আর কি হবে এমন জনম বসবো সাধুর মেলে

-জহির আহমেদ

মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজি: বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মরমী জগতের পথিকৃৎ ও প্রাণপুরুষ
হাজার বছরের বাংলার ধর্মীয় ইতিহাস সুফিবাদ, সহজিয়া মতবাদ ও বাউল-ফকিরদের ইতিহাস। এই প্রাণের বাংলায়- গানের বাংলায় যুগে যুগে ছিল উদার-অসাম্প্রদায়িক মানুষের বাস। এদেশ চিরকালই ফকির-দরবেশ ও মুনি-ঋষি-আওলিয়ার সাধন-ভজন ও এবাদত-বন্দেগীর চারণভূমি।

শাহজালাল, শাহপরান, গেছু দারাজ, মাইজভাণ্ডারী, বায়েজিদ বোস্তামি, আমানত শাহ, লালন সাঁইজি, হাসন রাজা, জালাল উদ্দিন, নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, শ্রীচৈতন্য, লোকনাথ, রামকৃষ্ণ, রাধারমণ, রামপ্রসাদ, অনুকূল চন্দ্র, বিবেকানন্দ, মনোমোহন, বিজয় সরকার প্রমুখ মহাপুরুষগণ বাঙালির বিশ্বাস-ভক্তির প্রাণপুরুষ।

বর্তমান বিশ্বজুড়ে সাম্প্রদায়িক উগ্রতার বিষবাষ্পের মধ্যে তারা আমাদের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক মানবপ্রেম তথা মানবধর্মকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।

ফকির লালন সাঁইজি বাঙালির অসাম্প্রদায়িক ও মরমী চেতনার প্রাণ পুরুষ। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান, আমির-ফকির ও আশরাফ-আতরাফ নামক সাম্প্রদায় ও জাতি-বর্ণের বিভাজনমুক্ত একটি অনুপম মানব সমাজের কথা লালনের মতো হৃদয় নিংড়ানো ভাষায় আর কে বলেছেন-

এমন মানব সমাজ কবে গো সৃজন হবে।
যেদিন হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান
জাতি গোত্র নাহি রবে।।

শোনায়ে লোভের ও বুলি
নেবে না কাঁধের ঝুলি,
ইতর আতরাফ ও বলি
দূরে ঠেলে নাহি দেবে।।

আমির ফকির হয়ে এক ঠাঁই
সবার পাওনা পাবে সবাই,
আশরাফ বলিয়া রেহাই
ভবে কেহ নাহি পাবে।।

ধর্ম কুল গোত্র জাতি
তুলবে না গো কেহ জিকির,
কেঁদে বলে লালন ফকির
কেবা দেখায়ে দেবে।।

আধ্যাত্মিক তত্ত্ব ও সংগীত পিপাসু মানুষের কাছে লালনের নাম কিংবদন্তি হয়ে আছে। ভারতবর্ষে প্রথম তাঁকেই মহাত্মা উপাধি দেয়া হয়েছিল; গান্ধীরও পঁচিশ বছর আগে। লালন সাঁইজি উনিশ শতকের বাউল গানের আদি রচয়িতাদের একজন এবং ফকিরকূল শিরোমণি। তিনি ধর্মগুরু, দার্শনিক ও সমাজ সংস্কারক।

লালনের জন্ম-ইতিহাস আজো রহস্যঘেরা। তিনি হিন্দু ছিলেন, না মুসলমান ছিলেন? বাউল ছিলেন, না ফকির ছিলেন? -এসব নিয়ে রয়েছে মতভেদ। লালন ছিলেন এসব মতভেদের ঊর্ধ্বে। আত্মতত্ত্ব ও পরমতত্ত্ব সম্পর্কে তিনি গভীর জ্ঞান অর্জন করেছিলেন।

তিনি ধর্মমত নির্বিশেষে সকল মানুষ নিয়ে একটি উদার অসাম্প্রদায়িক জীবন যাপন করেছেন এবং গুরু বা মুর্শিদরূপে এক আল্লাহ বা পরমেশ্বরের ভজনা করছেন। বলেছেন-

যে মুর্শিদ সেইতো রসুল
তাহাতে নাই কোন ভুল খোদাও সে হয়,
লালন বলে নাই এ কথা কোরানে কয়
সে কথা কোরানে কয়।।
পারে কে যাবি নবীর নৌকাতে আয়।

এই লালন’ই আবার নদীয়ার গৌরাঙ্গের মধ্যে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে দেখে বলেন-

ঐ গোরা কি শুধুই গোরা ওগো নাগরী।
দেখ দেখ চেয়ে দেখ কেমন রূপছিরি।।
শ্যাম অঙ্গে গৌরাঙ্গ মাখা
নয়ন দুটি আঁকা-বাঁকা,
মন বুঝে দিচ্ছে দেখা
ঐ ব্রজের বংশীধারী।।

শোনা যায়- লালন নিরক্ষর ছিলেন। কিন্তু তার গানের ভাষা, শব্দ চয়ন, তত্ত্ব ও ভাব বিশ্লেষণ করলে আশ্চর্য হতে হয়। সেগুলো অশিক্ষিত কোন রচয়িতার গানের মত নয় বরং মনে হয় স্রষ্টার কৃপা ও গভীর উপলব্ধিজাত। বাউল ও ফকিরি মতবাদের মানুষের কাছে লালন ‘সাঁই’ হিসেবে মান্য এবং তার গান ‘সাঁইজির কালাম’ হিসেবে সমাদৃত।

তারা বিশ্বাস করেন- এসব অমূল্য বাণী কোন সাধারণ মানুষের লেখা নয়; বরং সাধক লালনের ভাবনা ও মগ্নতার উচ্চদেশ থেকে অবতীর্ণ। তিনি গানের মাধ্যমে প্রেম, ভক্তি ও তত্ত্বসুধা পান করেছেন ও ভক্তদের মাঝে বিলিয়েছেন। মনে গানের ভাব জাগলে সাঁইজি ভক্তদের ডেকে বলতেন,

‘ওরে! তোরা কে কোথায় আছিস, আমার পোনা মাছের ঝাঁকেরা এসেছে।’

তিনি একের পর এক গান গাইতেন, আর ভক্তরা সেগুলো লিখে রাখতো। আজও লালনের গানের সুর ও বাণীর যাদুশক্তিতে লক্ষ-কোটি ভক্তশ্রোতা তত্ত্বজ্ঞানে মুগ্ধ ও ভক্তিরসে আপ্লুত হয়। ধর্মীয় ও সামাজিক কুসংস্কার ও সাম্প্রদায়িকতার বিষয়গুলোও তার গানে উঠে এসেছে।

চিরদিন পোষলাম এক অচিন পাখি, ও যার আপন খবর, আপনার হয় না, বড় সংকটে পড়িয়া দয়াল, সময় গেলে সাধন হবে না, জাত গেল জাত গেল বলে, এসব দেখি কানার হাট বাজার, আমি অপার হয়ে বসে আছি, বলি মা তোর চরণ ধরে, তিন পাগলের হলো মেলা, খাঁচার ভিতর অচিন পাখি, বাড়ির কাছে আরশিনগর, পাড়ে কে যাবি নবীর নৌকাতে আয়, ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার, কে বানাইলো এমন রং মহলখানা, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি , সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন,মিলন হবে কত দিনে-

আত্মতত্ত্ব-পরমতত্ত্ব, ভক্তিরস ও দার্শনিকতায় সমৃদ্ধ, ধর্মীয় ও সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সোচ্চার এমন অসংখ্য জনপ্রিয় গানের রচয়িতা বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইজি।

লালন ছিলেন ওহেদানিয়াতে বিশ্বাসী বা একেশ্বরবাদী। তিনি সাকারে নিরাকার বা মানুষরুপেই আল্লাহ বা ঈশ্বরকে ভেবেছেন। রাসুল বা অবতারগণ ধর্মের শরীয়তের আইন প্রনেতা ও প্রচারক, কিন্তু নেপথ্যে এক আল্লাহ বা পরমেশ্বরই।

মুখে পড় রে সদায় লা ইলাহা ইল্লাল্লা।
আইন ভেজিলেন রাসূলউল্লা।।

নামের সহিত রূপও
ধিয়ানে রাখিয়া জপ,
বে নিশানায় যদি ডাক
চিনবি কিরূপ কে আল্লা।।

লা শরীক জানিয়া তাকে
পড় কালাম দেলে মুখে,
মুক্তি পাবি থাকবি সুখে
দেখবি রে নূর তাজেল্লা।।

লা ইলাহা নফি সে হয়
ইল্লাল্লা সেই দীন দয়াময়,
নফি এজবাত যাহারে কয়
সেহি তো এবাদত উল্লা।।

বলেছে সাঁই আল্লা নূরী
এই জেকেরের দরজা ভারি,
সিরাজ সাঁই তাই কয় পুকারি
শোন রে লালন বেলিল্লা।।

মানুষের দেহ যেন একটি খাঁচা, আর প্রাণরুপ পরমেশ্বর হলেন সে খাঁচার পাখি। দেহ খাঁচার ভিতরে প্রাণপাখি দিনে চব্বিশ হাজার ছয়শ বার আসা-যাওয়া করে। কিন্তু সে অচিন পাখিকে ধরা যায় না, চিনা যায় না। তবু পায়ে মনবেরি পরিয়ে চিরদিনের অচিন পাখিকে লালন আপন করতে চায়।

খাঁচার ভিতর অচিন পাখি
ক’মনে আসে যায়,
ধরতে পারলে মনবেড়ি
দিতাম পাখির পায়।।

পিতার ‘হাড়-রগ-মণি-মগজ’ ও মাতার ‘গোস্ত-পোস্ত-লোম-খুন’- এই আট বস্তুতে মানবদেহ গঠিত। এই হলো আট কুঠুরি।

দুই চোখ, দুই কান, দুই নাক, মুখ বিবর, লিঙ্গ ও গুহ্য- এই হলো দেহের নয় দরজা। আর মস্তিষ্ক হলো মানুষের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সদরকোঠা। এখানেই আছে সাধকের আরশিনগর বা আয়নামহল। এ মহলেই হয় আত্মা ও পরমাত্মা দর্শন।

আট কুঠুরী নয় দরজা আঁটা
মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাঁটা,
তার উপরে সদর কোঠা
আয়নামহল তায়।।

কিন্তু বেভুলা মানুষের মন একদিন ধ্বংস হবে জেনেও মাটির খাঁচার আকর্ষণেই পড়ে থাকে, অচিন পাখিকে চিনতে চায় না। তাই ফকির লালনের আক্ষেপ-

মন তুই রইলি খাঁচার আশে
খাঁচা যে তোর কাঁচা বাঁশে,
কোন দিন খাঁচা পড়বে খসে
ফকির লালন কেঁদে কয়।।

মানুষ অন্তরে যা ধারণ করে, ভাষায় প্রকাশ করে, ও কর্মে প্রমাণ করে, তাই তার ধর্ম। নাম যা-ই হোক, মানব ধর্ম, প্রেমধর্ম বা শান্তির ধর্মই হলো সত্যধর্ম। অনাদি-অনন্ত-অখণ্ড-অব্যয়-অজ্ঞেয় পরম সত্ত্বার প্রতি বিশ্বাস, আত্মতত্ত্ব ও পরমতত্ত্ব সম্পর্কে জানা, সত্য ও সুপথে চলে সৃষ্টিজগতে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ধর্মের মূল বিষয়। ফকির লালন বলেন-

সত্য বল, সুপথে চল
ওরে আমার মন,
সত্য সুপথ না চিনিলে
পাবিনা মানুষের দরশন।।

নবী, রাসুল, অবতার, আউলিয়াগণ মানুষে-মানুষে কোন বিভেদ করেন না। অথচ ধর্মের নামেই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি অধর্ম হয়। অথচ পবিত্র কোরআনে ঘোষিত হয়েছে-

“নিশ্চয়ই এই মানবজাতি এক জাতি। আর আমি তোমাদের রব। তাই আমারই উপাসানা কর। এবং মানুষ তাদের কার্যকলাপ দ্বারা পারস্পরিক বিষয়ে মতভেদ সৃষ্টি করে। নিশ্চয়ই আল্লাহর দিকে প্রত্যেকের প্রত্যাবর্তন।”

এক একেশ্বরের সৃষ্টি সারাজাহান ও কুল মাখলুকাত। কিন্তু সীমাবদ্ধ জ্ঞানীরা মানুষের মধ্যে ধর্মবর্ণের বিভিন্ন বিভাজন সৃষ্টি করে রাখে। লালনের ব্যক্তিগত জাতিধর্ম নিয়ে প্রশ্ন উঠত। এ বিষয়ে তিনি গানে বলেছেন-

সবে বলে লালন ফকির
কোন্ জাতের ছেলে,
কারে বা কী বলি আমি
দিশে না মেলে।।

শ্বেতদণ্ড জরায়ু ধরে
এক একেশ্বর সৃষ্টি করে,
আগমনিগুম চরাচরে
তাই তো জাত ভিন্ন বলে।।

জাত বলিতে কী হয় বিধান
হিন্দু যবন বৌদ্ধ খ্রিস্টান,
জাতের আছে কিবা প্রমাণ
শাস্ত্র খুঁজিলে।।

মানুষের নাই জাতের বিচার
এক এক দেশে এক এক আচার,
লালন বলে জাত ব্যবহার
গিয়াছি ভুলে।।

বেশধারী, আচারসর্বস্ব, লোভী ও স্বার্থবাদীরা নিজের ধর্মমতকেই একমাত্র সত্য ও অন্যান্য সকল ধর্মকে বাতিল মনে করে। তারা সবসময়ই নিজ ধর্ম ও মতের প্রশংসা ও পরধর্ম ও মতের নিন্দা-কুৎসা ছড়ায়। সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় বক্তাদের দম্ভ, আস্ফালন ও অন্যের ধর্মমতের বিরুদ্ধে কুৎসা শুনতে শুনতে মানুষ ধর্মের নামে অন্ধ ও অহংকারী হয়ে উঠে। কিন্তু সত্যিকারের ধার্মিক কখনো পরধর্মের নিন্দা করেন না। আল্লাহ বলেছেন-

“নিশ্চয়ই মুসলমান, ইহুদী, নাসারা (খ্রীস্টান) ও সাবেঈন, তাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি ও শেষ দিবসের প্রতি এবং সৎকাজ করে, তাদের জন্য রয়েছে সওয়াব তাদের পালনকর্তার কাছে। আর তাদের কোনই ভয়-ভীতি নেই, তারা দুঃখিতও হবে না।”

মহামানবগণ চিরকালই মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক হয়ে থাকেন। ফকির লালন সাঁইজি বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অসাম্প্রদায়িক মানুষ। লালনের একটি জনপ্রিয় গানে আছে-

সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে।
লালন বলে জাতের কী রূপ
দেখলাম না এ নজরে।।

সুন্নত দিলে কয় মুসলমান
নারীর তবে কী হয় বিধান,
বামুন চিনি পৈতেয় প্রমাণ
বামুনী চিনি কী করে?

(চলবে…)

………………………..
আরো পড়ুন:
মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজি: এক
মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজি: দুই
মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজি: তিন


লালন ফকিরের নববিধান: এক
লালন ফকিরের নববিধান: দুই

লালন ফকিরের নববিধান: তিন

লালন সাঁইজির খোঁজে: এক
লালন সাঁইজির খোঁজে: দুই


মহাত্মা লালন সাঁইজির দোলপূর্ণিমা
মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজির স্মরণে বিশ্ব লালন দিবস
লালন গানের বাজার বেড়েছে গুরুবাদ গুরুত্ব পায়নি
লালন আখড়ায় মেলা নয় হোক সাধুসঙ্গ
কে বলে রে আমি আমি
ফকির লালন সাঁই
ফকির লালনের ফকিরি
ফকির লালন সাঁই


বিশ্ববাঙালি লালন শাহ্
ফকির লালন সাঁইজির শ্রীরূপ
গুরুপূর্ণিমা ও ফকির লালন
বিকৃত হচ্ছে লালনের বাণী?

লালন অক্ষ কিংবা দ্রাঘিমা বিচ্ছিন্ন এক নক্ষত্র

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!