মাওলা আলীর বাণী: ৪

মাওলা আলীর বাণী: ৪

৭৬
যদি কোন ব্যাপার মিশ্রিত হয়ে পড়ে তবে পূর্ববর্তীগুলো অনুসারে শেষটির প্রশংসা করতে হবে।

৭৭
জীরার ইবনে হামজাহ আদ-দিবাবী মুয়াবিয়ার কাছে বলেছিলেন, ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আলী ইবনে আবি তালিবকে আমি বহুবার দেখেছি গভীররাতে তিনি মসজিদের মধ্যে নিজের দাড়ি ধরে দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে এমনভাবে আর্তনাদ করতেন যেন সাপে কামড়ানো মানুষ এবং তিনি শোকাহত লোকের মতো রোদন করে বলতেন-

হে দুনিয়া! ওহে দুনিয়া! আমার কাছ থেকে দূর হও। কেন তুমি নিজকে আমার কাছে ব্যদনতা করছো ? তুমি কি আমাকে পাবার জন্য লালায়িত? আমাকে অভিভূত করার মতো সুযোগ তুমি পাবে না। অন্য কাউকে প্রতারিত করার চেষ্টা করো। তোমার সাথে আমার কোন কাজ নেই।

আমি তোমাকে তিন তালাক দিয়েছি; কাজেই আর কোন সম্পর্ক হবার জো নেই। তোমার স্থায়িত্ব অতি অল্প, তোমার গুরুত্ব নগণ্য এবং তোমার পছন্দ অতি হীন। আহা! রসদ অতি অল্প, পথ খুবই দীর্ঘ-ভ্রমণ দীর্ঘ সময়ের-লক্ষ্যস্থলে পৌঁছা কষ্টসাধ্য।

৭৮
এক ব্যক্তি আলীকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘সিরিয়ানদের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধ কি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত ছিল? তিনি বললেন-

তোমার ওপর লানত। তুমি এটাকে চূড়ান্ত ও অপরিহার্য ভাগ্য বলে মনে কর। যদি বিষয়টা সে রকম হয় তবে পুরস্কার অথবা শাস্তির প্রশ্ন উঠে না এবং আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ও সতকাদেশ অর্থবহ হয় না। অপরপক্ষে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে স্বাধীন ইচ্ছায় আমল করতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং পাপ সম্পর্কে সতর্ক করে।

বিরত থাকতে বলেছেন। তিনি তাদের ওপর সহজ সাধ্য দায়িত্ব অপর্ণ করেছেন এবং কোন ভারী দায়িত্ব অপর্ণ করেননি। তিনি তাদেরকে ক্ষুদ্র আমলের জন্য অধিক পুরস্কার দিয়ে থাকেন। তাকে পরাভূত করার কারণে কেউ অমান্য করে না। তাকে মান্য করতে কাউকে বল প্রয়োগ করা হয় না।

শুধুমাত্র কৌতুক করার জন্য তিনি নবী প্রেরণ করেননি। কোন উদ্দেশ্য ছাড়াই তিনি মানুষের জন্য। কোরান নাজেল করেননি। তিনি আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী ও এ দুয়ের মধ্যবর্তী সব কিছু বৃথা সৃষ্টি করেননি। ‘যারা অবিশ্বাস করে তারা এরূপই কল্পনা করে, তারপর যারা অবিশ্বাস করে তাদের ওপর লানত-আগুনের কারণে (কোরান ৩৮; ২৭)

৭৯
তারা যা বলে তা থেকে প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় গ্রহণ করো, কারণ জ্ঞানগর্ভ কোন কিছু যদি মোনাফেকদের বুকে থাকে। তবে তা বেরিয়ে এসে মোমেনের বুকে আশ্রয় নেয়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়ে।

৮০
জ্ঞানগর্ভ বাণী মোমেনের কাছে হারানো বস্তুর মতো। কাজেই মোনাফেকের কাছ থেকে হলেও জ্ঞানগর্ভমূলক বাণী গ্রহণ করো।

৮১
মানুষকে তার সাফল্য ও সিদ্ধি অনুযায়ী মূল্যায়ন করা হয়।

৮২
আমি তোমাদেরকে পাঁচটি বিষয় বলে দিচ্ছি। আল্লাহ ছাড়া আর কিছুতে আশা স্থাপন না করা নিজের পাপ ছাড়া আর কোন কিছু ভয় না করা। যা নিজে জানো না সে বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হলে, ‘আমি জানি না’ বলতে লজাবোধ না করা যা নিজে জানো না তা অন্যের কাছ থেকে শিক্ষা করতে লজ্জা না করা; এবং ধৈর্য ধারণ করার অভ্যাস করা, কারণ দেহের জন্য মাথা যেরূপ ইমানের জন্য ধৈর্য তদ্রূপ।

৮৩
এক ব্যক্তি আলীকে খুশি করার জন্য তার প্রশংসা করলে তিনি বললেন, যতটুকু তুমি প্রকাশ করেছ। আমি ততটুকু নই, কিন্তু যা তোমার অন্তরে রয়েছে তা থেকে আমি অনেক উর্দ্ধে।

৮৪
তরবারি থেকে বেঁচে যাওয়া লোকের সংখ্যা ও তাদের বংশধরের সংখ্যা বিরাট।

৮৫
‘আমি জানি না’ বলা যে পরিত্যাগ করে সে ধ্বংসের মুখোমুখি হয়।

৮৬
বয়োজ্যেষ্ঠ লোকের মতামত যুবকদের সংকল্পের চেয়েও আমি অনেক বেশি ভালোবাসি।

৮৭
ক্ষমা প্রার্থনার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি নিরাশায় ভোগে তার সম্বন্ধে আমার আশ্চর্য লাগে।

৮৮
ইমাম বাকির থেকে বর্ণিত আছে যে, আলী বলেছেন- আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা পাবার দুটি উপায় ছিল- একটি তুলে নেয়া হয়েছে অপরটি তোমাদের সম্মুখে রয়েছে। সুতরাং এটাকে তোমাদের মানতে হবে রক্ষা পাবার যে উপায়টি তুলে নেয়া হয়েছে তা হলো আল্লাহর রাসূল এবং যেটি এখনো আছে তা হলো ক্ষমা প্রার্থনা করা।

আল্লাহ বলেন, ‘অথচ আল্লাহ কখনই তাদের উপর আজাব নাজিল করবেন না যতক্ষণ আপনি তাদের মাঝে অবস্থান করবেন। তাছাড়া তারা যতক্ষণ ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে আল্লাহ কখনও তাদের উপর আজাব দেবেন না।’ (কোরান ৮:৩৩)

৮৯
যদি কোন মানুষ আল্লাহ ও তার নিজের মধ্যকার ব্যাপারে যথাযথ আচরণ করে তবে আল্লাহ তার ও অন্যের মধ্যকার বিষয়াবলী যথাযথ রাখেন। যদি কেউ পরকালের জন্য যথাযথ কর্মকাণ্ড করে। তবে আল্লাহ তার ইহকালের কর্মকাণ্ড যথাযথ রাখেন। যদি কেউ নিজেই নিজের ধর্মোপদেষ্টা হয় তবে আল্লাহ তাকে রক্ষা করেন।

৯০
ইসলামের যথার্থ ফেকাহবিদ সে যে আল্লাহর রহমত থেকে মানুষকে নিরাশ করে না, আল্লাহর দয়ার প্রতি হতাশ করে না এবং আল্লাহর শাস্তি থেকে নিরাপদ বলে মনে করিয়ে দেয় না।

৯১
হীনতম জ্ঞান জিহ্বায় থাকে এবং উচ্চমানের জ্ঞান কর্মের মাঝে প্রকাশ পায়।

৯২
দেহর মত হৃদয়ও অবসাদগ্রস্থ হয়ে পড়ে, তাই হৃদয়কে উৎফুল্ল রাখতে বিজ্ঞতাপূর্ণ ভাল কথার অনুসন্ধান কর।

৯৩
কারো একথা বলা উচিত নয়- ‘হে আল্লাহ বিপদাপদ থেকে আমি তোমার ফানা চাই।’ কারণ বিপদাপদ ছাড়া কাউকে পাওয়া যাবে না। যদি কেউ আল্লাহর নিরাপত্তা চায়। তবে বিপথগামিতা থেকে নিরাপত্তা চাওয়া উচিত।

কারণ আল্লাহ বলেন- ‘জেনে রাখো যে, তোমাদের সম্পদ ও সন্তানসন্ততি পরীক্ষা মাত্র।’ (কোরান ৮:১২)

এ আয়াতের অর্থ হলো আল্লাহ সম্পদ ও সন্তানসন্ততি দ্বারা এজন্য মানুষকে পরীক্ষা করেন যাতে যে ব্যক্তি তার জীবিকা নিয়ে অসন্তুষ্ট তার থেকে ওই ব্যক্তিকে আলাদা করা যায় যে প্রাপ্ত জীবিকায় খুশি। আল্লাহ তাদের সম্বন্ধে জানেন যা তারা নিজেরাও তাদের সম্বন্ধে জানে না।

তবুও তিনি এমনভাবে কর্মসাধন করতে দেন যার মাধ্যমে পুরস্কার অথবা শাস্তি অর্জন করতে পারে। কারণ তাদের কেউ পুরুষ সন্তান পছন্দ করে ও নারী সন্তান অপছন্দ করে এবং কেউ সম্পদ স্তূপীকৃত করতে চায় আবার কেউ দারিদ্র অপছন্দ করে।

৯৪
ভালো মানে এ নয় যে তোমার অনেক সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি থাকবে। ভালো মানে তোমার অনেক জ্ঞান থাকবে; তোমার ধৈর্য থাকবে অসীম এবং তুমি আল্লাহর ইবাদতে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে। যদি তুমি ভালো কাজ কর।

তবে আল্লাহর কাছে শুকারিয়া আদায় করো, যদি তুমি পাপ কর। তবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। এ পৃথিবীতে ভালো শুধু দু’ব্যক্তির জন্য, যে পাপ করার পর তওবা করে এবং যে ব্যক্তি দ্রুত ভালো কাজের দিকে এগিয়ে যায়।

৯৫
যে কাজে আল্লাহর ভীতি থাকে তা ব্যর্থ হয় না; যা মকবুল তা কী করে ব্যর্থ হতে পারে?

৯৬
রাসূল (সা) কী এনেছেন তা যে যত বেশি জানে সে রাসূলের তত নিকটের। ‘নিশ্চয়ই, মানুষদের মধ্যে যারা ইব্রাহীমের অনুসরণ করেছিল, তারা, আর এই নবী এবং যারা এ নবীর প্রতি ঈমান এনেছে তারা ইব্রাহীমের ঘনিষ্ঠতম-আর আল্লাহ হচ্ছেন মুমিনদের বন্ধু।’ (কোরান ৩:৬৮)

রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও সে-ই মুহাম্মদের বন্ধু যে আল্লাহর আনুগত। আর আল্লাহকে যে অমান্য করে সে মুহাম্মদের শত্রু, সে যতই নিকটাত্মীয় হোক।

৯৭
দৃঢ় ইমানে ঘুমানো সংশয় পূর্ণ ইবাদত থেকে অধিকতর উত্তম।

৯৮
যখন তুমি কোন হাদিস শোন তখন বুদ্ধিমত্তার সাথে তা পরীক্ষা করো, কারণ হাদিস বর্ণনাকারী জ্ঞানী লোকের সংখ্যা অনেক, কিন্তু হাদিসের সঠিকতা রক্ষাকারীর সংখ্যা খুবই কম।

৯৯
আমরা ‘ইন্নানিল্লাহি’ বলে আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে এবং ‘ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ বলে আমাদের মরণশীলতাকে স্বীকার করছি।

১০০
কতিপয় ব্যক্তি আলীের সামনে তার প্রশংসা করলে তিনি বললেন, হে আমার আল্লাহ! তুমি আমাকে আমার চেয়ে অনেক বেশি জান এবং আমি আমার নিজকে তাদের চেয়ে বেশি জানি।

হে আমার আল্লাহ! তারা যতটুকু চিন্তা করে তার চেয়ে অধিক ভালো তুমি আমাদের করে দাও এবং তারা যা জানে না সে বিষয়ে আমাদের ক্ষমা করে দাও।

…………………………….
সূত্র: নাহজ আল-বালাঘা

…………………………….
আরো পড়ুন:
মাওলা আলীর বাণী: ১
মাওলা আলীর বাণী: ২

মাওলা আলীর বাণী: ৩
মাওলা আলীর বাণী: ৪
মাওলা আলীর বাণী: ৫
মাওলা আলীর বাণী: ৬
মাওলা আলীর বাণী: ৭
মাওলা আলীর বাণী: ৮
মাওলা আলীর বাণী: ৯
মাওলা আলীর বাণী: ১০
মাওলা আলীর বাণী: ১১

মাওলা আলীর বাণী: ১২
মাওলা আলীর বাণী: ১৩
মাওলা আলীর বাণী: ১৪
মাওলা আলীর বাণী: ১৫

মাওলা আলীর বাণী: ১৬
মাওলা আলীর বাণী: ১৭
মাওলা আলীর বাণী: ১৮
মাওলা আলীর বাণী: ১৯
মাওলা আলীর বাণী: ২০

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!