হয় নবমী (অবিধবা নবমী) তিথিতে। শিশু বা সন্ন্যাসীর শ্রাদ্ধ হয় চতুর্দশী (ঘট চতুর্দশী) তিথিতে। অস্ত্রাঘাতে বা অপঘাতে মৃত ব্যক্তিদেরও শ্রাদ্ধ হয় এই তিথিতেই (ঘায়েল চতুর্দশী)।

পিণ্ড:
দাহের পূর্বে রান্না করা অন্নের অর্ধেক ফেলে দিয়ে চিতায় শব সাজানোর পর পিণ্ডদানকারী পিণ্ড প্রস্তুত করে থোকে। পিণ্ড হল ঘি ও কালো তিলের সাথে ভাত ও যবমিশ্রিত অন্নভোগ যা অন্তেষ্টিক্রিয়া ও শ্রাদ্ধ পালনের সময় পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে পবিত্র তীর্থে প্রদান করা হয়। কুরুক্ষেত্র, গঙ্গা, যমুনা, কৌশিকী, চন্দ্রভাগা প্রভৃতি নদী সকল পাপ নাশ করে।

ভদ্রা অবকাশ, গণ্ডকী, সরযু প্রভৃতি পবিত্র নদী। বৈনব বরাহ প্রভৃতি তীর্থে পিণ্ডদান করা হয়। পিণ্ড দানের জন্য সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হলো গয়া। গয়াতীর্থ বিষ্ণুর মাহাত্ম্য জড়িত। গয়া নামটি এসেছে গয়াসুরের নামে। পুরাকালে গয়াসুর নামে এক অসুর বিষ্ণুর উপাসনা শুরু করে। তার উদ্দেশ্য ছিল অমরত্ব লাভ করা এবং স্বর্গ দখল করা। 

তার কঠিন তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে বিষ্ণু স্বয়ং উপস্থিত হয়ে বলেন, হে গয়! তুমি অন্য কোন বর চাও। এই পৃথিবীর সৃষ্টির কারণ আমি। আমি তোমাকে পৃথিবীর নিয়মের ব্যতিক্রম অমরত্বের বর দিতে পারবো না। তুমি অন্য কিছু চাও।

গয় বলে, হে বিষ্ণু! আমার স্পর্শ না করে পৃথিবীর কারো যেন স্বর্গলোক প্রাপ্তি না হয়, আমাকে এমন দেহ দান করুন।

ভগবান বিষ্ণু বললেন, এ জন্য আমাকে যজ্ঞ করতে হবে আর তোমাকে মৃত্যুবরণ করে দেহটি দিতে হবে।

গয় তার দেহ দান করতে সম্মত হল। কিন্তু সে এত বিরাট ছিল যে বিষ্ণু কোথাও দাঁড়াতে পারছি না। তখন গয় নিজের মাথা পেতে দিলে ভগবান বিষ্ণু সেই মাথায় পা দিয়ে অত্র অঞ্চলকে মহাপবিত্র করে দেন। এবং বর দেন যে এইখানে পিণ্ড দান না করে কোন দেব দানব বা মানুষের আত্মা স্বর্গলোকে প্রবেশ করবে না। সেই থেকে গয়া মহা পবিত্র তীর্থ এবং পিণ্ড দানের আদর্শ স্থান।

তর্পণ:
মৃত পূর্বপুরুষের আত্মার উদ্দেশ্যে তাদের কাছে সুখ শান্তি কামনা করে জল নিবেদন করে তর্পণ করতে হয়। ‘তর্পণ’ শব্দটি এসেছে ‘ত্রুপ’ থেকে। এর অর্থ ‘সন্তুষ্ট করা’।

আশ্বিনমাসের কৃষ্ণপক্ষ ও শুক্লপক্ষের সন্ধিক্ষণে মহালয়া অমাবস্যা তিথি তর্পণের জন্য প্রসিদ্ধ। আশ্বিনের কৃষ্ণপক্ষের পক্ষকাল ধরে তর্পণ করা হয়। মহালয়ার দিনে হয় মহাতর্পণ। বলা হয়ে থাকে, এ সময় মৃত পুর্বপুরুষের আত্মা পৃথিবীর খুব কাছে বিরাজ করে। তখন তর্পণ করলে তর্পণের উদ্দেশ্য সফল হয়। 

কুরুক্ষেত্রের মন্ত্র পাঠ করে জল শুদ্ধি করে জল তর্পণ করার নিয়ম। তর্পণের জন্য প্রয়োজন পরে গঙ্গার জল, তুলসীপাতা আর কালো তিল আর তামার পাত্র। কোনো আসুরিক শক্তি পূর্বপুরুষের আত্মাকে যাতে কষ্ট না দেয় সেজন্য তপর্ণে কালো তিল ব্যবহার করা হয়।

তর্পণ মন্ত্র, ‘ব্রক্ষা হইতে তৃণ শিখা পর্যন্ত সমস্ত জীব জগৎ মদ্দত্ত জল দ্বারা তৃপ্ত হউক, এই প্রার্থনা।’

তর্পণ প্রকার- পিতৃ তর্পণ, মাতৃ তর্পণ, গুরু তর্পণ, ঋষি তর্পণ, দিব্য পিতৃতর্পণ, যম তর্পণ, ভীষ্ম তর্পণ, বাম তর্পণ, লক্ষণ তর্পণ, শূদ্র তর্পণ। পিতা-মাতা জীবিত থাকাকালীন প্রেত তর্পণ ভিন্ন অন্য তর্পণ করতে নেই।

সমাধি:
সনাতন মতে সমাধি বা মাটিতে কবর দেয়ার রীতিও প্রচলিত আছে। তবে সকলের জন্য সমাধি প্রযোজ্য নয়। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বা কোনো কোনো সম্প্রদায়ের মাঝে এর প্রচলন আছে। দেহ পূর্ণতা না পেলে দাহ করা বিধিসম্মত নয় সনাতনী বিশ্বাসে। সেকারণে শিশু এবং অন্তঃসত্ত্বা নারীকেও দাহ করার বিধান নেই।

এক্ষেত্রে শিশুকে সমাহিত করা হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্তঃসত্ত্বা মৃত নারীকে পানিতে ভাসিয়ে দেয়ার রীতিও দেখা যায়। সাপে কাটা মৃতদেহও দাহ না করে জলে ভাসিয়ে দেওয়া হতো একসময়। দশনামী সম্প্রদায়ের মধ্যে কয়েকটি গোত্রে মৃতদেহ জলে ভাসিয়ে দেয়ার রীতি প্রচলিত আছে। বলা হয়ে থাকে, তারা যেহেতু সংসারত্যাগী তাদের মুখাগ্নি করার জন্য পুত্র বা আত্মীয় পরিজন থাকে না। সে কারণেই তার দেহ জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

সাধারণভাবে যারা আট দশকের বেশি বাঁচার পর দেহত্যাগ করতো একসময় তাদের দেহ দাহ না করে সমাহিত করা হতো। বিশ্বাস ছিল, দেহের পূর্ণতা প্রাপ্ত হলে তাকে আর দাহ করার প্রয়োজন নেই। এখন সে বিধান দেখতে পাওয়া যায় না। তবে এখনো সন্ন্যাসীদের দাহ হয় না। তবে সকল সন্ন্যাস মার্গে মাটিতে সমাহিত করার বিধান প্রচলিত নেই।

বৈষ্ণবদের অনেককেই সমাহিত করা হয়। যদিও সকল বৈষ্ণবদের ক্ষেত্রে এই বিধির প্রচলন নেই। তবে সাধক বা সিদ্ধ পুরুষদের ক্ষেত্রে সমাধি করার প্রচলন অধিক।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!