মদন পাগলা

-জহির আহমেদ

তিনি একজন দুনিয়া বিমুখ পাগল। নিত্যদিন তিনি পরমের সন্ধানে ঘুরে বেড়ান। আপনমনে হেঁটে চলেন হাটে-মাঠে-পথে-ঘাটে ; গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। হাঁটেন মাটির দিকে চেয়ে। আলতোভাবে পা ফেলেন, যেন মাটিতে স্পর্শই লাগে না।

কথা বলেন কখনো একাএকা বিড়বিড় করে, কখনো দূরের অদৃশ্য কাউকে উদ্দেশ্য করে রহস্যপূর্ণ চাপাস্বরে। তার এমন সব কথাবার্তা ও চলাফেরার কি মোরতবা, তা কেবল তার অন্তর্যামীই জানেন। প্রশ্ন করলে কখনো অসংলগ্ন, কখনো স্বাভাবিক উত্তর দেন।

রাস্তায় হাঁটার সময় কখনো গ্রামের দুষ্ট বালকরা দূর থেকে তাঁকে ঢিল ছোড়ে। তাতেও তিনি কিছুই বলেন না। একটু রাগও করেন না। বড়জোর খানিকটা দৌঁড়ে বা দ্রুত হেঁটে অন্যত্র শুধু চলে যান।

তিনি মদন পাগলা। জন্ম ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগরে দুবাচাইল গ্রামে। দুবাচাইল, বাজেবিশাড়া, পিপড়িয়া, আলিপুরা, ভাংগানগর, ফরদাবাদ, রুপসদীসহ আরো কিছু গ্রামের লোক তাঁকে দেখে আসছেন বহুদিন ধরে।

আমিও ছোটবেলা থেকেই তাঁকে দেখে আসছি। শৈশবে আমার মনে তাঁর প্রতি ভয়মিশ্রিত একটা শ্রদ্ধাভাব ছিল। বড় হয়ে বুঝতে পেরেছি- তিনি ভয়ংকর কিছু নন ; আরো পরে বুঝতে পেরেছি- মাথা খারাপ বলে যে প্রচারণা আর তাকে নিয়ে তিনি তাও নন। পাগলা হলেও মানুষ হিসেবে তিনি খুব ভালো। কোনদিন কারো কোন ক্ষতি করেননি। মানুষ তাঁকে পছন্দ করে, ভালোও বাসে।

মানুষের কাজ করে দেয়া মদন পাগলার একটি অভ্যাস। কিছু লোক জমিতে আগাছা পরিষ্কার করছে, মদন পাগলা গিয়ে তাদের সাথে কিছু কাজ করে দিয়ে চলে যান। কখনো জমি থেকে ফসলের বোঝা মাথায় করে মানুষের বাড়ি পৌঁছে দেন।

পরীক্ষার্থী ছেলে-মেয়েরা তাঁর কাছে রেজাল্টের ব্যাপারে অগ্রিম জানতে চায়। তিনি যা বলেন, তার অধিকাংশ নাকি ফলেও যায়। সাধারণত কারো কাছে কোনদিন কিছু চেয়ে খান না। কেউ কিছু খাওয়াতে চাইলে ইচ্ছা হলে খান; না হলে জোর করেও খাওয়ানো যায় না।

অনেকে মনে করে, মদন পাগলা স্রষ্টার একজন মাজ্জুব ওলি। তিনি মানুষের জন্য শিক্ষনীয় অনেক কিছুই রেখে গেছেন; তা শুধু দৈহিক নয় রুহানিভাবেও মানুষের অনেক উপকার করে গেছেন।

মনে পরে, একদিন আমার মা দুপুরে আমার পছন্দের খাবার দেশী মোরগ রান্না করেছেন। খাওয়ার অপেক্ষায় ঘরে বসে আছি। হঠাৎ দেখি পাগলা আমাদের ঘরের সামনে দিয়ে যাচ্ছেন। আমি তাঁকে ঘরে এনে বসালাম এবং খেয়ে যেতে বললাম।

তিনি আমার পাশে বসে রইলেন। আম্মা আমাদের জন্য ভাত-তরকারি বাড়ছেন। এমন সময় কী নিয়ে যেন রাগ করে আমি আম্মার সাথে একটু উচ্চস্বরে কথা বললাম। এই ফাঁকে আমার অগোচরে পাগলা ঘর থেকে বের হয়ে উঠানে চলে গেছেন।

আমিও বাইরে গিয়ে তাঁকে ফিরিয়ে আনতে চাইলাম। তিনি রাজি হলেন না। হাত ধরে জোর করে বললাম, আম্মা মাংস রান্না করছে।

তিনি স্বভাবসুলভ কণ্ঠে বললেন, মাংস নাই, প্যাঁদা! প্যাঁদা! (তরকারির বাঁসি ঝোল)। ভাবলাম, মাত্র রান্না হয়েছে! তরকারি তো বাসি হওয়ার কথা নয়। তবে কি হলো? পালগা এই কথা বলছে কেনো? তখন বুঝতে পারলাম। তরকারি বাসি হয়নি; বাসি হয়েছে আমার আচরণ ও অতিথি আপ্যায়নের মানসিকতা। আর জোর করলাম না।

কিন্তু মনটা খারাপ হয়ে গেল। বুঝতে পারলাম- আমি অপরাধ করেছি। মায়ের সাথে রাগতঃ স্বরে কথা বলে আমি পাপ করেছি। তাই একজন অনাহূত মেহমানকে খাওয়ানোর সৌভাগ্য আজ আমার হলো না।

আম্মার কাছ থেকে শোনা আরেকটা ঘটনা মনে পরছে, সেদিন দুপুরেও মদন পাগলা আমাদের ঘরে এসে ঢুকলেন। আম্মা বললেন, ভাত খাইবা?

মদন পাগলা কৌতূহলপূর্ণ স্বরে বলল, বোয়াল মাছ আছে? বোয়াল মাছ?

আম্মারও মনে পরল, আমাদের এক প্রতিবেশির ঘরে আজ বোয়াল মাছের তরকারি রান্না হয়েছে। আম্মা খুশি হয়ে স্নেহের সুরে বললেন, বোয়াল মাছ খাইতে মন চাইছে? একটু বস।

এই বলেই আম্মা কোন দিন যা করেন নি, আজ তাই করলেন। প্রতিবেশির ঘরে গিয়ে তরকারি চাইলেন। কিন্তু ঐ ঘরের মহিলা তরকারি দিলেও, খুশি হয়ে দিলেন না, দিলেন অসন্তুষ্ট চিত্তে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, আম্মা অনেক চেষ্টা করেও সেদিন সে তরকারি মদন পাগলাকে খাওয়াতে পারলেন না। ঘরে যা ছিলো, তা দিয়ে খেয়েই চলে গেলেন। এই হলেন মদনা পাগলা।

আরো অনেক পরের কথা। আমি তখন এলাকার এক কলেজে শিক্ষকতা করি। নতুন বিয়ে করেছি। বেতনভাতা ভালো পাই না। আমার এক নিকট আত্মীয়ের উৎসাহে আমার বিদেশ চলে যাওয়ার ব্যাপারে পারিবারিকভাবে আলোচনা চলছিল। কিন্তু আমার নিজের ইচ্ছার মধ্যে অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল। আর্থিক প্রয়োজন এতই জরুরী হয়ে পরেছিল যে, যেতেই হবে, এমন একটা অবস্থা।

একদিন পাগলাকে পথে পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আমি কি বিদেশ যাবো?

পাগলা বললেন, যান! যান! পাঁচটা আত্মায় চাইলে যান।

মনে হলো- আমি সঠিক উত্তরটি পেয়ে গেছি। বুঝতে পারলাম, সর্বান্তকরণে চাইলেই যাওয়া উচিত। তা না হলে ‘না’। ভাবলাম, এটিই যথার্থ ও সঠিক উত্তর। এর উপরেই আমার সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। অবশ্য পাঁচ আত্মায় কোন দিন চায়ওনি, আর বিদেশও আমার যাওয়া হয়নি।

এমনি আরেকদিন দুপুরে আমি আধ্যাত্মিক সাধক মোখলেছ শাহর বাড়িতে ছিলাম। কোত্থেকে মদন পাগলাও এসে হাজির। মোখলেছ শাহ আমাদের দুজনকে দুপুরের খাবার খেতে বললেন। আমি পাগলাকেও বসতে বললাম। কিন্তু তিনি রাজি হলেন না।

মোখলেছ শাহ হাত ধরে বসাতে চাইলে পাগলা ঘর থেকে বেরিয়ে দিল দৌঁড়। মোখলেছ শাহও দৌঁড়ে গিয়ে পুকুর পাড় থেকে তাঁকে ধরে আনলেন। তখন দুজনেই হাসছেন। তিনজন খেতে বসলাম। জলপাই বা তেঁতুল দিয়ে রান্না করা টক জাতীয় তরকারি দিয়ে আমরা খাচ্ছিলাম। মদন পাগলা খেতে খেতে বললেন, অম্বল, অম্বল!

শুনে আমি আশ্চর্য। মোখলেছ শাহও মুচকি হাসলেন। সেই কত যুগ আগের পড়া! উপরন্তু আবার পাগল। টককে যে ‘অম্বল’ বলে তার এখনো মনে আছে!

মদন পাগলা খুব ভালো ছাত্র ছিলেন। মেট্রিক পর্যন্ত লেখাপড়া করেছিল। কিন্তু পরীক্ষা দেয়া হয়নি। বীরপাড়ার এক টং দোকানের টোলে বসে একদিন তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, মেট্রিক পরীক্ষা দেননি কেন?

সে মুচকি হেসে বলল, দিলে কী হইতো? শুধু টাকাটাই খরচ হইতো। উত্তরটি শুনে খুব মজা পেলাম। ভেবে দেখলাম, পাগল হলেও জীবনের অতীত বর্তমান সবই তার জানা! আর এটাও জানেন যে- বর্তমানের এই হালই তার নিয়তি। তাহলে কি ভবিষ্যতও তাঁকে জানানো হয়েছিল? মৃত্যুর পরের জীবনও?

মদন পাগলা বিয়েও করেছিলেন। সংসারমুখী হতে পারেন নি বলে স্ত্রীর অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায়। তারপর যা হবার তাই হয়েছে। নিঃসঙ্গ হয়ে, সংসারের বাঁধন থেকে মুক্ত হয়ে, বিশ্ব সংসারের মালিকের সন্ধানে পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছেন।

চমৎকার রসবোধও ছিল তাঁর মধ্যে। একদিন ঘরে বসে আমি মহর্ষি মনোমোহন দত্তের একটি বই পড়ছিলাম। বইটির নাম “ময়না বা পাগলের প্রলাপ”। বইটির ভেতরের একটি লেখার শিরোনাম ছিল “বুড়ো মরলে ক্ষতি কী?”

সেদিন টেলিপ্যাথিকভাবে হঠাৎ মদন পাগলাও আমার ঘরে এসে ঢুকলেন। তিনি বইটি দেখে মুচকি হাসলেন। যদিও তিনি পড়তে পারেন, তারপরও লেখাটি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কী?

আমি বললাম, ‘বুড়ো মরলে ক্ষতি কী?’

এবার তিনি আসল পাগলের প্রলাপটি বললেন, চালে তুইলা ফালাইয়া দিলে আরো ভালা!

সেদিন পাগলার রসিকতা আমি খুব উপভোগ করেছিলাম।

একদিন সন্ধ্যায় বাজার থেকে পাঁচ-সাত জন লোক মিলে বাড়ির দিকে যাচ্ছি। ঠাকুর বাড়ির সামনে আসার পর দেখলাম, মদন পাগলাও আমাদের সাথে হাঁটছেন আর আপন মনে কথা বলছেন। আমাদের মধ্যে কেউ একজন বললো, পাগলায় বিড়বিড় কইরা কী কয়?

আমি বললাম, তাঁর এসব কথার মধ্যেও…। এরপর কী বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। কয়েক সেকেন্ড নিরব থেকে উপযুক্ত শব্দটি খুঁজছিলাম, কিন্তু মনে করতে পারছিলাম না। মদন পাগলা আমার পাশেই হাঁটছিলেন। আমাকে আস্তে বলে দিলেন, মোরতবা আছে।

শব্দটা শুনে আমি বিস্মিত, অভিভূত! কারণ এতক্ষণ আমি ঠিক এই শব্দটিই মনে করতে চেষ্টা করছিলাম। এবার আমি পুরো বাক্যটি সবাইকে শুনালাম, তাঁর এসব কথার মধ্যেও মোরতবা (তাৎপর্য) আছে।

বীরপাড়ার হাসেম মিয়ার দোকানের টোলে বসে একদিন তাঁকে অনেক প্রশ্ন করলাম। সেদিনও তাঁর আসল রূপ কিছুটা বুঝতে পেরেছিলাম। আমাদের প্রশ্নোত্তরগুলো ছিল এমন-

: আল্লাহ কী?
:: কলবে আল্লাহ।

: আল্লাহকে পাওয়া যায় কীভাবে?
:: মানুষ মসজিদে সেজদা দেয়না? দু’হাতের তালু সেজদার মতো করে তিনি আমাকে দেখালেন।

: মুরিদ হতে হবে?
:: হুম।

: আপনি মুরিদ হইছেন?
:: না।

: কেন?
:: হইতে পারি নাই।

এবার মদন পাগলার দুঃখ যেন আমাকেই পেয়ে বসলো। কারণ আমিও মুরিদ হতে পারিনি। এরপর এ বিষয়ে আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি। আরো প্রশ্ন করলে হয়তো মদন পাগলার জীবনের অজানা আরো অনেক কিছুই জানা যেতো। যেমন:

: কেন পারেননি?

: মুরিদ হতে চেয়েছিলেন কি-না?

: কার কাছে মুরিদ হতে চেয়েছিলেন?

তাঁর পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবন নিয়েও কিছু প্রশ্ন করা যেতো।

তাঁর বিগত জীবন সঙ্গীনির ব্যাপারেও অন্য একদিন কিছু কথা হয়েছিল। সেদিন পাগলার কথায় মনে হয়েছিল, স্ত্রীকে হারানোর দুঃখও তার মনের কোন একটি স্থানে আজো রয়ে গেছে। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি মোখলেছ শাহর কাছে যান?

পাগলা আমাকে উল্টো প্রশ্ন করে বসলো, মামা কি তারে আইনা দিতে পারবো? মোখলেছ শাহকে তিনি মামা বলতেন।

এমনই অনেক বেদনায় ক্ষতবিক্ষত ছিল মদন পাগলার বুকের শুকনো পাঁজরগুলো। হায় মানবজীবন! জগতজোড়া এত দুঃখের কাহিনী! সংসারত্যাগী পাগলেরও এত দুঃখ থাকে! জগৎ সংসারের সব মানুষই কি তবে শুধু দুঃখের নৌকাই বেয়ে চলে?

মদন পাগলারও এত দুঃখ ছিল! সাথিকে হারানোর দুঃখ! মুর্শিদকে না পাওয়ার দুঃখ! মুরিদ না হতে পারার দুঃখ! পরমকে আপন করে না পাওয়ার দুঃখ! দুঃখে-দুঃখেই আজ সে পাগল!

সেই পাগল আবার কেমন পাগল? যে পাগল গোপনে মদন পাগলাকে একটা চাবি মেরে ছেড়ে দিল! আর এই এক চাবিতেই জীবনভর সে শুধু চলিতেছে আর চলিতেছে…।

আজও সে দুঃখের ঝাঁপি বুকে লয়ে তার মনের মানুষেরে, তার দুঃখের দরদীরে পথে-পথে খুঁজে বেড়ায়..

“আমি কোথায় পাবো তারে,
আমার মনের মানুষ যেরে।”

বুধবার রুপসদির বাউল্লাকান্দি বাজারের হাটবার। হাটে যাওয়ার উদ্দেশ্যে দুবাচাইল-বাজেবিশাড়ার কিছু লোক খেয়াঘাটে এসে নৌকায় চড়লে নৌকা ছেড়ে দিল। নদী পারাপারের জন্য নৌকা একটিই। হঠাৎ মদন পাগলা পাড়ে এসে ডাকলেন, নিয়া যান, নিয়া যান।

লোকজন পাটনিকে বললো, নাও ফিরাইও না, দেরি অইয়া যাইবো।

মদন পাগলাকে না নিয়েই নৌকা চলে গেল। দুবাচাইলের মোহন মিয়ার ছেলে শাহপরান নৌকায় ছিল। নদী পার হয়ে বাজারে গিয়ে শাহপরান দেখে মদন পাগলা আগেই বাজারে উপস্থিত। শাহপরান আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল, আপনে কেমনে আইলেন?

আমারে আল্লায় আনছে। তিনি উত্তর দিলেন।

গ্রামের কিছু তরুণ মিলে তখন মদন পাগলার নামে ছোট আকারে বাৎসরিক ওরশ করে। কিন্তু তিনি যেমন তেমনই। ওরশের রাতেও কোথাও চলে যাচ্ছেন দেখে ছেলেরা তাঁকে ধরে আনলে, খড়কুটার মধ্যে বসে থাকেন। তাঁর প্র‍য়াণের পর বর্তমানে ওরশটি বড় আকারেই হয়। আর প্রয়াত মদন পাগলাও এখন এলাকার যুবকদের কাছে দয়াল বাবা মদন শাহ।

মানুষ ওরশ করে কেন? সবশেষে তাঁকে এই প্রশ্নটিই করেছিলাম।

মানুষে মা-বাপের নামে করে না? তিনি বললেন। আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি। কারণ, ওরশের সংজ্ঞা আমি পেয়ে গেছি।

কী সহজ-সরল ব্যাখ্যা! এভাবে ভাবলে, ওরশের বিরুদ্ধে কথা বলার কোন সুযোগ থাকে? আমি আবারো বুঝে নিলাম, মদন পাগলা বিবেক-বুদ্ধিহীন বা অজ্ঞান-অচেতন কোন সাধারণ পাগল নন। তিনি স্রষ্টার মাজ্জুব ওলি। সেই স্রষ্টাই তাঁকে পাগল বানিয়ে রেখেছেন। আর পাগল সেজে তিনি মালিককেই সন্তুষ্ট করার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন।

আমার কথা শুনে কেউ হাসতেও পারেন। আধুনিক ও বিজ্ঞানমনষ্করা আমাকে ব্যাকডেটেড বা কুসংস্কারাচ্ছও মনে করতে পারেন। তারা হয়তো বলবেন- একজন মানসিক রোগীকে আমি চৌঠা আসমানে নিয়ে তুলছি। কিন্তু দেখুন! পৃথিবীতে কিছু রহস্য হয়তো চিরকালই অনুন্মোচিত থেকে যায়।

মানুষের রূহ হলো সেই সব অভেদ্য রহস্যের সেরা রহস্য। আল্লাহ কোরানে রূহ সম্পর্কে বলেন, “বলুন! রূহ আমার প্রভুর আদেশ।” মুসা নবীর আমলে খোয়াজ খিজিরের কথা কোরানে উল্লেখ আছে। তিনিও একজন মাজ্জুব ওলি ছিলেন। অথচ দৃশ্যতঃ তিনি ছিলেন উন্মত্ত পাগল।

আছাড় মেরে তিনি এক শিশু মেরে ফেলেছিলেন। এমন আরও কিছু ঘটনার কথা কোরানেই আছে। তাঁর এসব কাজের গোপন রহস্য নবী হয়ে মুসাও বুঝতে পারেন নি। মুসা নবীকে খোয়াজ খিজিরের কাছ থেকেই তা জানতে হয়েছিল।

সবশেষে এখন যা লিখবো সে ঘটনাই মদন পাগলার রূহানি শক্তি সম্পর্কে আমার বিশ্বাসকে আরো দৃঢ় করেছিল।

পাগলার ‘মোরতবা’ শব্দে মুগ্ধ হয়ে হাঁটতে হাঁটতেই আমি সাথের লোকদের বললাম, জানেন! আমি একদিন পাগলারে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আল্লাহ কী?’ তিনি কী বলছিল জানেন?

কী বলছিল? অন্যরা জানতে চাইলো।

বলছিল- ‘কলবে আল্লাহ।’

এই বলে আমি ডান হাত দিয়ে আমার বাম বুক স্পর্শ করে বলে সবাইকে শুনালাম। খুব মন দিয়েই সবাই আমার কথাগুলো শুনছিল। এবার আমার সাথে সবাই শুনলো যে, পাগলা আমার ভুল সংশোধন করে ডান হাতের তালু দিয়ে নিজের বাম বুক স্পর্শ করে বললেন, মুমিনের কলবে আল্লাহ।

মদন পাগলার এ উক্তিটি শুনে আমি যতটা মুগ্ধ, বিস্মিত ও অভিভূত হয়েছিলাম, এতটা বিস্মিত আমি জীবনে কমই হয়েছি। আল্লাহর পাগলগণ দৃশ্যতঃ আত্মমগ্ন। তারা সংসারত্যাগী, নির্লিপ্ত, নির্লোভ ও নিরহঙ্কার। পাগলদের এমন আচরণকে অহংকার ভাবার কোন সুযোগ নেই।

কারণ মদন পাগলা আমার ভুল সংশোধন করে দিয়েছেন। সবার ক্বলবে আল্লাহ থাকেন না। মোমিনের ক্বলবেই আল্লাহর সিংহাসন। তাই যারা মোমিন নয়, তারা বুকে হাত রেখে ‘ক্বলবে আল্লাহ’ বলার অধিকার রাখে না। মদন পাগলার মতো মুমিনরাই কেবল বুকে হাত রেখে বলতে পারেন ‘কলবে আল্লাহ।’

অবশ্য আমার সাথে একান্তে কথা বলার দিন তিনি ‘মুমিনের ক্বলবে আল্লাহ’ না বলে শুধু ‘ক্বলবে আল্লাহ’ই বলেছিলেন।

এমনিতে মনে হয়, দীন-দুনিয়ার কিছুই বোঝেন না, একাএকা বিড়বিড় করে। অথচ আল্লাহ তত্ত্বের নিগূঢ় রহস্যও তাঁর নির্ভুলভাবে জানা। এ কোন সাধারণ পাগলের বৈশিষ্ট্য হতেই পারে না। এমন আরও অনেক ঘটনা এলাকার অনেকের মাঝে ছড়িয়ে আছে। এই হলো মদন পাগলা! এবার বুঝুন পাগলদের খেলা!

নবীজি বলেছেন, যখন দেখো যে, কোন বান্দাকে নিশ্চিন্ততা ও দুনিয়া বিমুখতা দান করা হয়েছে, তখন তার কাছে যাও, তিনি তোমাকে হেকমত বা প্রজ্ঞার কথাবার্তা শোনাবেন। তিনি আরো বলেন, যদি চাও যে, আল্লাহপাক তোমাকে ভালোবাসুক, তবে দুনিয়া হতে বিরাগী হয়ে যাও। আল্লাহপাক তোমাকে অবশ্যই ভালোবাসবেন।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!