ভবঘুরে কথা
মা মারিয়াম

-মাসফিক মাহমুদ

মারিয়ামকে জেরুজালেমের গির্জার সেবাদানকারী হিসেবে প্রবেশের অনুমতি প্রদান করায় সিদ্দিকিয়া ও অন্যান্য পাদ্রীরা হতভম্ব হয়ে গেল। সভায় সিন্ধান্তের পর যাকারিয়্যা মারিয়ামের জন্য গির্জার এক কোনে আলাদা কক্ষ নির্মাণের জন্য কিশোর ইউসুফকে (মারিয়ামের চাচাতো ভাই) সাথে নিয়ে শুরু করে দেন। কাজের শুরুর এক পর্যায়ে দাউদ (গির্জার এক পাদ্রী) যাকারিয়্যাকে জানালেন তিনিও মারিয়ামের কুঁড়ে ঘর নির্মাণে সাহায্য করতে চান। এতে যাকারিয়্যা অবাক হয়ে বললেন, এতে তোমার পাদ্রীর সম্মান থাকবে? দাউদ বললেন, আমার পাদ্রীর সম্মানতো আপনার পায়ের নিচে।

মারিয়ামের কুঁড়ে ঘর নির্মাণকাজ দেখে দুষ্ট দুই পাদ্রী ইয়াসাকারকে বলে যাকারিয়্যা গির্জা পারিবর্তন করে ফেলছে। অন্যদিকে কে মারিয়ামের ওস্তাদ হবে তা নিয়ে পাদ্রীদের মাঝে বাকবিতণ্ডা তৈরি হয়। এক পর্যায়ে ইয়াসাকার বলেন, এটা গুরুত্বপূর্ণ নয় মারিয়ামের অভিভাবক/ওস্তাদ কে হবে, গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, এমন কিছু করতে হবে যেন যাকারিয়্যা তার দায়িত্ব গ্রহণ করতে না পারে।

পাদ্রীরা যখন ব্যস্ত কে মারিয়ামের অভিভাবক হবে, তখন যাকারিয়্যা হিলালের সভাপতিত্বে ও অন্যান্য পাদ্রীদের সামনে চারটি দলিল পেশ করে মারিয়ামের অভিভাবকত্ব গ্রহণের জন্য-

এক: সে তার গৃহে লালিত হয়েছে।
দুই: সে তার সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ।
তিন: তার মা তাঁর নিকট শিশুটির দায়িত্ব দিয়েছে।
চার: এই ‍মুক্তার মূল্য তার থেকে কেউ বেশি জানে না।

আজ যদি ইমরাম জীবিত থাকত, তবে সে নিজেই এ বিষয়ের সিন্ধান্ত নিতে পারত, আফসোস।

তর্ক-বিতর্কের এক পর্যায়ে হিলাল বললেন, লটারীর মাধ্যমে সিন্ধান্ত হোক মারিয়ামের দায়িত্ব কে নেবে। লটারীর দিন হিলালসহ পাদ্রীরা বাইতুল মুকাদ্দাসের পাশ দিয়ে বয়ে চলা জর্দান নদীর পাশে পৌঁছালে হিলাল জানান যে, সবাই সবার কলম জর্দান নদীতে নিক্ষেপ করবে এবং নদীর প্রবল শ্রোতে যার কলমটা বিপরীতে ভেসে থাকবে এবং ডুববে না, সেই মারিয়ামের লালন পালনের দায়িত্ব পাবে।

প্রত্যেকের কলম ডুবে গেলেও যাকারিয়্যার কলম ভেসে থাকায় হিলাল তাকে শুভকামনা জানায় এবং তাকে মারিয়ামের দায়িত্ব দেয়া হয়। এতে অন্যান্য পাদ্রীরা অসম্মতি জানালে বিরোধের মুখে পর পর তিন বার লটারী করা হয়, স্রষ্টার অসীম কৃপায় তিনবারই যাকারিয়্যার কলম ভেসে থাকে।

ওদিকে মারিয়ামের মা হান্না চিন্তিত হয়ে পরেন যে মারিয়ামের গর্ভে কি সত্যি ঈশা মসীহ আসবেন? কিন্তু সে এ কথা যাকারিয়্যাকে কিভাবে জিজ্ঞাসা করবেন তা ভেবে পান না। যাকারিয়্যা বিষয়টি লক্ষ্য করে হান্নাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‍তুমি চিন্তিত কেন? কিছু বলবে? হান্না তাকে তার মনের কথা বলার পাশাপাশি বললেন, যে দিন মারিয়ামের জন্ম হয়েছিল, সেদিন থেকেই সবার বরকত বৃদ্ধি পেয়েছে। গাভীদের দুগ্ধ বৃদ্ধি পেয়েছে, গোত্রে জমজ শিশুর জন্ম নিয়েছে, জমির শস্য বৃদ্ধি পেয়েছে। আর মারিয়ামের চোখ আমাকে এমন কিছু দেখায় যা বলে বোঝাতে পারব না! সে অবশ্যই একজন পবিত্র কন্যা, সে অবশ্যই ঈশা মসীহের মা হবেন!

এসব শুনে যাকারিয়্যা হান্নাকে বললেন, এসব কথা কাউকে বলো না। মারিয়ামের অসংখ্য শত্রু; এসব কথা তার বিপদের কারণ হতে পারে। সে তো গির্জার পাদ্রীদের সাথে একাকী জীবন অতিবাহিত করবে; তাই খুব সাবধান থাকতে হবে।

গির্জার দিকে যাওয়ার সময় শিশু মারিয়ামকে চিন্তিত দেখে যাকারিয়্যা জিজ্ঞাসা করলেন, কি হয়েছে মারিয়াম? আমি আমার খোদার ঘর দেখার জন্য খুব উদগ্রীব, তার পবিত্র ঘরের সেবা করতে পারব বলে খুশিও লাগছে, কিন্তু মাকে ছাড়া কিভাবে থাকব? শিশু মারিয়ামের একথা শুনে যাকারিয়্যা বললেন, শোন মারিয়াম! নিশ্চই অনেক বড় হেকমত এ কাজে লুকায়িত আছে। যে একা বেড়ে ওঠে সে ভালবাসা বিষয়ে অনেক জানে। আল্লাহ্ পাক সম্ভবত এতিমদের হৃদয় নিজের জন্য চান।

সে যেন শুধু আল্লাহর নৈকট্যই চায়। আমার মারিয়াম, তোমার হৃদয় তাঁর প্রেমে পূর্ণ করার জন্য প্রস্তুতি নাও, কারণ তিনি সদা মেহেরবান ও অধিক দায়িত্বশীল। আর শোন, গির্জার পাদ্রীদের থেকে দূরে থাকবে তারা এখনও কয়েকজন তোমার পিতার প্রতি দুশমনি রাখে। তারা সুযোগ পেলেই তোমার ক্ষতি করতে পারে, তাদের থেকে সাবধান থাকবে।

শিশু মারিয়াম বলেন, হে সৃষ্টিকর্তা! আমি আপনার সেবাদানকারী মারিয়াম, আমার মা থেকে বিচ্ছেদ হচ্ছি যাতে আপনার পবিত্র ঘরের সেবা করতে পারি। আমি এতিম, আমাকে কবুল করুন। আমাকে আর আমার মাকে এ বিচ্ছেদ সহ্য করার শক্তি দিন।

মারিয়াম যখন গির্জায় পৌঁছাল তখনও গির্জার পাদ্রীরা বিশ্বাস করতে পারছিল না যে, সত্যি সত্যি মারিয়াম গির্জার সেবাদানকারী হিসেবে এসে পরেছে। ইয়াসাকার মারিয়ামকে স্বাগতম জানিয়ে বলে, ভয় পেয়ো না। যাকারিয়্যা দ্রুত এগিয়ে এসে মারিয়ামকে বলে, এখানে তোমার প্রবেশ নিষেধ। এর নাম হচ্ছে আল কুদস। এটি পাদ্রীদের ইবাদতের স্থান। তোমার জন্য যে কুঁড়ে ঘর তৈরি করেছি, চল তোমাকে সেখানে নিয়ে যাই।

মারিয়ামে দিন কাটতে থাকে কুঁড়ে ঘরে। এক পাদ্রী তার শিষ্যদের পাঠদান করার সময় আঙ্গিনা পরিষ্কার করতে মারিয়াম সেখানে উপস্থিত হলে শিষ্যরা বলে, উস্তাদ মারিয়ামকে জিজ্ঞাসা করুন হালাল হারাম কি? পাদ্রী তাচ্ছিল্যভাবে জিজ্ঞাসা করে, তুমি বলতে পারবে হালাল হারাম কি? মারিয়াম বলে, যে প্রাণীর পায়ের খুরায় ফাটল আছে এবং একবার খেয়ে পুনরায় ফেরত নিয়ে আসতে পারে সেগুলো হালাল। শুধু উট ও খরগোশের খুরায় ফাটল নেই কিন্তু খেয়ে পুনরায় ফেরত আনতে পারে, তাই তা হালাল। শুকর হারাম কারণ, খুরায় ফাটল থাকা সত্ত্বেও খেয়ে ফেরত আনতে পারে না।

পাদ্রী অবাক হয়ে আবার জিজ্ঞাসা করে, কুরবানী সম্পর্কে বলতে পার? মারিয়াম বলে, কুরবানী আট প্রকার, যে মাংস পুড়িয়ে খাওয়া যায়, কারো সম্মুখে তার মঙ্গলের জন্য কুরবানী করা হয়, হাদিয়া, রেগে যায় যে প্রাণী, যে প্রাণী দেখতে উঁচু, কারো আরোগ্য লাভের জন্য, কারো ভুল শুধরানোর জন্য, গুনাহ্ মাফের জন্য কুরবানী করা হয়। প্রথম কুরবানীর ঘটনা ঘটেছিল হযরত হাবিল ও কাবিলের মধ্যে। হযরত ইব্রাহিম তার পুত্র ইসমাইলকে আল্লাহর নির্দেশে কুরবানী করতে নিয়ে যান, কিন্তু আল্লাহ্ খুশি হয়ে দুম্বা পাঠিয়ে দেন। যেন ইসমাইলের বদলে সেটিকে কুরবানী করা হয়। পাদ্রী হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞাসা করে, তুমি এতসব জানো কি করে? মারিয়াম জবাব দেয়, আমার চাচাজান যাকারিয়্যা আমাকে এ শিক্ষা দিয়েছেন।

গির্জায় মারিয়ামের উপর সকল কাজ চাপিয়ে দিয়ে কষ্ট দিচ্ছিল, এ নিয়ে যাকারিয়্যা অস্থির হয়ে উঠে। ইউসুফ (মারিয়ামের চাচাতো ভাই) মারিয়ামকে জিজ্ঞাসা করে, তুমি কি জান বাইতুল মুকাদ্দাসে কি রয়েছে? মারিয়াম জবাব দেয়, কিছুই নাই, ঐ অংশটি খালি রয়েছে। প্রাচীনকালে ঐ ঘরে হযরত মুসার লৌহফলক রাখা ছিল। শুধুমাত্র প্রতিটি গোষ্ঠির পুরহিতরা প্রবেশ করতে পারত। তাও আবার বছরে একবার। যেখানে সুগন্ধি জ্বালিয়ে দিবে যেন কোন দুর্গন্ধ না ছড়ায়; আমার চাচাজান যাকারিয়্যা আমাকে এ কথাগুলো বলেছেন।

যাকারিয়্যা বাইতুল মুকাদ্দাসে পৌঁছে মারিয়ামকে দেখে ব্যথিত হন, তিনি দেখেন মারিয়ামকে প্রহার করা হয়েছে। কেন প্রহার করা হয়েছে পাদ্রীদের কাছে জানতে চাইলে তারা বলে, এ জায়গা সব খাদেমদের জন্য সমান, যে কাজ করবে না তাকেই শাস্তি পেতে হবে। বিভিন্ন তর্কবিতর্কের পর যাকারিয়্যা সেই পাদ্রীকে বললেন, তোমার হৃদয়ের হিংসাগুলো কেন সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির উপর চাপিয়ে দিচ্ছ? আর হিলালকে অনুরোধ করে বলেন, মারিয়ামকে যেন বাইতুল মুকাদ্দাসের সব কাজ থেকে বিরত রাখা হয়।

যাকারিয়্যা ফিরে যাওয়ার সময় মারিয়ামকে বলে গেলেন, তিনি হিলালের সাথে কথা বলেছেন। তাকে আর কোন কাজ করতে হবে না। তুমি শুধু ইবাদত করে সময় পার করবে। ছোট্ট মারিয়াম জিজ্ঞাসা করল, ওরা কেন একে অন্যের সাথে বিবাদে জড়ায়? ওরা কেন আমাকে অপছন্দ করে? কেন মানুষ একে অপরকে ভালবাসছে না?

যাকারিয়্যা বলে, ওরা তোমার পিতা ইমরানকেও কষ্ট দিয়েছিল, কেননা সে পয়গম্বর ছিল। কিন্তু চাচাজান তারা যে ঈশা মসীহের আগমনের অপেক্ষায় আছে; ঈশা এসে মানুষের কাছে কি চাইবে? হযরত মুসার শরীয়তের কথাই মানুষ ঈশার মুখে শুনবে। মুসার শরীয়তের অনেক কথাই পরিবর্তন হয়ে গেছে, মুসার পরবর্তী সময়ে বনী ইসরাইলের ক্ষমতাবান লোকরা মুসার আইন কানুনকে নিজেদের সুবিধামত পরিবর্তন করে নিয়েছে।

ছোট্ট মারিয়াম রাতে মার কথা ভেবে মাঝেমাঝেই গির্জার আঙ্গিনায় বসে কাঁদত। আর ওদিকে মারিয়ামের মাও মেয়ের বিচ্ছেদের বিরহ সহ্য করতে না পেরে বাইতুল মুকাদ্দাসে এসে হাজির হন। গির্জার বাইরের নারীদের প্রার্থনার জায়গার এহেতেকাফে বসে থাকা এক নারী তাকে চিনতে পেরে, মারিয়ামকে ডাকতে চায়। কিন্তু হান্না তাকে নিষেধ করে বলে আমার সাথে দেখা হলে মারিয়ামের এখানে থাকা কষ্টকর হয়ে পরবে। হান্না আড়াল থেকেই মারিয়ামকে দেখে এবং তার গলার শব্দ শুনে ফিরে যাওয়ার সময় তিনি দুনিয়া ছেড়ে চলে যান।

যাকারিয়্যা ভেবে পাচ্ছিলেন না কিভাবে ছোট্ট মারিয়ামকে বলবেন তার মা এ দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে? মারিয়ামের সাথে তার যখন দেখা হলে মারিয়াম জানতে চাইলো, আমার মা কেন আসছে না? মা কি তার সন্তানকে ভুলে গেছে? তখন যাকারিয়্যার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পরতে লাগল, মারিয়াম বলল চাচাজান আপনি কেন কাঁদছেন?

যাকারিয়্যা বললেন, আমারও অনেক আমার মার কথা মনে পরছে। একদিন আমি জঙ্গলে কাঠ আনতে গিয়েছিলাম। হঠাৎ এক অদ্ভুত অস্থিরতা শুরু হল। ফিরে দেখলাম বাড়ির সামনে লোক ভিড় করে আছে। ঘরে ঢুকে দেখলাম মা একেবারে এক অন্যরকম ভাবে ঘুমিয়ে আছে। কোন সময় এমন দেখিনি, আমি কাছে যেয়ে তাকে চুমু দিলাম, জড়িয়ে ধরলাম, সে আর ঘুম থেকে উঠলেন না।

ছোট্ট মারিয়াম একথা শুনে বলল, এখন বুঝতে পেরেছি কেন তিনি আমাকে দেখতে আসেন নি। মারিয়াম দোয়া করলেন, হে রাব্বুল আলামিন, আপনি আমার মাকে আপনার মহব্বত ও রহমতের ছায়াতলে আশ্রয় দিন। আমি একা, আমাকে একা রাখবেন না, আমি ভীষণ বিষন্ন ও মনঃক্ষুন্ন। দেখতে দেখতে আরো এগারো বছর কেটে যায়।

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!