মাতা কাশীমণি দেবী

লাহিড়ী মহাশযের জীবনসঙ্গিনী শ্রীমতি কাশীমনি দেবীর সঙ্গে সাক্ষাতের বাসনা বহুদিন হতেই মনের মধ্যে সুপ্ত ছিল। অল্প কিছুদিনের জন্য কাশীতে গিয়ে আমার সে বাসনা পূর্ণ করবার সুযোগ পেয়ে গেলাম। কাশীর গরুড়েশ্বর মহল্লায় লাহিড়ী মহাশয়ের বাড়িতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করাতে কাশীমনি দেবী আমায় সাদরে গ্রহণ করলেন।

বার্ধক্যসত্বেও তাঁর চেহারাটি যেন পূর্ণপ্রস্ফুটিত পদ্মের মতো অদৃশ্যভাবে আধ্যাত্মিক সৌরভ যেন তা থেকে নির্গত হচ্ছে। তিনি মধ্যমাকৃতি, সরু গ্রীবা, গৌরবর্ণা এবং তাঁর চক্ষু দু’টি অতীব উজ্জ্বল।

প্রণাম করে বললাম, পূজানীয়া মা, আপনার মহাপুরুষ স্বামীর কাছে আমি শৈশবেই দীক্ষিত হয়েছিলাম। তিনি আমার পিতামাতা আর আমার নিজ গুরু শ্রী যুক্তেশ্বরজীর গুরু ছিলেন। তা হলে আপনার পূর্ণজীবনের কিছু কাহিনী শোনবার সুযোগ আমি নিশ্চয়ই পেতে পারি, কি বলেন?

তিনি আমাকে স্নেহভরে ডেকে বললেন, এসো বাবা, এসো উপরে চলো! কাশীমনি পথ দেখিয়ে উপরে নিয়ে চললেন। একটি অতিক্ষুদ্র ঘরে যেখানে কিছুদিন তিনি স্বামীর সঙ্গে বসবাস করেছিলেন। এই সেই পবিত্র তীর্থ যেখানে অদ্বিতীয় মহাগুরু মহাজীবনের বিবাহ নাটক অভিনয় করবার সৌজন্য প্রকাশ করেছিলেন, তীর্থদর্শন করে কৃতার্থবোধ করলাম।

সেই মহিময়ী মাতা তাঁর পাশের একটি গদির উপর আমায় বসতে ইঙ্গিত করলেন। তারপর তিনি বলতে লাগলেন, স্বামীর দিব্য মাহাত্ম্য বুঝতে আমার অনেকদিনই লেগেছিল। একদিন রাত্রিবেলা এই ঘরেতেই একটি পরিষ্কার স্বপ্ন দেখলাম,  আমার মাথার উপর মহান দেবদূতেরা কল্পনাতীত মনোরম ভঙ্গিতে ভেসে বেড়াচ্ছেন।

দৃশ্যটি এতদূর বাস্তব বলে বোধ হল যে আমি তখনই জেগে উঠলাম ঘরটি তখন উজ্জ্বল আলোয় ছেয়ে রয়েছে! পদ্মাসনে উপবিষ্ট আমার স্বামী ঘরের মাঝখানে তাঁর দেহ শূন্যে ভাসমান, আর দেবদূতেরা সব করোজোড়ে তাঁর স্তবস্তুতি করছেন। এতদূর আশ্চর্য হয়ে গেছি যে, তখনো আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না যেন আমি স্বপ্ন দেখছি।

লজ্জায় মরে যাই একথা ভেবে যে, যিনি সাক্ষাৎ দেবতা, আমি কিনা তাঁরই পাশে অজ্ঞান আচ্ছন্ন হয়ে এতদিন মোহঘোরে ঘুমিয়ে কাটিয়েছি। আজ রাত থেকে আর আপনি আমার স্বামী নন, আমার গুরু। এই দীনহীনা নারীকে আপনার শিষ্যা বলে গ্রহণ করবেন কি?

লাহিড়ী মহাশয় বললেন, কল্যাণী, এ তোমার স্বপ্ন নয়! তোমার মোহনিদ্রা চিরকালের জন্য পরিত্যাগ করো! তারপর ধীরে ধীরে যখন তিনি মাটিতে নেমে এলেন, তখন আমি তাঁর পায়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করলাম। বললাম, গুরুদেব, বারবার আমি আপনাকে প্রণাম করি। আপনাকে স্বামী বলে ভাবাতে আমার যে অপরাধ হয়েছে তা ক্ষমা করুন।

লজ্জায় মরে যাই একথা ভেবে যে, যিনি সাক্ষাৎ দেবতা, আমি কিনা তাঁরই পাশে অজ্ঞান আচ্ছন্ন হয়ে এতদিন মোহঘোরে ঘুমিয়ে কাটিয়েছি। আজ রাত থেকে আর আপনি আমার স্বামী নন, আমার গুরু। এই দীনহীনা নারীকে আপনার শিষ্যা বলে গ্রহণ করবেন কি?

গুরুদেব আমায় মৃদুস্পর্শ করে বললেন, হে পবিত্র আত্মা, ওঠো, তোমায় গ্রহণ করলাম। তারপর তিনি দেবদূতদের দেখে বললেন, এইসব পুণ্যাত্মা সাধুসন্তদের একে একে প্রণাম করো। যখন আমি নতজানু হয়ে সবাইকে প্রণাম করা শেষ করলাম, তখন সেই দেবদূতগণের কণ্ঠস্বর একসঙ্গে ধ্বনিত হয়ে উঠলো যেন কোন প্রাচীন শাস্ত্র থেকে সমবেত কণ্ঠে স্তোত্রপাঠ হচ্ছে।

দেবতার সঙ্গিনী আপনি পুণ্যবতী, আপনাকে আমরা প্রণাম করি। বলে তাঁরা সব আমার পদতলে প্রণাম করলেন, আর আশ্চর্য! সঙ্গে সঙ্গে সেই সব জ্যোতির্ময় মূর্তিসকল একেবারে অদৃশ্য হয়ে গেল। ঘর অন্ধকার। আমার গুরু আমায় ক্রিয়াযোগ এ দীক্ষা নিতে বললেন। আমি বললাম, নিশ্চয়ই নেব। হায়রে, আমার এমনই পোড়াকপাল যে ক্রিয়াযোগের আশীর্বাদ অনেকদিন আগেই পাইনি।

লাহিড়ী মহাশয় সান্ত্বনার হাসি হেসে বললেন, তখনও সময় হয় নি তাই, বুঝলে? তোমার অনেক কর্মফল আমি নিরবে খন্ডন করে দিয়েছি; এখন তুমি যোগ্য হয়েছো বলেই তোমার ইচ্ছা হয়েছে। এইবলে তিনি আমার ললাট স্পর্শ করলেন। একটা ঘূর্ণায়মান জ্যোতিঃপিণ্ড দেখা দিল।

সেই জ্যোতিঃপ্রভা ক্রমশ ওপ্যালের মত নীল আধ্যাত্মিক চক্ষুতে পরিণত হল সোনার বেড় দেওয়া, মাঝখানে একটি সাদা পঞ্চকোণ তারকা। তোমার চৈতন্যকে ঐ তারা ভেদ করে অনন্তজগতের দিকে প্রসারিত করো।

আমার গুরুদেবের কন্ঠে নতুন স্বর  দূর হতে ভেসে আশা গানের মতো মৃদু ও কোমল। সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো স্বপ্নের পর স্বপ্ন আমার আত্মার তটপ্রান্তে এসে আছড়ে পড়তে লাগল; তারপর চারিদিকের দৃশ্যমান জগত মিলিয়ে গিয়ে আনন্দ সাগরে পরিণত হলো। সেই আনন্দসাগরের তরঙ্গে ডুবে গিয়ে একেবারে আত্মহারা হয়ে গেলাম। ঘন্টাকতক পরে যখন আবার আমার বাহ্যজ্ঞান ফিরে এলো, গুরুদেব তখন আমায় ক্রিয়াযোগের প্রণালী শিক্ষা দিলেন।

সেই রাত থেকেই লাহিড়ী মহাশয় আমার ঘরে আর কখনো শোন নি। তিনি নিদ্রাই ত্যাগ করেছিলেন। তাঁর শিষ্যদের সঙ্গে নীচেকার সামনের ঘরে দিনরাত থাকতেন। এই কথাগুলি বলে সেই মহীয়সী নারী চুপ করলেন সেই মহান যোগীর সঙ্গে তার অপূর্ব সম্বন্ধ উপলব্ধি করে আমি তখন তাঁর জীবনের আরও কিছু কথা শোনবার ইচ্ছা প্রকাশ করলাম।

বাবা! তোমার লোভ বড্ড বেড়ে গেছে দেখছি? যাক, বেশিকিছু আর বলবো না তবে আমার একটি মাত্র ঘটনা তোমায় বলব। বলে একটুখানি সলজ্জ হাসি হেসে আবার শুরু করলেন, আমার গুরু-স্বামীর কাছে একটি যে পাপ করেছিলাম আজ তা স্বীকার করব। আমার দীক্ষার মাসকতক পরে আমি নিজেকে তাঁর কাছে পরিত্যক্ত আর অবহেলিত বলে বোধ করতে আরম্ভ করলাম।

একদিন লাহিড়ী মহাশয় এই ছোট্ট ঘরটিতে কিছু একটা জিনিস নিতে ঢুকলেন; আমিও তাড়াতাড়ি তাঁর পিছন পিছন এলাম। দারুণ মোহঘোরে অন্ধ হয়ে তাঁকে খোটা দিয়ে বললাম, আপনার সবটাই শিষ্যদের নিয়ে কাটে। আপনার স্ত্রীপুত্রের জন্য কি কোন কর্তব্য নেই? সংসার চালাবার জন্য আরো যে টাকার দরকার, তা যোগাবার আপনার কোন গরজই নেই।

মাথার উপর শূন্য থেকে উত্তর ভেসে এলো, এই যে, আমি এখানে। মাথা তুলে দেখি শূন্যে গুরুদেবের দেহ মস্তক ঘরের ছাদ স্পর্শ করে রয়েছে। চক্ষু দুটি যেন জ্বলন্ত অগ্নিশিখা! নিঃশব্দে তিনি মেঝের উপর নেমে এলে পর ভয়ে জ্ঞানশূন্য হয়ে তাঁর পায়ের উপর পড়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলাম।

গুরুদেব একটিবার মাত্রআমার দিকে দৃষ্টিপাত করলেন, তার পরেই ব্যাস, একেবারে হাওয়া। ভয়ে কাঠ হয়ে গিয়ে শুনলাম একটাই মাত্র কণ্ঠস্বর ঘরের চারি দিক থেকে ধ্বনিত হচ্ছে, দেখছো না, এ একেবারে শূন্য!  আমার মত একটা শূন্য পদার্থ তোমার জন্য টাকা আনবে কি করে, বলো?

আমি চেঁচিয়ে বলে উঠলাম, গুরুদেব! আমি কোটি কোটি বার আপনার কাছে মাপ চাইছি আমার পাপচক্ষু আপনাকে তো আর দেখতে পাচ্ছে না। দয়া করে আপনি আপনার পূণ্যদেহে আবার ফিরে আসুন! মাথার উপর শূন্য থেকে উত্তর ভেসে এলো, এই যে, আমি এখানে। মাথা তুলে দেখি শূন্যে গুরুদেবের দেহ মস্তক ঘরের ছাদ স্পর্শ করে রয়েছে।

চক্ষু দুটি যেন জ্বলন্ত অগ্নিশিখা! নিঃশব্দে তিনি মেঝের উপর নেমে এলে পর ভয়ে জ্ঞানশূন্য হয়ে তাঁর পায়ের উপর পড়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলাম।

তিনি বলতে লাগলেন, সেই পরমধনকে খোঁজো, এ সংসারের তুচ্ছ টাকাকড়ি নয়। অন্তরে ঐশ্বর্য সঞ্চয় করলে পর দেখতে পাবে যে, বাইরের সাহায্য সর্বদাই আসছে। তারপর আশ্বাস দিয়ে বললেন, আমার একটি আধ্যাত্মপুত্র তোমায় সব ব্যবস্থা করে দেবে দেখো, কিছু ভাবনা নেই!

গুরুজীর কথা সত্যি সত্যি ফলে গেল; একটি শিষ্য আমাদের সংসারের জন্যে অনেক টাকা দিয়ে গিয়েছিল। তাঁর অপূর্ব সব অভিজ্ঞতার বিষয় শ্রবণ করে আমি তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ দিলাম।**

তার পরদিন পুনরায় তাঁদের বাড়িতে গেলাম। দেখা হলো তাঁদের দুই ছেলের সঙ্গে তিনকড়ি আর দু’কড়ি লাহিড়ী। মহাগুরুর দুই সন্তান দীর্ঘাকৃত, গৌড়বর্ণ, বলিষ্ঠ, ঘন শ্মশ্রুবিশিষ্ট, কণ্ঠস্বর কোমল আর বনিয়াদী ব্যবহারে স্বভাবসিদ্ধ মাধুর্য। ঘন্টাকতক ধরে তাঁদের সঙ্গে ধর্মালোচনা চললো। ভারতের শ্রেষ্ঠ গৃহীযোগীর এই সাধুপ্রকৃতি পুত্রদ্বয় পিতার আদর্শ পদচিহ্ন অতি নিবিড়ভাবেই অনুসরণ করে চলতেন।

কাশীমণি দেবী যে লাহিড়ী মহাশয়ের একমাত্র শিষ্যা ছিলেন তা নয়; আরো শত শত শিষ্যা ছিলেন; আমার মা হচ্ছেন তাঁদের মধ্যে একজন। জনৈক মহিলাশিষ্যা মহাগুরুর কাছ থেকে একবার তাঁর একটি ফটোগ্রাফ চাইলেন। তিনি তাঁর হাতে ছবিখানি দিয়ে বললেন, তুমি যদি এটাকে রক্ষাকবচ বলে মনে করো, তবে তাই ই হবে; আর তা না হলে এটা কেবল ছবি হয়েই থাকবে।

দিনকতক পরে উক্ত স্ত্রীলোকটি আর লাহিড়ী মহাশয়ের পুত্রবধূ একদিন একটা টেবিলের উপর গীতা রেখে পড়ছিলেন। টেবিলটার পিছনেই সেই ফটোগ্রাফটি টাঙানো ছিল। হঠাৎ তখন প্রচন্ড জল ঝড় বজ্রপাত শুরু হয়ে গেল। ভয়ে স্ত্রীলোক দু’টি ছবির সামনে করজোড়ে বলতে লাগলেন, লাহিড়ী মহাশয় আমাদের রক্ষা করুন, আমাদের রক্ষা করুন। একটা বাজ এসে পড়ল তাঁরা যে বই পড়ছিলেন তার উপর; কিন্তু ভক্তদ্বয় অক্ষত দেহে রক্ষা পেয়ে গেলেন।

সেই শিষ্যাটি পরে বলেছিলেন, আমার মনে হল যেন একটা বরফের চাঁই আমায় চারিধারে ঘিরে রয়েছে, ওই বাজের আগুনে ঝলসে যাবার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য।

আভয়া নামের একটি শিষ্যার বেলাতেও লাহিড়ী মহাশয়কে দু’টি অলৌকিক ব্যাপার প্রদর্শন করতে হয়েছিল। আর তার স্বামী, কলকাতার একজন উকিল, গুরু দর্শনের জন্য একদিন কাশি যাত্রা করলেন। রাস্তায় খুব ভিড় থাকাতে ভাড়াটে গাড়ির পৌঁছতে দেরি হয়ে গেল। স্টেশনে ঢুকতে ঢুকতেই শুনতে পেলেন, কাশীর গাড়ি ছেড়ে যাবার বাঁশি দিচ্ছে।

এধারে অভয়া টিকিট ঘরের কাছে চুপচাপ দাঁড়িয়ে। মনে মনে নীরবে তার গভীর প্রার্থনা চলছে। লাহিড়ী মহাশয়, আপনার পায়ে পরি, গাড়িটা থামিয়ে দিন, থামিয়ে দিন! আপনার দর্শনলাভে আরও একদিন বিলম্ব হবে এ যে আমি কিছুতেই সইতে পারবো না।

ইঞ্জিনচালক,  গাড়ির যাত্রীরা তো সব ভয়েময়ে হুড়মুড় করে গাড়িতে ঢুকে পরলো; তারা জানতেও পারলো না কি করেই বা প্রথমে ট্রেনের গতি বন্ধ হয়েছিল, আর কি করেই বা তা ফের চলতে শুরু করল।

ব্যাস্! এধারে ট্রেনের চাকা ঘরঘর করে ঘুরেই চলেছে অথচ গাড়ি এক পাও আর এগোচ্ছে না। গাড়ির ইঞ্জিনচালক, আরোহীরা সবাই প্ল্যাটফর্মে নেমে পরলো, এই অদ্ভুত ব্যাপার সন্দর্শনের জন্যে। রেলের একজন সাহেব গার্ড, অভয়া আর তাঁর স্বামীর কাছে এসে দাঁড়ালো, আর যা কখনো করে না তাই সে করে বসলো বললো,  বাবু! আমায় টাকা দিন; আমি আপনাদের টিকিট কিনে এনে দিচ্ছি। আপনারা ততক্ষণ গাড়িতে উঠে বসুন।

স্বামী-স্ত্রীর দু’জনে যেমনি গাড়িতে উঠে বসলো আর টিকিটও পেয়ে গেল, অমনি ট্রেনও ধীরগতিতে চলতে শুরু করলো! ইঞ্জিনচালক,  গাড়ির যাত্রীরা তো সব ভয়েময়ে হুড়মুড় করে গাড়িতে ঢুকে পরলো; তারা জানতেও পারলো না কি করেই বা প্রথমে ট্রেনের গতি বন্ধ হয়েছিল, আর কি করেই বা তা ফের চলতে শুরু করল।

কাশীতে লাহিড়ী মহাশয়ের বাড়িতে পৌঁছে অভয়া তো নীরবে গুরুর সামনে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে পায়ের ধুলো নিতে গেল। লাহিড়ী মহাশয় বললেন, একটু স্থির হও অভয়া, একটু ঠাণ্ডা হও; তুমি আমায় কি জ্বালাতনটাই না করো, বলো দেখি! যেন এরপরের ট্রেনটায় আর আমার এখানে আসতে পারতে না!

আরেকটি ব্যাপারে লাহিড়ী মহাশয়ের কাছে উক্ত শিষ্যা গিয়ে ধরা পড়েছিল, সেটিও একটি স্মরণীয় ঘটনা। এবার তার আবেদন আর ট্রেনের জন্য নয় এবার তার সন্তানের জন্যে। অভয়া তো যথারীতি গুরুদেবের পাদবন্দনা করে তারপর তার অন্তরের বাসনা জানালো, গুরুদেব! এবার আমার নবম সন্তানটি যেন বেঁচে থাকে। আমার আটটি সন্তান হলো; কিন্তু সবকটিই জন্মাবার পরই মারা গেছে একটিও আর বেঁচে নেই।

অভয়া! দেখ দেখ, আলোটা এবার নিভলো বলে। ধাইটা দৌঁড়ে তেল এনে ভর্তি করে দিল যেই। সেই আলোটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল, অমনি গুরুদেব অদৃশ্য হয়ে গেলেন। দরজা বন্ধ হয়ে গেল আর খিলও পরেঁ গেল, কিন্তু কে যে দিয়ে দিল তা চোখে দেখা গেল না।

মধুর হাসিতে প্রসন্নবদন গুরুদেব বললেন, এবার তোমার সন্তানটি নিশ্চয়ই বাঁচবে, দেখো। আমার উপদেশগুলো বেশ করে মন দিয়ে শোনো। এবার তোমার একটি কন্যা সন্তান হবে, রাত্রিতেই ভূমিষ্ঠ হবে। শুধু এইটুকু নজর রেখো যেন পিদিমটা ভোর অবধি জ্বলতে থাকে কিছুতেই যেন নিভে না যায়। ঘুমিয়ে পোড়ো না যেন, তাহলেই পিদিমটা নিভে যাবে।

অভয়া একটি কন্যা সন্তান প্রসব করলো। রাত্রেই ভূমিষ্ঠ হল সর্বদর্শী গুরু যেমনটি বলে দিয়েছিলেন, ঠিক তেমনি। প্রসূতি ধাইকে প্রদীপটা তেলে ভর্তি করে রাখতে বলেছিলেন। স্ত্রীলোক দু’টি সারারাত জেগে শেষরাত অবধি পাহারা দিয়ে দিলে বটে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা ঘুমিয়েই পরল। এধারে প্রদীপের তেল প্রায় ফুরিয়ে এসেছে; আলোটা ক্ষীণ হয়ে গিয়ে ‘দপদপ’ করছে!

আঁতুড় ঘরের দরজার খিলটা ঘটাং করে খুলে গিয়ে দরজার পাল্লা দুটো ঝনঝন করে দু’ধারে খুলে গেল। স্ত্রীলোক দু’টি ধড়মড়িয়ে জেগে উঠে আশ্চর্য হয়ে দেখে যে লাহিড়ী মহাশয় সামনে দাঁড়িয়ে; প্রদীপটা দেখিয়ে দিয়ে লাহিড়ী মহাশয় বললেন, অভয়া!

দেখ দেখ, আলোটা এবার নিভলো বলে। ধাইটা দৌঁড়ে তেল এনে ভর্তি করে দিল যেই। সেই আলোটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল, অমনি গুরুদেব অদৃশ্য হয়ে গেলেন। দরজা বন্ধ হয়ে গেল আর খিলও পরেঁ গেল, কিন্তু কে যে দিয়ে দিল তা চোখে দেখা গেল না।

অভয়ের নবম সন্তানটি বেঁচে গেল; ১৯৩৫ সালে আমি খবর নিয়েছিলাম, কন্যাটি এখনো জীবিত।

………………………..
সূত্র:
যোগী-কথামৃত (Autobiography of a Yogi)

**শ্রী শ্রী পরমহংস যোগানন্দ বিরচিত পূজনীয় ও পরমারাধ্য আমার গুরুদেব শ্রী শ্রী স্বামী শ্রীযুক্তেশ্বর গিরি মহারাজের শ্রীকরকমলে অর্পিত।
**মৎপ্রণীত ইংরাজী ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ্ এ যোগী’র বঙ্গানুবাদে শ্রীমান ইন্দ্রনাথ শেঠের স্বেচ্ছা প্রণোদিত প্রয়াস ও অক্লান্ত প্রচেষ্টার জন্য আমি তাকে ধন্যবাদ ও আশির্বাদ জানাই। -শ্রী শ্রীপরমহংস যোগানন্দ

………………….
পুনপ্রচারে বিনীত: প্রণয় সেন

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

……………………..
আরো পড়ুন:
মা সারদা দেবী
প্রজ্ঞাপারমিতা শ্রীশ্রীমা সারদা
বহুরূপিনী বিশ্বজননী সারদামণি
মা মনোমোহিনী
শ্রীরামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে সপ্তসাধিকা
মাতৃময়ী তিনরূপ
মা আনন্দময়ী
আনন্দময়ী মায়ের কথা
ভারত উপাসিকা নিবেদিতা
রাসমণি
নিরাহারা যোগিনী মায়ের সন্ধানে
পূণ্যশীলা মাতা কাশীমণি দেবীর সাক্ষাৎকার
আনন্দময়ী মা
মা মারিয়াম :: পর্ব-১
মা মারিয়াম :: পর্ব-২
মা মারিয়াম :: পর্ব-৩
মা মারিয়াম :: পর্ব-৪
মীরার কথা
অলৌকিক চরিত্র মাদার তেরেসা
মা আনন্দময়ীর কথা
বৈষ্ণব সাধিকা যশোদা মাঈ
আম্মার সঙ্গলাভ
শ্রীশ্রী সাধিকা মাতা
জগৎ জননী ফাতেমা-১
জগৎ জননী ফাতেমা-২
জগৎ জননী ফাতেমা-৩
জগৎ জননী ফাতেমা-৪
জগৎ জননী ফাতেমা-৫
জগৎ জননী ফাতেমা-৬
জগৎ জননী ফাতেমা-৭
জগৎ জননী ফাতেমা-৮
জগৎ জননী ফাতেমা-৯
জগৎ জননী ফাতেমা-১০
জগৎ জননী ফাতেমা-১১
জগৎ জননী ফাতেমা-১২

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!