ভবঘুরে কথা
মা মারিয়াম

-মাসফিক মাহমুদ

হযরত দাউদের উপর একটি ওহির কথা যাকারিয়্যা তার ভক্তদের বললেন, স্রষ্টা বলেন, “হে দাউদ গুনাহকারীদের সুসংবাদ দাও আর নেক বান্দাদের ভয় পেতে বলো। কেননা তারা তওবা করলেই আমি কবুল করব আর নেক বান্দারা তারা তাদের আমল নিয়ে অহংকার করলেই তারা তাদের ধ্বংস ডেকে আনবে।”

মারিয়ামের চাচাতো ভাই ইউসুফ হিলালকে জানালেন, সে গির্জা ত্যাগ করে যাকারিয়্যার শিষ্য হতে চায়। হিলাল তাকে শুভকামনা দিয়ে বললেন, তুমি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছ। নিকট বিদায় নেওয়ার সময় ইউসুফ বলল, মারিয়াম আমাকে কিছু উপদেশ দাও। মারিয়াম বলল, যাকারিয়্যার পাশে থাকাই অনেক বড় নেয়ামত আর সৌভাগ্য।

যাকারিয়্যা ইউসুফকে নিয়ে পথ চলার সময় বললেন, এই অপরূপ সৌন্দর্য যা সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টি করেছেন, যা স্থায়ী নয় ধ্বংস হবে। কেয়ামতের দিন আবার সবাই পুনরুজ্জীবিত হবে। যারা এখন জুলুম করছে, তারা তখন নিজের হাত কামড়াবে আর বলবে, আফসোস যদি পয়গম্বরের কথা শুনতাম। আমি তোমার পূর্বে অসংখ্য শিষ্যকে শিক্ষা দিয়েছি, কিন্তু তারা কোন না কোন অজুহাতে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। অসম্ভব শান্তি পাই যখন এতিমের জন্য কিছু করি, একটি বৃক্ষ রোপন করি বা কারো জন্য একটি ছাউনি তৈরি করে দেই।

এরই মধ্যে একদিন বাদশাহ হেরড গির্জার সকল পাদ্রী ও যাকারিয়্যাকে তার প্রাসাদে একত্রিত করলেন, কারণ এক ষড়যন্ত্রকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিষয়ে পাদ্রীদের একমত পোষণ করা প্রয়োজন। যাতে পরবর্তীতে এ মৃত্যুদণ্ড নিয়ে যেন কোন সমস্যা তৈরি না হয়।

মৃত্যুদণ্ডের সাজায় সাজাপ্রাপ্ত ছিলেন স্বয়ং বাদশার স্ত্রী। বাদশাহ যাকারিয়্যাকে দেখে বললেন, আপনি আমার ভবিষ্যত সম্পর্কে কিছু বলুন। যাকারিয়্যা চুপ থাকায় হেরড বললেন, যাই হোক আপনারা এ মৃত্যুদণ্ডের সম্মতি দিচ্ছেন তো? যাকারিয়্যা বললেন, আমি দলিল দেখতে চাই। এতে হেরড ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, আপনাদের দলিল দেখাবার জন্য আনা হয়নি, সম্মতি দিন।

পাদ্রীরা সবাই সম্মাতি দিলেও যাকারিয়্যা বাদশাহকে একটি গল্প শোনাতে চাইলেন। বাদশাহ রাজি হলে তিনি বলতে শুরু করলেন, একদিন আমি হিলালের সঙ্গে হযরত ইমরানের সেবায় গিয়েছিলাম। তিনি আমাদের এক ক্ষমতাবান লোকের কথা শোনালেন। তিনি বললেন, সে লোক এক শহরে শাসন পরিচালনা করতেন। স্রষ্টার ইবাদত করতেন না। তার পরহেজগার স্ত্রীকে সবাই সম্মান করত, তার স্ত্রীর মন ছিল দয়ার সাগর, অসহায়দের যে কোন প্রয়োজনে সে ছুটে যেত। কিছু লোক তাকে হিংসা করে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে তার স্বামীর কাছে কুৎসা রটাতে লাগল।

ঐ ক্ষমতাবান লোক যখন জানতে পারল তার স্ত্রী একক সত্ত্বার ইবাদতকারী। তখন তিনি কোন খোঁজখবর না নিয়েই তাকে হত্যা করল। তার স্ত্রী শেষ রক্তবিন্দু মাটিতে গড়াবার পরপরই তার বোধ তৈরি হল যে তিনি অবিচার করেছেন। ঐদিন থেকে নিজেও অস্থির হলেন এবং সাথে সন্দেহের রোগে আক্রান্ত হলেন। তার এ সন্দেহের রোগে আর আশপাশের লোকজনসহ তার আত্নীয় স্বজনও রেহাই পেল না। সবাইকে এক এক করে হত্যা করলেন। অবশেষে নিজেও মৃত্যুবরণ করলেন।

ঘটনা শেষে যাকারিয়্যা হেরডকে বললেন, নিজের আমলের উপরই নিজের ভবিষ্যত নির্ভর করে। আপনার ভবিষ্যত কি হবে তা আপনি আমার থেকে শুনতে চেয়েছিলেন। এসব কথা শোনার পর বাদশাহ হেরড আরো অস্থির হয়ে পরলেন।

অন্যদিকে এক মধ্যরাতে গির্জার এক পাদ্রীকে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে ইয়াসাকারের কামড়ায় এসে বলল, এক হিংস্র নেকড়ে তার পিছু নিয়েছে। তখন ঐ কক্ষে আরো কয়েকজন পাদ্রী এবং রোমান সেনাপতিও উপস্থিত ছিল। সকলে বলল কই কই? তারা জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখতে পেল গির্জার দক্ষিণ দিকে একটা নেকড়ে গড়গড় শব্দ করে পায়চারি করছে। আর কে একজন ঐ হিংস্র নেকড়েটার দিক এগিয়ে যাচ্ছে। ইয়াসাকার বলল, মারিয়াম না! এতরাতে ও এখানে কি করছে? পাশ থেকে এক পাদ্রী বলল, জনাব! দারোয়ানকে খবর দিই? ইয়াসাকার বললেন, দাঁড়াও! মারিয়াম যদি পবিত্র হয় তবে ও নিজেই ওর হেফাজত করতে পারবে।

তারা দেখলেন ঐ হিংস্র নেকড়েটা মারিয়ামের সামনে এসে বসে পরল। আর কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে ফিরে গেল। তা দেখে সবাই যখন হতভম্ব তখন ইয়াসাকার বলে বসলেন, নারী আর শিশুদের সাথে প্রাণীদের কোন শত্রুতা নেই। রোমান সেনাপতি ইয়াসারকে জিজ্ঞাসা করলেন, এই কি সেই কন্যা যার কথা শুনেছি? পাশ থেকে এক পাদ্রী সেনাপতিকে লক্ষ করে বললেন, হ্যাঁ এই সেই কন্যা ওকে নিয়ে বেশ মজার গল্প আছে।

তার গির্জায় প্রবেশ নিয়ে আমরা সবাই বিরোধিতা করলাম। যেদিন সে আসলো তাকে নানারকম যন্ত্রণা দিলাম। অপমান করলাম। শাস্তি দিলাম। তাকে বিভিন্ন কাজ করতে বাধ্য করলাম। পক্ষান্তরে সে ধীরে ধীরে সবার কাছে প্রিয় ও মহান হল। লোকজন তার কথায় আকৃষ্ট হতে লাগল। পাদ্রীদের শয়তানের মুরিদ ভাবতে লাগল, একথা শুনে সেনাপতি বললেন, এ কি সত্যি জনাব ইয়াসাকার?

মারিয়াম সবার কাছে প্রিয় হয়ে উঠলেও দিনের পর দিন কোনমতে আহার করে রোজা পালন করে দুর্বল হয়ে পরছিল। একরাতে সে তার কক্ষে এক তীব্র আলোর উপস্থিতি টের পেল এবং আলোর দিকে তাকিয়ে থাকল। আলো আরো তীব্র হয়ে রাতের অন্ধকারে মিশে গেল। মারিয়াম চোখ মেলে দেখে তার টেবিলে এক থালা ভর্তি বিভিন্ন ফল। এভাবে মহান খোদা তার আহারের জন্য নেয়ামত দিতেন। যাকারিয়্যা তার কক্ষে এরকম অমৌসুমী ফল দেখে অবাক হয়ে মারিয়ামকে জিজ্ঞাসা করলেন, এ ফল তোমাকে কে দিয়েছে? মারিয়াম বললেন, আমার খোদা আমার জন্য পাঠিয়েছেন।

অন্যদিকে বাদশাহ হেরডের প্রতি যাকারিয়্যার করা ভবিষ্যত বাণী সত্য হতে লাগল। সে তার নির্দোষ স্ত্রীকে হত্যার পর, অস্থির হয়ে তার কুচক্রী বোনসহ তার ছেলে ও আশপাশের লোকদের হত্যা করল। অতঃপর সে প্রলাপ বকতে লাগল।

সাধারণ মানুষের কাছে দিন দিন যখন মারিয়ামের সম্মান বৃদ্ধি ও তার পবিত্রতার কথা চারদিকে ছড়িয়ে পরতে লাগল তখন পাদ্রীরা এক সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র শুরু করল। তারা প্রথমে যাকারিয়্যাকে সবার কাছে হেয় করার জন্য গোপনে গির্জার পাদ্রীদের অর্থ বিতরণ করে বিভিন্ন জায়গায় কুৎসা রটাতে লাগল। সে ভণ্ড পয়গম্বর এমনকি তার বাড়িতেও বিভিন্ন মহিলা পাঠিয়ে তার স্ত্রীর কান ভারি করতে লাগল যেন সে ঘরেও স্বস্তি না পায়।

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!