ভবঘুরে কথা
খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া

-নূর মোহাম্মদ লিপু

হযরত খাজা মাহবুবে ইলাহি নিজামউদ্দিন আউলিয়া যখন সৃষ্টির প্রথম মানব আদমের প্রেমের কাহিনী বর্ণনা করছিলেন। তখন শৃঙ্খল পরিহিত ছয়জন দরবেশ খানকা শরিফে প্রবেশ করে নৃত্য করতে লাগল। কোন প্রকার সালাম-দোয়া তা তো করলই না এমনকি হুজুরের প্রতিও কোনরূপ ভক্তি শ্রদ্ধা প্রদর্শনও করল না।

কিছুক্ষণ নৃত্য করে তারা সেখানেই বসে অকথ্য ও অশ্রাব্য সব কথা বার্তা বলতে লাগল। নিজামউদ্দিন আউলিয়া তাদের কথা ভ্রূক্ষেপ না করে মাওলানা কফখরুদ্দীন জারাদীকে, আমাকে ও আমার ছেলেদেরকে বললেন, যে সব খাবার প্রস্তুত আছে তা ঐ দরবেশদেরকে পরিবেশন করো।

আমরা তাদের জন্য খাবার নিয়ে গেলাম। তারা আমাদের নিকট হতে খাবার গ্রহণ করে দূরে ফেলে দিল এবং জঘন্য ভাষায় যা তা বলতে লাগল। তাদের এ ব্যবহারে আমরা হতবুদ্ধি হয়ে পড়লাম, কারণ হুজুর যদি এ সম্বন্ধে জানতে চান তাহলে কী বলব?

শেষ পর্যন্ত দেখা গেল যে আমরা বলার পূর্বেই হযরত খাজা ব্যাপারটা জেনে গেছেন। হযরত নিজেই তখন আবার নতুনভাবে তাদের জন্য আহার নিয়ে কয়েকজন খেদমতগারসহ তাদের সামনে উপস্থিত হলেন, প্রথমে তিনি দরবেশদেরকে সালাম দিলেন, কিন্তু দরবেশরা তাঁর সালামের কোন উত্তর তো দিলই না এমনকি তাঁর প্রতি কোনও মনোযোগও দিলো না। খাজা খাবার সামনে রেখে তাদেরকে আহারের জন্য অনেক অনুনয় বিনয় করতে লাগলেন। কিন্তু তারা বাজে গানে নিমগ্ন হয়ে রইল।

এ বিশ্রী পরিবেশ বেশ কিছুক্ষণ অবলোকন করার পর খাজা তাদেরকে বললেন, হে দরবেশগণ, এ খাবার কেন খাচ্ছ না? এ খাবার কি করণের খাবারের চেয়েও নিকৃষ্ট, যা তোমরা সেখানে কাবাব করে খেয়েছিলে? কিন্তু আমি বলছি, না, এ খাবার সে খাবার হতে নিকৃষ্ট তো নয়ই বরং শত-হাজার গুণ অধিক উৎকৃষ্ট। দরবেশরা একথা শুনবার সাথে সাথে হযরত খাজার পায়ে মাথা রাখল এবং পরে এক পায়ের উপর দাঁড়িয়ে বলতে লাগল, হুজুর আপনি দয়া করে আর কষ্ট করবেন না। আপনি যান আমরা খাবার খেয়ে নিচ্ছি। আমরা শুধু আপনাকে দেখার জন্যই এমন করছিলাম।

দরবেশদের এরূপ বিপরীত ব্যবহারে আমরা আরও বিস্মিত হয়ে পড়লাম। হুজুর চলে যেয়ে মজলিসে যোগ দিলেন। আমরা দরবেশদেরকে আহার পরিবেশন করাতে লাগলাম। আহার পর্ব শেষ হলে আমি ও মাওলানা ফখরুদ্দিন জারাদী তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, হে দরবেশগণ! আপনাদের এ অদ্ভূত আচরণের ভেতরে কোন রহস্য লুকিয়ে আছে একটু খুলে বলুন না?

উত্তরে তারা বলল, দেশ ভ্রমণ করতে করতে একবার আমরা করণ শহরে পৌঁছালাম। করণ শহরটি ছিল তখন দুর্ভিক্ষ এলাকা। বিশেষ করে আমরা যখন সেখানে পৌঁছালাম তখন সেখানে জন মানুষের নাম গন্ধও ছিল না। আমরা বিপাকে পরে গেলাম সেই বিজন স্থানে।

একদিন দু’দিন করে তিনদিন অতিবাহিত হতে চলল, সেই সঙ্গে ক্ষুধার যন্ত্রণাও বাড়তে বাড়তে এক ভীষণ রূপ নিল। আমরা আহারের অনুসন্ধান করতে করতে দিশাহারা হয়ে পরলাম। এ সময় পথ চলতে চলতে আমরা শ্রান্ত-ক্লান্ত ও ক্লিষ্ট-পিষ্ট হয়ে হযরত ওয়ায়েস করনী রহমাতুল্লাহি আলাইহি যে স্থানে হযরত রাসুলে মকবুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দান্দান শহীদ হওয়ার সংবাদ শুনে তাঁর প্রতি তুলনাহীন মুহাম্মতে নিজের ৩২টি দাঁত একের পর এক শহীদ করে দাফন করেছিলেন, সেই স্থানে পৌঁছালাম।

সে স্থানটিও ছিল জনহীন, তাই আমরা জিয়ারত পর্ব শেষ করে আহারের অনুসন্ধানে সম্মুখে চলতে লাগলাম। চলতে চলতে পথিমধ্যে দেখতে পেলাম কয়েকদিন পূর্বের মরা একটা উট। তার মাংস পঁচে ফুলে-ফেটে হাড় পৃথক হয়ে গিয়েছে। বিশ্রী উৎকট দুর্গন্ধ। তবু যেন মনে হলো এটাই বাঁচার জন্য আশার আলো।

সকালে একত্রে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলাম, ‘জান বাঁচানো ফরজ’ অতএব এর মাংস বের করে চকমকি পাথর দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে সেঁকে কাবাব বানিয়ে আহার করেছিলাম সেদিন। অবশ্য আমরা এ ছয় জন ব্যতীত অন্য কোন লোক এ ঘটনা সম্বন্ধে জানতেন না।

অথচ আজ খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া সেই অতি গোপন ঘটনা উদঘাটন করে তাঁর কাশফের (অন্তর্দৃষ্টি) প্রখরতা প্রমাণ করলেন। এখন আমরা অকপটে এক বাক্যে স্বীকার করছি যে, হ্যাঁ, দরবেশী এমনই হওয়া উচিৎ যা খাজা হাসিল করে শ্রেষ্ঠ হয়েছেন।

…………………………………..
সূত্রঃ আমীর খুসরু রহমাতুল্লাহি আলাইহি জীবনী থেকে নেওয়া।

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!