মনসুর হাল্লাজ ফকির

মনসুর হাল্লাজ ফকির সে তো: চার

তবে তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের স্বপক্ষে কোন স্বাক্ষী ছিল না। তাই ১০১ জন আলেমের সম্মতিতে রায় কার্যকর করার নির্দেশ দেয়া হয়।

পরিতাপের বিষয় হলো এই সম্মতিপত্রে সর্বপ্রথম স্বাক্ষর দিয়েছিলেন হাল্লাজেরই গুরু জুনায়েদ বাগদাদী। বাগদাদী স্বাক্ষর করার সময় বলেছিলেন, ‘আপাত দৃষ্টিতে ইসলামী শরিয়া আইন অনুযায়ী সে দোষী এবং শাস্তির যোগ্য বটে, কিন্তু প্রকৃত সত্য আল্লাহই জানেন।’ (কার্ল আর্নেস্ট তার গ্রন্থে আত্তারের এই দাবী অস্বীকার করে বলেছেন জুনায়েদ বাগদাদী মারা যান ৯১০ সনে আর হাল্লাজের মৃত্যুদণ্ড কার্য়কর হয় ৯২২ সনে)

রায় জানার পর হাল্লাজ বলেছিল- ‘এককের সাথে লীন হওয়াই পরমানন্দদায়ক।’

বন্দিদের মাঝে মুক্তির ইচ্ছা জাগ্রত ও তাদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করার দায়ে বাগদাদের কাজী হাল্লাজকে প্রকাশ্য তিনশ দোররা মারার আদেশ দেন।

অন্যদিকে এক জন আলেমের স্বাক্ষর সংগ্রহ বাকি থাকায় হাল্লাজের ফাঁসি কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছিল না। এই রায়ে স্বাক্ষর করার জন্য আব্বসীয় বাহিনী আর একজন আলেমকে সম্মত করতে পারছিল না। শেষে হাল্লাজ নিজেই ১০১তম স্বাক্ষী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

খলিফার অনুমতির পর তার স্বাক্ষর গ্রহণ করে দীর্ঘ ১১ বছর বাগদাদ নগরে কারাবাসের পর রায় কার্যকর করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। আব্বাসীয় শাসক চেয়েছিল তাকে এমন শাস্তি প্রদান করা হবে যাতে আর কেউ এমন মত প্রকাশ করতে না পারে। আলেমদের সম্মতিতে তাকে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

জানা যায়, বিচারের কাঠগড়ায় নিয়ে যাওয়ার সময় একজন সুফি হাল্লাজকে প্রশ্ন করেন, প্রেম কি?

হাল্লাজ জবাবে বলেন, ‘তুমি আজ, কাল, আর পরশুদিন তা নিজ চোখেই দেখবে।’

উল্লেখ্য সেই দিনই হাল্লাজকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, পর দিন তার দেহাবশেষ পোড়ানো হয়, আর তার পর দিন তার দেহভস্ম বাতাসে মিলিয়ে ফেলা হয়।

তৎকালীর সুফি ফরিদউদ্দিন আত্তার এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এটাই প্রেম’।

অবশেষে সেই দিন উদয় হলো। ২৬ মার্চ ৯২২ খ্রিস্টাব্দে হাল্লাজকে হাজির করা হলো সকলের সামনে। প্রথমে তাকে প্রকাশ্যে ৩০০ দোররা মারা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো এতোগুলো দোররা মারা হলেও তিনি তার আঘাতে সামান্য শব্দ পর্যন্ত করেন নি।

তিনি কেবল বলে চলছিলেন- ‘হক, হক, আনাল হক’। সমবেত জনতাও তার সাথে বলে চলেছিল- ‘হক, হক, আনাল হক’।

দোররা প্রদানের শাস্তি শেসে হাল্লাজকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় হাল্লাজ বলেন-

এখন সত্য আর আমার মাঝে আর কেউ দাঁড়িয়ে নেই
না আছে কোনো কারণ প্রদর্শনের;
না আছে কোনো প্রমাণ উদঘাটনের;
এখন সর্বময় উজ্জ্বল আলোতে পূর্ণ সত্যের আলোকসজ্জায়,
প্রতিটি ঝিলিক সে আলোরই ক্ষুদ্রতম অংশ।।

কথিত আছে, দীর্ঘক্ষণ ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রাখার পরও মৃত্যু না হওয়ায় উজির-ই-হাকিমের নির্দেশে হাল্লাজকে ফাঁসি কাষ্ঠ থেকে নামানো হয়। তারপর নির্দেশ দেয়া হয় তার হাত ও পা বিচ্ছিন্ন করার।

নির্দেশ মতো এ সময় প্রকাশ্যে সকলের সামনেই প্রথমে তার পা কাটা হয়। তখন তিনি বলেন যে, ‘এই পা দিয়ে আমি দুনিয়াতে চলাফেরা করতাম, এখন তো বেহেস্ত মাত্র এক কদম দূরে; পারলে সেই পা কাটো।’

তারপর যখন হাত কেটে ফেলা হয়, তখন তিনি সেই কাঁটা বাহুর রক্ত মুখে মেখে নেন।

বাহুর রক্ত মুখে নেয়া দেখে তাকে প্রশ্ন করা হয়- আপনি এমনটা কেনো করলেন?

হাল্লাজ জবাব দেন, ‘আমার দেহ থেকে অনেক রক্ত পাত হয়েছে, তাই আমার মুখ হলুদে দেখাচ্ছে। আমি নিজের মুখ ফ্যাকাশে দেখাতে চাই না।’ [ফ্যাকাশে মুখ দেখে কেউ যাতে না ভাবে আমি ভয় পেয়েছি]

এভাবে রক্তক্ষরণে হাল্লাজের দেহ ফ্যাকাশে হলো বটে কিন্তু এতেও তার মৃত্যু হল না। সে তখনও উদ্বিগ্ন না হয়ে জনতার সাথে কথা বলে যাচ্ছিল। তখন তার নাক, কান ও জিহ্বাও কেটে ফেলা হয়। তখনো হাল্লাজ বলছিল, ‘হক, হক, আনাল হক’।

খলিফার আদেশে মত আলেমরাও একমত হন। সে মতো খণ্ডিত টুকরোগুলো তেল ঢেলে পুড়িয়ে ফেলা হয়। কিন্তু সেই দেহাবশেষ যখন টাইগ্রিস নদীতে ফেলা হল। তখন নদীর পানি ফুঁলে ফেঁপে উঠতে লাগল। তার বিশাল বিশাল ঢেউ ধেয়ে আসতে লাগল নগরীর দিকে।

যখন তার চোখ উপড়ে ফেলা হল, তখন জনতা চিৎকার করে উঠল। তাদের কেউ কেউ আতঙ্কিত ও হতবিহ্ববল হয়ে পড়ল, কেউ কেউ মাটিতে উবু হয়ে উচ্চে:স্বরে কাঁদতে লাগল, ওদিকে হাল্লাজের দেহ রক্ত মাখামাখি হয়ে তার খণ্ডিত টুকরোগুলো চারিদিকে ছড়িয়ে রাখা হলো দর্শনার্থীদের দেখবার জন্য। [মুহম্মদ আলী জামনিয়া, টেলস ফ্রম দ্যা ল্যান্ড অফ সুফিজ]

পরদিন সকলে সকলে খেয়াল করলো হাল্লাজের দেহের খণ্ডিত টুকরোগুলোতে তখনো প্রাণ আছে। এবং সেগুলো থেকে অবিরত ‘আনাল হক’ ধ্বনিত হচ্ছে। এ ঘটনায় উজির-ই-হাকিম, আলেমগণ সহ সকলে হতভম্ব হয়ে যায়। তাদের মনে সংশয় দেখা দেয়। তাদের কেউ কেউ ভাবতে লাগলো, তারা কি ভুল করেছে হাল্লাজকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে?

বাগদাদী সকলকে বললেন, ‘আল্লাহর সাথে হাল্লাজের দিদার লাভ হয়ে গেছে। নিজের ভেতর যখন তিনি আল্লাহকে দেখেছিলেন, তখন তাকে বলেছিলেন- তুমি কে? আল্লাহ বলেছিলেন, ‘আনাল হক’। আর সেই উচ্চারণই মনসুরের দেহ প্রতিধ্বনিত করছে মাত্র।’

খলিফাও বিষয়টি জেনে বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি জনতার ক্রোধ বিস্ফোরণের আশঙ্কায় তৎক্ষণাৎ দেহ-খণ্ডগুলো পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন।

খলিফার আদেশে মত আলেমরাও একমত হন। সে মতো খণ্ডিত টুকরোগুলো তেল ঢেলে পুড়িয়ে ফেলা হয়। কিন্তু সেই দেহাবশেষ যখন টাইগ্রিস নদীতে ফেলা হল। তখন নদীর পানি ফুঁলে ফেঁপে উঠতে লাগল। তার বিশাল বিশাল ঢেউ ধেয়ে আসতে লাগল নগরীর দিকে।

সমগ্র বাগদাদ নগরীতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। সকলে দিকবিদিক ছুটাছুটি করতে শুরু করে দিলো। এ সময় হাল্লাজের শিষ্য সামেরী হাল্লাজের ব্যবহৃত একটা জোব্বা এনে সেই পানিতে ছুঁড়ে দিলো। তাতে নদী শান্ত হয়ে গেলো।

সামেরী পরে জানায়, মৃত্যুর ৪০ দিন পূর্বে হাল্লাজ তাকে এ পরিস্থিতির কথা বলেছিলেন, আর তাকে এমনটাই নির্দেশ দিয়েছিল।

হাল্লাজের মৃত্যুর পর সুফি আব্বাস তুসি বলেছিলেন, ‘শেষ বিচারের দিন হাল্লাজকে সদ্য যাত শিশুদের সারিতে উপস্থিত করা হবে, কারণ তার মাঝে আছে ঐশ্বরিক পরমানন্দ। সে পুরো বিশ্বকে উল্টোদিকে চালিত করতে পারে।’

কথিত আছে, তৎকালীন বহু উলামায়ে কেরাম তার মৃত্যুদণ্ডের সময় এই বলে কেঁদেছিল যে, যদি ফেতনার আশংকা না থাকত, তাহলে আমরা হাল্লাজের মৃত্যদণ্ডের পক্ষে মত প্রদান করতাম না।

প্রকৃতপক্ষে সুফিবাদের গূঢ়তত্ত্বকে না জানলে হাল্লাজকে বোঝা সহজ নয়। ফকির লালন সাঁইজি তাকে নিয়ে বেঁধেছেন পদ-

আমি কি তাই জানলে সাধন সিদ্ধি হয়।
আমি কথার অর্থ ভারি, আমি তো সে আমি নই।।

অনন্ত শহরে বাজারে
আমি আমি শব্দ করে,
আমার আমি চিনতে নারে
বেদ পড়ি পাগলের প্রায়।।

মনসুর হল্লাজ ফকির সে তো
বলেছিল আমি সত্য,
সই হল সাঁইর আইন মত
সবাই কি জানতে পাই।।

কমবে জনে বা জনে আল্লা
সাঁইর হুকুম আমি হেল্লা,
লালন তেমনি কেটো মোল্লা
ভেদ না বুঝে গোল বাধায়।।

(চলবে…)

<<মনসুর হাল্লাজ ফকির সে তো: তিন।। মনসুর হাল্লাজ ফকির সে তো: পাঁচ>>

…………………
আরো পড়ুন:

মনসুর হাল্লাজ ফকির সে তো: এক
মনসুর হাল্লাজ ফকির সে তো: দুই
মনসুর হাল্লাজ ফকির সে তো: তিন
মনসুর হাল্লাজ ফকির সে তো: চার
মনসুর হাল্লাজ ফকির সে তো: পাঁচ

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!