ইবনে আল আরাবী

সুফিবাদের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ইবনে আল আরাবী

-সাজ্জাদুর রহমান লিমন

মুসলিম সুফিবাদের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ইবনে আল আরাবীর নাম অধিকাংশ মানুষের কাছেই অজানা। ‘আল শেইখ আল আকবার’ বা সুফিবাদের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে অভিহিত হওয়া সত্ত্বেও ইতিহাস তাঁর দার্শনিক পরিচয় নির্ণয় করতে ভুল করেছে। অথচ ধর্মকে বিজ্ঞানের আলোকে ব্যাখ্যা করা, কুরআনের বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা, হাদীসের দার্শনিক ব্যাখ্যা, আইনশাস্ত্র, অতীন্দ্রিয়বাদ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি করে গেছেন তিনি।

তাঁর মূল নাম মোহাম্মদ আর পারিবারিক নাম ছিল আবু আব্দুল্লাহ মোহম্মদ ইবনুল আলী ইবনুল মোহাম্মদ ইবনুল আরাবী। তিনি ১৭ রমজান ৫৬১ হিজরি (১১৬৫ খ্রিস্টাব্দ) তারিখে তৎকালীন আন্দালুসিয়া বা বর্তমান স্পেনের মূর্সিয়া নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। এ জন্য তাঁকে আন্দালুসি ও আল-মূর্সি বলা হয়। তাছাড়া তিনি দামেস্কে মৃত্যুবরণ করায় ডাকা হয় দামেস্কি।

ইবনে আল আরাবীর যখন আট বছর, মুরসিয়া তখন পার্শ্ববর্তী এক রাজার আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি সপরিবারে চলে যান লিসবন শহরে। তবে সেখানে সবকিছু ঠিকঠাক বনিবনা না হওয়ায় সিভিল শহর হয় তার পরবর্তী ঠিকানা। সিভিল শহরেই তিনি শিক্ষাদীক্ষায় পূর্ণতা লাভ করেন, তার ধ্যান-জ্ঞান বিকশিত হয়। শহরটি ছিল মধ্যযুগের সুফিবাদচর্চার কেন্দ্রস্বরূপ।

এ শহরেই অনেক বিখ্যাত সুফির সাক্ষাৎ লাভ করেন আল আরাবী, সংস্পর্শে আসেন অনেক বিদুষী নারীর, যাদের প্রভাব তার পরবর্তী জীবনে গভীরভাবে লক্ষণীয়। এরমধ্যে যে নামটি না বললেই নয়, তা হচ্ছে মার্চেন এর ইয়াসমিন। ইয়াসমিনের গুণমুগ্ধ আরাবীর মুখেই শোনা যাক, ‘তার কাজকর্মে এবং যোগাযোগে বিশুদ্ধ আধ্যাত্মিকতার উপস্থিতি তাকে নিয়ে গেছে শ্রেষ্ঠদের কাতারে!’

সমকালীন বিখ্যাত সুফিদের সাথে তার ভাব জমে ওঠে। বিখ্যাত মুসলিম দার্শনিক ইবনে রুশদ ছিলেন আরাবীর বাবার বন্ধু। সে সুবাদের রুশদের সংস্পর্শেও আসেন তিনি। ২০ বছর বয়সে আনুষ্ঠানিকভাবে সুফিবাদকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেন তিনি।

আল আরাবীর প্রথম জীবনের শিক্ষক ছিলেন আবু জাফর নামক এক দরিদ্র কৃষক। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবিবর্জিত শিক্ষকের কাছে প্রাথমিকভাবে কুরআন পড়তে শেখেন তিনি। এরপর একে একে সিভিলের সব বিখ্যাত শিক্ষকের কাছে আরবি ব্যাকরণ, কুরআনের ব্যাখ্যা, হাদিসের ব্যাখ্যা, আইনশাস্ত্র এবং ফিকহশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন।

কৈশোরে পদার্পণ করেই আধ্যাত্মিকতার দিকে ঝুঁকে পরেন। সমকালীন বিখ্যাত সুফিদের সাথে তার ভাব জমে ওঠে। বিখ্যাত মুসলিম দার্শনিক ইবনে রুশদ ছিলেন আরাবীর বাবার বন্ধু। সে সুবাদের রুশদের সংস্পর্শেও আসেন তিনি। ২০ বছর বয়সে আনুষ্ঠানিকভাবে সুফিবাদকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেন তিনি।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি দৈববাণী পেয়ে সুফিবাদের দিকে ধাবিত হয়েছেন। তখন ১১৮৪ খ্রিস্টাব্দ সিভিলের কোনো এক সরকারি অনুষ্ঠানে শহরের সকল গণ্যমান্যদের সাথে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন ইবনে আরাবীও। অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে যখন মদ্যপান শুরু হয়, তখন আরাবীও সকলের সাথে তাল মেলাতে মদের গ্লাস হাতে নেন। কিন্তু গ্লাসে চুমুক দিতে উদ্যোত হলেই তিনি শুনতে পান কোনো এক অদৃশ্য স্বর! ‘হে মুহাম্মদ, তোমাকে কী এজন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে?’

তিনি মদের গ্লাসে রেখে দিলেন এবং দ্রুত অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করলেন। তার মন বিষণ্ণতায় ভরে উঠলো। হাঁটতে হাঁটতে একটি গুহায় প্রবেশ করলেন এবং সেখানে ধ্যানমগ্ন হয়ে ‘জিকরুল্লাহ’ বা আল্লাহর জিক্‌র শুরু করেন। তার এই ধ্যান ভাঙে ৪দিন পর, গুহা থেকে বের হয়ে তিনি বুঝতে পারেন নিজের মধ্যে গুণগত পরিবর্তন চলে এসেছে। তিনি দিব্যজ্ঞান লাভ করেছেন।

‘আমার একাকীত্ব যাপন শুরু হয় ফজরের সময়, যখন সূর্যকিরণ ধীরে ধীরে সব অন্ধকার দূর করে দিতে থাকে। তখন ‘গায়েবি’ (অদেখা/অদৃশ্য) জগতের রহস্যগুলো আমার কাছে একে একে জট খুলতে থাকে। ১৪মাস আমি নির্জনে ধ্যান করেছি, সেগুলো দেখেছি আর লিখে রেখেছি।” –ইবনে আরাবী

তিনি প্রায় ১৪মাস একটানা নিভৃতচারীর মতো জীবনযাপন করেন। এ সময় তিনি কেবলই একজন মানুষের সাথে সাক্ষাৎ করতেন, কথাবার্তা বলতেন। তিনি হচ্ছেন তার দীক্ষাগুরু শেখ ইউসুফ বিন ইউখালফ আল কুমি। টানা ১৪মাসের নিভৃতযাপন শেষে তিনি নিজ বাসস্থানে ফিরে গেলেও সরকারি কাজে আর যোগ দেননি। যাবতীয় অর্থ সম্পদের মোহত্যাগ করে তিনি কেবল জিক্‌র আজগারে সময় ব্যয় করতেন।

মানবীয় দৈহিক সত্তায় ঐশী সত্তার পূর্ণতম প্রকাশই আল্লাহর এক চিরন্তন রহস্য- মানুষের মাঝে নিজেরই মধুরতম বিকাশ বাসনার খেয়ালে সৃষ্টি লোকের সম্ভব হয়েছে। আল্লাহর দীদার বা দর্শন অশরীরী অবস্থায় সম্ভব নয় এবং রমনী রূপে আল্লাহর বিকাশই সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ।

তিনি বলেন, নবুয়ত কেয়ামত পর্যন্ত জারি থাকবে। কিতাব দেয়া নবুওয়াতের একটা বিশিষ্ট কার্যমাত্র। এটা অসম্ভব যে, আল্লাহর সংবাদ ও সৃষ্টিলোকের জন্য তার চিন্তাভাবনা শেষ হয়ে যাবে। যদি তা বন্ধ হয়ে যায় তাহলে সৃষ্টিলোক বেঁচে থাকার শক্তি বা আহার পাবে না।

আল আরাবী সৃষ্টি মাত্রই আল্লাহর সন্ধান করেছেন। তিনি হুলুল বা মানুষে ঐশীরুপ দেখেছেন এবং বিশ্বাস করেছেন যে, ইলাহীয়তে বা ঐশী সত্ত্বার বিকাশ স্ফুরণ হয় আদামিয়াত বা মানবত্বে।

আর ইত্তিহাতের ভিত্তিমূলে তিনি আদম কে সর্বপ্রথম আল্লাহর শারীরিক বিকাশ বলে মানতেন। মানবীয় দৈহিক সত্তায় ঐশী সত্তার পূর্ণতম প্রকাশই আল্লাহর এক চিরন্তন রহস্য- মানুষের মাঝে নিজেরই মধুরতম বিকাশ বাসনার খেয়ালে সৃষ্টি লোকের সম্ভব হয়েছে। আল্লাহর দীদার বা দর্শন অশরীরী অবস্থায় সম্ভব নয় এবং রমনী রূপে আল্লাহর বিকাশই সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ।

মানুষের জন্য উৎকর্ষের স্তর চারটি- ঈমান, ওলিয়াত, নবুওয়াত ও রেসালাত। তিনি সকল ধর্মেই আল্লাহর সন্ধান করতেন। তিনি তাকলীদকে একেবারে পরিত্যাগ করেন। তিনি বলতেন, যারা বলে ইবনে হাজম এরকম বলেছেন, আহমদ এরকম বলেছেন, নোমান এরকম বলেছেন আমি নিশ্চয়ই তাদের দলভুক্ত নই।

আল আরাবীর আল ফুতুহাত আল মাক্কিয়াহ (দ্য মাক্কান ইলুমিনেশন) গ্রন্থটিকে এককথায় সুফিবাদের বিশ্বকোষ বলা যেতে পারে। সুফিবাদের তিনটি মূল স্তম্ভ- যুক্তি, প্রথা ও অন্তর্দৃষ্টিকে তিনি অনুপম দক্ষতায় ব্যাখ্যা করেছেন এই গ্রন্থে। এই গ্রন্থেই তিনি তার বিখ্যাত দর্শন ‘ওয়াহাদাত আল ওয়াজুদ’ বা ‘ইউনিটি অব বিং’ এর পরিচয় করান।

এর সহজ বাংলা হতে পারে অস্তিত্ব বা সত্ত্বার একত্ব। তার এই দর্শনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল মানুষকে তার অন্তর্নিহিত শক্তি আর সম্ভাবনার নাগাল পাইয়ে দেয়া। যিনি সঠিক পথে গিয়ে নিজের প্রকৃত ক্ষমতা উন্মোচন করতে পারবেন, তিনি ‘ইনসান আল কামিল’ বা পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয়ে উঠবেন।

এককথায় ‘যেহেতু সৃষ্টিকর্তা সবকিছুর উর্ধ্বে এবং সর্বোৎকৃষ্ট, তাই তিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ড থেকে আলাদা নন কিংবা বিশ্বসংসার তার থেকে আলাদা নয়। বরং, সমগ্র মহাবিশ্ব তার মাঝেই নিমগ্ন আছে!’ কিন্তু তার এই গভীর চিন্তা সমকালীন অনেকেই ধরতে পারেনি। ফলে তাকে ‘সর্বেশ্বরবাদী’ উপাধি দেয় অনেকে এই যুক্তিতে যে, তিনি সর্বত্র সৃষ্টিকর্তার উপস্থিতি বিরাজমান বলেছেন হেতু তিনি সবকিছুকেই সৃষ্টিকর্তা বিবেচনা করেন!

অথচ তার এই দর্শনে অত্যন্ত চমৎকারভাবে মানুষের জন্য পূর্ণাঙ্গ হয়ে ওঠার বাণী রয়েছে। সৃষ্টিকর্তা যেমনি তার সৃষ্টির মাঝে বিরাজমান, অন্য কথায় তার মাঝেই তার সৃষ্টি নিমজ্জিত হয়ে আছে, তেমনি একজন যথাযথ পূর্ণাঙ্গ মানুষ তার কাজের মাঝেই বিরাজমান। অধ্যবসায় আর সাধনার মাধ্যমেই কেবল মানুষ পূর্ণতা লাভ করতে পারে। আর যিনি পূর্ণতা লাভ করেন, তিনি সৃষ্টিকর্তাকে চিনতে পারেন।

তিনি ওয়াহদাতুল ওজুদ মতবাদ প্রচার করেন। তার এই মতবাদ সবাই মেনে নিতে পারেন নি। ৬৩৮ হিজরীর ২৮ শে রবিউস সানী  সিরিয়ায় তিনি একদল দুষ্টু মানুষ দ্বারা আক্রান্ত হন এবং প্রাণত্যাগ করেন এবং স্রষ্টার দরবারে ফিরে যান।

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!