মোখলেছ শাহ

-জহির আহমেদ

পীর-ফকির-বাউল, অলি-আউলিয়া-দরবেশ ও মহর্ষি-সন্ন্যাসীর দেশ এই বাংলাদেশ। শুধু তিনশ ষাট কিংবা বারো আউলিয়া নয়। হাজার-হাজার আধ্যাত্মিক সাধকগুরু যুগে-যুগে এই বাংলায় জন্ম নিয়েছেন। মানুষকে সুপথ ও শান্তির পথ দেখিয়েছেন ও আজো দেখাচ্ছেন। আগে রেডিওতে একটি গান শুনতাম-

এই অলি আল্লাহর বাংলাদেশ
এই শহীদ গাজীর বাংলাদেশ
রহম কর আল্লাহ, রহম কর আল্লাহ।।

একদিকে হজরত শাহজালাল-শাহপরান, শাহ মখদুম, শাহ আলী, আমানত শাহ ও অন্যরা। অন্যদিকে লালন সাঁই, হাছন রাজা, জালালউদ্দীন খাঁ, শাহ আব্দুল করিম, মহর্ষি মনোমোহন, রাধারমণ, বিজয় সরকার প্রমুখ। তাঁরা আজীবন জীবাত্মার মুক্তির জন্য সাধনা করে গেছেন এবং সাধনায় সিদ্ধিলাভ করে, সেই শান্তির বাণী তাদের কথায় ও গানে মানবের মাঝে প্রচার করে গেছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার দুবাচাইল (বাজেবিশাড়া) গ্রামেও তেমন একজন আধ্যাত্মিক মহান সাধকের জন্ম হয়েছিল। তাঁর নাম মোখলেছুর রহমান। এলাকায় তিনি মোখলেছ ফকির বা মোখলেছ শাহ হিসেবেই পরিচিত।

কঠোর সাধনায় পরিপূর্ণ, ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল, মানব-দরদী তাঁর দীর্ঘ জীবন নিয়ে একটি চমৎকার জীবনীগ্রন্থ রচিত হতে পারে। তবে আজ তাঁর খুবই সংক্ষিপ্ত জীবনকথা ও কিছু অলৌকিক ঘটনা বা কারামতির কাহিনী শৈল্পিক বা সাহিত্যিক রুপ দিয়ে তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

ষোলই শ্রাবণ ইঞ্জিনচালিত নৌকার বহর এসে জমা হতে থাকে দুবাচাইল খালের পাড়ে। নিশান উড়িয়ে মাইক বাজিয়ে নেচে-গেয়ে মুর্শিদী গানে মাতোয়ারা হয়ে ভক্তরা এসে জড়ো হয় তাদের দয়ালের দরবার শরীফে। এছাড়া শুকনো মৌসুমে ছাব্বিশে ফাল্গুন ও বাইশে চৈত্রসহ বছরে তিন-চার দিন ভক্তরা তাদের দয়ালের দরবারে এসে ওরশ করে।

তাদের দয়ালের নাম মোখলেছ শাহ। তিনি তাদের পীর বা মুর্শিদ। অর্থাৎ দীক্ষাগুরু। ভক্তরা জানে, মোখলেছ শাহ তাদের রুহানী পিতা। তাই তিনিই তাদের দয়াল বাবা। মানুষের দেহের অষ্টববস্তুর জন্মদাতা-জন্মদাত্রী তাদের জাগতিক পিতা-মাতা, কিন্তু তাদের সৃষ্টিকর্তার প্রতিনিধি- তাদের আত্মার আত্মীয় হলেন তাদের পীর।

তারা বিশ্বাস করে মোখলেছ শাহ আল্লাহর অলি। তাই মোখলেছ শাহর ভক্তরা সর্বক্ষণ তাদের পীরের প্রেমে দেওয়ানা থাকে। কথায় বলে- যার যেমন ভাব, তার তেমন লাভ। গুরুর প্রেমে জাগতিক কামনা-বাসনা যে যতটা ত্যাগ করতে পারে, গুরুর সান্নিধ্য সে ততটা পেয়ে থাকে। ইহকালে না হোক, পরকালে হলেও এক জনমে না হোক, দুই জনমে হলেও।

সুফিবাদ বা বাউলতত্ত্ব হলো ভক্তির মাধ্যমে আল্লাহকে পাওয়ার পথ। কথায় বলে, ভক্তিতে মুক্তি। বাংলার তরিকতপন্থী সুফি ও বাউলদের মতাদর্শের মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। মোখলেছ শাহ হলেন একজন তরিকতপন্থী সুফি। তাঁর দরবারে নিয়মিত বাউল গান হয়। বাউলেরাও গুরুবাদী।

একজন ব্যক্তিকে পীর মেনে তার কাছে আত্মসমর্পন করা মানে আল্লাহকে পাওয়ার আশায় জাত-কুল-মান বিসর্জন দিয়ে পীরের কাছে নিজেকে নিবেদন করা। মোখলেছ শাহর কাছে বায়েত হয়ে সেই অসাধারণ কাজটিই করেছে তাঁর ভক্তরা। শুধু নিজে বায়েত হয়েই ক্ষান্ত হননি, অনেকে তার স্ত্রী-সন্তানকেও পীরের কাছে নিয়ে গিয়ে মুরিদ করিয়েছেন।

মোখলেছ শাহ দুবাচাইল গ্রামের একজন আধ্যাত্মিক সাধক। তিনি বাজেবিশাড়া গ্রামে জন্ম নিয়ে পরবর্তিতে দুবাচাইল গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। বাজেবিশাড়ার নোয়াব আলী মুন্সির ছেলে এই মোখলেছুর রহমান। একসময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে চাকুরি করতেন।

পিতার মৃত্যুর পর বিশেষ কারণে চাকুরীতে ইস্তফা দিয়ে চলে আসেন। পিতা নোয়াব আলী মুন্সি দাউদকান্দির এক গ্রামের মসজিদে একাধারে দীর্ঘ ষাট বছর ইমামতি করেছেন। এ যুগে কি এমনটা কল্পনাও করা যায়? যাহোক, কথায় বলে- দেশ না ছাড়লে দেশ মিলে না।

চাকুরি ছেড়ে মোখলেছুর রহমান পেয়ে যান নতুন দেশের সন্ধান। আগেই স্বচক্ষে দেখেছিলেন, এবার পেয়ে যান বাঞ্ছারামপুর ছয়ফুল্লাকান্দি এলাকার আধ্যাত্মিক সাধক রাহাত আলী শাহর সত্যিকারের পরিচয়। রাহাত আলী শাহ সংসার-বিরাগী ছিলেন। মোখলেছুর রহমান রাহাত আলী শাহকে গুরু মেনে নেন।

দিন যেতে থাকে। একদা দেড় বছরের একটি পুত্র সন্তান রেখে স্ত্রী মারা গেলে মোখলেছুর রহমানের মনেও সংসার-ধর্মের প্রতি বিরাগ চলে আসে। একদিন দেওয়ানা হয়ে তিনি তাঁর জন্মদাত্রী মা ও সন্তানকে রেখে হঠাৎ ঘর ছেড়ে চলে যান দাউদকান্দি, যে এলাকায় তাঁর বাবা ইমামতি করতেন।

সংসারত্যাগী সন্ন্যাসীর বেশে নিরন্তর সাধনা করে চলেন প্রায় পঁচিশ বছর। ওই এলাকার লোকজন তাঁকে ‘মুন্সির পুত’ বলে সম্বোধন করতো এবং ভালবাসতো। ইতোমধ্যেই তাঁর কিছু ভক্তবৃন্দ হয়েছে। অবশেষে মোখলেছুর রহমান সাধনায় সিদ্ধিলাভ করে ফিরে আসেন নিজ গ্রাম বাজেবিশাড়া।

অতঃপর বসতি স্থাপন করেন দুবাচাইল গ্রামে। তাঁর হাজার হাজার অনুসারী মিলে পীর মোখলেছ শাহকে কেন্দ্র করে দুবাচাইল গ্রামে বিশাল এক আধ্যাত্মিক শাহী দরবার গড়ে তোলে। ভক্ত অনুসারীদের কাছে মোখলেছুর রহমান এখন দয়াল বাবা মোখলেছ শাহ।

কুমিল্লার দাউদকান্দিসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার ভক্ত-শিষ্যের সমাগম বাড়তে থাকে দিনের পর দিন। লোকজন আসে, শান্তি ও মানব-প্রেমের বাণী শোনে- আর প্রশান্ত মন নিয়ে বাড়ি ফিরে যায়।

দুবাচাইলের পার্শ্ববর্তী গ্রাম পিপড়িয়া কান্দা। সেই গ্রামে মোখলেছ শাহর এক শিষ্য হাবিব ডাক্তার। এই হাবিব ডাক্তারের বড় ছেলে পিন্টু। বর্তমানে বাবার মতো সেও পল্লী চিকিৎসক। পিন্টুও মোখলেছ শাহর শিষ্য। পিন্টু ডাক্তারও তার গুরুর প্রতি অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ও তাঁর একনিষ্ঠ সেবক। সেও বাবার মতো আত্ম-অহঙ্কার বিসর্জন দিয়ে মোখলেছ শাহকে ভালবাসে। পীরভক্তি করে সে আত্মতৃপ্তি পায়।

পিন্টু ডাক্তার রাজ বাজারে তার ঔষধের দোকানে কিছু ছবি টানিয়ে রেখেছে। সবচেয়ে বড় বিশাল ফ্রেমের ছবিটি হলো তার দয়াল মোখলেছ শাহর। ছবিগুলো সে সসম্মানে টাঙিয়ে রেখেছে বহু বছর যাবৎ। যে কেউ পিন্টু ডাক্তারের ঘরে যায়, ছবিগুলো দেখতে পায়।

পিন্টু ছবির ফ্রেমগুলোতে রঙিন মালা পরিয়ে রেখেছে। মোখলেছ শাহর ছবিটিতে দেখা যায়- দরবেশ বেশে তিনি চেয়ারে বসে আছেন। তাঁর দৃষ্টিতে মানবতাবাদী দরদী এক মানবাত্মার রুপ ফুটে উঠেছে। অন্য একটি ছবি মোখলেছ শাহর এক আশ্চর্য ঘটনার সাক্ষ্য বহন করে।

ঘটনাটি এরকম- মোখলেছ শাহর দরবারে গরু-ছাগলসহ অন্যান্য পোষা প্রাণীর সাথে ছিল একটি পোষা কুকুর ও একজোড়া রাজহাঁস। একসময় একটি রাজহাঁস মারা যায়। এরপর থেকে ভক্তবৃন্দ ও এলাকাবাসী প্রত্যক্ষ করতে থাকে সেই অলৌকিক ব্যাপারটি। অস্বাভাবিক প্রেমের এক অদ্ভূত উদাহরণ সৃষ্টি হয় তখন।

রাজ হাঁসটি তার জাত-সঙ্গীকে হারিয়ে জীবন-যাপনের দোসর হিসেবে বেছে নেয় বিজাতীয় প্রাণী কুকুরটিকে। লক্ষ্যণীয় এক সখ্যতা গড়ে ওঠে রাজহাঁস ও কুকুরের মধ্যে। বিজাতীয় প্রেমের এক অসাধারণ উদাহরণ সৃষ্টি হয় এই কুকুর ও রাজহাঁসের মধ্যে।

দুয়ে মিলে তারা একত্মা হয়ে আছে যেন। একজন যেন অন্যজনকে ছাড়া বাঁচে না। কুকুর আর রাজহাঁসের নিত্যদিনের দৃশ্যটি ছিল এমন-

মোখলেছ শাহ তাঁর দরবারের সামনের উঠানে বসে আছেন ভক্তবৃন্দ নিয়ে। কুকুর আর রাজহাঁস গলায় গলা জড়িয়ে, গায়ে গা মিলিয়ে মোখলেছ শাহর পায়ের কাছে বসে আছে এমনভাবে, -যেন তারাও মোখলেছ শাহ ভক্ত।

কোন কারণে কুকুরটি কোনদিকে দৌড় দিলে রাজহাঁসটিও ডানা ঝাপটিয়ে প্রাণপণ চেষ্টায় দৌড়াতে থাকে কুকুরটির পিছুপিছু। আবার কুকুরের সাথেই ফিরে এসে আশ্রয় নেয় গুরুজির চরণতলে। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। ভক্তবৃন্দ বিস্মিত চোখে চেয়ে থাকে আর ভাবে, আসলে ইতর প্রাণী দিয়েও মোখলেছ শাহ তাদের প্রেম শিক্ষা দিচ্ছেন। এ কথা ভেবে তারা আরো ভাবাপ্লুত হয়ে পড়ে যে, তাদের দয়াল কত বড় প্রেমিক, কত মহান!

আরো বেশি বিস্ময়ের বিষয় হলো, কোন এক দিন কুকুরটি মারা যাওয়ার পর রাজহাঁসটি খাদ্যগ্রহণ প্রায় বন্ধ করে দেয়। তার কিছুদিন পর রাজহাঁসটিও মারা যায়। ভক্তদের কাছে কুকুর ও রাজহাঁসের বিষয়টি অবিস্মরণীয় হয়ে আছে।

এটিকে তারা তাদের দয়াল গুরুর অলৌকিক শক্তি বা কারামতি হিসেবেই বিশ্বাস করে। চেয়ারে বসা মোখলেছ শাহ ও তাঁর পায়ের কাছে রাজহাঁস-কুকুরের ভাবদৃশ্য নিয়ে একটি ছবিও পিন্টু ডাক্তারের দোকানে শোভা পাচ্ছে।

ছবিগুলো টানাতে পেরে পিন্টু ডাক্তার আনন্দিত ও গর্বিত। এছাড়া ছবিগুলোর মাধ্যমে তার গুরুর শান-মান প্রকাশ ও প্রচার তার উদ্দেশ্য। এসব কারণে মোখলেছ শাহর হাজার হাজার ভক্তবৃন্দ অর্থাৎ তার পীর ভাইদের কাছে পিন্টু ডাক্তার একজন পরিচিত ব্যক্তি।

মোখলেছ শাহ বাজারে গেলে পিন্টু ডাক্তার গুরুকে চেয়ারে বসিয়ে প্রথমেই তাঁকে তাজিম করে। তারপর তাঁকে আপ্যায়ন করে। বাজারের লোকজন সেই দৃশ্য অবলোকন করে। পিন্টু ডাক্তারের সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। কথায় বলে না, ভক্তিতে মুক্তি। তার শুধু মোখলেছ শাহর দয়ার আশা।

পিন্টু কাজের ফাঁকে যখনই সুযোগ পায়, ছুটে আসে দরবারে। দেহটি তার সংসারে ও কাজেকর্মে, মনটি পড়ে থাকে দয়ালের কাছে। এভাবে তার দিন যায়-মাস যায়-বছর যায়। ইতোমধ্যে তার সংসারও হয়েছে। স্ত্রী কিছুটা বাঁধ সাধে পিন্টুর এই গুরুবাদী মারেফতের পথে। কষ্টে পিন্টুর অন্তর ক্ষত-বিক্ষত হওয়ার অবস্থা।

পিন্টু ডাক্তার ভাবে, আমি মানুষের চিকিৎসা করি, আমার অন্তরে রোগ হয়েছে, আমার চিকিৎসা কে করবে? আজকাল দরবারেও তেমন আসা হয়ে উঠে না তার। কাউকে বলতেও পারে না নিজের মনোবেদনা। দরবারের জন্য তার প্রাণ কাঁদে।

কখনো যদি ছুটে যায়ও, কিন্তু থেকে যায় পিছুটান। পিন্টু কতদিন শুনেছে, তাঁর দয়াল প্রায়ই বলেন একটি কথা- দেশ না ছাড়লে দেশ মিলে না। পিন্টু যে তার মায়ার দেশ ছাড়তেও পারছে না। দোটানা প্রেমে পিন্টুর হাসফাঁস অবস্থা। পিন্টুর মনে শান্তি নেই।

মোখলেছ শাহ পিন্টুর মানসিক অবস্থা টের পেয়ে একদিন তাকে সম্বোধন করলেন। তার প্রকৃত অবস্থা জানতে চাইলেন। পিন্টু তাঁর দয়ালকে বললো, আমি রামচন্দ্রপুর বাজারে যেতে চাইলে, কেউ আমাকে পিছন থেকে টেনে ধরলে যাই কীভাবে? মোখলেছ শাহর বুঝতে বাকি রইলো না।

মোখলেছ শাহ বললেন, আচ্ছা, দেখা যাক।

মোখলেছ শাহ একদিন হঠাৎ পিন্টু ডাক্তারের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত। পিন্টুর আড়ালে কী যেন বললেন তিনি তাঁর শিষ্য স্ত্রীকে। পিন্টু আজ বলে, দয়াল আমার! আমার আড়ালে আমার স্ত্রীকে কী বাণী শোনালেন! আজ প্রায় দুই যুগ, অথচ আর একদিনের জন্যও আমার স্ত্রী আমার সাধন পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি, বরং আরো সহায়ক হয়েছে।

পিন্টু কোনদিন তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেসও করেনি তাঁর দয়াল তাকে কী বলেছিল। একদিন তার একজন পীর ভাই তাকে জিজ্ঞেস করলো, আপনি আপনার স্ত্রীর কাছে জানতে চাননি, দয়াল তাকে কী উপদেশ দিয়েছিল?

-সেইটা তো আমার দরকার নাই। আমার যা চাওয়ার ছিল, তাতো আমি পাইছি।

পিন্টু তার গুরুর লীলার কথা ভেবে বিস্মিত হয়। এভাবেই নানান ঘটনায় গুরুর প্রতি তার ভক্তি-প্রেম আরো বেড়ে যায়। একদিন তার জন্মদাতা পিতা দুনিয়া ছেড়ে চলে যান। কিন্তু পিন্টুর জীবন থেমে থাকে না। তার দয়াল বাবার নির্দেশেই তার জীবন এগোতে থাকে। চলতে থাকে তার আধ্যাত্মিক সাধন-ভজন।

কত অদ্ভুত ঘটনা ঘটে এ পৃথিবীতে। তার সব কিছুর কি ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব? মহান আল্লাহ তাঁর অবিনশ্বর অস্তিত্ব প্রকাশ করার জন্য তাঁর প্রিয় বান্দাদের কাছে তাঁর স্বত্তা প্রকাশ করেন, কথা বলেন- ওহী ও এলহামের মাধ্যমে। আবার মাঝে-মধ্যে কিছু অলৌকিক ঘটনাও ঘটিয়ে থাকেন।

ইসলামী পরিভাষায় নবী-রাসুলদের জীবনের এসব ঘটনাকে বলা হয় মোজেজা। আর নবুয়ত পরবর্তী যুগে আউলিয়াদের জীবনে ঘটা এসব ঘটনাকে বলা হয় কারামতি। এসব অলৌকিক ঘটনায় সাধারণ মানুষের গোমরাহী বা বিভ্রান্ত হয়ে যাওয়া মন গভীর ভাবে বিশ্বাসী হয়ে ওঠে সেই অদৃশ্য মহান শক্তির প্রতি।

মোখলেছ শাহর জীবনে এমন অনেক অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে। মোখলেছ শাহর অসংখ্য ভক্ত এসবের সাক্ষী। পিন্টু ডাক্তারের কাছ থেকে শোনা তার জীবনের আরেকটি ঘটনা আমাকে আকৃষ্ট ও অনেকটা বিস্মিত করেছে। ঘটনাটি এমন-

১৯৯৮ সাল। দীর্ঘ দেড় মাসের বন্যায় দেশ তখন সয়লাব। বন্যার পানি ওঠে এসেছে দুবাচাইল ও পিপড়িয়া কান্দা গ্রামেও। দুবাচাইলের তুলনায় পিপড়িয়া কান্দা গ্রাম তুলনামূলক নিচু হওয়ায় পিন্টু ডাক্তারের ঘরের ভেতরেও পানি। চৌকির নিচে তিন-চারটি ইট দিয়ে তারপর চৌকিতে বিছানা পাততে হয়েছে তার ঘরে।

ঘরে তার স্ত্রী ও সদ্যোজাত পাঁচদিনের পুত্র সন্তান। পাশের ঘরে পিন্টুর মা। এমন পরিস্থিতিতেও পিন্টু তার মুর্শিদকে ছেড়ে থাকতে পারে না। বিশেষ করে আবার বৃহস্পতিবার রাতে তো নয়ই। কারণ এই রাতেই হয় তার দয়ালের দরবারে সাপ্তাহিক মাহফিল।

প্রতি সপ্তাহে সেই মাহফিলে জড়ো হয় অনেক ভক্ত ভাই। গভীর রাত পর্যন্ত চলে বাউলের দরদী কণ্ঠে দেহতত্ত্ব, মুশির্দী, বিচার ও বিচ্ছেদী গান। ভক্তরা নশ্বর জীবনে না পাওয়া ও আঘাতের বেদনাগুলো সারিয়ে নিতে চায় অবিনশ্বর প্রেমের আস্বাদনে।

গুরুর প্রেমে ভক্তরা সে রাতে মাতোয়ারা হয়ে উঠে। তারা আত্মহারা হয়ে ডুকরে-ডুকরে, ফুপিয়ে-ফুপিয়ে কাঁদে। এভাবেই তারা তাদের অসহায় মনের ভালবাসা জানায় তাদের দয়াল গুরম্নকে। এ কান্না যেন কান্না নয়। এ মানবাত্মার হৃদয়ের উৎসারণ- জন্ম থেকে নাড়ি ছেড়া মানুষের অব্যক্ত বেদনার প্রকাশ।

এ কান্না যেন সসীম দেহে অসীমকে পাওয়ার জন্য- পরমাত্মার সাথে খণ্ডিত জীবাত্মার সম্মিলনের জন্য হাহাকার ও আজন্ম আকাঙ্খা।

এমন রাতে পিন্টু ডাক্তার কী করে ঘরে শুয়ে থাকে? তাই কাপড় ভিজিয়ে, বন্যার বাঁধাকে ডিঙিয়ে ছুটে যায়। গভীর রাত্রিতে সারা পথে বন্যার পানিতে লুঙ্গি ভিজিয়ে তার দয়াল মোখলেছ শাহর আলোকিত বাড়ির আঙিনায় গিয়ে ওঠে।

হাতে করে নিয়ে যায় সে আরো একটি লুঙ্গী। শুকনো লুঙ্গিটি পরে ভেজা লুঙ্গিটি ছড়িয়ে দেয় সে উঠানের তারে। অবশেষে পীরকে তাজিম করে সে বসে পড়ে আস্তানায়।

বন্যার বাঁধা অবহেলা করে প্রতিদিনের মতো অনেক ভক্তের সমাগম হয়েছে আজো। তার হিন্দু ধর্মাবলম্বী গুরুভাই কৃষ্ণ গান করছিল সে রাতে। গানের চেয়ে বরং পিন্টুর মনোযোগ ছিল বেশি তার দয়ালের দিকে। সাধারণত একটি গান শেষ হলে মোখলেছ শাহ তাঁর অমৃত বাণী ভক্তদের শোনাতেন।

আর ভক্তরাও তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষায় থাকতো অমৃততুল্য সে বাণীর জন্য। অন্যদিনের মতো সেদিনও কত উপদেশই দিয়েছিলেন পিন্টুর দয়াল মোখলেছ শাহ। কিন্তু শুধু একটি কথার তীব্রতা ও তাৎপর্যে সে রাতের সব কথাকে আজ ভুলে গেছে পিন্টু।

পিন্টুর আজো স্পষ্ট মনে আছে, তার গুরুর পায়ে কিছুটা চুলকানি হয়েছিল। সে রাতে পিন্টু তার ডিসপেনসারি থেকে একটি ‘ভেটনোভেট-এন’ ক্রিম নিয়ে গিয়েছিল সাথে করে। মোখলেছ শাহ বিছানায় শুয়ে চোখ মুদে আছেন। মাঝে মাঝে এক পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে অন্য পা চুলকাচ্ছেন।

পিন্টু হাতে মলম নিয়ে সে জায়গায় লাগিয়ে দিচ্ছেন। কয়েকবার এমন করার পর হঠাৎ মোখলেছ শাহ ধড়মড়িয়ে বিছানায় উঠে বসলেন। তিনি পিন্টুকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন, আও মিয়া, আপনে বইসা আছেন কেরে? আপনে চইলা যান। গাধাটায়তো ঔই দিকে মাইরা ফালাইতাছে। আপনে চইলা যান।

পিন্টু কী বুঝলো তা শুধু তার অন্তর্যামীই জানেন। তবে সে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে বন্যার পানি ভেঙ্গে যত দ্রুত সম্ভব বাড়িতে গিয়ে পৌঁছালো। তখন রাত দুটো কিংবা আড়াইটা বাজে। পিন্টু আসার সময় ঘরের দরজাটি টেনে দিয়ে চাপিয়ে এসেছিল। বাড়িতে পৌঁছেই সে দরোজায় একটা ধাক্কা দিল। খুলে গেল দরজা।

ভেতরে তখনো কেরসিনের প্রদীপ জ্বলছিল। প্রদীপের আধো আলোতে সে দেখতে পেল এক অদ্ভুত দৃশ্য। তার পাঁচদিনের শিশু সন্তান রানা (যার নাম তখনো রাখা হয়নি) ঘরের টলটলে পানির নিচে পড়ে আছে। আর তার স্ত্রী তখন হতবিহবল-আত্মভোলা ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে খাটে বসে অপলক চোখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে ডুবে যাওয়া তার নিজেরই সন্তানের দিকে।

সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য! দৃশ্য যতই অভূতপূর্ব কিংবা অভাবনীয় হোক, পিন্টুতো তাকিয়ে তাকিয়ে তা দেখতে পারে না। পিন্টুও অনেকটা আত্মভোলার মতো হঠাৎ ডুবে যাওয়া সন্তানের পা ধরে টান দিয়ে তাকে পানি থেকে উপরে উঠালো। পিন্টুর চিৎকার শুনে তার মা পাশের ঘর থেকে ছুটে এলো।

শিশুটিও তখন নিঃশ্বাস ফেলে তার বেঁচে থাকার প্রমাণ দিল। পিন্টুর স্ত্রী তখনও আগের মতোই ভাবলেশহীন তাকিয়ে আছে। পিন্টু তার স্ত্রীর গায়ে হাত লাগাতেই সে বিছানায় ঢলে পড়লো। পিন্টু, তার মা ও অন্যরা যারা ঘরে এসেছিল তারা তখন বুঝতে পারলো যে, সে এতক্ষণ অচেতন অবস্থায় ছিল।

পরদিন সকালে পিন্টু ডাক্তার তার মা ও স্ত্রীসহ শিশুটিকে নিয়ে তার পীর মোখলেছ শাহর দরবারে ছুটে যায়। তারা তাদের দয়ালের কাছে গত রাতের ঘটনা খুলে বলে। মোখলেছ শাহ মুচকি হেসে শিশু রানার হাতের আঙ্গুল ধরে আস্তে করে টেনে দিতে থাকেন আর মুচকি হেসে একটি কথা কয়েকবার বলেন, আল্লাহর নামে রাখলে নেয় কে, আল্লাহর নামে রাখলে নেয় কে?

………………………………
স্মৃতিকাতর এক রাতের গল্প থেকে পরিমার্জিত।

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!