বায়েজিদ বোস্তামী

সাধক বায়জিদ বোস্তামী

-মূর্শেদূল কাইয়ুম মেরাজ

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে মা বালক বায়জিদ বোস্তামীর কাছে পানি চাইলেন তৃষ্ণা নিবারণের জন্য। মাতৃভক্ত বায়জিদ ঘরে পানি না পেয়ে রাতের অন্ধকারেই ছুটলেন পানির খোঁজে। বহুদূর থেকে পানি সংগ্রহ করে বায়জিদ যখন ঘরে ফিরলেন। ততক্ষণ তৃষ্ণার্ত মা আবার ঘুমিয়ে পরেছেন। বায়জিদ মায়ের ঘুম না ভাঙিয়ে শিয়রে পানির গ্লাস হাতে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। যাতে মায়ের ঘুম ভাঙলেই তিনি পানি দিতে পারেন। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই রাত পার করে দিলেন তিনি। সকালে যখন মা ঘুম থেকে উঠলেন, চোখ খুলেই দেখলেন পুত্র পানি হাতে দাঁড়িয়ে আছে মাথার কাছে। শিশুপুত্রের এমন ভক্তি দেখে মা বিস্মিত হয়ে গেলেন। যে মহান সাধককে ঘিরে এই কাহিনী তার জীবনীগ্রন্থে এই ঘটনার সন্ধান না পাওয়া গেলেও জগতে তিনি এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পেয়েছেন। পরবর্তি জীবনে গভীর নিষ্ঠার সাথে সাধনা করে সুফি ধারাকে আরো সমৃদ্ধ করেন এই মহান সাধক বায়জিদ বোস্তামী। মাতৃভক্তির কথা উঠলেই মানুষ আজো বায়জিদকে স্বরণ করে। এই ঘটনা নিয়ে রচিত হয়েছে বহু গান-কবিতা-সাহিত্য। কালিদাস লিখেছেন-

“কহিল মা, মরি মরি!
বাছারে আমার পানি হাতে করে সারা রাত্রটি ধরি
দাঁড়াইয়া আছো? ঘুমাওনি আজ? চোখে এলো জল ভরি।”

সাধক বায়জিদ বোস্তামী ১২৮ হিজরী (৮০৪ খ্রিস্টাব্দ) ইরানে অর্থাৎ তৎকালীন পারস্যের রকুমিস প্রদেশের অন্তর্গত খোরাসানের বোস্তাম শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম আবু ইয়াজিদ তাইফুর ঈসা বিন আদম বিন সরুশান আল বোস্তামী; বোস্তামী অর্থ বোস্তামবাসী। পারিবারিকভাবে তার নাম আবু ইয়াজিদ রাখা হলেও স্থানীয় রীতি অনুযায়ী নামের শেষে যুক্ত হয় তার শহরের নাম বোস্তাম; বোস্তাম থেকে বোস্তামী। তার ইয়াজিদ নামটিই কালক্রমে বায়জিদ হয়ে যায়। জানা যায়, পিতামহ সুরাশান পারসিক/জরথুস্ত্রুর ধর্মাবলম্বী অর্থাৎ মূর্তি ও অগ্নি উপাসক হলেও তার পিতা তয়ফুর ঈসা বোস্তামী পরবর্তীতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি তবে তাবেঈন ছিলেন।

শৈশবে বায়জিদের জন্য গৃহেই শিক্ষক রেখে শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। তার আলেম পিতাও তাকে গৃহে শিক্ষা দিতেন। একটু বড় হলে ভর্তি করা হয় মাদ্রাসায়। জানা যায়, বায়জিদ অন্যসব শিশুর মতো দূরন্ত ছিল না। তার বেশিভাগ সময় কাটত ঘর থেকে মসজিদ আর মসজিদ থেকে ঘরে আসা-যাওয়ার মধ্য দিয়ে। মাদ্রাসায় পড়াকালীন সময় হঠাৎ তার পিতা মারা যায়। তবে পরিবারিক স্বচ্ছলতা থাকায় তার শিক্ষাক্রম অব্যাহত থাকে। পরে তিনি উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য শামসহ বিভিন্ন দেশে গিয়ে তিন বছরে প্রায় ১৭০ জন খ্যাতিমান মুহাদ্দেসীন, ফোকাহা ও উলামা মাশায়েখের সান্নিধ্যে গিয়ে কোরআন হাদীসসহ শরীয়তের বিভিন্ন শাখা উপশাখায় গভীর জ্ঞাণার্জন করেন। তবে এতে তার জ্ঞানের তৃষ্ণা তৃপ্ত না হওয়ায় তিনি মারেফাত ও সূফীততত্ত্বের অনেক গূঢ রহস্য সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করেন। তার বিশিষ্ট শিক্ষকের মধ্যে ইমাম সাদিক ও শফিক বলখি ছিলেন অন্যতম। তিনি বেলায়তের মহান উচ্চাসনে আসীন হয়েও তরীকতের দীক্ষা নেন ও বায়আত গ্রহণ করেন। তার প্রধান পীর মুর্শিদ হিসেবে যার নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য তিনি হলেন আলে রাসূল দঃ হযরত সৈয়্যদ ইমাম জাফর সাদেক রাঃ।

বায়জিদের আগে জুন্নুন আর মিস্রি নামে এই অঞ্চলের অন্যদুজন সাধকও মারেফাতের তত্ত্ব প্রবর্তন করেন। তাদের প্রবর্তিত মারেফাতের সাথে খ্রীষ্টানদের রহস্যবাদ (গনোস্টিক) বিশ্বাসের মিল পাওয়া যায়। বায়জিদ বোস্তামী পরবর্তীতে এ তত্ত্বকে আরো সমৃদ্ধ করেন, তিনি ইসলামে ধর্মীয় সুখের গুরুত্ব সম্পর্কে বিশদে বিশ্লেষণ করেন। এই সুখকে তিনি ওয়াজদ/শুকর নাম দেন( এটি মূলত ধর্মীয় মাতাল অবস্থা, যাকে বলা হয় ড্রাংনেস)। পরম ঈশ্বরের বিশ্বাসে লীল হয়ে যাওয়া। জানা যায়, এর আগে সুফি পথ মূলত ধার্মিকতা আর আল্লাহ্‌র বন্দেগিতে সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু তিনি এই ঈশ্বরপ্রেম তত্ত্ব সূচনা করেন। জীবনের দীর্ঘ ত্রিশ বছর তিনি সুফিবাদ প্রচারে ব্যয় করেন। তিনি তার ঈশ্বরে লীন হবার তত্ত্বের জন্য বিখ্যাত। এরজন্য বায়জিদ বোস্তামীকে সুলতান-উল আরেফিন বলে আখ্যায়িত করা হয়। 

তিনি ৮৭৭ সালে ১৩১ বছর বয়সে মারা যান, বোস্তাম শহরে তাকে সমাহিত করা হয়। কিন্তু সুফিপ্রেমীদের ভক্তির কারণে পৃথিবীর বেশ কয়েকটি জায়গায় তার নামে মাজার গড়ে ওঠে। তুরস্কের কিরিখানেও এমনকি সুদূর বাংলাদেশের চট্টগ্রামেও রয়েছে বায়জিদ বোস্তামীর মাজার, যদিও কোনদিন তিনি এখানে এসেছিলেন কিনা তার ঐতিহাসিক কোনো প্রমাণ নেই। তবে সুফিপ্রেমীদের কাছে এই সুফিপ্রেমিক সর্বদা ভক্তি পেয়ে আসছেন তার আপন মহিমায়।

বোস্তামীর ভক্তরা বিশ্বাস করে, সিল্ক রুটের সময়কালে ভারত, চীন আর মধ্যপ্রাচ্যের পথে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ছিল চট্টগ্রাম। এ পথেই বায়জিদের অনুসারীরা সম্ভবত নবম শতকে এ বন্দর নগরীতে এসেছিল। আর তাদের প্রভাবেই এই মাজার প্রতিষ্ঠা পায়। স্থানীয়দের দাবী, বায়জিদ বোস্তামী স্বয়ং এই অঞ্চলে এসেছিলেন এবং ভক্তদের ভালোবাসা দেখে নিজের কনিষ্ঠ আঙ্গুল থেকে কয়েক ফোঁটা রক্ত চট্টগ্রামের মাটিতে ঢেলে দেন এবং সেখানে একটি মাজার বানানোর অনুমতি দেন।

…………………………………..
তথ্যসূত্র
১. তাযকেরাতুল আউলিয়া
২. তাজকিরাতুল আউলিয়া, পৃষ্ঠা-৯০ -হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহঃ) ও তাঁর দরগাহ্ শরীফ, পৃষ্ঠা-১৩৭
Robert C. Zaehner, Abū Yazīd of Bisṭām. A turning point in Islamic mysticism, Indo-Iranian Journal 1 (1957), 286–301
৩. Robert C. Zaehner, Hindu and Muslim mysticism, London 1960.
৪. Arthur John Arberry, Bistamiana, BSOAS 25/1 (1962) 28–37
৫. Abd al-Raḥmān al-Badawī, Shaṭaḥāt al-Ṣūfiyya, Cairo 1949
৬. Carl W. Ernst, Words of ecstasy in Sufism, Albany 1985
৭. Carl W. Ernst, The man without attributes. Ibn ʿArabī’s interpretation of al-Bisṭāmī, Journal of the Muhyiddin Ibn ʿArabi Society, 13 (1993), 1–18
৮. ʿAbd al-Rafīʿ Ḥaqīqat, Sulṭān al-ʿĀrifīn Bāyazīd Basṭāmī, Tehran 1361sh/1982

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!