মা মারিয়াম

মা মারিয়াম :: পর্ব-৪

-মাসফিক মাহমুদ

যাকারিয়্যা একদিন তার গৃহে প্রবেশ করে দেখলেন তার স্ত্রী খুব কান্না করছে। বুঝতে দেরি হল না, তার প্রবেশের পূর্বে যারা বেরিয়ে গেল তারাই তার স্ত্রীকে কটু কথা বলে গেছে। তিনি উত্তেজিত হয়ে বললেন, দাঁড়াও আমি এর জবাব দিয়ে আসছি।

তিনি গির্জায় পৌঁছে ইয়াসারকে বললেন, কেন তোমরা আমাকে আর আমার পরিবারকে জ্বালাতন করছে? তোমরা হান্নার হৃদয় ভেঙ্গে দিয়েছ কেন? আমার সন্তান নেই, আমি আমার খোদার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি। তোমাদের জন্য আফসোস হয়। তোমরা এত ফ্যাসাদে জড়িয়ে পরেছ যে, তোমরা অন্ধ হয়ে খোদাকে আর দেখতে পাচ্ছ না।

তোমরা কি এসবে (মুদ্রার থলি) কোন দুর্গন্ধ পাও না? তোমাদের সাথে আর কোন সম্পর্ক রাখা সম্ভব নয়। তোমাদের বিরুদ্ধে খোদার নিকট অভিযোগ করা ছাড়া আমার আর কোন পথ তোমরা রাখলে না।

যাকারিয়্যা রাগান্বিত হয়ে ইয়াসাকারের কক্ষ থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার সময় গির্জার এক খাদেম তার বার্ধক্য নিয়ে কটু কথাসহ মারিয়ামের মার মৃত্যু জন্য তাকেই দায়ী করল। এমনও বলল যে, তিনি যদি সত্যি পয়গম্বর হন, তবে কেন নিজের কোন সন্তান নেই?

তোমার রব বলেছেন, এটা আমার জন্য সহজ। আমি তো ইতঃপূর্বে তোমাকে সৃষ্টি করেছি, তখন তুমি কিছুই ছিলে না। যাকারিয়্যা বলল, হে আমার রব, আমার জন্য একটি নিদর্শন ঠিক করে দিন। তিনি বললেন, তোমার জন্য এটাই নিদর্শন যে, তুমি সুস্থ থেকেও তিন রাত কারো সাথে কথা বলবে না।

তার অবর্তমানে কে তার বংশে বাতি জ্বালাবে? কেন আপনি এখনও নিজের পয়গম্বরির দাবি করছেন? কেন? আপনি বৃদ্ধ হয়ে গেছেন, খুব বেশিদিন আর আপনার অবশিষ্ট নেই।

যাকারিয়্যা অসহায় হয়ে বললেন, হে খোদা! তাদের এসব তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য আমার আর সহ্য করার শক্তি অবশিষ্ট নেই। আমি আর তাদের তিক্ত কথা নিতে পারছি না। হে খোদা এমন কোন আদেশ পাঠাও যাতে আমার ক্ষত উপশম হয়।

যাকারিয়্যা কুদসুল আকদাসে ইবাদতের মেহরাবে দাঁড়িয়ে বললেন, হে আমার রব! আমার হাড় দুর্বল হয়ে গেছে এবং বার্ধক্যবশতঃ আমার মাথার চুল সাদা হয়ে গেছে। হে আমার রব! আপনার কাছে দোয়া করে আমি কখনো ব্যর্থ হইনি।

গির্জার বাইরে এক মহিলা চিৎকার করে বলতে লাগল, হে বনী ইসরাইল তোমরা তোমাদের নোংরা হাত ধুয়ে নাও। মুক্তির আগমনী বার্তা শুনতে পাচ্ছি; প্রতারণা করা, হারাম খাওয়া, বিধবা ও ইয়াতিমদের সম্পদ লোপাট থেকে বিরত থাক। ইয়াহিয়ার আগমনই ইশারা দিচ্ছে, তিনি খোদার কালেমার সত্যতা প্রমাণ করবেন।

আর আমার পরে স্বগোত্রীয়দের সম্পর্কে আমি আশংকাবোধ করছি। আপনি আমাকে আপনার পক্ষ থেকে একজন উত্তরাধিকারী দান করুন। যে আমার এবং ইয়াকূবের বংশের উত্তরাধিকারী হবে। হে আমার রব! আপনি তাকে পছন্দনীয় বানিয়ে দিন।

স্রষ্টা বললেন, হে যাকারিয়্যা! আমি তোমাকে একটি পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিচ্ছি, তার নাম ইয়াহইয়া। ইতিপূর্বে কাউকে আমি এ নাম দেইনি। যাকারিয়্যা বলল, হে আমার রব! কিভাবে আমার পুত্র সন্তান হবে? আমার স্ত্রী তো বন্ধ্যা আর আমিও তো বার্ধক্যের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছি। ফেরেশতা বলল, এভাবেই।

তোমার রব বলেছেন, এটা আমার জন্য সহজ। আমি তো ইতঃপূর্বে তোমাকে সৃষ্টি করেছি, তখন তুমি কিছুই ছিলে না। যাকারিয়্যা বলল, হে আমার রব, আমার জন্য একটি নিদর্শন ঠিক করে দিন। তিনি বললেন, তোমার জন্য এটাই নিদর্শন যে, তুমি সুস্থ থেকেও তিন রাত কারো সাথে কথা বলবে না।

অতঃপর সে মিহরাব হতে বেরিয়ে তার লোকদের সামনে আসল এবং ইশারায় তাদেরকে বলল, তোমরা সকাল ও সন্ধ্যায় তাসবীহ পাঠ কর।

স্রষ্টার আদেশের পর যাকারিয়্যার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পরলে, ধাত্রী পরীক্ষা করে জানতে পারে, সে সন্তান সম্ভবা!! মূহুর্তের মধ্যে শহরে যাকারিয়্যার সন্তান আসার সংবাদ ছড়িয়ে পরল। সবাই এটিকে একটি অলৌকিক ঘটনা বলে বলাবলি করতে লাগল।

সৃষ্টিকর্তা হযরত দাউদকে ওহীর মাধ্যমে বললেন, হে দাউদ! নিজ গৃহ পরিস্কার কর। খোদা সেখানে অবতরণ করবেন। দাউদ বললেন, সেটি কেমন কক্ষ যেখানে আপনি অবতরণ করতে পারবেন? স্রষ্টা বললেন, সেটি মুমিন বান্দার দিল। দাউদ বললেন, কিভাবে পরিষ্কার করব? আল্লাহ্ বললেন, সব কিছু ত্যাগ কর যার সাথে আমার সাথে কোন সম্পর্ক নেই।

তারা আরো বলতে লাগল, খোদা যেভাবে হযরত ইব্রাহিমকে বৃদ্ধ বয়সে সন্তান উপহার দিয়েছিলেন! তাদের দুইবোনই বন্ধ্যা ছিল, খোদা হযরত ইমরানকে দিয়েছিলেন মারিয়াম আর এখন যাকারিয়্যাকে দিচ্ছেন!!

গির্জার বাইরে এক মহিলা চিৎকার করে বলতে লাগল, হে বনী ইসরাইল তোমরা তোমাদের নোংরা হাত ধুয়ে নাও। মুক্তির আগমনী বার্তা শুনতে পাচ্ছি; প্রতারণা করা, হারাম খাওয়া, বিধবা ও ইয়াতিমদের সম্পদ লোপাট থেকে বিরত থাক। ইয়াহিয়ার আগমনই ইশারা দিচ্ছে, তিনি খোদার কালেমার সত্যতা প্রমাণ করবেন।

যারা এতদিন যাকারিয়্যার স্ত্রীকে এড়িয়ে চলত ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত তারাই এখন তার জন্য খাবার নিয়ে বাড়িতে হাজির। আগতদের সাথে কথোপকোথনের মাঝে যাকারিয়্যার স্ত্রী অনুভব করে যে তার গর্ভের সন্তান নড়ছে আর কেউ একজন তার বাড়ির দরজায় এসেছে। সে গিয়ে দেখে মারিয়াম তার দরজায়।

তিনি বলে ওঠেন, মারিয়াম! তোমার উপস্থিতিতে আমার গর্ভের সন্তানকে অনেক বেশী অনুভব করছি। মারিয়াম তোমার চেহারায় নূর দেখতে পাচ্ছি। তুমি তাহলে বাইরে আসতে পারলে। যাকারিয়্যার বাড়িতে ভিড় করা মহিলারাও মারিয়ামকে দেখে বিস্ময় হয়ে তাকিয়ে রইল।

আমার খোদা যেন আপনাদের কন্যাকে সুস্থতা দান করেন। মারিয়াম যাবার সময় তাকে বলে গেল, আপনার কন্যা আর স্ত্রীর প্রতি ভালবাসাই আপনাকে মুক্তি দিবে। মারিয়ামের কথায় রোমান সেনা চোখ অশ্রুজল চোখে তাকিয়ে রইল। আর মনে মনে তার অহংকারের জন্য ক্ষমা চাইতে লাগল।

যাকারিয়্যা বাড়ি ফিরে দেখলেন, লোকজন তার বাড়ির সামনে ভিড় করে আছে আর কেউ কেউ ক্ষমা চাচ্ছে ও তার সাহায্য চাচ্ছে। যাকারিয়্যা বললেন, আমি খুব অবাক হই যখন কেউ কিছু হারিয়ে ফেলে ও পুনরায় তার সন্ধান করে। কিন্তু নিজেকে হারিয়ে ফেলে আর নিজেকে আর সন্ধানের চিন্তা করে না।

সৃষ্টিকর্তা হযরত দাউদকে ওহীর মাধ্যমে বললেন, হে দাউদ! নিজ গৃহ পরিস্কার কর। খোদা সেখানে অবতরণ করবেন। দাউদ বললেন, সেটি কেমন কক্ষ যেখানে আপনি অবতরণ করতে পারবেন? স্রষ্টা বললেন, সেটি মুমিন বান্দার দিল। দাউদ বললেন, কিভাবে পরিষ্কার করব? আল্লাহ্ বললেন, সব কিছু ত্যাগ কর যার সাথে আমার সাথে কোন সম্পর্ক নেই।

যাকারিয়্যার বৃদ্ধ বয়সে পিতা হবার অলৌকিক ঘটনার পর গির্জার পাদ্রীদের মাঝে অস্থিরতা তৈরি হল। মানুষজন তাদের ভণ্ড বলে অবিহিত করতে লাগল, তাদের ধর্মব্যবসা শেষ হয়ে যেতে লাগল।

পাদ্রীদের অপপ্রচার যখন চরম পর্যায়ে, যাকারিয়্যার শিষ্য তার সাথে সাক্ষাৎ করে বললেন, আমরা দৃঢ় কণ্ঠে বলছি আমরা আপনার সাথে আছি ও আপনার জন্য উৎসর্গ হতেও সম্মত আছি।

যাকারিয়্যা বললেন, তোমাদের মনোভাব তার দ্বীনের পথেই আছে, সেভাবেই পথ চল। আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে যে কোন কিছুর মোকাবেলার জন্য, সংকটময় সময় যাচ্ছে।

মারিয়াম যেদিন যাকারিয়্যার বাড়ি থেকে বাইতুল মুকাদ্দাসে ফিরে যাচ্ছিল, পথ মধ্যে রোমানবাহিনীর এক সেনা তার পথ রোধ করে বলল, আমরা আড়ালে দাঁড়িয়েছি তোমার সাথে দেখা করার জন্য। ঐ দেখ আমার স্ত্রীর কোলে আমার অসুস্থ কন্যা। তুমি ওকে সুস্থতা দান করতে পারলে তোমাকে অনেক স্বর্ণমুদ্রা দেব।

মারিয়াম বলল, দেখুন মহান আল্লাহর ইচ্ছায় সবকিছু জড়িত। তিনি চাইলে সব সম্ভব। তিনি না চাইলে কিছুই সম্ভব নয়। আমার কিছুই করার নেই। তিনিই সকল কিছুর মালিক। আমি শুধু তার দরবারে আপনার কন্যার জন্য দোয়া করতে পারি।

আমার খোদা যেন আপনাদের কন্যাকে সুস্থতা দান করেন। মারিয়াম যাবার সময় তাকে বলে গেল, আপনার কন্যা আর স্ত্রীর প্রতি ভালবাসাই আপনাকে মুক্তি দিবে। মারিয়ামের কথায় রোমান সেনা চোখ অশ্রুজল চোখে তাকিয়ে রইল। আর মনে মনে তার অহংকারের জন্য ক্ষমা চাইতে লাগল।

এ শুনে ইয়াসাকার আরো ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, এখন ষোল বছরের এক কন্যার কাছে আমাদের দিক নির্দেশনার জন্য খোদা ওহী পাঠাবেন? ইয়াসাকার তৎক্ষণাৎ সকলকে উস্কে দিয়ে যাকারিয়্যা ও মারিয়াম এর মৃত্যুদণ্ড চাইলেন। সভার যে সম্মানিত ব্যক্তি তাতে বাঁধা দেওয়াতে সে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।

সেদিন রাতে মারিয়ামকে অসহায়দের সাহায্য করতে দেখে ইয়াসাকার তাকে ভণ্ড এবং যা-তা বলে তিরস্কার করল। মারিয়াম ফিরে গিয়ে দোয়া করলেন, হে মাবুদ! নেক বান্দাদের তোমার দরগায় আশ্রয় দাও ও পাপীদের ক্ষমা কর।

আমাকে এমন হৃদয় দান কর যেন তোমার সকল বান্দাদের ভালবাসতে পারি। তোমার মহব্বত ও রহমতের ভিক্ষারি আমি আমাকে সাহায্য কর।

দোয়া করতে করতে মারিয়াম ঘুমিয়ে পরে। হঠাৎ এক তীব্র আলোতে তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। তিনি শুনতে পান এক ভারী কণ্ঠে তাকে বলা হচ্ছে, মারিয়াম! মারিয়াম!! ওঠো মহান রব তোমাকে পবিত্র নারী হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং তোমার দ্বারা একটি মহান কাজের ফল দেওয়ার জন্য তিনি ইচ্ছা পোষণ করেছেন।

হে মারিয়াম! তাঁর আনুগত্য পোষণ কর। তার জন্য সেজদা কর।

আলোটা তাকে ইবাদত কক্ষের দিকে যাওয়ার ইশারা করল। তখন গভীররাত, মারিয়াম বাইতুল মুকাদ্দাসের ইবাদত কক্ষের সামনে পৌঁছাতেই আলোটা রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। সে প্রবেশ করতেই দেখতে পেল সারি সারি ফেরেশতা কাতারে দাঁড়িয়ে আছে। যেন তার জন্যই আপেক্ষা করছিল।

হঠাৎ খুব মিষ্টি একটা সুগন্ধ তার নাকে আসতেই কুদসের দিক থেকে একটা নূর তার দিকে ছুটে এসে তার নাম ধরে ডাকল। সাথে আরো তিনজন নারীর নাম সম্মানের সাথে উচ্চারণ করল। মারিয়াম অবাক হয়ে রইল। যে তিনজন পবিত্র নারীর সাথে তার নাম উচ্চারণ করা হয়েছে। তারপর সে ফেরেশতাদের সাথে ইবাদত আদায় করল।

বাইতুল মুকাদ্দাসে মারিয়ামের প্রবেশ ও ইবাদতের কথা জানাজানি হয়ে যাবার পর পাদ্রীরা ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে পরলেন। তারা যাকারিয়্যাকে নানামুখী প্রশ্ন করে দোষী করার চেষ্টা করার সময় যাকারিয়্যা বললেন, মারিয়াম কখনও মিথ্যা বলতে পারে না যে, তার কাছে স্রষ্টার নির্দেশ এসেছে।

এ শুনে ইয়াসাকার আরো ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, এখন ষোল বছরের এক কন্যার কাছে আমাদের দিক নির্দেশনার জন্য খোদা ওহী পাঠাবেন? ইয়াসাকার তৎক্ষণাৎ সকলকে উস্কে দিয়ে যাকারিয়্যা ও মারিয়াম এর মৃত্যুদণ্ড চাইলেন। সভার যে সম্মানিত ব্যক্তি তাতে বাঁধা দেওয়াতে সে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।

এমন সময় জিব্রাঈল এসে বলল, চিন্তা কর না। পেরেশানির-ভয়-শংকার কোন কারণ নাই। এখন তোমার দরকার প্রসব যেন সুবিধা মত হয় এবং তোমার শরীরের দূর্বলতাও যেন দূর হয়। তুমি শারীরিকভাবে অসুস্থ। আগে তোমার সুস্থতা দরকার। তোমার খাদ্য ও পানি দরকার।

তার কিছুদিন পর যাকারিয়্যা মারিয়ামকে নিয়ে নিজের বাড়ির দিকে রওনা হলেন, তখন ইউসুফ দৌঁড়ে এসে তার সন্তান ইয়াহিয়ার জন্মের সুসংবাদ দেয়। সব শুনে যাকারিয়্যা আবেগে আপ্লুত হয়ে পরে।

অন্যদিকে একদিন মারিয়াম মসজিদের পূর্বদিকের আড়াল স্থানে পর্দা টানিয়ে সেখানে অবস্থান করছিল। আল্লাহ্ তাঁর কাছে ফেরেশতা জিব্রাঈলকে পাঠালেন। তিনি মারিয়ামের নিকট মানবাকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করলেন।

মারিয়াম ভয় পেয়ে বলল, আমি তোমার থেকে করুণাময় স্রষ্টার আশ্রয় প্রার্থনা করছি যদি তুমি খোদা ভীরু হও। জিব্রাঈল বলল, ভয় পেওনা। আমি তো কেবল তোমার প্রভুর প্রেরিত দূত। এজন্য যে, আমি যেন স্রষ্টার আদেশে তোমাকে একটি পবিত্র পুত্র সন্তান দান করতে পারি।

মারিয়াম বলল, কিভাবে আমার পুত্র সন্তান হবে? অথচ কোন মানুষ আমাকে স্পর্শ করেনি এবং আমি ব্যভিচারিণী নই। জিব্রাঈল বললেন, এমনটিই হবে। তোমার রব বলেন, এমনটি করা আমার জন্য অতি সহজ আর আমি এটা এ জন্য করব যে, এই ছেলেকে আমি লোকদের জন্য একটি নিদর্শন ও নিজের পক্ষ থেকে একটি অনুগ্রহে পরিণত করব। ঈশাকে পৃথিবীবাসীর জন্য রহমতের জন্য প্রেরণ করতে চাই।

জিব্রাঈল মরিয়ামের মুখে ফুঁ দিলে তাতেই তাঁর গর্ভসঞ্চার হল। এরপর তিনি সেখান থেকে বের হয়ে আরো প্রায় ৯.৫ কিমি দূরে দক্ষিণে বাইতুল লাহামে চলে যান। এই বাইতুল লাহামই পারবর্তীতে ব্যাথেলহাম নামে পরিচিতি পায়। ৩২৬ খ্রিষ্টাব্দে ঈশার সম্মান ও স্মরণার্থে এখানে একটি গির্জা স্থাপন করা হয়।

অতঃপর প্রসব বেদনা নিয়ে মারিয়াম একটা সম্পূর্ণ মৃত, শুকনা খরখরে খেজুর গাছের নিচে আশ্রয় নিলেন। চিন্তা ও তীব্র ব্যথা-যন্ত্রণাতে অস্থির হয়ে বলতে লাগলেন, হে পারওয়ারদিগার! এ ঘটনার আগেই যদি আমার মৃত্যু হয়ে যেত, তাহলে কতই না ভালো হত।

এমন সময় জিব্রাঈল এসে বলল, চিন্তা কর না। পেরেশানির-ভয়-শংকার কোন কারণ নাই। এখন তোমার দরকার প্রসব যেন সুবিধা মত হয় এবং তোমার শরীরের দূর্বলতাও যেন দূর হয়। তুমি শারীরিকভাবে অসুস্থ। আগে তোমার সুস্থতা দরকার। তোমার খাদ্য ও পানি দরকার।

তাদের ক্ষিপ্রতা বেড়ে যাওয়ার আগেই তার কোলে থাকা চল্লিশ দিনের শিশু ঈশা দুগ্ধ পান ছেড়ে এক কথায় বললেন, আমি ঈশ্বরের বান্দা!! আমি যেভাবে এরকম কুদরতের সাথে জন্মগ্রহণ করেছি, ঠিক তেমনি আমাকে ঈশ্বর কিতাব দিয়েছেন এবং নবী বানিয়েছেন। তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন এবং যতদিন আমি জীবিত থাকি তিনি আমাকে সালাত ও যাকাত আদায় করতে আদেশ করেছেন।

কওম এর কাছে কি জবাবদিহিতা করবে সেটা পরের ব্যাপার। তোমার জন্য সুসংবাদ হচ্ছে, তুমি যেখানে বসে আছো তার নিচের দিকে তাকাও। দেখ, খোদা তোমার জন্য একটা বিশুদ্ধ ও মিষ্টি পানির ধারা প্রবাহিত করে দিয়েছেন।

তুমি যে খেজুর গাছের নিচে বসে আছো তাতে একটু ঝাঁকি দিয়ে দেখ, রব তোমাকে এ মৃত ও শুকনা খেজুর গাছ থেকে পরিপক্ক সুন্দর পাঁকা খেজুর দান করবেন। মারিয়ামের খেজুর গাছে ধাক্কা দেওয়ার সাথে সাথে মূহুর্তের মধ্যে গাছটি সজীব ও খেজুরে পরিপূর্ণ হয়ে গেল।

তুমি শান্ত হও। খাও, পান কর এবং চক্ষু শীতল কর। স্রষ্টা এও বলে দিলেন, এ বাচ্চার বিষয়ে তোমার কওমের কাছের উত্তর দেওয়ার ব্যবস্থা আমি করে দিব। তুমি যদি কোন লোককে দেখতে পাও বা কোন লোক তোমাকে দেখে ফেলে, তুমি বলে দিও তুমি তোমার মহান প্রভুর জন্য কথা না বলার রোজা রেখেছ। তার সন্তান প্রসব হল।

সন্তান প্রসবের চল্লিশ দিন পর্যন্ত ব্যক্তিগতভাবে অতিবাহিত করে, সম্পূর্ণ পবিত্র হয়ে সন্তানকে নিয়ে তার কওমের কাছে গেলেন।

মারিয়ামকে তারা সন্তানসহ দেখার পর নানামুখী কটুক্তি ও তিরস্কার করা শুরু করল। একজন বলল, হে মারিয়াম! তোমার পিতা তো খারাপ লোক ছিল না। তুমি যে সন্তান নিয়ে আসলে তাতো বোঝাই যাচ্ছে যে এ ব্যভিচার হওয়া সন্তান। আর তোমার মাও-তো ব্যভিচারিণী ছিল না। তুমি কিভাবে এ কাজ করলে?

মারিয়াম তার প্রভুর আদেশ অনুযায়ী তখনও চুপ রইলেন। কারো কোন প্রশ্নের জবাব দিলেন না। সে আল্লাহ্ পাকের আদেশ অনুযায়ী তার কোলের চল্লিশ দিনের শিশুর দিকে ইশারা করে দেখালেন। যেন তারা এই শিশুর কাছে প্রশ্ন করে। সকলে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে আরো তীর্যকপূর্ণ তিরস্কার করতে লাগল।

তাদের ক্ষিপ্রতা বেড়ে যাওয়ার আগেই তার কোলে থাকা চল্লিশ দিনের শিশু ঈশা দুগ্ধ পান ছেড়ে এক কথায় বললেন, আমি ঈশ্বরের বান্দা!! আমি যেভাবে এরকম কুদরতের সাথে জন্মগ্রহণ করেছি, ঠিক তেমনি আমাকে ঈশ্বর কিতাব দিয়েছেন এবং নবী বানিয়েছেন।

তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন এবং যতদিন আমি জীবিত থাকি তিনি আমাকে সালাত ও যাকাত আদায় করতে আদেশ করেছেন।

আমাকে মায়ের প্রতি অনুগত করেছেন এবং তিনি আমাকে অহঙ্কারী, অবাধ্য করেন নি। আর যেদিন আমি জন্মেছি এবং যেদিন আমি মারা যাব আর যেদিন আমাকে জীবিত অবস্থায় উঠানো হবে।

চল্লিশ দিনের শিশুর মুখের কথা শুনে সকল অপবাদকারীদের অস্থির ও ভীত হয়ে পরল।

ঈশা যৌবনে পদার্পণের পর মা মারিয়াম সম্পূর্ণ পর্দার আড়ালে থেকে মহান আল্লাহ্ পাকের ইবাদতে মশগুল হয়ে পরেন। ঈশাকে আকাশে তুলে নেওয়ার বছর পাঁচেক পর মারিয়াম তিপান্ন বছর বয়সে পৃথিবী ত্যাগ করেন। তার কবর দামেস্কে অবস্থিত।

(সমাপ্ত)

……………………….
আরো পড়ুন-
মা মারিয়াম : পর্ব-১
মা মারিয়াম : পর্ব-২
মা মারিয়াম : পর্ব-৩
মা মারিয়াম : পর্ব-৪

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

……………………..
আরো পড়ুন:
মা সারদা দেবী
প্রজ্ঞাপারমিতা শ্রীশ্রীমা সারদা
বহুরূপিনী বিশ্বজননী সারদামণি
মা মনোমোহিনী
শ্রীরামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে সপ্তসাধিকা
মাতৃময়ী তিনরূপ
মা আনন্দময়ী
আনন্দময়ী মায়ের কথা
ভারত উপাসিকা নিবেদিতা
রাসমণি
নিরাহারা যোগিনী মায়ের সন্ধানে
পূণ্যশীলা মাতা কাশীমণি দেবীর সাক্ষাৎকার
আনন্দময়ী মা
মা মারিয়াম :: পর্ব-১
মা মারিয়াম :: পর্ব-২
মা মারিয়াম :: পর্ব-৩
মা মারিয়াম :: পর্ব-৪
মীরার কথা
অলৌকিক চরিত্র মাদার তেরেসা
মা আনন্দময়ীর কথা
বৈষ্ণব সাধিকা যশোদা মাঈ
আম্মার সঙ্গলাভ
শ্রীশ্রী সাধিকা মাতা
জগৎ জননী ফাতেমা-১
জগৎ জননী ফাতেমা-২
জগৎ জননী ফাতেমা-৩
জগৎ জননী ফাতেমা-৪
জগৎ জননী ফাতেমা-৫
জগৎ জননী ফাতেমা-৬
জগৎ জননী ফাতেমা-৭
জগৎ জননী ফাতেমা-৮
জগৎ জননী ফাতেমা-৯
জগৎ জননী ফাতেমা-১০
জগৎ জননী ফাতেমা-১১
জগৎ জননী ফাতেমা-১২

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!