ভবঘুরেকথা
শব্দের মায়াজাল

-মূর্শেদূল মেরাজ

জ্ঞানেন্দ্রিয় শব্দ : শব্দের মায়াজাল: তেরোতম পর্ব

অনেক সময় দেখা যায় কেবল নামের বিচারে অনেক শিল্প কালোর্ত্তীণ হয়ে রয়ে যায়। কোনো কোনো বইয়ের নাম মানুষ ভুলতে পারে না কোনো কালেই। এ সবই শব্দের মায়াজাল। শব্দের খেলা ও প্রতিকৃয়া রূপ।

আবার কোনো কোনো বই এর নাম এতো জনপ্রিয়তা পায় তা হয়তো সকলে পড়েনি কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ তার নাম জেনে আসছে। একই কথা খাঁটে শিল্পের অন্যান্য মাধ্যমের ক্ষেত্রেও।

নাম কোনো কিছুর কতটা যথাযথ তা নিয়ে তর্ক চলতেই পারে। হয়তো একই নামে একটা নদী আছে, সেই নামেই একটা বাস বা উড়োজাহাজের নাম আছে, হয়তো একটা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নামও তাকে কেন্দ্র করেই রাখা হয়েছে। এমনকি কারাগারের নামও হতে পারে।

আবার সেই নামটিই অসংখ্য মানুষের নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তার মধ্যে কে বা কারা এই নামের যর্থাথতা রক্ষা করতে পারে সেটা ভিন্ন আলোচনা। তবে নাম তথা শব্দ যে একটা গুরুত্ব বহন করে তা এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।

আবার জাতে উঠবার জন্যও অনেকে নিজের বা নিজ সন্তানের এমন নাম রাখতে চান যাতে সে সমাজে একটা অবস্থান তৈরি করতে পারে। ধর্মান্তরিত অনেকের মাঝেই এর প্রবণতা দেখা যায়। যদিও অনেক ধর্মেই নতুনরা কি কি নাম বা পদবীর শব্দ ব্যবহার করতে পারবে তাও থাকে নির্দিষ্ট।

এক সময় কেবল পূর্বপুরুষের নামের পদবীই বংশপরম্পরায় ব্যবহারের সক্ষমতা ছিল বিভিন্ন সম্প্রদায়ে। তার অনেকটা এখনো প্রচলিত থাকলেও। এই নিময় ভাঙতে আধুনিক চিন্তার মানুষ আর পিছপা হয় না। তবে নামের পদবীতে কি ‘শব্দ’ আছে তা আজো বেশ গুরুত্ব বহন করে সাধারণের মাঝে। কারণ তা দিয়েই তারা সামাজিক অবস্থান নির্ণয় করে থাকে।

ধর্মান্তরিতদের মাঝে উচ্চবর্গের পদবীর শব্দ নামের সাথে জুড়ে নেয়ার একটা রেওয়াজও ইতিহাসে পাওয়া যায়। তাতে তারা নিজেদেরকে শাসকশ্রেণী বা প্রভাবশালীদের সমকক্ষ হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করতো। এখনো তা যে ঘটে নি তা অবশ্য নয়।

তবে আগের মতো পদবীর শব্দ নিয়ে এখন সকল জায়গায় এতোটা বারাবারি না থাকায় তাতে উৎসহ কিছুটা ভাটা পরেছে। একটা সময় ছিল যখন পদবীর শব্দের উপর ভিত্তি করেই নির্দিষ্ট হতো কে কতটা যেতে পারবে। আর কাকে দরজার বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।

শব্দ এভাবে প্রতিনিয়ত নিজেই নিজেকে নিয়ে খেলে। আবার শব্দ নিয়ে পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে আছে নানান খেলা। শব্দজট নিয়ে লেখা হয়েছে নানা গল্প-কবিতা-উপন্যাস। হয়েছে নাটক-সিনেমা-যাত্রাপালা। নির্মিত হয়েছে বহুরূপ খেলনা। এসবের মধ্যে ‘ক্রস ওয়ার্ড’, ‘ওয়ার্ড পাজেল’, ‘সুডোকু’ ইত্যাদির জনপ্রিয়তা বিশ্বজোড়া।

এসব খেলায় সাধারণত মাথা খাঁটিয়ে নানান মারপ্যাঁচে অক্ষরের সাথে অক্ষর মিলিয়ে অর্থবোদক শব্দ তৈরি করে বিজয়ী হয় একজন। এসব খেলা যে কেবল কাগজে লিখে-এঁকে বা খেলনা জোগে হয় তাও নয়। মুখে মুখেও পরপর শব্দ বলে সে শব্দগুলোকে মনে রাখা নিয়েও নানার খেলার প্রচলন আছে।

অনেকজন মিলে একটা শব্দের সাথে আরেকটা শব্দ জুড়ে শব্দের মালা গেঁথে চলতে থাকে সেসব খেলা। এসব শব্দের খেলায় বুদ্ধিমত্তার যেমন প্রয়োজন হয়, তেমনি গুরুত্ব বহন করে স্মরণশক্তি।

সত্যজিৎ রায় তার অন্যতম সৃষ্টি ফেলুদার ‘বাদশাহী আংটি’ গল্পে বনবিহারীবাবুকে দিয়ে শব্দের প্রচলিত একটা খেলা এই ভাবে ব্যক্ত করেছেন, ‘Steal মানে হরণ, Horn মানে শিং, Sing গান, Gun মানে কামান, Come on মানে আইস, I saw মানে আমি দেখিয়ছিলাম-এটা জানো?’

আমরা যেমন বানান মনে রাখার জন্য একসময় বিদেশী শব্দের বাংলা করে মনে রাখার জন্য পড়তাম- ‘আমার মানুষ গান গায়’ অর্থাৎ Mymansing। বাবা মোগল সাম্রাজ্যের শাসকদের ক্রম মনে রাখবার জন্য পড়তাম- ‘বাবার হইল একবার জ্বর সারিল ঔষধে’।

এর প্রতিটা শব্দের প্রথম অক্ষর দিয়ে ক্রম ধারাবাহিকভাবে মনে রাখা সহজ হতো- বাবর, হুমায়ুন, আকবর, জাহাঙ্গির, শাহজাহান ও আওরঙ্গজেব।

তবে শব্দের খেলায় সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো- ‘ধাঁধা’। এটা মূলত শব্দের ফেঁদে ফেলে এক ধরনের প্রশ্ন করা। যা বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সমাধান করতে হয়। এই ধাঁধা কেবল ছেলেপিলেদের নিছক মজা করার জন্যই রচিত হয়নি। এই ধাঁধার খেলায় রাজা-মহারাজারাও মেতে উঠে।

পৃথিবীজুড়ে জটিল সব ধাঁধা রচিত হয়েছে। এই ধাঁধা যে কেবল শিল্পী-সাহিত্যিক রচিত করেছেন তা কিন্তু নয়। ধর্মগুরু থেকে শুরু করে বিজ্ঞানীরাও নানান মজার মজার শব্দের ধাঁধার জন্ম দিয়েছেন।

বিজ্ঞানীর আইন্সটাইনের একটি ধাঁধা জগদ্বিখ্যাত হয়ে আছে। ১৫টি সূত্র দিয়ে তৈরি করা এই ধাধায় পাঁচটি পাঁচটি ভিন্ন দেশের নাগরিকের পাঁচটি ভিন্ন রঙের বাড়ির মালিককে কেন্দ্র করে। সূত্রগুলো হলো-

১. ব্রিটিশ বাস করে লাল রঙের বাড়িতে।
২. সুইডিশের কাছে রয়েছে কুকুর।
৩. ড্যানিশ চা পান করে।
৪. সবুজ রঙের বাড়িটি সাদা বাড়ির বাম পাশে অবস্থিত।
৫. সবুজ রঙের বাড়ির ব্যক্তি কফি পান করে।
৬. যে ব্যক্তি পল মল সিগারেট খায় তার রয়েছে পোষা পাখি।
৭. হলুদ রঙের বাড়ির মালিক ডানহিল সিগারেট খায়।
৮. মাঝের বাড়ির ব্যক্তি দুধ পান করে।
৯. নরওয়েজিয়ান বাস করে প্রথম বাড়িতে।
১০. যে ব্যক্তি ব্লেন্ড সিগারেট খায় সে বিড়াল পোষা বাড়ির পাশে থাকে।
১১. যে ব্যক্তির পোষা ঘোড়া রয়েছে সে ডানহিল সিগারেট খাওয়া ব্যক্তির পাশে থাকে।
১২. যে ব্যক্তি ব্লুমাস্টার সিগারেট খায় সে বিয়ারও পান করে।
১৩. জার্মান ব্যক্তি প্রিন্স সিগারেট খায়।
১৪. নরওয়েজিয়ান ব্যক্তি নীল বাড়ির পাশে থাকে।
১৫. যে ব্যক্তি ব্লেন্ড সিগারেট খায় তার পাশের বাড়ির ব্যক্তি পানি পান করে।

প্রশ্ন- পোষা প্রাণী হিসেবে মাছ পালন করে কোন ব্যক্তি?

অন্যদিকে সত্যজিৎ রায় তার বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র ফেলুদার অপরাধ বিশ্লেষণে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন মগজাস্ত্রে। আর এই মগজাস্ত্র ব্যবহার করে ফেলুদা ‘ঘুরঘুটিয়ার ঘটনা’য় সমাধান করে ফেলেন এক শব্দের ধাঁধার।

এই ধাঁধার ভেতর দিয়ে ব্রিটিশরা সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থের শব্দ ব্যবহার করেও কি করে বাঙালীদের সাথে কথা বলার প্রকৃয়া বের করেছিলেন তা উঠে এসেছে। সত্যজিৎ রায় লিখছেন-

স্পষ্ট শুনলাম ফেলুদা বলল, দেয়ার ওয়াজ এ ব্রাউন ক্রো।

আমি কনুইয়ের ভর করে উঠে বসলাম, ব্রাউন ক্রো? কাক আবার ব্রাউন হয় নাকি? এ সব কী আবোল-তাবোল বকছ ফেলুদা?

…এদেশে এসে সাহেবরা যখন গোড়ার দিকে হিন্দি শিখত, তখন উচ্চারণের সুবিধের জন্য কতগুলো কায়দা বার করেছিল! দেয়ার ওয়জ এ ব্রাউন ক্রো-এই কথাটার সঙ্গে কিন্তু বাদামি কাকের কোনও সম্পর্ক নেই।

এটা আসলে সাহেব তার বেয়ারাকে দরজা বন্ধ করতে বলছে- ‘দরওয়াজা বন্ধ করো’। এই ত্রিনয়নের ব্যাপারটাও কতকটা সেই রকম! গোড়ায় ত্রিনয়নকে তিন ভেবে বার বার হোঁচট খাচ্ছিলাম।

সে কী? ওটা তিন নয় বুঝি? আমিও তো। ওটা তিন ভাবছিলাম।

উঁহু। তিন নয়। ত্রিনয়নের ত্রি-টা হল তিন। আর নয়ন হল নাইন। দুইয়ে মিলে থ্রি-নাইন। ত্রিনয়ন ও ত্রিনয়ন হল ত্রি-নাইন-ও-থ্রি-নাইন। এখানে ও মানে জিরো অর্থাৎ শূন্য।

আমি লাফিয়ে উঠলাম। তা হলে একটু জিরো মানে- এইট-টু-জিরো। জলের মতো সোজা। সুতরাং পুরো সংখ্যা হচ্ছে- থ্রি-নাইন-জিরো-থ্রি-নাইন-এইট-টু-জিরো।

কেমন, ঢুকাল মাথায়?

শব্দের খেলাটাই আসলে এখানে। অর্থ ভিন্ন হলেও তা একটা ধারণা তৈরি করে। আর ঐ ধারণাকে কেন্দ্র করেই সাধারণ মানুষ শব্দকে অনুসরণ করে।

শব্দের যেমন সংস্কার আছে তেমনি আছে কু-সংস্কার। যেমন বাঙালীরা চলে যাওয়ার সময় যদি বলে ‘যাই’। তৎক্ষণাৎ বয়োজ্যেষ্ঠরা দাঁত কেটে বলবেন, আরে না না। যাওয়ার সময় যাই বলতে নেই। বলতে হয় আসি। আবার কাউকে ডাকলে, সে আসছি না বলে অনেক সময়ই বলে ‘যাই’। এরকম বহু উদাহরণ বাংলাভাষাতেই পাওয়া যায়।

আবার কিছু শব্দ বিশেষ বিশেষ সময় উচ্চারণে থাকা মানা। এটা আইনের বিধিনিষেধ না হলেও পারিবারিক বা সামাজিক বিধান বা সংস্কার বলা যেতেই পারে। যেমন রাতের বেলা অনেকে ‘ভূতপ্রেতে’র নাম উল্লেখ করতে চান না। ‘সুই’ কে রাতে অনেক সুই না বলে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকে। সাপকে রাতে অনেকে বলে লতা। ইত্যাদি ইত্যাদি।

শব্দের আরেকটা প্রচলিত ব্যবহার হলো ‘কৌতুক’ বা ‘হাস্যরস’। শুনতে খুব সহজ মনে হলেও কৌতুক সকলে করতে পারেন না। রসবোধ না থাকলে হাস্যরস করা বেশ কঠিন।

(চলবে…)

পরবর্তী পর্ব >>

……………………
আরো পড়ুন:
শব্দের মায়াজ্বাল: পর্ব-১
শব্দের মায়াজ্বাল: পর্ব-২
শব্দের মায়াজ্বাল: পর্ব-৩
শব্দের মায়াজ্বাল: পর্ব-৪
শব্দের মায়াজ্বাল: পর্ব-৫
শব্দের মায়াজ্বাল: পর্ব-৬
শব্দের মায়াজ্বাল: পর্ব-৭
শব্দের মায়াজ্বাল: পর্ব-৮
শব্দের মায়াজ্বাল: পর্ব-৯
শব্দের মায়াজ্বাল: পর্ব-১০
শব্দের মায়াজ্বাল: পর্ব-১১
শব্দের মায়াজ্বাল: পর্ব-১২
শব্দের মায়াজ্বাল: পর্ব-১৩
শব্দের মায়াজ্বাল: পর্ব-১৪
শব্দের মায়াজ্বাল: পর্ব-১৫

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!