আত্তারের সাধনার সপ্ত স্তর শেখ ফরিদ উদ্দিন আত্তার

আত্তারের সাধনার সপ্ত স্তর: এক

-মূর্শেদূল মেরাজ

মাওলানা জালালুদ্দিন রুমির লেখা পড়তে দিয়ে সন্ধান পাই সুফি কবি ফরিদ উদ্দিন আত্তারের। আত্তার নামটা শুনেই একটা কৌতূহল কাজ করতে শুরু করে। অবশ্য রুমির লেখায় আত্তারের উপস্থিতিই তার প্রতি আকর্ষণের মূল কারণ ছিল।

কে এই কবি? কি তার রচনা? কোথায় তার বাস? তা জানতে গিয়ে আত্তারে লেখা পড়তে শুরু করি। তবে যর্থাথ অনুবাদ সংগ্রহ করতে না পেরে সে চেষ্টা বেশিদূর এগোই নি সে সময়। একসময় হাতে চলে আসে কবির বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘মানতিকুত্তয়ূর’ এর কয়েকটি অনুবাদ। আর তা পড়তে গিয়ে কবিকে যতই জানতে শুরু করি ততই তার প্রতি আকৃষ্ট হতে শুরু করি।

আত্তারের কাব্য পড়তে গিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো রওনা করি এক আধ্যাত্মিক অভিযাত্রায়। যে যাত্রার সঙ্গী স্বয়ং আত্তার নিজে। আত্তার স্বয়ং হাত ধরে এই অভিযাত্রায় নিয়ে যায় তার কাব্যগ্রন্থ ‘মানতিকুত্তয়ূর’ বা ‘পাখিদের সমাবেশে’।

রুমির মসনবী যেমন বাঁশরির বিচ্ছেদের গল্পের মধ্য দিয়ে আধ্যাত্মিকতার আদ্যপ্রান্ত ব্যক্ত করেছেন। তেমনি আত্তার পাখিদের অভিযাত্রার মধ্য দিয়ে ব্যক্ত করেছেন সুফি সাধনার অনন্ত লীলা কাহিনী। পারস্যের এক আতরওয়ালা যে সুগন্ধ তার কাব্যের ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে রেখেছেন তা ‘মানতিকুত্তয়ূর’ পড়লে মর্মে মর্মে টের পাওয়া যায়।

যতদূর জানা যায়, শেখ ফরিদ উদ্দিন আত্তারের প্রকৃত নাম মোহাম্মদ ইবনে আবু বক্কর ইব্রাহিম। তিনি অবশ্য কবিতা লিখতেন শেখ ফরিদ উদ্দিন আত্তার নামে। ধারণা করা হয়, পারিবারিক আতরের ব্যবসা করার জন্য তার এই নামকরণ।

ভেষজবিদ বা ওষুধপত্রের কারবারিকে ফারসিতে আর সুগন্ধির ব্যবসায়ীকে আরবিতে বলা হয় ‘আত্তার’। আর এই আত্তার নামেই শেখ ফরিদ উদ্দিন জগতের মানুষের কাছে সমাদৃত। পারস্যের সাহিত্যে সুফি ধারায় তার অবদান অনস্বীকার্য।

ভিখারিটি তাকে দেখিয়ে তৎক্ষণাৎ মাটিতে শুয়ে কালেমা পড়তে পড়তে দেহত্যাগ করে ফেললো। এ ঘটনা আত্তারের মনে গভীর প্রভাব ফেললো। তিনি অতি যত্নে ও ভক্তিতে ভিখারির দেহ সমাহিতের কাজ সমাধা করলেন। তারপর নিজের দাওয়াখানা-কারখানা সবকিছু মানুষকে দান করে দিলেন।

ফারসি সুফি সাহিত্যের সর্বকালের সেরা তিন রচয়িতার একজন ধরা হয় আত্তারকে। অপর দুইজন হলেন- সানাবি ও রুমি। সুফি সাহিত্যের সাফল্যের যে মুকুট মাথায় পড়েছেন মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি। তার সূচনা করেছিলেন এই শেখ ফরিদ উদ্দিন আত্তার।

১১৪৫ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান ইরানের খোরাসান প্রদেশের নিশাপুর শহরে আত্তারের জন্ম। তখন ছিল সেলজুক সলতনতের সময়। ১২২১ খ্রিস্টাব্দে মঙ্গোলদের অভিযানের সময় দস্যুদের হাতে আত্তার নিহত হন। নিশাপুরেই কবির সমাধি সৌধ বর্তমান। তবে অনেকেই মনে করেন তিনি শত বছর বেঁচে ছিলেন।

জানা যায়, অল্প বয়সেই আত্তার মক্কায় তীর্থযাত্রা করেন। এ সময় ইরাক, মিশর, দামেস্ক, তুরস্ক, ভারতবর্ষ সহ বহু জায়গা ভ্রমণ করে শেষে নিজ শহর নিশাপুরে স্থায়ী হন।

পিতার মৃত্যুর পর আত্তার ওষুধ বিক্রির পৈত্রিক ব্যবসাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। ব্যবসার প্রয়োজনে এ সময় তিনি চিকিৎসা শাস্ত্রে ব্যাপক জ্ঞান অর্জন করেন। জানা যায়, প্রতিদিন অসংখ্য রোগী চিকিৎসার জন্য তার কাছে আসতো। তিনিও তাদের নিজের তৈরি ওষুধ দিতেন।

বলা হয়ে থাকে, রোগী দেখার সময়ও আত্তার কাব্য রচনা করতেন। তার বেশিভাগ গ্রন্থ নাকি তিনি তার দাওয়াখানায় বসেই লিখেছেন। তার লেখা অধিকাংশ গ্রন্থই কাব্যাকারে রচিত। অবশ্য তিনি গদ্যাকারেও লিখেছেন।

কথিত আছে, একদিন আত্তার তার দাওয়াখানার কাছে এতই মশগুল ছিলেন যে; দোকানে আগত এক ভিখারির শত কাকুতি-মিনতিও তার কানে পৌঁছচ্ছিল না। শেষে ভিখারি রাগত স্বরে চিৎকার করে বলে উঠলো, নগণ্য দুনিয়ার সামান্য ধন দিতে তোমার এতো কুণ্ঠা? না জানি প্রাণ দিতে তুমি কত কুণ্ঠিত হবে!

আত্তার এবার রেগে গিয়ে বলে উঠলো, তুমি যেভাবে প্রাণ দিবে-আমিও সেভাবেই প্রাণ দিব।

ভিখারিটি তাকে দেখিয়ে তৎক্ষণাৎ মাটিতে শুয়ে কালেমা পড়তে পড়তে দেহত্যাগ করে ফেললো। এ ঘটনা আত্তারের মনে গভীর প্রভাব ফেললো। তিনি অতি যত্নে ও ভক্তিতে ভিখারির দেহ সমাহিতের কাজ সমাধা করলেন। তারপর নিজের দাওয়াখানা-কারখানা সবকিছু মানুষকে দান করে দিলেন।

এছাড়াও শ দুয়েক গ্রন্থের সাথে আত্তারের নাম যুক্ত রয়েছে। গবেষকদের মতে, সেগুলো তার রচনা নয়। পরবর্তীতে এসব বইয়ে তার নাম যুক্ত করে দেয়া হয়েছে। শেখ ফরিদ উদ্দিন আত্তার ‘তাযকিরাতুল আউলিয়া’ বা দরবেশদের স্মৃতিকথা নামে একটি গদ্য গ্রন্থও লিখেছেন। আর এই গ্রন্থের জন্য তিনি ‘হেগিয়াগ্রাফি’ (সুফিদের জীবনীকার) নামেও পরিচিত।

সব বিলিয়ে দিয়ে নিঃস্ব হয়ে আত্তার বেড়িয়ে পরলেন ভিখারির বেশে। এ সময় তিনি রুকনুদ্দিন আফাকের কাছে তরিকত শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন। এরপর হজের উদ্দেশ্যে মাক্কার উদ্দেশ্য যাত্রা করেন। সেখানেও বহু মাশায়েখের সহবতে তরিকত শিক্ষায় রত থাকেন। সর্বশেষ মাজদুদ্দিন বাগদাদীর হাতে বায়াত হন।

জানা যায়, মঙ্গোলীয় তাতাড় দস্যুদের নিশাপুর লুণ্ঠনের সময় জনৈক দস্যু আত্তারকে হত্যা করার উদ্দেশ্য আক্রমণ করে। তখন এক জন বলে উঠে, তোমাকে সশস্ত্র আশরফী দেব তাও এই ওলীকে হত্যা করো না। আত্তার বলে, এত স্বল্প মূল্যে আমাকে বিক্রি করো না। আমার মূল্য অনেক বেশি।

অধিক মূল্য পাবার আশায় দস্যুটি আরো কিছুদূর অগ্রসর হলে এবং আরেক জন বললো, এই পীরকে হত্যা করো না- বিনিময়ে আমি তোমাকে এক আঁটি খড় দিবো। আত্তার বলে, দিয়ে দাও, আমার মূল্য এর চেয়েও কম। এ কথা শুনে দস্যুটি রাগ দমন করতে না পেরে আত্তারকে হত্যা করে ফেলে। এভাবেই সমাপ্তি ঘটে এই সাধক ও সুফি কবির।

আত্তার তার জীবদ্দসায় অন্তত ৩০ খানা গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার রচিত গ্রন্থের মধ্যে-

  • দিওয়ান (আত্তারের উদ্ভাবিত চিন্তা)।
  • শরহুল কুলুব (হৃদয়ের মহৌষধ)।
  • মুসিবতনামা (সালিক তথা দরবেশের পাথেয়)।
  • ইলাহিনামা (রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সম্পদ)।
  • মাকামাতুত্তইর (ইশকের মেরাজ)।
  • আসরারনামা (মারেফাতর পৃথিবী)।
  • মুখতারনামা (হৃদয়বানের জান্নাত)।
  • খসরুনামা (ভাষা ও ভাব-বিন্যাস)।
  • পান্দনামা (নসীহতনামা)।
  • জওয়াহেরনামা (মূল্যবান তত্ত্ব)।
  • শরহুল কলব উল্লেখযোগ্য।

এছাড়াও শ দুয়েক গ্রন্থের সাথে আত্তারের নাম যুক্ত রয়েছে। গবেষকদের মতে, সেগুলো তার রচনা নয়। পরবর্তীতে এসব বইয়ে তার নাম যুক্ত করে দেয়া হয়েছে। শেখ ফরিদ উদ্দিন আত্তার ‘তাযকিরাতুল আউলিয়া’ বা দরবেশদের স্মৃতিকথা নামে একটি গদ্য গ্রন্থও লিখেছেন। আর এই গ্রন্থের জন্য তিনি ‘হেগিয়াগ্রাফি’ (সুফিদের জীবনীকার) নামেও পরিচিত।

সম্ভবত মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি তার কিশোর বয়সে আত্তারের সাক্ষাৎ লাভ করেন। সে সময় আত্তার জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছেছেন। যদিও আত্তারের সাথে রুমির সরাসরি সাক্ষাৎ হয়েছিল কিনা তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতোবিরোধ করেছে। রুমি আত্তারকে তার রচনার অনেক জায়গায় নিজের পথ প্রদর্শক এবং ইমাম রূপে উল্লেখ করেছেন। আত্তার সম্পর্কে লিখেছেন-

আত্তার করেছেন সফর প্রেমের সপ্তনগর,
আমরা ঘুরছি কেবল কানা গলির ভেতর।।

সকল রচনায়তেই আত্তার তার প্রতিভার সাক্ষার রাখলেও তার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হলো কাব্যগ্রন্থ ‘মানতিকুত্তয়ূর’ বা ‘পাখিদের সমাবেশ’। এটি চারহাজার পাঁচশত লাইনের দীর্ঘ একটি সুফি কবিতা। এই দীর্ঘ কবিতার শুরুতেই আছে আল্লাহ ও রাসূলের প্রশংসা ও খোলাফায়ে রাশেদীনের সুখ্যাতি বর্ণনা। এরপর গ্রন্থের মূল কাহিনীতে প্রবেশ করেছেন আত্তার।

পাখিদের সমাবেশ গ্রন্থ মূলত পাখিদের আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে এক আধ্যাত্মিক যাত্রার কাব্য। আত্তার ‘মানতিকুত্তয়ূর’ কাব্যগ্রন্থে ‘অন্বেষণ থেকে ফানা’ হওয়ার যে রূপক যাত্রার বর্ণনা দিয়েছেন তা অল্প কথায় বলতে গেলে-

পাখিরা তাদের গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়ে মতবিনিময়ের জন্য এক জায়গায় সমবেত হয়েছে। তাদের আলোচনার বিষয় আশ্চর্য-ঐশ্বরিক পাখি ‘সী-মোরগ’। সকলেই সে পাখির নাম শুনেছে। কিন্তু কেহই তাকে দেখে নাই।

তারা সকলেই জেনেছে যে, সেই পাখিই জগতের সকল পাখির প্রাণের প্রাণ। তার দেখা পেলে তবেই সার্থক হয় জীবন। আর তার দরশন না পেলে জীবনের ষোল আনাই বৃথা।

সবার এক কথা- পৃথিবীর সব দেশেই সম্রাট রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে রাজা-বাদশাহ-সম্রাট নেই। এ কারণে সবখানে চলছে অরাজকতা। আমাদের প্রয়োজন একজন ন্যায়বিচারক সহমর্মী সম্রাট। কিন্তু সেই সম্রাটকে কোথায় পাওয়া যাবে?

এ সময় পাখিদের কোলাহল মুখর পরিবেশে হুপো বা হুদহুদ পাখি উপস্থিত হল। সমবেত পাখিরা সবাই মিলে জ্ঞানী, প্রজ্ঞাবান ও কষ্টসহিষ্ণু হুদহুদ পাখিকেই তাদের নেতা ও মুখপাত্র হিসেবে মনোনীত করল।

হুদহুদ বলল, সম্রাট হওয়ার জন্য যেমন যোগ্যতা সম্পন্ন পাখির প্রয়োজন। সে যোগ্যতা আছে শুধু সী-মোরগ পাখির। তবে সী-মোরগের সন্ধান ও সাক্ষাৎ পাওয়া সহজ নয়। তার কাছে যেতে হলে অনেক দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে তবে সেই দেশে পৌঁছাতে হবে।

(চলবে…)

আত্তারের সাধনার সপ্ত স্তর : দুই>>

……………………………………..
আরো পড়ুন:
আত্তারের সাধনার সপ্ত স্তর : এক
আত্তারের সাধনার সপ্ত স্তর : দুই

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!