খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া

দিল্লীর নিজামউদ্দিন আউলিয়া: কিস্তি দুই

-মূর্শেদূল মেরাজ

বাবা ফরিদউদ্দিন গঞ্জেশকার

নিজামউদ্দিন আউলিয়া তার মুর্শিদের কথা বলতে গিয়ে বলেন, বাবা ফরিদের নাম শোনার পর মনে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। তা অন্য কোনো সুফি সাধকের নাম শুনে, এমনকি তাদের সঙ্গে সাক্ষাতের পরও এ অবস্থা হয়নি।

তার সহপাঠীরা বাবা ফরিদের নামে দোহাই দিয়ে তাকে দিয়ে যে কোন কাজ করিয়ে নিত। তারা জানত বাবা ফরিদের দোহাই দিলে সে কাজ যত কষ্টকরই হোক নিজাম তা করবেই করবে। অনেকে বলেন, ১৩ বছর বয়সেই নিজাম সর্বোক্ষণ স্মরণে রাখতেন ফরিদউদ্দিন গঞ্জেশকারের নাম।

নিজাম তার ২০ বছর বয়সে পাকিস্তানের পাকপাত্তান যান। সেখানেই ফরিদউদ্দিন গঞ্জেশকারের কাছে বায়াত হন। তিনবার রমজান মাসে বাবা ফরিদের দরবারে অবস্থান করেন। এখান থেকেই সুফিবাদের দীক্ষা গ্রহণ করেন। ধীরে ধীরে তিনি বাবা ফরিদের প্রিয় শিষ্য হয়ে উঠেন।

 

দিল্লীর দরবার নিজামউদ্দিন আউলিয়া

পরবর্তীতে বাবা ফরিদ তাকে খলিফা মনোনীত করেন। নিজামউদ্দিন দিল্লীতে ফিরে আসার পর তার মুর্শিদ ফরিদউদ্দিনের ওফাতের খবর জানতে পারেন। দিল্লীতে তিনি বিভিন্ন অস্থায়ীভাবে বিভিন্ন স্থানে বাস করতে শুরু করেন। পরে দিল্লী শহরের কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে গিয়াসপুরে স্থায়ী হন।

তখন দিল্লীর সিংহাসনে অসীন প্রতাপশালী সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন (১২৬৫-৮৭)। কথিত আছে, বলবনের নাম শুনলে প্রজাদের ঘুম হারাম হয়ে যেত। এই অভিযোগ খণ্ডনের জন্য দিল্লীর দরবারে ডাক পরে নিজামউদ্দিন আউলিয়ার।

সেখানেই তিনি তার দরবার স্থাপন করেন। তার দরবারে সকল জাত-ধর্ম-গোত্রের ধনী-গরীব সকলই ছিল স্বাগত। তিনি ভালোবেসে জীবদ্দশায় স্রষ্টা প্রাপ্তির শিক্ষা দিতেন তার অনুসারীদের। এতে কট্টরপন্থীরা তার শত্রুতে পরিণত হয়।

কট্টরপন্থীরা সুলতানের কাছে অভিযোগ করে, নিজামউদ্দিন মুসলমান ও বিধর্মীদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ করে না। তিনি শরিয়তের আইন না মেনে খামখেয়ালি করছে।

তখন দিল্লীর সিংহাসনে অসীন প্রতাপশালী সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন (১২৬৫-৮৭)। কথিত আছে, বলবনের নাম শুনলে প্রজাদের ঘুম হারাম হয়ে যেত। এই অভিযোগ খণ্ডনের জন্য দিল্লীর দরবারে ডাক পরে নিজামউদ্দিন আউলিয়ার।

বলবনের দরবারে হাজির হয়ে নিজামউদ্দিন বলেন, হে সুলতান! এ কথা সত্য যে, আমি হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান কারও মধ্যে ভেদাভেদ করি না। কারণ আল্লাহর জমিনে সবাই তার বান্দা, আদম সন্তান।

অভিযোগকারীরা বলেন, নিজামউদ্দিন আউলিয়া মানু্ষর চোখে ধুলা দিয়ে প্রেমের কথা বলেন।

জবাবে নিজামউদ্দিন বলেন, আপনারা নিশ্চয়ই ঘুঘুর গল্পটা জানেন, যে তার সঙ্গীর কাছে নিজেকে সমর্পণ করেনি।

পুরুষ ঘুঘু আবেগে বলেছিল, ‘তুমি যদি নিজেকে সমর্পণ না কর তাহলে আমি বাদশাহ সোলায়মানের সিংহাসন উল্টে দেব।’

সে কথা বাদশাহ সোলায়মানের দরবারে পৌঁছলে বাদশাহ ঘুঘুকে ডেকে পাঠান।

ঘুঘু বলেছিল, ‘হে আল্লাহর বান্দা! প্রেমিক-প্রেমিকার কথার কোনো ব্যাখ্যা আশা করা উচিত নয়।’

ঘুঘুর উত্তরে বাদশাহ সোলায়মান খুশি হয়েছিলেন। আমিও আশা করি, আমার উত্তরে সুলতান বলবন সন্তুষ্ট হবেন।’

নিজামউদ্দিন আউলিয়ার কথা শুনে দরবারে উপস্থিত সবাকে বাহ বাহ করে উঠেন। সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনও তার সুখ্যাতি করেন।

 

শাহজালারের সাথে নিজামউদ্দিন আউলিয়াসাক্ষাৎ

নিজামউদ্দিন আউলিয়া এক শিষ্যের মারফত জানতে পারেন তার এলাকায় ইয়েমেন থেকে শাহজালাল নামে একজন দরবেশ এসেছেন। কথিত আছে, নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মনে হজরত শাহজালাল প্রকৃত দরবেশ কিনা তা নিয়ে একটু সংশয় ছিল।

পরে বাবা নিজামউদ্দীন নিজেই হজযরত শাহজালালের সাথে সাক্ষাত করেন এবং নিজ দরবারে নিয়ে আসেন। পরে দিল্লীতে তিনি যতদিন ছিলেন ততদিন নিজামউদ্দিন আউলিয়ার দরবারে শিষ্যদের নিয়ে অবস্থান করেন।

তারপরও তিনি তার এক শিষ্যকে শাহজালালের কাছে দাওয়াতী পত্র দিয়ে পাঠান। ঐদিকে বাতেনী জ্ঞানে শাহজালাল নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মনের সংশয়ের কথা জানতে পারেন।

তিনি নিজামউদ্দিন আউলিয়ারকে দেয়ার জন্য শিষ্যের হাতে একটা কৌটা দেন। যার ভেতর তিনি তুলার মাঝখানে এক টুকরা জ্বলন্ত কয়লা রাখেন। নিজামউদ্দিন শিষ্যের হাত থেকে কৌটাটি নিয়ে খুলে দেখেন ভেতরে রাখা জ্বলন্ত কয়লা তুলাকে স্পর্শও করেনি। তখন তিনি নিশ্চিত হলেন শাহজালাল একজন প্রকৃত দরবেশ।

পরে বাবা নিজামউদ্দীন নিজেই হজযরত শাহজালালের সাথে সাক্ষাত করেন এবং নিজ দরবারে নিয়ে আসেন। পরে দিল্লীতে তিনি যতদিন ছিলেন ততদিন নিজামউদ্দিন আউলিয়ার দরবারে শিষ্যদের নিয়ে অবস্থান করেন।

দিল্লী থেকে সিলেটের দিকে ররওনা হওয়ার সময় নিজামউদ্দিন আউলিয়া শাহজালালকে একটি জায়নামাজ এবং একজোড়া কবুতর উপহার দেন। সেই কবুতরই ‘জালালি কবুতর’ নামে পরিচিতি পায় সর্বত্র।

(চলবে…)

……………………………
আরো পড়ুন:
দিল্লীর নিজামউদ্দিন আউলিয়া-১
দিল্লীর নিজামউদ্দিন আউলিয়া-২
দিল্লীর নিজামউদ্দিন আউলিয়া-৩
দিল্লীর নিজামউদ্দিন আউলিয়া-৪

…………
তথ্যসূত্র:
উইকিপিডিয়াসমূহ

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!