আনন্দময়ী মায়ের কথা

(যোগী কথামৃত থেকে)

আমার ভাইঝি অমিয়া বসু একদিন আমায় বলল, নির্মলা দেবীকে না দেখে আপনি ভারতবর্ষ ত্যাগ করে যাবেন না। তাঁর  ভগবদ্ভক্তি অতীব গভীর, আর আনন্দময়ী মা বলেই তিনি সকলের কাছে পরিচিত।’ বলতে বলতে তার চোখে মুখে ফুঁটে উঠল এক গভীর আকূতি।

বললাম, নিশ্চয়ই, সেই সন্ন্যাসিনীকে দেখে যাব বই কি। তাঁর ঈশ্বর ভাবের উচ্চাবস্থার কথা আমি সবই পড়েছি। বছর কতক আগে ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ পত্রিকায় তাঁর বিষয়ে একটি ছোট প্রবন্ধও বেরিয়েছিল। অমিয়া বলতে লাগল, আমি তাঁকে দর্শন করেছি। আমরা যেখানে থাকি, জামসেদপুর শহরে সম্প্রতি তিনি এসেছিলেন।

জনৈক শিষ্যের অনুরোধে আনন্দময়ী মা একটি মরণাপন্ন লোকের বাড়িতে যান। তার মৃত্যু শয্যার পাশে দাঁড়িয়ে লোকটির কপালে হাত বুলিয়ে দিতেই তার মৃত্যু যন্ত্রণা সব থেমে যায়। রোগও সঙ্গে সঙ্গে অন্তর্হিত হয়; আনন্দে, বিস্ময়ে লোকটি দেখল যে সে একেবারে নিরাময় হয়ে গেছে।

তিনি বললেন, ‘বাবা! এ জীবনে  আজ আমি আপনাকে এই প্রথম দেখছি। কত যুগ যুগান্তর পরে। এখুনি আর চলে যাবেন না।’  

দিনকতক বাদে শুনতে পেলাম, আনন্দময়ী মা কলকাতার ভবানীপুর অঞ্চলে তাঁর এক শিষ্যের বাড়িতে অবস্থান করছেন। রাইট সাহেব আর আমি, দু’জন মিলে আমাদের কলকাতার বাড়ি থেকে তাড়াতাড়ি করে বেরিয়ে পড়লাম। ভবানীপুরের সেই বাড়িটির কাছে আমাদের ফোর্ডগাড়ি পৌঁছতে রাইট সাহেব আর আমি রাস্তার উপর একটা অদ্ভুত দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলাম।

দেখলাম আনন্দময়ী মা একটা হুডখোলা মোটর গাড়িতে দাঁড়িয়ে, প্রায় শতখানেক শিষ্য তাঁকে ঘিরে রয়েছে। দেখে বোধ হল কোথাও যাবার জন্যে বেরচ্ছেন। রাইট সাহেব ফোর্ড গাড়িটাকে কিছু দূরে রেখে আমার সঙ্গে সঙ্গে হেঁটে সেই নীরব জনতার দিকে এগিয়ে চলল।

আনন্দময়ী মা আমাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করা মাত্রই গাড়ি থেকে নেমে আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন। ‘বাবা আপনি এসেছেন!’ আবেগভরে এই কথাটি বলে এক হাত দিয়ে আমার গলা বেষ্টন করে তিনি আমার কাঁধের উপর তাঁর মাথাটি রাখলেন। রাইট সাহেবকে একটু আগেই বলেছি, আমি এই সাধ্বীটিকে বিশেষ চিনি না।

কাজেই এই রকম অসাধারণ অভ্যর্থনার দৃশ্য দেখে সে বেচারা অবাক হয়েই তাকিয়ে রইল। আর সেই শতখানেক চেলা তারাও অবাক বিস্ময়ে এই স্নেহভরা দৃশ্যাবলী স্থির হয়ে দেখতে লাগল।  সঙ্গে সঙ্গে আমি টের পেলাম যে সাধ্বীটি তখন সমাধির খুব উচ্চাবস্তায় রয়েছেন। বাইরে নারীর ছদ্মবেশ সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে তিনি নিজেকে জানতে পেরেছেন যে তিনি শ্বাশত আত্মা।

সেই উচ্চাবস্তা থেকে তিনি আর একজন ঈশ্বর ভক্তকে সানন্দে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করছেন। হাত ধরে তিনি তাঁর গাড়ির কাছে আমায় নিয়ে গেলেন। আমি একটু প্রতিবাদের সুরে বললাম, ‘আনন্দময়ী মা, আমি আপনার বেরোনো তো দেরি করিয়ে দিচ্ছি!’

তিনি বললেন, ‘বাবা! এ জীবনে  আজ আমি আপনাকে এই প্রথম দেখছি। কত যুগ যুগান্তর পরে। এখুনি আর চলে যাবেন না।’  গাড়ির পিছন দিকের আসনে আমরা দুজন বসলাম। সঙ্গে সঙ্গে আনন্দময়ী মা সমাধিতে মগ্ন হয়ে পড়লেন, শরীর স্থির, নিশ্চল, স্থাণুবৎ। সুন্দর দু’টি চক্ষু তাঁর আকাশের দিকে অর্ধন্মীলিত, দৃষ্টি স্থির হয়ে এসে নিবদ্ধ হল নিকট; সুদূর অন্তরের স্বর্গরাজ্যে। শিষ্যবর্গ শান্ত ও মৃদুস্বরে বলে উঠল, ‘আনন্দময়ী মাঈ কি জয়!’

মায়ের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য দেখবার জন্যে আমাদের একটি দল সর্বদাই ওঁর সঙ্গে সঙ্গে ভ্রমণ করে। মায়ের মতো যত্ন নিয়ে ওঁকে আমাদের সর্বদা দেখাশোনা করতে হয়, কারণ উনি দেহের প্রতি মোটেও ভ্রুক্ষেপ করেন না।

ভারতবর্ষে আমি বহু ব্রহ্মজ্ঞানী মহাপুরুষের সাক্ষাৎ পেয়েছি, কিন্তু এরূপ উচ্চাবস্তার সাধিকার দর্শনলাভ আমার আগে কখনও ঘটেনি। তাঁর শান্ত, স্নিগ্ধ মুখশ্রী আনন্দে উজ্জ্বল, তাতে করেই তাঁর নাম হয়েছে ‘আনন্দময়ী মা।’

সুদীর্ঘ ঘন কৃষ্ণকেশপাশ অবগুণ্ঠনহীন মস্তকের পিছনে লুটিয়ে পড়েছে, কপালে রক্তচন্দনের ফোঁটা; তৃতীয় নেত্রের প্রতীক, আধ্যাত্মিক দৃষ্টি অন্তরে তাঁর সদা জাগ্রত। ছোট্ট মুখখানি, ছোট্ট দুটি হাত আর ছোট্ট দুটি পা। তাঁর আধ্যাত্মিক বিরাটত্বের সঙ্গে কি অদ্ভুত বৈসাদৃশ্য।

আনন্দময়ী মা সমাধিস্থ থাকাকালীন আমি নিকতস্থ একটি শিষ্যকে কতকগুলি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলাম। শিষ্যটি বললেন, ‘আনন্দময়ী মা ভারতের বহস্থানেই ভ্রমণ করেন; নানাজায়গায় তাঁর শতশত শিষ্য-শিষ্যা আছে। তাঁর দুঃসাহসিক প্রচেষ্টার ফলে নানা প্রয়োজনীয় সামাজিক উন্নতি সাধিত হয়েছে। নিজে ব্রাক্ষণ হলেও তিনি কোনপ্রকার জাতিভেদ মানেন না।

মায়ের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য দেখবার জন্যে আমাদের একটি দল সর্বদাই ওঁর সঙ্গে সঙ্গে ভ্রমণ করে। মায়ের মতো যত্ন নিয়ে ওঁকে আমাদের সর্বদা দেখাশোনা করতে হয়, কারণ উনি দেহের প্রতি মোটেও ভ্রুক্ষেপ করেন না।

কেউ যদি না ওঁকে খেতে দেয় তো খানই না, বা তার কোন খোঁজও করেন না। খাবার সামনে ধরে দিলেও, তা পর্যন্ত উনি ছোঁন না। এইরকম না খেয়ে খেয়ে শেষপর্যন্ত উনি যদি দেহত্যাগই করে বসেন, সেই ভয়ে আমরা ওঁর শিষ্যরা, ওঁনাকে নিজের হাতে খাইয়ে দিই।

দিনের পর দিন উনি সমাধি অবস্থায় থাকেন, নিঃশ্বাস পড়ে কি না সন্দেহ, দৃষ্টি তখন থাকে একেবারে নিস্পলক-স্থির। ওঁর প্রধান শিষ্যদের মধ্যে একজন হচ্ছেন ওঁর স্বামী, নাম ভোলানাথ। বহুবছর আগে ওঁদের বিবাহ হবার অল্পকাল পরেই তিনি মৌনব্রত অবলম্বন করেন।

শিষ্যটি একটি ভদ্রলোককে দেখিয়ে দিলেন, বেশ চওড়া কাঁধ, আকৃতিও বেশ সুন্দর, লম্বা চুল আর সাদা দাড়ি। ভদ্রলোক নীরবে জনতার মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলেন করজোড়ে-শিষ্যের ভক্তিনত ভাবে। ব্রক্ষানন্দসাগরে অবগাহন করে আনন্দময়ী মা এখন যেন জড়জগতে ফিরে এলেন।

‘বাবা, বলুন, এখন আপনি কোথায় থাকেন?’ তাঁর স্বর অতি পরিষ্কার, যেন সঙ্গীতের মধুর ঝঙ্কার। ‘বর্তমানে কোলকাতা কিম্বা রাঁচীতে থাকি, কিন্তু শীগগিরই আমেরিকায় যাচ্ছি।’

‘আমেরিকা?’

‘হ্যাঁ; সেখানকার ধর্মপিপাসু লোকেরা আপনার মত ভারতীয় সাধিকাকে দেখলে নিশ্চয়ই আন্তরিকভাবে খুশি হবে, যাবেন আপনি?’

যে কোন উৎসবই ছেলেদের আনন্দিত করে তোলে। পড়াশোনার হাঙ্গামা নেই, গানবাজনা, সর্বোপরি ভুরিভোজন, স্ফূর্তির চূড়ান্ত। যে দিন তিনি এসে পৌঁছলেন, গেটের কাছ থেকেই ছেলেরা চিৎকার করে অভ্যর্থনা জানাল, ‘জয়! আনন্দময়ী মাঈ কি জয়!’

‘বাবা নিয়ে গেলেই যাব!’ উত্তর শুনে তো উপস্থিত শিষ্যের দল সব সভয়ে চমকে উঠলেন। একজন তারমধ্যে থেকে এগিয়ে এসে আমাকে দৃঢ়স্বরে বললেন, ‘শুনুন মশায়, আমাদের মধ্যে এই জনকুড়ি কি তারও বেশি; আমরা আনন্দময়ী মায়ের সঙ্গে সর্বদাই ভ্রমণ করি। ওঁকে ছেড়ে আমরা কোথাও থাকতে পারব না। উনি যেখানে যাবেন, আমরাও সেখানে যাব, বুঝলেন?

‘নিতান্ত অনিচ্ছাসত্বেও মতলবটি ছাড়তে হল, দেখলাম যে এ একেবারে অসম্ভব, কারণ শুধু শুধু দল বেজায় ভারি হয়ে যায়। তাঁর কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় বললাম, ‘আপনার শিষ্যদের নিয়ে অন্ততঃ রাঁচীতে তো আসুন। আপনি নিজে একজন ঈশ্বরের দিব্য শিশু, আমার রাঁচী বিদ্যালয়ের শিশুদের দেখেও ভারি আনন্দই পাবেন।’

‘বাবা আমায় যখনই নিয়ে যাবেন, তখনই খুশি হয়ে যাব’  

অল্প কিছুদিন পরেই আনন্দময়ী মা’র রাঁচী বিদ্যালয়ে প্রতিশ্রুত আগমনের কথা শোনা গেল। যে কোন উৎসবই ছেলেদের আনন্দিত করে তোলে। পড়াশোনার হাঙ্গামা নেই, গানবাজনা, সর্বোপরি ভুরিভোজন, স্ফূর্তির চূড়ান্ত। যে দিন তিনি এসে পৌঁছলেন, গেটের কাছ থেকেই ছেলেরা চিৎকার করে অভ্যর্থনা জানাল, ‘জয়! আনন্দময়ী মাঈ কি জয়!’

করতাল, শঙ্খধ্বনি আর মৃদাঙ্গবাদ্যের সঙ্গে সঙ্গে গাঁদাফুলের বৃষ্টি! আনন্দময়ী মা রৌদ্রকজ্জ্বল বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে হাস্যমুখে চতুর্দিক পরিভ্রমণ করে বেড়াতে লাগলেন। যেন স্বর্গের একটি সচল আনন্দ প্রতিমা।

প্রধানগৃহ যেটি সেখানে আমি তাঁকে নিয়ে যেতে আনন্দময়ী মা সানন্দে বলে উঠলেন, ‘এ জায়গাটি তো ভারি সুন্দর!’ শিশুসুলভ সরল হাসি হেসে তিনি আমার পাশেই বসে পড়লেন। তাঁকে পেয়ে লোকের মনে হয় তিনি আপনা হতেও আপন, অথচ একটা দূরত্বের আভাস যেন সর্বদা তাঁকে ঘিরে রয়েছে, সর্বব্যাপিত্বের একি রহস্যময় স্বাতন্ত্র্য! বললাম, ‘আপনার জীবন সমন্ধে কিছু বলুন।’

ঘন্টাখানেক ধরে দু’জনেই আমরা তখন ধ্যানানন্দে মগ্ন হয়ে রইলাম। ছোট্ট একটি উচ্ছ্বাসিত হাসিতে টের পেলাম- আনন্দময়ী মা’র সম্বিৎ ফিরে এসেছে। বললাম, ‘আনন্দময়ী মা, দয়া করে আমার সঙ্গে বাগানে আসুন। রাইট সাহেব গোটাকতক ছবি নেবেন।

‘বাবা তো সবই জানেন, তবে আবার বলা কেন?’ হয়ত তিনি মনে করেছিলেন যে, একটা জন্মের ঘটনার ক্ষুদ্র ইতিহাস সে আর ধর্তব্যের মধ্যেই নয়, তা আবার বলবে কি! একটু হেসে সবিনয়ে আমি আবার একবার অনুরোধ করলাম। কি আর করেন, সুন্দর সুঠাম হস্ত হতাশাসূচক ভঙ্গিতে প্রসারিত করে বললেন, ‘বাবা বলবার আর কি আছে, কিছুই নেই। আমার চৈতন্য কখনও এই নশ্বর দেহটার সঙ্গে জড়িত হয় নি।

এই পৃথিবীতে আসবার আগে, ‘বাবা, ‘আমি! সেই একই ছিলাম।’ ছোট্ট একটি মেয়ে যখন ছিলাম তখনও ‘আমি সেই’, নারীত্বে পৌঁছে তখনও ‘আমি সেই।’ যে পরিবারের মধ্যে জন্মেছিলাম, তাঁরা যখন এই দেহটার বিবাহ দিতে চাইলে, তখনও ‘আমি সেই’। আর বাবা, এখন আপনার সামনেও ‘আমি সেই’ একই আছি। আর এই অনন্ততের কোলে আমায় ঘিরে সৃষ্টির লীলা যতই চলুক, নিত্যাকালের জন্যে ‘আমি সেই একই থাকব।’

তারপর আনন্দময়ী মা যেন গভীর ধ্যানের মধ্যে ডুবে গেলেন। দেহ তাঁর মর্মের প্রতিমার মত নিথর, নিষ্পন্দ। মন যেন কার ডাকে কোন সুদূরে উধাও হয়ে ছুটে চলেছে; গভীর কালো চোখদুটি যেন কাঁচের মত প্রাণহীন, নিষ্প্রভ। সাধুসন্তরা যখন জড়দেহ হতে তাঁদের চৈতন্য অপসারিত করেন, তখন প্রায়ই তাঁদের এইরকম ভাব দেখা যায়।

সে সময় বোধহয় দেহটা যেন একটা নিষ্প্রাণ মাটির পুতুলের মত। ঘন্টাখানেক ধরে দু’জনেই আমরা তখন ধ্যানানন্দে মগ্ন হয়ে রইলাম। ছোট্ট একটি উচ্ছ্বাসিত হাসিতে টের পেলাম- আনন্দময়ী মা’র সম্বিৎ ফিরে এসেছে। বললাম, ‘আনন্দময়ী মা, দয়া করে আমার সঙ্গে বাগানে আসুন। রাইট সাহেব গোটাকতক ছবি নেবেন।’

‘আচ্ছা বেশ বাবা, আপনার ইচ্ছাই আমার ইচ্ছা।’ অনেকগুলো ছবি তোলা হল; ভক্তির দীপ্তিতে উদ্ভাসিত তাঁর নয়নযুগলে তখনও সেই দিব্যজ্যোতিঃ অপরিবর্তিত। তারপর এল ভোজের পালা। আনন্দময়ী মা কম্বলাসনে বসলেন একজন শিষ্যা পাশে বসে তাঁকে খাওয়াতে লাগলেন। শিষ্যাটি আনন্দময়ী মার মুখে খাবার তুলে দিতে ঠিক ছোট্ট শিশুটিরই মত শান্তভাবে খেতে লাগলেন।

আনন্দময়ী মা নিজের বিষয়ে ‘আমি’ বলে উল্লেখ করেন না। তিনি বিনয়সূচক পরোক্ষ উক্তি করেন, যেমন- এই দেহটা, এই ছোট মেয়েটি, আপনার কন্যা ইত্যাদি। কাকেও তাঁর ‘শিষ্য’ বলেও উল্লেখ করেন না। নৈর্ব্যক্তিকভাবে তিনি সকল ব্যক্তিরই উপর জগজ্জননীর প্রেম বিতরণ করেন।

খেতে খেতে দেখা গেল যে খেয়েই যাচ্ছেন, তরকারি আর মিষ্টিতে যে স্বাদের কোনো পার্থক্য আছে, আনন্দময়ী মার কাছে তার কোন প্রকার বোধ কিছুমাত্র নেই।

সন্ধ্যা হয়ে এলো আনন্দময়ী মা তাঁর শিষ্যদের সঙ্গে নিয়ে আশ্রম থেকে বিদায় গ্রহণ করলেন; যাবার সময় আর একদফা তাঁদের উপর সেই রকম গোলাপ ফুলের পাপড়ি বৃষ্টি; তিনিও ছেলেদের হাত তুলে আশির্বাদ করতে লাগলেন। স্বতঃউৎসারিত ভক্তির উচ্ছ্বাসে ছেলেদের মুখ উজ্জ্বল। তাদের সে এক মহা আনন্দের দিন! যীশুখ্রীষ্ট ঘোষণা করেছেন-

‘তুমি তোমার প্রভু ঈশ্বরকে ভালোবাসবে তোমার সকল আন্তঃকরণ, সকল আত্মা, সকল মন আর সকল শক্তি দিয়ে; এই হচ্ছে আমার প্রথম অজ্ঞা।’*

সকলপ্রকার তুচ্ছ আকর্ষণ পরিহার করে আনন্দময়ী মা ভগবানে একান্তভাবে ও পরিপূর্ণ রূপেই আত্মসমর্পণ করেছেন। পণ্ডিতদের চুলচেরা বিচারে নয়, কিন্তু বিশ্বাসের ধ্রুবন্যায়ে এই অপনভোলা শিশুর মত সরল সাধিকা, মানব জীবনের একমাত্র সমস্যার সমাধান করেছেন, সেটা হচ্ছে ভগবানের সাযুজ্য লাভ। লক্ষকোটি সংসারিক তুচ্ছ ব্যাপারে ব্যতিব্যস্ত মানুষ আজ এই একমাত্র সহজ সরল সত্যটাকে একেবারে ভুলে গেছে।

এক ও অদ্বিতীয় ভগবানের প্রতি প্রেম অস্বীকার করে জাতিসকল বাহ্যিক মানবহিতৈষণার প্রতি উৎকট নিষ্ঠা প্রদর্শন করে তাদের নাস্তিকতা লুকাবার চেষ্টা করে। অবশ্য এইসব মানবকল্যাণকর প্রচেষ্টাগুলিও সৎ, কারণ তারা মানুষের মনকে সাময়িকভাবে তাদের নিজেদের কাছ থেকে সরিয়ে দেয়; কিন্তু যীশুখ্রীষ্ট তাঁর ‘প্রথম আজ্ঞায় যা বলেছেন, জীবনের সেই একমাত্র দায়িত্ব থেকে তা কিন্তু মানুষকে মুক্ত করে না।

ঈশ্বরকে ভালোবাসার যে উন্নতি সাধন কর্তব্য, তা তারা একমাত্র দাতার* মুক্তহস্তের দান; প্রথম শ্বাসগ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই এসে পড়ে।

রাঁচীতে যাওয়ার পর আর একবার আনন্দময়ী মায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল; শিষ্যদলের সঙ্গে শ্রীরামপুর স্টেশনে গাড়ির জন্য তখন তিনি অপেক্ষা করছিলেন। তিনি বললেন, বাবা! আমি হিমালয়ে যাচ্ছি; সুহৃদয় জনকয়েক লোক মিলে আমাদের জন্যে দেরাদুনে একটি আশ্রম তৈরি করে দিয়েছেন।’

গাড়িতে চড়লেন… দেখে অবাক হয়ে গেলাম যে, কি ভিড়ের মধ্যে কি  ট্রেনে, কি ভোজনে, কি নীরব ধ্যানে; কোন উপলক্ষ্যেই তাঁর দৃষ্টি ঈশ্বর থেকে কখনও লক্ষচ্যুত হয়না। অন্তরের মধ্যে এখনও সেই অপরিসীম সুধামাখা বাণীর প্রতিধ্বনি শুনি, দেখুন, এখন  আর সর্বদাই, পরমাত্মার সঙ্গে এক হয়ে ‘আমি চিরকাল সেই একই আছি!’

আনন্দময়ী মা নিজের বিষয়ে ‘আমি’ বলে উল্লেখ করেন না। তিনি বিনয়সূচক পরোক্ষ উক্তি করেন, যেমন- এই দেহটা, এই ছোট মেয়েটি, আপনার কন্যা ইত্যাদি। কাকেও তাঁর ‘শিষ্য’ বলেও উল্লেখ করেন না। নৈর্ব্যক্তিকভাবে তিনি সকল ব্যক্তিরই উপর জগজ্জননীর প্রেম বিতরণ করেন।

……………………………………………………….
* মার্ক ১২:৩০ ( বাইবেল )।
* অনেকেই একটি নূতন এবং উন্নততর জগৎ সৃষ্টি করার জন্য মনে মনে উন্মুখ হয়ে ওঠেন। কিন্তু এরূপ চিন্তার জাল রচনা করার পরিবর্তে তোমরা তাঁরই ধ্যানে নিয়োজিত হয়ো যাঁর কাছ থেকে পরিপূর্ণ শান্তি লাভের প্রত্যাশা করা যায়। মানুষের প্রধান কর্তব্য হচ্ছে ঈশ্বরের বা সত্যের সন্ধানে নিযুক্ত হওয়া।’
* পূর্ববঙ্গের ত্রিপুরা জেলার খেওরা গ্রামে ১৮৯৬ সালে আনন্দময়ী মা জন্মগ্রহণ করেন।

……………………………………………………….
সূত্র:
যোগী-কথামৃত (Autobiography of a Yogi)
**শ্রী শ্রী পরমহংস যোগানন্দ বিরচিত পূজনীয় ও পরমারাধ্য আমার গুরুদেব শ্রী শ্রী স্বামী শ্রীযুক্তেশ্বর গিরি মহারাজের শ্রীকরকমলে অর্পিত।
**মৎপ্রণীত ইংরাজী ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ্ এ যোগী’র বঙ্গানুবাদে শ্রীমান ইন্দ্রনাথ শেঠের স্বেচ্ছা প্রণোদিত প্রয়াস ও অক্লান্ত প্রচেষ্টার জন্য আমি তাকে ধন্যবাদ ও আশির্বাদ জানাই। -শ্রী শ্রীপরমহংস যোগানন্দ

………………….
পুনপ্রচারে বিনীত: প্রণয় সেন

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

……………………..
আরো পড়ুন:
মা সারদা দেবী
প্রজ্ঞাপারমিতা শ্রীশ্রীমা সারদা
বহুরূপিনী বিশ্বজননী সারদামণি
মা মনোমোহিনী
শ্রীরামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে সপ্তসাধিকা
মাতৃময়ী তিনরূপ
মা আনন্দময়ী
আনন্দময়ী মায়ের কথা
ভারত উপাসিকা নিবেদিতা
রাসমণি
নিরাহারা যোগিনী মায়ের সন্ধানে
পূণ্যশীলা মাতা কাশীমণি দেবীর সাক্ষাৎকার
আনন্দময়ী মা
মা মারিয়াম :: পর্ব-১
মা মারিয়াম :: পর্ব-২
মা মারিয়াম :: পর্ব-৩
মা মারিয়াম :: পর্ব-৪
মীরার কথা
অলৌকিক চরিত্র মাদার তেরেসা
মা আনন্দময়ীর কথা
বৈষ্ণব সাধিকা যশোদা মাঈ
আম্মার সঙ্গলাভ
শ্রীশ্রী সাধিকা মাতা
জগৎ জননী ফাতেমা-১
জগৎ জননী ফাতেমা-২
জগৎ জননী ফাতেমা-৩
জগৎ জননী ফাতেমা-৪
জগৎ জননী ফাতেমা-৫
জগৎ জননী ফাতেমা-৬
জগৎ জননী ফাতেমা-৭
জগৎ জননী ফাতেমা-৮
জগৎ জননী ফাতেমা-৯
জগৎ জননী ফাতেমা-১০
জগৎ জননী ফাতেমা-১১
জগৎ জননী ফাতেমা-১২

 

প্রাসঙ্গিক লেখা

1 Comment

  • Abdullah Al Jamir , বুধবার ২৪ এপ্রিল ২০১৯ @ ১২:০০ অপরাহ্ন

    এসো হে আনন্দময়ী…

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!