শব্দের মায়াজাল: তৃতীয় পর্ব

শব্দের মায়াজাল: তৃতীয় পর্ব

-মূর্শেদূল মেরাজ

জ্ঞানেন্দ্রিয় শব্দ : শব্দের মায়াজাল: তৃতীয় পর্ব

আবার মন্ত্র পড়বার আগে পুরোহিত শঙ্খ বাজার, কাশি বাজায়, কেউবা শিঙ্গায় ফু দেয়। কেউ পাথরে পাথর ঘষে, কেউ বা মঙ্গল চক্র ঘোরায়। শব্দের মায়াজালে সৃষ্টি হয় ঘোর। জেগে উঠে অজানা অনুভূতি।

সাউন্ড হিলিং, সাউন্ড থেরাপি বা শব্দে আরগ্যে নামে একটা চিকিৎসা পদ্ধতি প্রচলিত আছে। পদ্ধতিটি বেশ প্রাচীন হলেও সম্প্রতি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সাধারণত যারা ঔষধ প্রয়োগের পরিবর্তে প্রাকৃতিক চিকিৎসায় ভরসা রাখেন তারা এই ধরনের পদ্ধতিগুলো গ্রহণ করে থাকেন।

বিভিন্ন আকৃতির তামার পাত্রে নির্দিষ্ট মাত্রায় শব্দ করে রোগের চিকিৎসা করা হয় এই পদ্ধতিতে। এখানে শব্দে সুরে ফেলে একটা মোহাবশেষ পরিবেশ তৈরি করে রোগীর চিন্তা-চেতনাকে কেন্দ্রীভূত করা হয়। আর এই কেন্দ্রীভূত সত্তাকে শান্ত করে রোগ নিরাময় করা হয়।

সাধারণত মানুষিক চাপ, যন্ত্রণা, ব্যাথা উপসমে এই শব্দ চিকিৎসা বেশ কার্যকর। তবে এর চিকিৎসকরা দাবী করেন এ পদ্ধত্বিতে মানবদেহের জটিল থেকে জটিলতর রোগেও উপসম করা সম্ভব।

অন্যদিকে দাগী আসামীদের নির্যাতন করার করার জন্য তাদের এমন সব বিচিত্র ও তীক্ষ্ম শব্দ ক্রমাগত শোনানো হয় যাতে আসামী দিকবেদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে যায়। বাধ্য হয় অপরাধ স্বীকার করতে।

আসলে মন স্থির/কেন্দ্রীভূত করার জন্য বা ইন্দ্রিয় থেকে অন্তকরণে বা গভীরে অর্থাৎ ভেতরে প্রবেশ করার পূর্বে সুর-শব্দ-ধ্বনি বেশ গুরুত্ব বহন করে। সংগীতেও শব্দের ব্যবহারের আগে বেশিভাগক্ষেত্রেই বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনি দিয়ে প্রস্তুত করা হয় শ্রোতাকে।

বেশিভাগ পরিচিত শব্দ আমাদের কাছে তাৎক্ষণিক একটা অর্থ দাঁড় করায়। তবে যে সকল শব্দের অর্থ করা যায় না তা আমাদেরকে সকল সময়ই বেশি গভীরতায় নিয়ে যায়। যেমন পাখিদের শব্দ, বাতাসের শব্দ, প্রকৃতির বিভিন্ন নড়াচড়ার শব্দ।

আবার হিংস্র প্রাণীদের হুংকার, প্রলয়ের শব্দ আমাদেরকে অনেক সময় আতঙ্কিত করে তোলে। তবে পর্যাপ্ত নিরাপত্তায় নির্দিষ্ট দূরত্বে তাও মধুর মনে হয় সময় সময়ে।

শব্দ যে কি ভয়ঙ্কর তার এতো বেশি প্রমাণ ইতিহাসের পাতায় আছে তার পরিসংখ্যান করা আধুনিক যন্ত্রপাতিও করতে পারবে কিনা তাতেও যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এক ‘পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘুরে নাকি সূর্য পৃথিবীর চারাপাশে ঘুরে’ এই কথার প্রেক্ষিতে পৃথিবীতে কত হত্যাকাণ্ড হয়েছে বা নির্মম বিচার হয়েছে তা ইতিহাসের কয়েক পাতা উল্টালেই পাওয়া যায়।

আবার মনসুর হাল্লাজের ‘আনাল হক’ বা ‘আমিও সত্য’ কথার প্রেক্ষিতেও কত কিনা ঘটে গেছে। মক্কায় যখন হজরত মোহাম্মদ আল্লাহর বাণী প্রচার করলেন তখন তিনি হয়ে গেলেন পরিচিত সকলের শত্রু। তেমনি যীশু, মুসা, দাউদ প্রমুখ।

কত শত-সহস্র কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীকে যে সইতে হয়েছে নির্যাতন-নিপিড়ন তার শেষ নেই। বিশেষ শব্দ উচ্চারণের অপরাধে শুধু দেশান্তরই নয় বিচারের মুখোমুখি করে হত্যার ঘটনাও নেহাত কম নয়।

এই শব্দ প্রয়োগে সচেতন হয়ে আবার অনেক সাধক-দার্শনিক প্রথমে গড়ে তুলেছেন নিজ সম্প্রদায় বা দল তারপর খুব গোপনে তা তাদের মাঝে প্রচার করেছেন। মূল কথা রেখে গেছেন খুব গোপন।

আবার সাধক কখনো কখনো নিজের সাধনা লব্ধ জ্ঞানে নিজেই এতো বিস্মিত হয় উঠে যে তা প্রকাশ না করে থাকতে পারে না। সে ভুলে যায় সে কোথায়, কোন সমাজে, কোন অবস্থায়, কোন মানুষের মাঝে রয়েছে। সত্যানুসন্ধানে হারিয়ে ফেলে হিতাহিত জ্ঞান।

আসলে মনের মাঝে ‘ভাবের’ উদয় হলে তা প্রকাশের ইচ্ছাও পাশাপাশি ব্যক্ত হয়। আর সেই ভাব মানুষ স্বাধারণত প্রকাশ না করে থাকতে পারে না। তবে তা চরিত্র-স্বভাব-প্রকৃতি ভেদে প্রকাশের ভঙ্গি পৃথক হয়ে থাকে। ভাবের প্রকাশ সাধারণত মানুষ শব্দে… সুরে… করে থাকে।

ভাবের উদয় হলে কেউ গুনগুনিয়ে গাইতে শুরু করে। কেউ বলতে শুরু করে। কেউ উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠে। কেউবা লিখতে শুরু করে। এভাবেই ভাব ও ভাবনার প্রকাশ পায় শব্দে।

এই শব্দমালা একএক জন একএক ভাবে প্রকাশ করে থাকে। সেই সব শব্দমালা শুনে আবার একএক জন একএক ভাবে প্রতিকৃয়া দেয়। শব্দের শক্তি ও প্রভাব বোঝাতে প্রবাদে বলা হয়- ‘অসির চেয়ে মসি বড়’। অর্থাৎ জ্ঞানীর কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়ে ক্ষমতাশালী’।

অনেকভাবেই এর ব্যাখ্যা দেয়া যায়। শব্দ কি করে প্রতাপশালী থেকে প্রতাপশালী শাসকদেরও ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে তার উদাহরণের অভাব নেই ইতিহাসে। এখানে গত শতকের তিনজন নেতার নাম না বললেই নয়।

যারা জনসম্মুখে ভাষণ দিয়ে নিজ নিজ জনগোষ্ঠীকে নিজের অধিকার আদায়ে এতোটাই উজ্জীবিত করতে পেরেছিলেন যে, তাদের সমর্থকরা নিজেরা কতটা সমর্থ সেসব ভুলে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরেছিল।

হ্যা ঠিকই ধরেছেন এই অবিস্মরণীয় নেতারা হলেন- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মার্টিন লুথার কিং, নেলসন ম্যান্ডেলা। যাদের ভাষণ-বক্তব্য শুনলে আজো মানুষের মনে দেশ প্রেম জাগ্রত হয়। দেশের জন্য কিছু করবার বাসনা প্রকাশ পায়।

আবার হিটলারের মতো শাসকও ভাষণের মধ্যে দিয়ে তার সৈন্যদের মাঝে এমন এক প্রভাব তৈরি করেছিল যে, তার কথা শোনার পর তাদের আর কোনো হিতাহিত জ্ঞান থাকত না। আবার চার্লি চ্যাপলিন তার নির্বাকতার মধ্য দিয়ে সেলুলয়ডে সর্ব কালের সেরা বক্তব্য উপস্থাপন করে গেছেন।

শব্দের বিষয়টাই এমন। যা যথাযথ ব্যবহার করেও মানুষের মাঝে প্রাণের সঞ্চার করা যায়। আবার প্রকাশ না করেও অব্যক্ত শব্দের ব্যবহারে এমন এক আবহ তৈরি করা যায় যা দিয়েও মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়া যায়। সে এক আজব লীলা।

স্বামী বিবেকানন্দ তার ‘ভক্তি-পথে শব্দের কার্যকারিতা’য় লিখেছেন- “…ক্রুদ্ধ হইলে আমরা সংযুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণ ব্যবহার করি- ‘আহাম্মক’, ‘মূর্খ’ ইত্যাদি; আবার দুঃখিত হইলে কোমল হ্রস্ব স্বরবর্ণ উচ্চারণ করি- ‘আহা!’ এগুলি অবশ্য ক্ষণিক মনোভাব মাত্র; কিন্তু প্রেম, শান্তি, স্থৈর্য, আনন্দ, পবিত্রতা প্রভৃতি সকল ধর্মেই কতকগুলি চিরন্তন মনোভাব আছে।

ঐ-সকল ভাব প্রকাশ করিবার বিশিষ্ট শব্দরাশি আছে। মানুষের উচ্চতম ভাবরাশির একমাত্র প্রতীক হইতেছে শব্দ। শব্দ চিন্তা হইতে জাত। আবার এই শব্দগুলি হইতে চিন্তারাশি বা ভাবরাশি জাত। এখানেই শব্দের সাহায্য প্রয়োজন। এরূপ শব্দগুলির প্রত্যেকটি শব্দ যেন এক-একটি প্রতীক।

এ-সকল রহস্যপূর্ণ পবিত্র শব্দরাশি আমরা জানি এবং বুঝিতে পারি, কিন্তু কেবল গ্রন্থাদিতে পড়িলেই ঐগুলি আমাদের উপর কোন প্রভাব বিস্তার করিতে পারিবে না। শব্দগুলি ভাবপূর্ণ হইলে এবং সাধনা করিয়া যিনি স্বয়ং ভগবানের স্পর্শ লাভ করিয়াছেন এবং এখনও ভাগবত জীবন যাপন করেন, এরূপ ব্যক্তির স্পর্শ থাকিলে ঐগুলি ফলপ্রদ হয়।”

প্রত্যেক ধর্ম-দর্শন প্রবক্তা তাদের মতাদর্শ নিজ নিজ অনুসারীদেরই নয় সমগ্র মানবজাতীর জন্য দিয়ে গেছেন শব্দে। আর যা বুঝতে গেলে শব্দের পথ ধরে যেতে হয় নি:শব্দের ঘরে। ফকির লালন সাঁইজি বলেছেন-

শব্দের ঘরে নিঃশব্দ করে
সদাই তাঁরা আছে জুড়ে
দিয়ে জীবের নজরে
ঘোর টাটি
পরের হাতে কল কাঠি
খুজে ধন পাই কি আমি
শতক তলা মাল কুঠরি।।

আপন ঘরে পরের কারবার
আমি দেখলাম না রে তার বাড়ি ঘর
আমি বেহুশ মুটে
তার মুট খাটি
পরের হাতে কলকাঠি
খুজে ধন পাই কি আমি
শতক তলা মাল কুঠরি।।

থাকতে রতন ঘরে
এই কি বেহাত আজ আমারে
ফকির লালন বলে
মিছে ঘর বাটি
পরের হাতে কলকাঠি
খুজে ধন পাই কি আমি
শতক তলা মাল কুঠরি।।

বিদায় হজে ইসলামের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মোহাম্মদ (সা) মানবজাতির কর্তব্য সম্পর্কে বলে দিয়ে গেছেন। কৃষ্ণ কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে ভক্ত অর্জুনের মাধ্যমে সমগ্র মানবজাতিকে দিয়ে গেছেন সাধনের বার্তা। অষ্টবক্র তার জ্ঞান ভক্ত রাজা জনককে বলেছেন যা পরিচিত ‘অষ্টবক্র গীতা’ নামে।

(চলবে…)

পরবর্তী পর্ব >>

……………………
আরো পড়ুন:
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-২
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৩
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৪
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৫
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৬
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৭
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৮
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৯
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১০
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১১
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১২
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১৩
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১৪
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১৫

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!