ভবঘুরে কথা
ইমাম গাজ্জালী

-নূর মোহাম্মদ মিলু

মাদ্রাসা নিযামিয়ার অধ্যক্ষ পদে ইমাম গাজ্জালী
কিমিয়ায়ে সা’আদাত বাগদাদে তখন তুর্কিরাজ মালেক শাহের আধিপত্য ছিল। তার প্রধানমন্ত্রী হাসান বিন আলী নিযামুল মূলক একজন অসাধারণ পণ্ডিত ও বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তি ছিলেন। তার নামানুসারেই বাগদাদের বিশ্ববিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় ‘মাদ্রাসায়ে নিযামিয়া’ এবং উহার পাঠ্যতালিকা ‘দরসে নিযামী’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে।

তিনি অত্যন্ত আগ্রহের সাথে ইমাম গাজ্জালীকে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ পদে নিযুক্ত করেন। তখন তার বয়স ৩৪ বছর, এত অল্প বয়সেও তিনি অধ্যাপনা ও পরিচালনা কাজে নিতান্ত দক্ষতা ও নিপুণতার পরিচয় দেন। স্বয়ং বাদশাহ ও রাজপুরুষরাও রাজকাজের জটিল সমস্যাগুলো তার পরামর্শ গ্রহণ করতেন।

এ সময় তার নাম দুনিয়ার সর্বত্র ছড়িয়ে পরে এবং বিভিন্ন দেশ থেকে শত শত ছাত্র তার শিষ্যত্ব গ্রহণের জন্য ছুটে আসে। মাদ্রাসা নিযামিয়ার খ্যাতিও অত্যন্ত বৃদ্ধি পায়। অধ্যাপনার সাথে সাথে তিনি নানা জটিল বিষয়ে গবেষণাও করতে থাকেন। এভাবে তিনি অপরিসীম জ্ঞানের অধিকারী হন।

মাদ্রাসা নিজামিয়া ত্যাগ
প্রভূত যশ ও যোগ্যতার সাথে ইমাম গাজ্জালী চার বছর মাদ্রাসা নিযামিয়াতে কাজ করেন। নানা জটিল বিষয়াদির চমৎকার ব্যাখ্যা শ্রবণ ও তার জ্ঞানের গভীরতা উপলব্ধি করে তার ছাত্ররা একেবারে বিস্মিত হয়ে পরত। এখানে অবস্থানকালে তিনি দর্শন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের গ্রন্থরাজি অধ্যয়ন সমাপ্ত করেন। তরপরও তার মন তৃপ্ত হল না। অজানাকে জানবার এবং অদেখাকে দেখবার জন্য তার মন ব্যাকুল হয়ে উঠিল।

সকল কিছুর প্রতি তার মন বিতৃষ্ণ হয়ে উঠল। তিনি বুঝলেন কেবল পুঁথিগত জ্ঞান দিয়ে বিশেষ কোন কাজ হয় না। বিশুদ্ধ জ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গে একাগ্র সাধনা ও কঠোর রিয়াযতের প্রয়োজন। এ সম্পর্কে তিনি স্বয়ং বলেন, “মানুষের সদ্‌গুণরাজির বিকাশের জন্য অক্লান্ত সাধনা ও একনিষ্ঠ সংযমের একান্ত আবশ্যক।”

এই উপলব্ধির পর নিজ স্বভাব ও কাজের প্রতি মনোনিবেশ করে দেখলাম, আমার কোন কাজই এই নীতির অনুরূপ না, যা দিয়ে আমার স্বভাব, আত্মা ও মানবতের উন্নতি সাধন থেকে পারে। আমি আরও বুঝতে পারলাম, আমি প্রবৃত্তির বশীভূত হয়ে কাজ করছি এবং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের জন্য আমার কাজ কোন কাজ হচ্ছে না।

তবে আল্লাহর সন্তোষ-লাভের জন্য লোকালয়ে অবস্থান করেই দুনিটার সকল মোহ বর্জন করতে হবে। এসব চিন্তা করতে করতে যাবতীয় কাজের প্রতি আমার বিতৃষ্ণা ও বৈরাগ্যভাব জন্মাতে লাগল। মাদ্রাসার অধ্যাপনা এবং পরিচালনা কাজেও শৈথিল্য দেখা দিল, মৌনাবলম্বনের স্পৃহা বৃদ্ধি পাইল। হজম শক্তি কমতে লাগল এবং ঔষধেও অশ্রদ্ধা জন্মাল।

চিকিৎসকরা বললেন, “এমতাবস্থায় কোন ঔষধই ফলপ্রদ হবে না।” শেষে দেশ ভ্রমণে যাওয়ার মনস্থ করলাম। দেশের আমীর-উমরাহ, আলিম-উলামা, সুধীমণ্ডলী ও রাজপুরুষগণ এই সঙ্কল্প পরিত্যাগের জন্য আমাকে অনুরোধ করতে লাগল। কিন্তু আমি মনকে বশে আনতে পারলাম না। শেষে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে হিজরি ৪৮৮ সনের যিলকাদাহ্‌ মাসে আমি গোপনে সিরিয়া অভিমুখে রওয়ানা হলাম।

ইমাম গাজ্জালী এক অসাধারণ অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে জন্মেছিলেন। জাগতিক জ্ঞান তার মনের তীব্র পিপাসা নির্বাপিত করতে পারে নাই। তাই তিনি আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অন্বেষণে বেরিয়ে পরলেন। শৈশব থেকেই তার ধর্মের প্রতি অনুরাগ ও জ্ঞানপিপাসা ছিল অত্যন্ত প্রবল। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সকল দার্শনিকের মতবাদও গভীর মনোনিবেশ সহকারে তিনি অধ্যয়ন করেন।

কিন্তু এতে তার মনের জিজ্ঞাসের কোন সঠিক জবাব তিনি খুঁজে পেলেন না। তাই এক অজ্ঞাত রহস্যের সন্ধানে সংসারবিরাগী সূফী দরবেশের বেসে জীবনের দীর্ঘ দশটি বছর নানা দেশ পর্যটনে অতিবাহিত করেন। এই পথেই তিনি তার চির আকাঙ্ক্ষিত রহস্যের সন্ধান পান। তার মন চিররহস্যময় আল্লাহর স্বরূপ উদ্ঘাটনে সমর্থ হয় এবং তার অন্তরের পিপাসা নিবারিত হয়।

কথিত আছে, মাদ্রাসা নিযামিয়াতে অবস্থানকালে গাজ্জালী মূল্যবান পোশাক পরতেন। কিন্তু দেশ পর্যটনের সময় তিনি নিতান্ত সাধারণ পরিচ্ছেদ একটি মোটা কম্বল সম্বল করে বের হন। কিন্তু এতেও তাকে খুব প্রফুল্ল দেখাত। সিরিয়ার পথে তিনি কিছুকাল দামেস্ক নগরের উমাইয়া জামে মসজিদে অবস্থান করেন।

সেসময় এই মসজিদের পাশে একটি বিরাট মাদ্রাসা ছিল। ইমাম গাজ্জালী এই মসজিদের পশ্চিম প্রান্তে মিনারার এক প্রকোষ্ঠে বাসস্থান নির্ধারণ করেন এবং অধিকাংশ সময়ই ইহাতেমুরাকাবা-মুশাহাদায় নিমগ্ন থাকতেন। অবসর সময়ে তিনি কিছুসংখ্যক অতি আগ্রহী শিক্ষার্থীকে শিক্ষাদান করতেন এবং সময় সময় আলেমদের সাথে জটিল বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন।

বায়তুল মাক্‌দাস যাত্রা ও নির্জনবাস
দুই বছর দামেস্ক নগরে থাকার পর তিনি বায়তুল মাক্‌দাস যাত্রা করেন। জানা যায়, এই প্রশংসা তার মনে অহংকারের সৃষ্টি করতে পারে ভেবে ইমাম সাহেব সেখান থেকে সঙ্গোপনে বায়তুল মাক্‌দাসে চলে যান। সেখানে তিনি ‘সাখ্‌রাতুস্‌সাম্মা’ নামক বিখ্যাত প্রস্তরের পাশ্ববর্তী এক নির্জন প্রকোষ্ঠে থাকতেন।

তিনি এখানে সবসময় যিকর-ফিকরে মশগুল থাকতেন এবং সময় সময় পাশ্ববর্তী পবিত্র মাযারসমূহ যিয়ারতে বের হতেন। মাকামে খলিলে তিনটি প্রতিজ্ঞাঃ বয়তুল মাকদাসের যিয়ারত শেষ করে ‘মকামে খলীল’ নামক স্থানে হযরত ইব্রাহিম (আ) এর মাযার শরীফ যিয়ারত করেন।

সেখানে তিনি তিনটি প্রতিজ্ঞা করেন-
১. কখনও কোন রাজ দরবারে যাব না।
২. কোন বাদশাহর কোন দান বা বৃত্তি গ্রহণ করব না।
৩. কারো সঙ্গে বিতর্কে জড়াবো না।

বায়তুল মাকদাসে অবস্থানকালে ইমাম গাজ্জালী অনেক সময় বায়তুল আকসায় আল্লাহর ইবাদত ও ধ্যনে মগ্ন থাকতেন।

মদিনা শরীফ জিয়ারত
বায়তুল মাকদাস থেকে ইমাম গাজ্জালী মদীনা শরীফ যেয়ে রাসুলুল্লাহ (সা) এর রওজা জিয়ারত করেন এবং সেখানে কিছুদিন অবস্থান করেন।

(চলবে…)

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!