ভারত উপাসিকা নিবেদিতা

যে নিবেদিতা ভারতে প্রথম এসেছিলেন, সেই নিবেদিতা ইংল্যান্ডে বক্তৃতা দিতে গিয়ে, বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থায় পড়ে, মানুষের সাথে ভাব বিনিময়ের ফলে, নিভৃতে চিন্তাভাবনার পরে নিজের ও অন্যের মতের বিশ্লেষণ করার প্রতিক্রিয়া স্বরূপ – অন্য নিবেদিতা হয়ে উঠেছিলেন।

তবুও আশা করতেন, এই দুই প্রাচ্য পাশ্চাত্যের সমস্ত বৈরিতার সমাধান ঘটবে ও তাদের মিলন হবে। পরে বুঝেছিলেন- এ অসম্ভব। নিবেদিতার ভারতের প্রতি ঐকান্তিক শ্রদ্ধা-প্রীতি আর একাত্মবোধের মূলে ছিলেন স্বামীজি, তাঁর গুরুদেব। স্বামীজির চোখেই তিনি ভারতকে দেখে ছিলেন।

প্রথম ভারতে এসে, প্রকৃতপক্ষে এই দেশ সম্বন্ধে তাঁর কোন অভিজ্ঞতা ছিল না। চিন্তারও প্রয়োজন হয়নি। ভারতবর্ষকে সেবা করার মূলে ছিল, গুরুদেব স্বামীজির আদর্শ আর গুরুর প্রতি অসীম শ্রদ্ধা। ভারতের প্রতি ব্রিটিশদের কদর্য ব্যবহার আর নিষ্ঠুরতা দেখে তিনি কষ্ট পেতেন। তিনি জানতেন ভারতের সঙ্গে পাশ্চাত্যের কত তফাৎ, তবুও আশা করতেন, এই দুই প্রাচ্য পাশ্চাত্যের সমস্ত বৈরিতার সমাধান ঘটবে ও তাদের মিলন হবে।

পরে বুঝেছিলেন- এ অসম্ভব। নিবেদিতার ভারতের প্রতি ঐকান্তিক শ্রদ্ধা-প্রীতি আর একাত্মবোধের মূলে ছিলেন স্বামীজি, তাঁর গুরুদেব। স্বামীজির চোখেই তিনি ভারতকে দেখে ছিলেন। আমেরিকায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে সেখানের অনেক ভ্রান্ত আর অদ্ভুদ ধ্যানধারণা, হীন মনোভাবগুলো তাঁকে কষ্ট দিয়েছিল।

ব্রিটিশরা শাসক জাতি, তাই তারা অবজ্ঞা করতে পারে, কিন্তু অন্য পাশ্চাত্য দেশগুলির অবজ্ঞার কারন ছিল – শুধুই ভারতের পরাধীনতা। যে দেশ পরাধীন, তার কোথাও সম্মান নেই।

“দেশীয় সরকার যদি বিজ্ঞানের কাজের ভার নেয়, তা হলে খুব ভালো হয়। কিন্তু তা করার মতো উদার হৃদয় ইংরেজদের নেই।”

শ্রীযুক্ত বিপিনচন্দ্র পাল যখন আমেরিকায় বক্তৃতা দিতে গিয়েছিলেন, তখন একজন এই কথাই বলেছিল- “আগে তোমরা স্বাধীন হও, তারপর এদেশে এসে তোমাদের ধর্ম, দর্শন সম্বন্ধে বক্তৃতা দিও। তখন আমরা শুনব।” নিবেদিতা এবং স্বামীজিও এইরকম অপ্রস্তুত অবস্থায় নিশ্চয় পড়েছিলেন। ক্রমে, ভারতের পরাধীনতার সম্বন্ধে উত্তরোত্তর অভিজ্ঞতা লাভের প্রতিক্রিয়ার ফল হল – নিবেদিতার রূপান্তরকরণ।

এতদিন তিনি স্বামীজির আশ্রয়ে, স্বামীজির আদর্শে, স্বামীজির দেখানো পথে চলছিলেন ; কিন্তু ইংল্যান্ডে এসে, স্বামীজির ছত্রছায়া ছাড়া একাকী, নিবেদিতার ব্যক্তিসত্তা ক্রমশই অভিব্যক্ত হয়ে ওঠে, নানা ঘটনার মধ্যে দিয়ে তিনি ভারতকে গভীরভাবে চিনতে ও জানতে শেখেন। ডঃ বসুর ক্ষেত্রে, তিনি খুব ব্যথিত হয়ে ছিলেন।

পরাধীন দেশের বৈজ্ঞানিককে বিজ্ঞান -প্রতিভা বিকাশের কাজে সুযোগ দেওয়া তো দূরের কথা, পদে পদে নানা বাধার চেষ্টা করে তাকে অসহিষ্ণু করে তোলে শাসকদল। এর ফলে বৈদেশিক শাসনের ভয়াবহ রূপ তাঁর কাছে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। গভীর দুঃখের সঙ্গে তিনি লিখেছিলেন – ” দেশীয় সরকার যদি বিজ্ঞানের কাজের ভার নেয়, তা হলে খুব ভালো হয়। কিন্তু তা করার মতো উদার হৃদয় ইংরেজদের নেই।”

তাদের একটুও আত্মমর্যাদা বোধ নেই, নিজেই নিজেকে ধিক্কার দেন। জামসেদজী টাটার বিশ্ববিদ্যালয় পরিকল্পনায় অবধি ইংরেজ সরকারের উদাসীন মনোবৃত্তি । এইসব শাসকশ্রেণীর বিভিন্ন অনৈতিক, অবিবেচক ব্যবহারে, ভারতকে অবদমিত করে রাখার চেষ্টাতে – নিবেদিতার আইরিশ রক্ত রাগে টগবগ করে ফুটতে থাকে।

এর আগে ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্বন্ধে আলোচনা করার সুযোগ নিবেদিতার হয়নি। এখন বিভিন্ন লোকের সঙ্গে মিশে দেখলেন, ভারতের প্রতি খুব কম ব্যক্তি সহানুভূতি পোষণ করেন। অধিকাংশ হল ভারত-বিরুদ্ধ। যারা সহানুভূতিসম্পন্ন, তাদের কাছে জানতে পারলেন – কিভাবে ভারতের জনগণ রাষ্ট্রচেতনা লাভ করেছে।

বিশেষ করে রমেশচন্দ্র দত্তের কাছে তিনি ভারতের আর্থিক, সামাজিক অবস্থা আর রাজনৈতিক দলের মনোভাব জানার সুযোগ পেলেন। অন্যদিকে বিরুদ্ধ মিশনারিদের অপপ্রচার তাকে ক্রদ্ধ সিংহিনীর মতো ক্ষিপ্ত করে তুলল। ভারতীয় ছাত্রদের মধ্যে যখন দেখেন- তাদের একটুও আত্মমর্যাদা বোধ নেই, নিজেই নিজেকে ধিক্কার দেন।

জামসেদজী টাটার বিশ্ববিদ্যালয় পরিকল্পনায় অবধি ইংরেজ সরকারের উদাসীন মনোবৃত্তি । এইসব শাসকশ্রেণীর বিভিন্ন অনৈতিক, অবিবেচক ব্যবহারে, ভারতকে অবদমিত করে রাখার চেষ্টাতে – নিবেদিতার আইরিশ রক্ত রাগে টগবগ করে ফুটতে থাকে। এর ফলে তাঁর মনেপ্রানে এক বিপুল পরিবর্তন আসে। তিনি ছিলেন তো অগ্নিশিখাই, হয়ে উঠলেন বজ্রের মতো কঠিন, শাণিত তলোয়ারের মতো উদ্যত বিদ্রোহিণী ; বাস্তবিক অর্থেই স্বামীজির প্রিয় সিংহিনী।

………………….
পুনপ্রচারে বিনীত: প্রণয় সেন

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

……………………..
আরো পড়ুন:
মা সারদা দেবী
প্রজ্ঞাপারমিতা শ্রীশ্রীমা সারদা
বহুরূপিনী বিশ্বজননী সারদামণি
মা মনোমোহিনী
শ্রীরামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে সপ্তসাধিকা
মাতৃময়ী তিনরূপ
মা আনন্দময়ী
আনন্দময়ী মায়ের কথা
ভারত উপাসিকা নিবেদিতা
রাসমণি
নিরাহারা যোগিনী মায়ের সন্ধানে
পূণ্যশীলা মাতা কাশীমণি দেবীর সাক্ষাৎকার
আনন্দময়ী মা
মা মারিয়াম :: পর্ব-১
মা মারিয়াম :: পর্ব-২
মা মারিয়াম :: পর্ব-৩
মা মারিয়াম :: পর্ব-৪
মীরার কথা
অলৌকিক চরিত্র মাদার তেরেসা
মা আনন্দময়ীর কথা
বৈষ্ণব সাধিকা যশোদা মাঈ
আম্মার সঙ্গলাভ
শ্রীশ্রী সাধিকা মাতা
জগৎ জননী ফাতেমা-১
জগৎ জননী ফাতেমা-২
জগৎ জননী ফাতেমা-৩
জগৎ জননী ফাতেমা-৪
জগৎ জননী ফাতেমা-৫
জগৎ জননী ফাতেমা-৬
জগৎ জননী ফাতেমা-৭
জগৎ জননী ফাতেমা-৮
জগৎ জননী ফাতেমা-৯
জগৎ জননী ফাতেমা-১০
জগৎ জননী ফাতেমা-১১
জগৎ জননী ফাতেমা-১২

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!