শব্দের মায়াজাল: অষ্টম পর্ব

শব্দের মায়াজাল: অষ্টম পর্ব

-মূর্শেদূল মেরাজ

জ্ঞানেন্দ্রিয় শব্দ : শব্দের মায়াজাল: অষ্টম পর্ব

অন্যদিকে ফকির লালন সাঁইজি বলছেন-

আপনার আপনি ফানা হলে
সে ভেদ জানা যাবে,
কোন নামে ডাকিলে তারে
হৃদাকাশে উদয় হবে।।

আরবী ভাষায় বলে আল্লাহ
ফারসীতে কয় খোদাতালা,
গড বলিছে যীশুর চেলা
ভিন্ন দেশে ভিন্নভাবে।।

মনের ভাব প্রকাশিতে
ভাষার উদয় এ জগতে,
মনাতীত অধরে চিনতে
ভাষাবাক্য নাহি পাবে।।

আল্লাহ হরি ভজন পূজন
এ সকল মানুষের সৃজন,
অনামক চেনায় বচন
বাগেন্দ্রিয় না সম্ভবে।।

আপনাতে আপনি ফানা
হলে তারে যাবে জানা,
সিরাজ সাঁই কয় লালন কানা
স্বরূপে রূপ দেখ সংক্ষেপে।।

আমরা ধরেই নিয়েছি আমাদের প্রয়োগ করা শব্দেই লুকিয়ে আছে শ্রেষ্ঠত্ব-মাহাত্ম্য। এর বাইরে গেলেই বিপদ। কিন্তু আমরা ভুলে যাই ধারিত্রীর বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষ তার নিজস্ব ভাষা খুঁজে নিয়েছে নিজেদের মতো করেই। প্রত্যেক শব্দই তার নিজ নিজ উৎপত্তি স্থলের জন্য যথাযথ বা প্রকৃতজাত।

গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যাবে সেই সকল শব্দ পৃথক পৃথক স্থানে জন্ম নিলেও তাদের যথেষ্টও মিলও আছে। আবার শব্দ পৃথিবীময় ঘুরে ঘুরে আদি শব্দের রূপ পাল্টে নতুন শব্দের জন্ম দিয়েছে। আবার একই শব্দ একের দেশে একেক ভাষাভাষীর মুখে উচ্চারণেও ভিন্নতার ছোঁয়া পেয়েছে।

তাই এখানে তৈরি হচ্ছে নতুন দ্বন্দ্ব। শব্দ গুরুত্বপূর্ণ নাকি এর ভাব গুরুত্বপূর্ণ? যদি শব্দ গুরুত্বপূর্ণ হয় তাহলে আমরা একই শব্দের ভিন্ন ভিন্ন ব্যবহার কেনো ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করি?? আর যদি ভাব গুরুত্বপূর্ণ হয় তাহলে আমরা সকল শব্দকে তার যথাযথ সম্মান কেনো দিতে পারি না? কোন রাজনীতি আমাদের পায়ে শেকল পড়ায়?

এ রকমই নানামুখি শব্দের ব্যবহারের আরেকটা হলো- ‘হুকুম জারি’। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। আমরা আচরণ বা ব্যবহার দ্বারা একে অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই সত্য, কিন্তু শব্দের গাঁথুনিতে তা সবচেয়ে বেশি কার্যকর। আইন-কানুন, রীতিনীতি সবই সবই লিপিবদ্ধ করে রাখা হয় শব্দের লিখিত রূপ দ্বারা।

আর সেই শব্দকে অতিক্রম করলেই রাষ্ট্রের আইনের ফাঁদে পরতে হয়। পদের বলে একই শব্দ আবার পাল্টে যায়। একই শব্দ কোথাও অনুরোধ কোথাও হুকুম আবার কোথাও হাস্যরস মাত্র। একই শব্দ হাকিম বললে হয়ে যায় হুকুম। তা মানতে বাধ্য হতে হয়। নয়তো আসতে হবে শাস্তির আওতায়।

সেই একই শব্দ পরিচিত অন্য কেউ বললে হয়তো ততটা গুরুত্ব পায় না। এর সবচেয়ে যথাযথ উদাহরণ হতে পারে ‘গালমন্দ’ বা ‘গালাগালি’,। অপরিচিত কেউ যদি আপনাকে রাগবশত গালাগাল দেয়। তাহলে আপনি তাতে চরম অপমানিত তো বোধ করবেনই; পাশাপাশি ক্রোধে ফেটে পরবেন।

আর যদি আপনি তারচেয়ে প্রভাবশালী নিজেকে মনে করেন তাহলে হয়তো কয়েকটা গালাগাল আপনিও দিয়ে ফেলবেন।

কিন্তু একই বিষয় যদি হাস্যরসের সাথে হয় বা বহুদিনের পরিচিত কেউ ঘটায়, তাহলে দেখবেন বিষয়টাকে আপনি ঠিক পাত্তা দিচ্ছেন না। একই শব্দ ভিন্ন পরিবেশ-পরিস্থিতি ও মনস্থিতিতে তার চরিত্র পাল্টে নিতে যথেষ্ট পটু। নয়তো ভেবে দেখুন গালাগাল কিন্তু একই ছিল কিন্তু প্রতিকৃয়া কতটাই না ভিন্ন।

গালাগালের আরেকটা যথার্থতা আছে। মানুষ সাধারণত ক্রোধে-উত্তেজনায় রাগ প্রশমন করতে না পেরে গালাগালা দিয়ে থাকে। এতে তার ভেতরের চাপা ক্ষোভ-দু:খ-অব্যক্ত কথা বেড়িয়ে এসে তাকে স্বস্তি দেয়। এটা মূলত শব্দের একটা উত্তেজিত রূপ।

যদিও বা অনেকের ভাষার সাথেই মিশে থাকে গালাগাল। আমাদের ঢাকার আঞ্চলিক ভাষার কোনো কোনো সম্প্রদায়ের মাঝে এর ব্যবহার দেখা যায়। তবে তা ভাষারই অঙ্গরূপে প্রকাশিত হয় বেশিভাগ সময়। সেগুলোকে ঠিক গালাগাল বলা কঠিন হয়ে যায়।

আবার কারো কারো স্বভাবই এমন যে। তারা প্রচলিত সমাজ যাকে ‘মন্দ’ বলে তেমন শব্দের প্রয়োগে পুলকিত বোধ করে। কেউ কেউ এ কাজটি করেন খুব সচেতন ভাবে, প্রথা ভাঙবার জন্য। তবে বেশিভাগই করে থাকেন সঙ্গদোষে বা সঙ্গগুণে। অর্থাৎ পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রভাবে।

আবার শব্দের সাথে আচরণ জড়িয়ে থাকে। যেমন শব্দ উচ্চারণ করতে করতে মানুষ তার আচরণ পাল্টে ফেলে। শব্দ লিখতে লিখতেও অনেক সময় তেমনটা হয়। এমনকি শব্দ পড়তে পড়তে উত্তেজনায় মানুষ তার আচরণ পাল্টে ভিন্ন আচরণ করতে থাকে।

গৌতম বুদ্ধ বলেছেন, ‘রাগের বশে হাজারও শব্দকে খারাপভাবে বলার থেকে ভালো মৌনতা হচ্ছে এমন একটা শব্দ, যেটা জীবনে শান্তি নিয়ে আসে।’

শব্দের এমনি মায়াবিনী শক্তি অর্থাৎ শব্দের মায়াজাল এমনি এক শক্তি তার মাঝে লুকিয়ে বা অব্যক্ত অবস্থায় রেখে দেয়। মাস্টার মশাই ক্রোধে উত্তেজনায় থরথর করে কাপতে কাপতে যখন শিক্ষার্থীর দিকে এগিয়ে যায়। তখন গোবেচারা ভীত শিক্ষার্থী শব্দ হারিয়ে ফেলে। আবার অধিক আনন্দে মানুষ বলে উঠে, কি বলবো ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না।

সাধন পথে অনেকেই নামের সাথে নানাবিধ উপাধি যোগ করে থাকে নিজ নিজ সাধন ধারা অনুযায়ী। যদিও নিয়মতান্ত্রিক ভাবে এই সকল উপাধি কেবল গুরুর আদেশেই শিষ্য তার নামে যুক্ত করে প্রচারের অধিকার রাখে।

তারপরও অনেকেই নিছক শখের বশে বা না বুঝেই কিংবা যার তার কাছ থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন উপাধি নিজের নামে সাথে জুড়ে দিয়ে নতুন নাম ধারণ করে। লালন মতে না ডুবে, কেবল লালনের পদ গাইতে গাইতে অনেকেই এরকম নানা প্রকার পদবী বা উপাধি নিজের নামের সাথে যুক্ত করে নেয়।

সেগুলো তাদের সাধনার অগ্রযাত্রার সাথে কোনো সম্পর্ক থাকে না। কেবল তা নামের সাথে শব্দ হয়ে লটকে থাকে। যা বিভ্রান্তি ছড়ায়। যে সাধন বলে উপাধি প্রাপ্ত আর কে শখের বশে উপাধি ধারণ করেছে সাধারণের পক্ষে তা নির্ধারণ করা অসম্ভব হয়ে পরে প্রাথমিক অবস্থায়।

লালন পথে শখের বশে ব্যবহৃত এই শব্দগুলোর মধ্যে- বাউল, ফকির, সাধু, পাগল, খ্যাপা, শাহ্, সাঁই, সাঁইজি উল্লেখযোগ্য। যারা গুরু কর্তৃক বা সাধনার যাত্রাপথে এ সকল উপাধি হিসেবে প্রাপ্ত হন তাদের কথা বলছি না। কিন্তু যারা শখ করে নামের সাথে এ সব শব্দ জুড়ে দেন, তাদেরকে নিয়ে মনের মাঝে একটা সমালোচনা কাজ করতো।

পরবর্তীতে অনেক ভেবে দেখেছি, যদিও তারা সাধনার গুরু-শিষ্য পরম্পরার প্রচলিত ধারাকে পাশ কাটিয়ে নিজেই নিজের নামের বিশেষণ বসিয়েছে। তারপরও এটা তো মানতেই হবে যে, গুরু না দিলও এই নাম বহন করাও চাট্টিখানি কথা নয়। এর জন্য সমাজ-সংসার তো আর ছেড়ে কথা বলে না।

তাদেরকেও সহ্য করতে হয় কত না গঞ্জনা-বঞ্চনা। হতে হয় কুল হারিয়ে কলঙ্কিনী। তাই নামে-দামে যাই হোক না কেনো শুদ্ধতা যার মাঝে বিকাশ করে সর্বত্রকে গ্রাস করে নিয়ে মহান মহীমায় আলোকিত করে সেই সাধুত্ব লাভ করে। প্রকৃত সাধক হয়। সদ গুরু হয়। বাকিরা নাম সর্বস্ব রয়ে যায়।

নাম-গোত্র-জাত-কুল ধন-দরিদ্র, মোটা-চিকন, ফর্সা-কালো, সুদর্শন-কদাকার যে যেমনই হোক না কেনো দেহ-মন-আমি অর্থাৎ ইন্দ্রিয়-চিত্ত-আত্মা শুদ্ধ না হলে তার মাঝে সাধুত্ব বাস করে না। সাধুত্ব কেবল কোন শব্দ নয় শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ ধারণ করা এক শুদ্ধতার নাম।

এই শুদ্ধতায় ডুবতে না পারলে সেই যা দিয়ে শুরু করেছিলাম সেই জায়গাতেই বসে থাকতে হয়। অর্থাৎ শব্দের গভীরতায় না প্রবেশ করে পূর্ব ধারণায় একটা সিদ্ধান্তে আগেই উপনীত হতে হয়। এই যেমন আমিও উপাধির শব্দের পেছনে পড়েছিলাম কত কত দিন।

আসলে শুদ্ধতা না জাগলে – প্রেমভাব না উদয় হলে যেখান থেকে শুরু সেখানেই এসে থমকে দাঁড়াতে হয়। চলতে থাকে জন্ম জন্মান্তরের ঘূর্ণিপাক।

(চলবে…)

পরবর্তী পর্ব >>

……………………
আরো পড়ুন:
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-২
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৩
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৪
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৫
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৬
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৭
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৮
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৯
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১০
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১১
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১২
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১৩
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১৪
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১৫

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!