শব্দের মায়াজাল: দশম পর্ব

শব্দের মায়াজাল: দশম পর্ব

-মূর্শেদূল মেরাজ

জ্ঞানেন্দ্রিয় শব্দ : শব্দের মায়াজাল: দশম পর্ব

যৌগিক শব্দ: শব্দগঠনের প্রক্রিয়ায় যাদের অর্থ পরিবর্তিত হয় না, তাদেরকে যৌগিক শব্দ বলে। যেমন- গায়ক (গৈ+অক), বাবুয়ানা (বাবু+আনা), মধুর (মধু+র), পাক্ষিক (পক্ষ+ইক), দলীয় (দল+ঈয়) ইত্যাদি।

রূঢ় বা রূঢ়ি শব্দ: প্রত্যয় বা উপসর্গ যোগে গঠিত যেসব শব্দ তার মূল বা প্রকৃতি অনুযায়ী অর্থ প্রকাশ না করে ভিন্ন কোনো অর্থ প্রকাশ করে, সেসব শব্দকে রূঢ় বা রূঢ়ি শব্দ বলে। যেমন- হস্তী (হস্ত+ইন্), গবেষণা (গো+এষণা), বাঁশি (বাঁশ+ইন), তৈল (তিল+ষ্ণ্য), পাঞ্জাবি (পাঞ্জাব+ই), গবাক্ষ (গো+অক্ষি) ইত্যাদি।

যোগরূঢ় শব্দ: সমাস নিষ্পন্ন যে সব শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ আর ব্যবহারিক অর্থ আলাদা হয়, তাদেরকে যোগরূঢ় শব্দ বলে। যেমন-

পঙ্কজ (পঙ্কে জন্মে- পদ্মফুল), রাজপুত (রাজার পুত্র-একটি জাতি বিশেষ), অনুজ (অনুতে জন্মগ্রহণকারীদের মধ্যে শুধু সহোদর ভাই), জলধি (জল ধারণ করে যা- সমুদ্র), মহাযাত্রা(মহাসমারোহে যাত্রা- মৃত্যু) ইত্যাদি।

এছাড়াও আছে-

পারিভাষিক শব্দ: বিদেশি শব্দের অনুকরণে ভাবানুবাদমূলক প্রতিশব্দ হিবেসে সৃষ্ট শব্দগুলো পরিচিত পারিভাষিক শব্দ বলে। যেমন- অম্লজান (Oxygen), উদযান (Hudrogen), নথি (File), সমাপ্তি (Final) ইত্যাদি

ব্যুৎপত্তিগত অর্থ: উৎপত্তিগত ভাবে শব্দটির যে অর্থ দাঁড়ায়, তাকে ব্যুৎপত্তিগত অর্থ বলে। যেমন, ‘মধুর’ শব্দটি গঠিত হয়েছে ‘মধু+র’ অর্থাৎ ‘মধু’ শব্দ হতে। তাই ‘মধুর’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হওয়া উচিত মধু সংশ্লিষ্ট কোন অর্থ।

ব্যবহারিক অর্থ: কোন শব্দ প্রকৃত অর্থে যে অর্থে ব্যবহৃত হয়, বা যে অর্থ প্রকাশ করে, তাকে সেই শব্দের ব্যবহারিক অর্থ বলে। যেমন- ‘মধুর’ শব্দটির ব্যবহারিক অর্থ ‘মধুর মত মিষ্টি গুণযুক্ত’।

ব্যাকরণ থেকে বিজ্ঞানে মনোনিবেশ করলেও শব্দ সম্পর্কে অনেক কিছু জানার আছে। বিজ্ঞানের ভাষায় শব্দ আদৌতে একটা তরঙ্গ ভিন্ন কিছুই নয়। যা কঠিন, তরল ও বায়বীয় অর্থাৎ সকল পদার্থের মধ্যে দিয়েই বয়ে যেতে পারে। মূলত পদার্থের অণু-পরমাণুর কম্পনের মাধ্যমে শব্দ প্রবাহিত হয়।

পদার্থবিজ্ঞান- ভেলোসিটি ও ফ্রিকোয়েন্সি এই দুই পরিমাপ দিয়ে শব্দকে বোঝার চেষ্টা করে।

বাতাসে শব্দের গতিবেগ সেকেণ্ডে ৩৪০ মিটার, পানির নিচে সেকেণ্ডে ১৪৮০ মিটার। কম্পাঙ্কের পরিমাপ করা হয় হার্জ-এ। যে শব্দ কানে শোনা যায় তার কম্পাঙ্ক ২০ হার্জ থেকে ২০ কিলোহার্জের মধ্যে। তার নীচের সবই ‘ইনফ্রাসাউণ্ড’ আর উপরে ‘আলট্রাসাউণ্ড’।

বিজ্ঞানী স্প্যালানজানি ১৭৯৪ সালে তার গবেষণায় বলেন, অন্ধকারে আলট্রাসাউন্ডের সাহায্যে বাদুড় দিকনির্ণয় করে। সে আলট্রাসাউন্ড ছাড়ে আর তার প্রতিধ্বনি দিয়ে বুঝে নেয় কোন দিকে চলাচল করতে হবে।

অর্থাৎ শব্দের বাঁধা প্রাপ্তে যে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি হয় তা দিয়ে সে কোনো কিছুর দূরত্ব নির্ণয় করেন। একই পদ্ধতিতে পানির নিচে যেমন চলাচল করে সাবমেরিন।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিজ্ঞান এই একই পদ্ধতিতে তরঙ্গের প্রতিফলনের মাধ্যমে দেহের ভেতরের ছবিও তুলে নেয়। সাধারণ শব্দে বলতে গেলে ‘আল্ট্রাসনোগ্রাফি’। দেহের অভ্যন্তরে কম্পনের প্রতিধ্বনির ভেতর দিয়ে শব্দের ছবি তুলে আনা। অর্থাৎ শব্দের ছবির প্রতিরূপ।

শব্দের প্রতিফলনকে বহুমূখি ব্যবহারে ত্রিমাত্রিক ছবি পর্যন্ত তুলতে বিজ্ঞান আজ সমর্থ। এমনকি সে সব প্রযুক্ত আজ বিশাল বিশাল যন্ত্রপাতির বদলে মোবাইলের মতো হাতে হাতে ঘোরা যন্ত্রেও চলে আসছে।

বিজ্ঞানের এসব জটিল ও কঠিন কঠিন শব্দের বিশদে না গিয়ে সায়েন্সকিডস নামের ওয়েবসাইট শব্দ সম্পর্কে বলেছে সে সম্পর্কে একটু জেনে নিলে অনেকটা ধারণা পাওয়া যাবে। সায়েন্সকিডস ওয়েবসাইট বলছে-

  • যেখানে বাতাস নেই, সেখানে শব্দও শোনা যায় না। বায়ুশূন্য মাধ্যমে শব্দের চলাচল সম্ভব নয়।
  • শব্দ তৈরি হয় কম্পন থেকে। এই কম্পন থেকে শব্দতরঙ্গ তৈরি হয়। এরপর সেটা বিভিন্ন মাধ্যমে কানে এসে পৌঁছালে আমরা শব্দ শুনতে পাই।
  • মূল কম্পনটি যেখান থেকে বা যে মাধ্যমে হয়, আমাদের কানেও ঠিক একইভাবে কম্পন হয়। এতে আমরা বিভিন্ন ধরনের শব্দ শুনতে পাই।
  • মানুষের চেয়ে অনেক ভালো কানে শুনতে পায় কুকুর। তারা এমন মাত্রার শব্দও টের পায়, যা সম্বন্ধে মানুষ কোনো ধারণাই করতে পারে না!
  • বিভিন্ন প্রাণী বিপদাপদ টের পায় শব্দের মাধ্যমে। এতে করে বিপদের আগেই সতর্ক হয়ে যেতে পারে তারা।
  • শব্দের গতিবেগ আলোর চেয়ে কম। ঘণ্টায় ১২৩০ কিলোমিটার।
  • জলীয় মাধ্যমে শব্দ বায়ু মাধ্যমের চেয়ে চারগুণ গতিশীল।
  • শব্দতরঙ্গ নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে ‘অ্যাকুস্টিকস’ বলা হয়।
  • বিদ্যুৎ চমকানোর আওয়াজ তৈরি হয় তীব্রভাবে উত্তপ্ত বাতাসের মাধ্যমে, যার চারপাশ ঘিরে থাকে বিদ্যুৎ। এর ফলে সাধারণ গতিবেগের চেয়ে বিদ্যুৎ চমকানোর আওয়াজ অনেক দ্রুত শোনা যায়।

শব্দজগতেই আমরা বাস করি। তার মাত্রা কতটা হলে সহনীয় কতটা হলে অসহনীয় তা মাপারও নানা প্যারামিটার তৈরি হয়েছে। শব্দের তীব্রতাকে আধুনিক ভাষায় বলা হয় শব্দদূষণ বা শব্দ সন্ত্রাস। শব্দদূষণও আমাদের জীবনযাত্রায় বিশাল ভূমিকা রাখে। সেও এক বিশাল জগৎ।

সে নিয়েও আছে গণিতের কঠিন মারপ্যাঁচ, বিজ্ঞানের নানা ছক, পরিসংখ্যান। তবে সহজভাষায় বলতে গেলে বলতে হয়, আমাদের কান যেকোনো শব্দের জন্যই যথেষ্ট সংবেদী। সে কারণে শব্দের তীব্রতা কানের পর্দাকে নষ্টও করে দিতে পারে। আর এই শব্দের তীব্রতা পরিমাপের একক ডেসিবেল (ডিবি)। শব্দের মাত্রা ৪৫ ডিবি হলেই সাধারণত মানুষ ঘুমাতে পারে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ৬০ ডেসিবেল সাময়িকভাবে শ্রবণশক্তি নষ্ট করে দেয় আর ১০০ ডেসিবেল শব্দ হলে চিরতরে শ্রবণশক্তি নষ্ট হতে পারে।

শব্দদূষণের কারণে শ্রবণশক্তি হ্রাসের পাশাপাশি দুশ্চিন্তা, উগ্রতা, উচ্চ রক্তচাপ, শ্রবণশক্তি হ্রাস, স্মরণশক্তি হ্রাস, মানসিক অবসাদ, ঘুমের ব্যাঘাত সহ অন্যান্য ক্ষতিকর ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া ঘটে থাকে বলে বিশেষজ্ঞ মহল বলে থাকেন।

মজার বিষয় হলো, পশু-পাখি-কীট-পতঙ্গ-প্রকৃতি থেকে আমরা প্রতিনিয়ত অগনতি শব্দ শুনি যার অর্থ আমরা জানিও না। জানা পর্যন্ত পৌঁছাতেও পারি না। বিষয়টা আমরা অনেকটাই স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছি। পশু-পাখি-কীট-পতঙ্গ-প্রকৃতি শব্দের অর্থ আমাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় সেটা আমরা বুঝেই পথ চলি।

অবশ্য না বুঝলেও কিছু কিছু অনুমান করার চেষ্টা করি। তারাও যে আমাদের ভাষা বা শব্দ সঠিকভাবে বোঝে কিনা তাও আমরা বুঝতে পারি না। তবে আমরা দুই পক্ষই যার যার অবস্থান থেকে ছাড় দিয়ে একটা মধ্যবর্তী অবস্থায় যেতে চাই যদি প্রেমের ধারা বহমান থাকে।

পশু-পাখি-কীট-পতঙ্গ-প্রকৃতি সাথে যদি প্রেমভাব হয় তাহলে তার শব্দ-এর প্রকৃত অর্থ না বুঝলেও আমরা অনেকটাই আন্তাজ করতে পারি। খুব সাধারণভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে- যার ভেতরে পশু-পাখি প্রেম প্রবল তার সাথে পশু-পাখির সম্পর্কও বেশ ভালো।

আপনি যত উদার হয়ে তাদের কাছাকাছি যাবেন, তারাও ততটাই উদার হয়ে আপনার কাছে আসবে। অবশ্য এতে চাতুরি থাকলে বিশ্বাসী পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়; কথা সত্য। তারপরও সেই সব অর্থ না জানা নানা শব্দ আমরা বোঝার যেমন চেষ্টা করি। আবার সেইরূপ শব্দ নিজেরাও করে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করি।

আরো মজার বিষয় হলো, কেবল পশু-পাখি-কীট-পতঙ্গ-প্রকৃতি নয় আমরাও প্রতিনিয়ত অনেক সব শব্দ করি যার কোনো সঠিক অর্থ বা তাৎপর্য আমরা নিজেরাও জানি না। তাও করি। এর অনেকগুলো আমরা প্রকৃতি থেকেও সংগ্রহ করি। আবার কিছু কিছু শব্দ আমরা নিজেরও তৈরি করেছি যার কোনো অর্থ হয় না।

বিজ্ঞানের আধুনিক সব যন্ত্রপাতি গবেষণা করে চলছে এসব শব্দ নিয়ে। ভাষাবিদরা চেষ্টা চালাচ্ছে এদের লিখিত রূপ দিতে। আর আমরা সাধারণেরা সেসবে না ডুবে বিচিত্র বিচিত্র শব্দ জুড়ে নতুন নতুন সব অর্থহীন শব্দ করেই চলেছি।

শব্দ যেমন বলবার বিষয় তেমনি শুনবারও বিষয়। মানুষরা শব্দের মায়াজালে শব্দের যে স্তর পর্যন্ত শুনতে সক্ষম। তার অনেক নিম্নস্তরের শব্দ শুনতে সক্ষম কুকুর। আরো সূক্ষ্ম ও ক্ষুদ্র প্রাণীরা এমন সব শব্দ শুনতে পায়। যা খালি কানে আমরা শুনতে পাই না। বলা হয় যদি আমরা সকল শব্দ শুনতে পেতাম তাহলে পাগল হয়ে যেতাম।

সাধনায় শব্দের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো ‘মন্ত্রযোগ’। প্রায় প্রতিটা ধর্ম বা মতাদর্শে বেশিকিছু শব্দকে সাজিয়ে গুছিয়ে কিছু বাক্য গাঁথা হয়। সেই বাক্যগুলোকে প্রার্থনার বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে শব্দ করে বা মনে মনে উচ্চারণ করে সাধনায় প্রবেশ করতে চায় সাধক।

(চলবে…)

পরবর্তী পর্ব >>

……………………
আরো পড়ুন:
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-২
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৩
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৪
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৫
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৬
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৭
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৮
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৯
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১০
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১১
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১২
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১৩
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১৪
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১৫

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!