শব্দের মায়াজাল: পঞ্চম পর্ব

শব্দের মায়াজাল: পঞ্চম পর্ব

-মূর্শেদূল মেরাজ

জ্ঞানেন্দ্রিয় শব্দ : শব্দের মায়াজাল: পঞ্চম পর্ব

কারণ সাধারণত মানুষ যত শুদ্ধরূপে কোনো কিছু সম্পর্কে জানতে শুরু করে ততই বিনীত হতে শুরু করে। যারা কেবল কিছু তথ্য-উপাত্য জেনে নিজেকে জ্ঞানী বা পণ্ডিত শ্রেণী ভাবতে শুরু করে, তাদের মধ্যে প্রকাশ পায় অহংবোধ। অহং শব্দের মায়াজালে বন্দি হয় থাকে।

আর তা তাদের আচরণে যেমন প্রকাশ পায় তেমনি প্রকাশ পায় ভাষার ব্যবহার ও শব্দ চয়নেও। তাই কারো ভাষা, শব্দ, শব্দ চয়ন ও শব্দের ব্যবহার থেকে কারো সম্পর্কে ধারণা করাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়।

কথায় বলে, ‘অ-জায়গায় কলস কলস তেল ঢাললেও কোনো কাজ হয় না, যতটা হয় জায়গা মতো এক ফোট তেল দিলে।’ বিষয়টা এমনই। জায়গা মতো সঠিক শব্দের ব্যবহার আপনাকে যেমন বাঁচিয়ে দিতে পারে। তেমনি একটা ভুল শব্দের ব্যবহারে মারাত্মক বিপদ ঘটে যেতে পারে মুর্হূতেই।

এবার কিছু বাস্তবিক অভিজ্ঞতার কথা বলা যাক। আমি যবে থেকে আমার চলাচলকে কেবল আসা-যাওয়া থেকে একটু গভীরে ভাবতে শুরু শুরু করলাম। তবে থেকে আমি প্রথম যে বিষয়টা আবিষ্কার করলাম তা হলো, সাধন পথের প্রাথমিক গণ্ডিটার মূল খেলাই হলো শব্দগত।

বুঝতে শুরু করলাম, যথাযথ শব্দমালা যত দ্রুত শিখে নেয়া যাবে ততটাই সহজ হবে এ পথ এগিয়ে যেতে। তবে বিষয়টা সহজ নয়। কারণ কেউ আপনাকে তাদের কোড শব্দগুলো শেখাবে না। যদি না আপনি তাদের ঘরে দীক্ষা গ্রহণ করেন। দীক্ষিত হলে তবেই সাধক তার পছন্দ করা মত-পথের শব্দগুলো ধীরে ধীরে শিখতে শুরু করবেন।

যেমন মানুষ ভিন্ন ভিন্ন মতের-বিষয়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হয়ে সে বিষয়ের কোড শব্দগুলো শিখে নেয়। যার সাথে সাধারণের সম্পর্ক তেমন থাকে না। কিন্তু নির্দিষ্ট ঘরের বা নির্দিষ্ট বিষয়ের মানুষ একত্রিত হলেই সেই শব্দগুলো ভাষা খুঁজে পায়।

শব্দের মাঝে যতক্ষণ আপনি নম্রতা-বিনয়-প্রেম-ভক্তি-শ্রদ্ধা আনতে না পারবেন, ততক্ষণ আপনার মধ্যে ভাবের উদয় হবে না। আপনি পরচর্চা-পরনিন্দা, উগ্র-কট্টর-কটু বাক্য প্রয়োগ করে আপনি কিছু লোকের জমায়ত করতে পারবেন সত্য কিন্তু অন্তর্নিহিত অর্থাৎ আখেরে কোনো লাভ হবে না সাধন-ভজনে বা যে কোনো শিক্ষায়।

খেলায় করলে দেখবেন যে সাধনার বা শিক্ষায় যে যত গভীরে প্রবেশ করেছে তার বাক্য ততবেশি পরিশীলিত, ততবেশি মার্জিত ও প্রেমময়। আবার যারা উপরি উপরি সাধনপথে ঘুরেফিরে তাদের কথা হবে আক্রমনাত্বক, তীক্ষ্ম ও নির্মম।

অন্যের খুঁত ধরাতেই তাদের আনন্দ। তারা সকল সময়ই ব্যস্ত সময় কাটায় অপরে কি করছে এই ভেবে। কে কি ভুল করছে, কে ভালো, কে মন্দ এই নিয়েই তাদের যত আলোচনা-সমালোচনা-পর্যালোচনা। তাদের শব্দের প্রয়োগে এক ধরনের তাপ লক্ষ্য করা যায়। অহং এর পাশাপাশি অন্যকে ছোট কর দেখবার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়।

শব্দ সম্পর্কে জানতে গেলে- শব্দ আমাদেরকে… আমাদের চিন্তাচেতনাকে… কি করে নিয়ন্ত্রণ করে সে সম্পর্কে সামান্য ধারণা থাকাটাও জরুরী। কারণ এই প্রভাবশালী ইন্দ্রিয়টি আমাদের শুধু ব্যক্তিত্বই নয় আমাদের সমগ্র চিন্তা-চেতনাকে নিয়ন্ত্রণ করে।

শিশু অবস্থায় আমরা কোনো কিছু সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার জন্য, সে সম্পর্কে প্রশ্ন করার পরিবর্তে প্রথম অবস্থায় দৃষ্টি অর্থাৎ রূপ দিয়ে ধারণা করার চেষ্টা করি। তারপর ধারণা করার চেষ্টা করি শব্দ বা ধ্বনি শুনে। এরপরই ছুঁয়ে দেখে অর্থাৎ ত্বক দিয়ে এবং তারপর জিহ্বায় স্বাদ নিয়ে অর্থাৎ রস দিয়ে তার সম্পর্কে ধারণা সংগ্রহ করি।

কারণ প্রকৃতিও প্রাথমিকভাবে আমাদেরকে শব্দ বা ভাষা উপহার দেয় না। নির্দিষ্ট সময় পর শব্দ আমাদের মাঝে উদয় হয়। প্রাথমিক অবস্থায় শব্দ শোনার এবং তা শুনে বোঝার ক্ষমতা আমরা ধীরে ধীরে লাভ করতে শুরু করি। কিন্তু বলে প্রকাশ করার জন্য শব্দ বা ভাষা আমরা প্রথমে পাই না। তার জন্য অপেক্ষা করতে হয়।

প্রকৃতি বা ব্রহ্মাণ্ডের শর্তও ঠিক তেমনি। প্রাথমিক অবস্থায় নিরবতা পালন। তারপর সুর ও ধ্বনি হয়ে তারপর শব্দ। তাই তার কাছে পৌঁছাতে হলেও শব্দ, সুর হয়ে নিরবতায় পৌঁছাতে হয়।

যখনি আমরা শব্দ বলা শিখে যাই, তখনই আমরা অন্য ইন্দ্রিয় থেকে শব্দের প্রতি অধিক জোড় দিতে শুরু করি। আমরা প্রশ্ন করতে শুরু করি। যাদের সামনে পাই তাদের কাছেই প্রশ্ন ছুড়ে দেই। এতে যদি আশপাশের মানুষ প্রকৃত জ্ঞানসম্পন্ন হয়-শুদ্ধ ও নম্র ভাষার হয় তা হলে আমরা অনেককাংশে প্রকৃত বিষয় সম্পর্কে ধারণা পেতে শুরু করি। কিন্তু সব সময় তা হয় না।

বা আশপাশের মানুষ ব্যস্ত থাকলে বা অজ্ঞ থাকলে; ভুল বিষয়গুলোও আমাদের শিশু মনে জায়গা করে নেয়। অনেক অনেক সব প্রশ্ন আছে, যা সেই বয়সে আমাদের জানানোটা সঠিক বলে বিবেচিত হয় না। সে সম্পর্কে ইচ্ছাকৃত ভুল তথ্য দেয়া হয়।

এজন্য প্রাচীন আরব অঞ্চলে প্রচলিত বিধি ছিল যে, জন্মের পর শিশুকে এমন কোনো পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দেয়া যাতে করে সে শুদ্ধ-শালীন ভাষা, সঠিক উচ্চারণ এবং তার সঠিক ব্যবহার শিখতে পারে।

অন্যদিকে ভারতবর্ষে দেখা যায় শিশুর বোধবুদ্ধি হলেই তাকে গুরুকুলে পাঠিয়ে দেয়ার বিধান। যাতে করে গুরুর নিবাসে অবস্থান করে সকল কিছু সুষ্ঠু ও সঠিকভাবে শিখতে-জানতে-বুঝতে ও বলতে পারে।

পাশ্চত্যে শিশুদের জন্য হাউজ গর্ভনেন্স নিয়োগ দেয়া হয়। তবে তা বেশিভাগ ক্ষেত্রে শিশুকে দেখভাল করার জন্য। অবশ্য অনেকক্ষেত্রেই হাউজ গর্ভনেন্স শিশুর সিদ্ধান্ত গ্রহণেও ভূমিকা পালন করে থাকে।

এ সকল চেষ্টাই প্রকৃতপক্ষে শিশুকে শিশুকাল থেকেই সঠিক শব্দ-ভাষা-ব্যবহারের সাথে পরিচিত করা। যাতে তার সংস্কার হয় শুদ্ধ। সংস্কার শুদ্ধ হওয়া কেনো জরুরী এবার আসা যাক সে আলোচনায়-

আমরা যখন নতুন কিছু দেখি তার সম্পর্কে ধারণা করার জন্য আমরা আমাদের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা থেকে এক ধরনের সিদ্ধান্তে আশার চেষ্টা করি। তেমনি যখন আমরা কোনো শব্দ শুনি তখনি আমরা আমাদের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা থেকে ধারণা সাজিয়ে নেই।

যেমন আমরা ‘বিড়াল’ শব্দটি শুনলেই আমাদের অভিজ্ঞায় সঞ্চিত বিড়ালের ছবি দেখতে বা ভাবতে শুরু করে দেই। বিড়াল শব্দ শুনে হাতি বা মহিষকে ভাবতে পারে কয় জনা? আমরা শব্দের স্রোতে অভিজ্ঞতার সিদ্ধান্তে চলে যাই। এই চলে যাওয়া সাধন পথে বিপদজনক।

কারণ শব্দ সম্পর্কে সঠিক ধারণা অভিজ্ঞতায় সঞ্চিত না থাকলে চিন্তায় তালগোল পাকিয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। আর সেটাই আমাদের মতো সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে ঘটে। কিন্তু সাধুগুরুরা সাধারণ মানুষ নন, তারা সহজ মানুষ। তারা জন্ম-জন্মান্তরের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার আলোকে ভাবেন না। তারা উপলব্ধির উপর নির্ভর করেন।

তারা সাধন বলে সংস্কার শূন্য হন। যাতে করে তারা অভিজ্ঞতার বদলে উপলব্ধির মাধ্যমে অভিব্যক্তি ব্যক্ত করতে পারে। তবে এই সংস্কার শূন্য হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। এ সাধনাও জন্ম-জন্মান্তরের। সংস্কার শূন্য হওয়া বিষয়টা বুঝবার জন্য সংস্কার কি তা বোঝা অত্যন্ত জরুরী।

সাধককুল বলেন, জন্মের মধ্য দিয়ে মানুষ তিনটি জিনিস প্রাপ্ত হয়। তা হলো- দেহ, মন ও বুদ্ধি। জন্ম বিষয়টা বুঝতে গেলে বুঝতে হবে জন্মান্তরের গূঢ় লীলা। সেই গূঢ়তত্ত্বে না গিয়ে জন্ম থেকেই যদি শুরু করি, তাহলে বলতে হয়- নর-নারীর মিলনে জীব ব্রহ্মাণ্ডে দেহধারী হয়ে প্রকাশের যে অনুমতি লাভ করে তাই প্রাকৃতিকভাবে জন্ম।

সাধু মতে, এক মানবদেহেরও অনেক ভাগ। কেউ একে দুইভাগে, কেউ তিন, কেউ পাঁচ আবার কেউ সাত ভাগে ভাগ করেছেন। তবে প্রাথমিকভাবে দেহকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। স্থূলদেহ ও সূক্ষ্মদেহ। সাধারণের বিচরণ মূলত স্থূল দেহের মাঝেই।

যদিও তাদের সূক্ষ্ম দেহে যাতায়াত আছে কিন্তু তার নিয়ন্ত্রণ তার হাতে থাকে না। বাদবাকি দেহগুলোর আলোচনা এখানে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। সে গভীর ভাবের বিষয়।

মানবের এই স্থূলদেহ মূলত ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির পঞ্চতত্ত্ব দিয়েই গড়া। অর্থাৎ মাটি, জল, আগুন, বায়ু ও আকাশের সমষ্টি। আবার সূক্ষ্ম দেহ গঠিত ইন্দ্রিয় দ্বারা। সূক্ষ্ম দেহে মূলত ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি বিরাজ করে।

পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় অর্থাৎ শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধ দ্বারা মূলত মানুষ বর্হিজগতের বিষয়াদি অনুভব করে। আর এই অনুভবের প্রতিকৃয়া দেয় ‘মন’ নামক এক অদৃশ্য, অস্পৃশ্য, বর্ণনাতীত, সঙ্গাতীত এক চেতনা। আর মন এই প্রতিকৃয়া প্রকাশ করে বুদ্ধির বিচার-বিবেচনা দ্বারা।

প্রকৃত অর্থে স্থূলদেহের গঠন ও প্রকৃতি নিয়ে যৎসামান্য ধারণা করা গেলেও, সূক্ষ্মদেহের গঠন ও প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা করা সহজ নয়। আর অন্যান্য দেহগুলো তো কল্পনা করাও মুশকিল।

সত্য কথা হলো, মন-বুদ্ধি এই শব্দগুলো সম্পর্কে ধারণা থাকলেও এর প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের কোনো যথাযথ বোধ নেই। আমরা এ সবের অস্তিত্বকে স্বীকার করে নিয়েছি মাত্র। মন-বুদ্ধি সম্পর্কে আদৌতে এ পর্যন্তই আমাদের জ্ঞান। আমরা অনেক উপমায় তাদের সাজিয়েছি সত্য কিন্তু আখেরে সে সম্পর্কে কিছুই জানি না।

আমাদের ইন্দ্রিয়সমূহ জাগতিক যে অভিজ্ঞতা গ্রহণ করে, মন তার প্রতিকৃয়া দেয়। মন সেই প্রতিকৃয়া প্রদর্শন করে, তার বুদ্ধির বিচার-বিবেচনার দ্বারা। এখানে প্রশ্ন হলো বুদ্ধি তার বিচার-বিবেচনা প্রাপ্ত হয় কোথা থেকে? এখানেই চলে আসে সেই শব্দ ‘সংস্কার’।

সহজ ভাষায় বলতে গেলে ‘সংস্কার’ হলো অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের সঞ্চিত ভাণ্ডার। এই সংস্কারও পাঁচ প্রকার। যথা- পৈত্রিক সংস্কার, পারিপার্শ্বিক সংস্কার, নিজস্ব সংস্কার, পূর্বজন্মের সংস্কার ও আত্মার মূল সংস্কার।

(চলবে…)

পরবর্তী পর্ব >>

……………………
আরো পড়ুন:
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-২
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৩
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৪
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৫
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৬
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৭
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৮
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-৯
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১০
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১১
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১২
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১৩
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১৪
শব্দের মায়াজাল: পর্ব-১৫

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!