মাদার তেরেসা

অ্যাগনেস গনহ্যাজ বোজাহিও তাঁর জন্মভূমি যুগোস্লাভিয়ার স্কপজি শহর ছেড়ে ১৯২৮ সালে কলকাতায় আসেন। আসা মাত্র নিবেদিতার মতোই ভালোবেসে ফেলেন কলকাতার মানুষজনকে। স্থির করলেন সন্ন্যাসিনী হয়ে গরিব-দুঃস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াবেন, আর্তের সেবা করবেন।

১৯৩১ সালে কলকাতার লরেটো কনভেন্টে সিস্টার হিসেবে যোগদান করেন। তাঁর নতুন নাম হয় ভগিনী তেরেসা। পরবর্তীতে তিনি মাদার তেরেসা নামে পরিচিত হন। পরনে নীল পাড় সাদা শাড়ি, হাতে বাইবেল এবং একটা ছোট্ট ক্রশ- কোনও সামান্যা মানবী নন, সাক্ষাৎ দেবীপ্রতিমা যেন। এই মহামানবীর জন্ম হয় ২৭ আগস্ট, ১৯১০ সালে।

তারপর এল সেই বিশেষ দিনটি যা তাঁর জীবনে চিরস্মরণীয় মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত। ১৯৪৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর দার্জিলিং যাওয়ার সময় তিনি অনুভব করলেন প্রভু যিশুর সেই দৈব আদেশ। তাঁর একান্ত আধ্যাত্মিক উপদেশদাতা ফাদার সেলেস্তে ভ্যান এক্সেমকে বললেন তাঁর মনের গোপন কথা।

ফাদার চমকে উঠে জানতে চাইলেন- কী বলছ তেরেসা, লরেটোয় শিক্ষকতার লোভনীয় চাকরি ছেড়ে, গরিব, দুঃখী, আর্তের সেবা করবে? সন্ন্যাসিনী হবে? টেরেজার সাহসী জবাব- প্রভু যিশুর তাই ইচ্ছা।

ফাদার খানিকক্ষণ চিন্তা করে বললেন- ভালো লাগল তুমি ‘গুড সামারিটন’ হতে চাও, কিন্তু কাজটা কঠিন। ভ্যাটিকানের পোপের অনুমতি প্রয়োজন। অবশেষে অনেক চেষ্টার পর পোপের অনুমতি পাওয়া গেল। ১৯৪৮ সালের ১৭ আগস্ট লরেটো কনভেন্ট ত্যাগ করে মানবসেবার কাজে আত্মনিয়োগ করলেন চিরকালের জন্য। আমরা পেলাম মাদার তেরেসাকে।

উত্তরণ ঘটল এক সামান্য রমণী থেকে এক অসামান্য মহামানবীতে। তাঁর আশ্চর্য জীবনে লক্ষ করা যায় সেবিকা এবং সন্ন্যাসিনীর এক অভূতপূর্ব সমন্বয়। কলকাতার এন্টালি এলাকার বস্তির দুঃস্থ ছেলেমেয়ে, অসহায় মানুষদের সেবার মধ্য দিয়ে শুরু হল তাঁর ‘মিশনারিজ অব চ্যারিটি’-র জয়যাত্রা।

কুষ্ঠরোগীদের শুশ্রূষা করতেন। এই প্রথম ‘হ্যানসেনের অসুখ’কে তিনি সামাজিক অভিশাপমুক্ত করলেন। সমাজচ্যুত কুষ্ঠরোগীদের নিয়ে টিটাগড়ের কাছে প্রতিষ্ঠা করলেন তাঁদের নিজস্ব সেবাপ্রতিষ্ঠান, পুনর্বাসনের আশ্রয়স্থল- শান্তিনগর।

মাদার তেরেসা সম্পর্কে বিখ্যাত ফরাসি চিত্রপরিচালক দোমিনিক লাপিয়েরের স্মৃতিচারণায় জানা যায়, সেসময় পঞ্চাশ-ষাটের দশকে, কালীঘাটে কালীমন্দির সংলগ্ন গঙ্গার ঘাটে জরাগ্রস্ত মৃতপ্রায় হিন্দুদের সৎকারের জন্য ফেলে রাখা হতো। মাদার টেরেজা এবং তাঁর সহযোগী সিস্টাররা অসহায়দের সেবা করতে গেলে তাঁদের বিরুদ্ধে আর্তের সেবা করার সুযোগ নিয়ে ধর্মান্তর করার নির্মম অভিযোগ তোলা হয়। কিন্তু তা ছিল সর্বৈব মিথ্যা।

প্রসঙ্গত লাপিয়ের সাহেব একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন যা তাঁকে দারুণভাবে নাড়া দিয়েছিল। তিনি লিখেছেন- ‘Mother Teresa saw a man pale as a corpse was laying on the ground. He was a priest from the temple. No one Dared to touch him. He had cholera. Mother took him in her arms to the hospice and nursed him back to health. He said, “For 30 years I have venerated a Kali of stone. It is now a Kali of flesh and blood that I venerate.’’ (The Week, Sept 21, 1997).

তেরেসার এই মাতৃসমা সেবা পরায়ণতার বহু উদাহরণ দেখতে পাওয়া যায়। তাঁর ‘নির্মল হৃদয়’ সেবা প্রতিষ্ঠানে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার জন্য ছিল অবারিত দ্বার। তিনি যেন মিরাকেল দেখাতেন। শেষ পর্যন্ত ভ্যাটিকানের পোপ দ্বিতীয় জন পল স্বীকার করতে বাধ্য হলেন যে, ঈশ্বর আর মাদার এক এবং অদ্বিতীয়।

১৯ অক্টোবর ২০০৩ সালে ‘বিয়েটিফিকেশন’-এর মাধ্যমে তাঁর উপর ঈশ্বরত্ব আরোপ করা হল। তিনি মানবী থেকে রূপান্তরিত হলেন দেবীতে। তাঁর এই অলৌকিক রূপান্তর, তাঁর ‘সেইন্টহুড’-এ উত্তরণ তাঁকে মৃত্যুর (৫ সেপ্টেম্বর ১৯৯৭) পর অবিনশ্বরতা দান করলেও তিনি বেঁচে থাকবেন রক্তমাংসে গড়া এক অসামান্য নারীশক্তি হিসাবে।

আমরা বহুলাংশে তাঁর মানবকল্যাণকামী শান্তসমাহিত রূপটি প্রত্যক্ষ করে থাকি। তাঁর প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর তেমন শুনতে পাই না। কিন্তু তিনি প্রতিবাদও করেছেন। আর তখন তাঁর প্রশান্ত কোমল নারীপ্রকৃতি বদলে যায় কঠোর-কঠিন নারীবাদী সত্তায়।

নির্বিচারে গর্ভপাতের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ করেছেন। দলিত খ্রিস্টানদের সংরক্ষণের প্রশ্নে তাঁর ধর্নামঞ্চ তৈরি করে প্রতিবাদ জানানোর কথাও এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে। ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে যুবরানি ডায়নার লড়াইকে তিনি সমর্থন জানিয়েছিলেন।

কলকাতায় এলে তিনি ডায়নাকে আশীর্বাদ করেছিলেন যাতে তাঁর অভীষ্ট লক্ষ্যে- মানবসেবায় এবং নারী স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামে তিনি সফল হন। এইভাবে বিভিন্ন প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে আমরা তাঁর নারীশক্তির এক ভিন্নরূপ উপলব্ধি করতে পারি।

আশ্চর্যের বিষয় বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ দুঃখ-আর্তের সেবায়, বিশ্বশান্তি এবং ধর্মনিরপেক্ষ ঐক্যস্থাপনের প্রচেষ্টায় এই মহীয়সী নারী আত্মোৎসর্গ করলেও সমালোচনার ঊর্ধ্বে ছিলেন না তিনি। তাঁর নীল পাড় সাদা শাড়িতে কালিমা লেপনের চেষ্টা করা হয়েছে।

তিনি নীরবে মুখ বুজে সহ্য করেছেন তাঁর বিরুদ্ধে আনা যাবতীয় নিষ্ঠুর অমানবিক অভিযোগ। পশ্চিমী দুনিয়ায় তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্র্য বিক্রি করে তিনি মানবিক সহানুভূতি এবং আর্থিক সহায়তা লাভের চেষ্টা করেছেন বলা হয়। বিতর্ক উঠেছিল তাঁর নির্বিচারে দান গ্রহণের বিষয় নিয়েও।

উল্লেখ্য বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালিকা ক্রিস্টোফার হিচেনস মাদার তেরেসাকে নিয়ে যে তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন তাতে তেরেসাকে ‘হেল’জ এঞ্জেল’ অর্থাৎ ‘নরকের দেবদূত’ নামে চিত্রিত করা হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় এসবের বিরুদ্ধে তিনি কখনও সরাসরি প্রতিবাদ জানাননি বরং যাবতীয় সমালোচনার বিরুদ্ধে তাঁর উত্তর ছিল একটাই- ক্ষমা।

মাদার তেরেসা ছিলেন নারীশক্তির এক মূর্ত প্রতীক। এই শক্তির ফলে তিনি বিশ্বজয় করতে পেরেছিলেন। স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৯ সালে তিনি পেয়েছিলেন নোবেল শান্তি পুরস্কার। তাঁর জীবনের চরম লক্ষ্য ছিল বিশ্বমানবতাবোধের উপলব্ধি এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা।

মৃত্যুর পরেও এই পথচলা শেষ হয়ে যায়নি। আগামী নারী প্রজন্মের কাছে তিনি বেঁচে আছেন এক যুগান্তকারী আদর্শ এবং জীবন্ত অনুপ্রেরণা হিসাবে। সত্যি তিনি অমর। তাঁর দৈহিক মৃত্যু হলেও তাঁর ‘নোবেল মিশন’-এর মৃত্যু কখনও হবে না।

তাঁর মহাপ্রয়াণের পর রামকৃষ্ণ মিশনের তৎকালীন প্রধান স্বামী লোকেশ্বরানন্দ মহারাজ শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন এইভাবে- ‘Her work among the dying and the terminally ill was really something unique.’ (Outlook, 15 Sept, 1997) বলা বাহুল্য মাদার তেরেসার মানবতাবাদী শান্তিকল্যাণকামী জীবনদর্শনই আজকের অশান্ত সন্ত্রাসগ্রস্ত মৃতপ্রায় পৃথিবীতে বেঁচে থাকার একমাত্র পথ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

…………………………
আরও আধ্যাত্মিক তথ্য পেতে ও জানতে :
পুণঃপ্রচারে বিনীত -প্রণয় সেন

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!