শব্দের মায়াজাল: পনেরোতম পর্ব

শব্দের মায়াজাল: পনেরোতম পর্ব

-মূর্শেদূল মেরাজ

জ্ঞানেন্দ্রিয় শব্দ : শব্দের মায়াজাল: পনেরোতম পর্ব

তবে ই-মেইল, ম্যাসেজ বা ক্ষুদেবার্তায় সেই রস পাওয়া মুশকিল। একসময় রাজা রাজরাদের বিভিন্ন বার্তা ফরমান নিয়ে অশ্বারোহী ছুটে যেতো দূর বহুদূরে। সেই লিখিত বার্তা পাঠাতে পাখির ব্যবহারও ইতিহাসে পাওয়া যায়।

পরবর্তী চাকা আবিস্কারের পর ডাক পায় নতুন রূপ। ডাকবিভাগ মানুষের কথা তথা শব্দ দূরবর্তী নির্দিষ্ট মানুষকে পৌঁছে দেয়ার কাজ করেছে বহুকাল। সেসব এখন স্মৃতি মাত্র।

সেই কত কত কাল আগে আবিষ্কৃত শব্দের লিখিত রূপ পাথর, বৃক্ষ, বৃক্ষছাল, পশুর চামড়া, কাপড়, কাগজ পেরিয়ে কিবোর্ডে পৌঁছেছে। এর মাঝে টাইপ, মুদ্রণ যন্ত্র সহ কত কিছুর আবিষ্কার যে একে এগিয়ে নিতে অবদান রেখেছে, সেই হিসাবের তালিকাও বেশ লম্বা।

চলচ্চিত্র, টিভি, রেডিও এবং এরূপ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার শব্দকে দেয় নতুন মাত্রা। অন্যদিকে পাথর খণ্ড, তালপাতা পেরিয়ে কাগজের বই, সংবাদপত্র, ডিজিটাল স্ক্রীন শব্দকে দিয়েছে লিখিত রূপের প্রাণবন্ত স্বরূপ।

প্রযুক্তিবিদরা এরূপ নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে অনেক মানুষের কাছে নির্দিষ্ট শব্দকে পৌঁছে দেয়ার এই পথ উত্তর-উত্তর এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তবে এটা কেবলই মাধ্যম মাত্র। শব্দ তার নিজের গতিতেই চলে। নিজের প্রকৃতিতেই অবস্থান করে। শব্দ তার রহস্য নিজের মধ্যেই গুপ্ত রেখে রহস্যময়ই থেকে যায়।

বিজ্ঞান বলে মহাবিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে এই দৃশ্যমান জগতের সৃষ্টি। আবার আধ্যাত্মবাদের একটা অংশ বলে শব্দ থেকেই জগতের সৃষ্টি। এই দুই মতের মধ্যেই শব্দের এক বিশাল ভূমিকা বিদ্যমান। আর এই জ্ঞানেন্দ্রিয় ‘শব্দ’ এই ব্রহ্মাণ্ডকে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে আছে যে তাকে নিয়ে গুছিয়ে কিছু বলা প্রায় অসম্ভব।

আসলে আমাদের জীবনে শব্দের এতো বহুমুখী ব্যবহার যে, এর কথা বলে বা লিখে শেষ করা যাবে না। শব্দের ভেতর দিয়ে শব্দকে বাঁধা তাই মোটেও সহজ নয়। এই লেখায় জ্ঞানেন্দ্রিয় শব্দের কিছু দিক সম্পর্কে সামান্য আলোচনার চেষ্টা করা হলো মাত্র।

যাতে শব্দের তত্ত্ব, শব্দের রাজনীতি, শব্দের ষড়যন্ত্র, শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন উঠে আছে। এর বেশি কিছু নয়।

এই লেখা মূলত জ্ঞানেন্দ্রিয় ‘শব্দ’ অর্থাৎ শব্দের মায়াজালকে নিয়ে হলেও এর সাথে জড়িত আরো অনেক কিছু নিয়েই লিখতে হলো। অল্প শব্দে ধরা দিলো না সকল কথা। তার সাথে জড়িয়ে কত শব্দই না ব্যক্ত হলো। আবার কত শব্দই অব্যক্ত রয়ে গেলো। আবার কতো শব্দ তার মাঝে অনেক অনেক শব্দ গুপ্ত করে রাখলো।

যা জিজ্ঞাসুদের জন্য ইশারা হয়ে রইলো। জিজ্ঞাসুরা ঠিকঠিকই তার পিছনে হাঁটবে নতুন কিছু শব্দের সন্ধানে। আবার অনেকে এতো সব শব্দ না পড়েই এই লেখা নিয়ে কয়েক শব্দের মূল্যায়ন নির্ধারণ করবে। আবার কেউ ভাষাই খুঁজে পাবে না।

বক্তা যেমন তার দীর্ঘ বক্তব্য দেয়ার পর বলেন আর দু’চার কথা বলে বক্তব্য শেষ করবো। তখন উপস্থিত জনতা বুঝতে পারে কেউ এসে না থামালে এ বক্তব্য শেষ হবে না। কারণ এরে আগেও দু-চার কথা বলতে গিয়ে ঘণ্টার পার করেছেন।

বিষয়টা তেমনি, অল্পে মনের ভাব প্রকাশ করার সাধ্য সকলের থাকে না বা হয় না। অল্পে ভাব প্রকাশের যে কথা তা সকলে রপ্ত করতে পারে না। আর তা আমার মতো অজ্ঞানীর পক্ষে ধারণ করা তো অসম্ভব তা যে কেহই বলতে পারবে। বিষয়টি গীতিকার ও শিল্পী গুরুপদ গুপ্ত সুন্দর করে লিখেছেন-

ও মানুষ…. মানুষ…
দুডো চোক আর দুডো কান,
দেকপা আর শোনবা
এট্টা মুক তো, কথা কম কবা।।

কিন্তু কে মানে কার কথা। কেবল কথা বলতে দেয়া হয় না বলেই তো আমরা কত কত সঙ্গ ত্যাগ করে অন্যত্র হাঁটা দেই। আবার উল্টোটাও হয় অধিক কথা থেকে বাঁচতেও আমরা জমা উঠা মজমা ত্যাগ করি। অধিক কথা বললে লোক বলে মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আবার নিরব হলে মানুষ বলে কি মশাই ডিপ্রেসনে পরলেন নাকি!

তাই কয়েকটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলে এ যাত্রায় লেখাটা শেষ করাই সমীচীন বলে মনে হচ্ছে-

সাধুর হাটে ঘুড়তে গিয়ে দেখেছি, যে সাধুগুরু কথা কম বলেন বা বলেনই না। তার ভক্তকুল হয় বিনয়ী-নম্র। তুলনামূলক প্রেমময়। আবার যে গুরু প্রচুর কথা বলেন, তার ভক্তরা যে বিনয়ী-নম্র হয় না তা নয়।

তবে সাধারণ বিচারে দেখা যায় অধিক কথা বলা গুরুর ভক্তকুল পরস্পর দ্বন্দ্বে জড়িয়ে থাকে অধিক হারে। কোনো কিছু মেনে নেয়ার প্রবণতা তাদের মধ্যে তুলনামূলক কম।

আবার যে সাধু কথা বলেন কিন্তু তা অত্যন্ত ভাব-গাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে বা প্রতি শব্দের পর একটা দৃঢ়তার নি:স্তব্দতার নিশ্চুপতা থাকে। তার ভক্তকুলের মাঝে কোনো কিছুকে শুনবার বা জানবার বা বুঝবার মধ্যে একটা আগ্রহ ও দৃঢ়তা গড়ে উঠে।

আবার যে সাধুগুরু রসিকতায় ডুবে থাকেন তার ভক্তকুলের মাঝে প্রেমভাব প্রগাঢ় হয় যদি সাধু হন নিরহংকারী ও উদার। অন্যে কি করলো তা নিয়ে মাথা ঘামান না।

কিন্তু যে সকল গুরু সর্বক্ষণ ভক্তদের মাঝে- অন্যরা কি ভুল করছে। অন্যরা কি করছে তা নিয়ে ঠাট্টা তামাশায় মগ্ন থাকেন। তাদের ভক্তদের মাঝে তৈরি হয় সন্দেহ প্রবণতা।

এ সকল গড়পড়তা কথাবার্তা সকলের সাথেই মিলবে এমন কথা নয়। তবে সাধুগুরুরা বলেন, মানবদেহের সপ্তচক্রের, নিচ থেকে উপরের দিকে পঞ্চম চক্র হলো ‘বিষূদ চক্র’। গলার ঠিক নিচে কণ্ঠের মাঝে এই চক্রের অবস্থান। আর এই বিষূদ চক্র উন্মুক্ত বা জাগ্রত হলেই সাধকের বাক্য নিয়ন্ত্রণ হয়।

এই চক্র জাগ্রত হলে- শব্দ উচ্চারণ, শব্দ চয়ন, শব্দের ব্যবহার, অনাবশ্যক শব্দ প্রত্যাহার, রুচিকর শব্দের প্রয়োগ, শব্দহীন ভাষার ব্যবহার সবই সাধকের আয়াত্বে চলে আসে। সাধক হয়ে উঠে বাক্যশুদ্ধ। সত্য ও সঠিক শব্দ বা নি:শব্দই হয় তার ভাষা।

শব্দের প্রকাশে যেমন মনের ভাব প্রকাশ করা যায় সহজেই তেমনে একথাও কেহই অস্বীকার করবে না যে, যে জন নিরবতার মধ্য দিয়ে তার ভাব বোঝাতে সক্ষম তার ভাব সবচেয়ে গভীর ও প্রগাঢ় হয়। তাই হয়তো আমরা কোনো কিছুকে বুঝতে গেল নিবরতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বলেছেন-

‘দোহাই তোদের একটুকু চুপ কর, ভালোবাসিবারে দে আমারে অবসর।’ (শেষের কবিতা)

এই লেখা কোথাও শেষ করা মুশকিল। কারণ এটা চক্রাকারে ঘুরতেই থাকবে। তাই নিরুপায় হয়ে জীবনানন্দের দ্বারস্থ হলাম। তার কাব্য দিয়েই শেষ করছি। জয়গুরু।।

জীবনানন্দ দাশের ‘সূর্যতামসী’ কবিতা-

কোথাও পাখির শব্দ শুনি;
কোনো দিকে সমুদ্রের সুর;
কোথাও ভোরের বেলা র’য়ে গেছে – তবে।
অগণন মানুষের মৃত্যু হ’লে

অন্ধকারে জীবিত ও মৃতের হৃদয়
বিস্মিতের মতো চেয়ে আছে;
এ কোন সিন্ধুর সুর:
মরণের – জীবনের?
এ কি ভোর?
অনন্ত রাত্রির মতো মনে হয় তবু।
একটি রাত্রির ব্যথা সয়ে –
সময় কি অবশেষে এ-রকম ভোরবেলা হয়ে
আগামী রাতের কালপুরুষের
শস্য বুকে ক’রে জেগে ওঠে?
কোথাও ডানার শব্দ শুনি;
কোন দিকে সমুদ্রের সুর-
দক্ষিণের দিকে,
উত্তরের দিকে,
পশ্চিমের পানে?

সৃজনের ভয়াবহ মানে;
তবু জীবনের বসন্তের মতন কল্যাণে
সূর্যালোকিত সব সিন্ধু-পাখিদের শব্দ শুনি;
ভোরের বদলে তবু সেইখানে রাত্রি করোজ্জ্বল
ভিয়েনা, টোকিও, রোম, মিউনিখ – তুমি?
সার্থবাহ, সার্থবাহ, ওইদিকে নীল
সমুদ্রের পরিবর্তে আটলাণ্টিক চার্টার নিখিল মরুভূমি!
বিলীন হয় না মায়ামৃগ – নিত্য দিকদর্শিন;
যা জেনেছে – যা শেখেনি –
সেই মহাশ্মশানের গর্ভাঙ্কে ধূপের মত জ্ব’লে
জাগে না কি হে জীবন – হে সাগর –
শকুন্ত-ক্রান্তির কলরোলে।

(সমাপ্ত)

……………………
আরো পড়ুন:
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-২
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৩
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৪
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৫
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৬
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৭
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৮
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৯
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১০
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১১
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১২
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১৩
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১৪
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১৫

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!