হজরত ওমর

হজরত ওমর পাক-সাফ হয়ে বোনের হাত থেকে সুরা ত্বাহার অংশটুকু নিয়ে পড়তে শুরু করলেন। পড়া শেষ করে বললেন- আমাকে তোমরা মুহাম্মাদের কাছে নিয়ে চল। ওমরের একথা শুনে এতক্ষণে খাব্বাব ঘরের গোপন স্থান থেকে বেরিয়ে এলেন।

বললেন- ‘সুসংবাদ ওমর! বৃহস্পতিবার রাতে রাসূলুল্লাহ তোমার জন্য দোয়া করেছিলেন। আমি আশা করি তা কবুল হয়েছে। তিনি বলেছিলেন- ‘আল্লাহ! ওমর ইবনুল খাত্তাব অথবা আমর ইবন হিশামের দ্বারা ইসলামকে শক্তিশালী কর।’

খাব্বাব আরো বললেন- রাসূল (সা) এখন সাফার পাদদেশে ‘দারুল আরকামে’।

ওমর চললেন ‘দারুল আরকামের’ দিকে। হামযা এবং তালহার সাথে আরো কিছু সাহাবী তখন আরকামের বাড়ির দরজায় পাহারারত। ওমরকে দেখে তাঁরা সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেন।

তবে হামযা সান্ত্বনা দিয়ে বললেন- আল্লাহ ওমরের কল্যাণ চাইলে সে ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলের অনুসারী হবে। অন্যথায় তাকে হত্যা করা আমাদের জন্য খুবই সহজ হবে।

নবীজী তখন বাড়ির অভ্যন্তরে। তাঁর উপর তখন ওহী নাযিল হচ্ছে। একটু পরে তিনি বেরিয়ে ওমরের কাছে এলেন। ওমরের কাপড় ও তরবারির হাতল মুট করে ধরে বললেন- ওমর, তুমি কি বিরত হবে না?’

…তারপর দোয়া করলেন- হে আল্লাহ! ওমর আমার সামনে, হে আল্লাহ! ওমরের দ্বারা দ্বীনকে শক্তিশালী কর।’

ওমর বলে উঠলেন- আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি আল্লাহর রাসূল।

ইসলাম গ্রহণ করেই তিনি আহ্‌বান জানালেন- ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! ঘর থেকে বের হয়ে পড়ুন।’ (তাবাকুতুল কুবরা/ইবন সা’দ ৩/২৬৭-৬৯) এটা নবুওয়াতের ষষ্ঠ বছরের ঘটনা।

ইমাম যুহরী বর্ণনা করেন- নবীজী দারুল আরকামে প্রবেশের পর ওমর ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পূর্বে নারী-পুরুষ সর্বমোট ৪০ অথবা চল্লিশের কিছু বেশী লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ওমরের ইসলাম গ্রহণের পর জিব্রাইল (আ) এসে বলেন- ‘মুহাম্মাদ! ওমরের ইসলাম গ্রহণে আসমানের অধিবাসীরা উৎফুল্ল হয়েছে।’ (তাবাকাত- ৩/২৬৯)

ওমরের ইসলাম গ্রহণে ইসলামের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। যদিও তখন পর্যন্ত ৪০/৫০ জন লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং তাদের মধ্যে হজরত হামযাও ছিলেন, তথাপি মুসলমানদের পক্ষে কাবায় গিয়ে নামাজ পড়া তো দূরের কথা নিজেদেরকে মুসলমান বলে প্রকাশ করাও নিরাপদ ছিল না।

হজরত ওমরের ইসলাম গ্রহণের সাথে সাথে এ অবস্থার পরিবর্তন হলো। তিনি প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা দিলেন এবং অন্যদের সংঙ্গে নিয়ে কাবা ঘরে নামাজ আদায় শুরু করলেন।

হজরত ওমর বলেন- আমি ইসলাম গ্রহণের পর সেই রাতেই চিন্তা করলাম, মক্কাবাসীদের মধ্যে নবীজীর সবচেয়ে কট্টর দুশমন কে আছে। আমি নিজে গিয়ে তাকে আমার ইসলাম গ্রহণের কথা জানাবো। আমি মনে করলাম, আবু জাহলই সবচেয়ে বড় দুশমন। সকাল হতেই আমি তার দরজায় করাঘাত করলাম।

আবু জাহল বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো, ‘কি মনে করে?’

আমি বললাম- ‘আপনাকে একথা জানাতে এসেছি যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মুহাম্মাদের প্রতি ঈমান এনেছি এবং তাঁর আনীত বিধান ও বাণীকে মেনে নিয়েছি।’

একথা শোনা মাত্র সে আমার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিল এবং বললো- ‘আল্লাহ তোকে কলঙ্কিত করুক এবং যে খবর নিয়ে তুই এসেছিস তাকেও কলঙ্কিত করুক।’ (সীরাতু ইবন হিশাম)

এভাবে এই প্রথমবারের মত মক্কার পৌত্তলিক শক্তি প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হলো। সাঈদ ইনবুল মুসায়্যিব বলেন- ‘তাঁর ইসলাম গ্রহণের পর মক্কায় ইসলাম প্রকাশ্য রূপ নেয়।’

আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (র) বলেন- ওমর ইসলাম গ্রহণ করেই কুরাইশদের সাথে বিবাদ আরম্ভ করে দিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ক’বায় নামাজ পড়ে ছাড়লেন। আমরাও সকলে তাঁর সাথে নামাজ পড়েছিলাম।’

সুহায়িব ইবন সিনান বলেন- তাঁর ইসলাম গ্রহণের পর আমরা কাবার পাশে জটলা করে বসতাম, কাবার তাওয়াফ করতাম, আমাদের সাথে কেউ রূঢ় ব্যবহার করলে তার প্রতিশোধ নিতাম এবং আমাদের ওপর যে কোন আক্রমণ প্রতিহত করতাম। (তাবকাত- ৩/২৬৯)

তাই নবীজী তাঁকে ‘আল-ফারুক’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। কারণ, তাঁরই কারণে ইসলাম ও কুফরের মধ্যে প্রকাশ্য বিভেদ সৃষ্টি হয়েছিল।

নবীজী বলেছেন- ওমরের জিহ্বা ও অন্তঃকরণে আল্লাহ সত্যকে স্থায়ী করে দিয়েছেন। তাই সে ‘ফারুক’। আল্লাহ তাঁর দ্বারা সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করে দিয়েছেন। (তাবাকাত- ৩/২৭০)

মক্কায় যাঁরা মুশরিকদের অত্যাচার অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন, নবীজী তাদেরকে মদীনায় হিজরতের নির্দেশ দিলেন। আবু সালামা, আবদুল্লাহ বিন আশহাল, বিলাল ও আম্মার বিন ইয়াসিরের মদীনায় হিজরতের পর বিশজন আত্মীয়-বন্ধুসহ ওমর মদীনার দিকে পা বাড়ালেন।

নবীজীকে যত যুদ্ধ করতে হয়েছিল, যত চুক্তি করতে হয়েছিল, কিংবা সময় সময় যত বিধিবিধান প্রবর্তন করতে হয়েছিল এবং ইসলাম প্রচারের জন্য যত পন্থা অবলম্বন করতে হয়েছিল তার এমন একটি ঘটনাও নেই, যা ওমরের সক্রিয় অংশগ্রহণ ব্যতীত সম্পাদিত হয়েছে।

এ বিশজনের মধ্যে তাঁর ভাই যায়িদ, ভাইয়ের ছেলে সাঈদ ও জামাই খুনাইসও ছিলেন। মদীনার উপকণ্ঠে কুবা পল্লীতে তিনি রিফায়া ইবন আবদুল মুনজিরের বাড়িতে আশ্রয় নেন।

ওমরের হিজরত ও অন্যদের হিজরতের মধ্যে একটা বিশেষ পার্থক্য ছিল। অন্যদের হিজরত ছিল চুপে চুপে। সকলের অগোচরে। আর ওমরের হিজরত ছিল প্রকাশ্যে। তার মধ্যে ছিল কুরাইশদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ও বিদ্রোহের সুর।

মক্কা থেকে মদীনায় যাত্রার পূর্বে তিনি প্রথমে কাবা তাওয়াফ করলেন। তারপর কুরাইশদের আড্ডায় গিয়ে ঘোষণা করলেন, আমি মদীনায় চলছি। কেউ যদি তার মাকে পুত্রশোক দিতে চায়, সে যেন এ উপত্যকার অপর প্রান্তে আমার মুখোমুখি হয়।

এমন একটি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে তিনি সোজা মদীনার পথ ধরলেন। কিন্তু কেউ এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণের দুঃসাহস করলো না। (তারীখুল উম্মাহ আল-ইসলামিয়্যাহ- খিদরী বেক, ১/১৯৮)

বিভিন্ন বর্ণনার মাধ্যমে জানা যায়, নবীজী বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জনের সাথে ওমরের দ্বীনী ভ্রাতৃ-সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন। আবু বকর সিদ্দিক, উয়াইস ইবন সায়িদা, ইতবান ইবন মালিক ও মুয়াজ ইবন আফরা (র) ছিলেন ওমরের দ্বীনী ভাই।

তবে এটা নিশ্চিত যে, মদীনায় হিজরতের পর বনী সালেমের সরদার ইতবান ইবন মালিকের সাথে তাঁর দ্বীনী ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। (তাবাকাত- ৩/২৭২)

হজরত ওমরের কর্মময় জীবন:

হিজরী প্রথম বছর হতে নবীজীর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওমরের কর্মজীবন প্রকৃতপক্ষে নবীজীর কর্মময় জীবনেরই একটা অংশবিশেষ। নবীজীকে যত যুদ্ধ করতে হয়েছিল, যত চুক্তি করতে হয়েছিল, কিংবা সময় সময় যত বিধিবিধান প্রবর্তন করতে হয়েছিল এবং ইসলাম প্রচারের জন্য যত পন্থা অবলম্বন করতে হয়েছিল তার এমন একটি ঘটনাও নেই, যা ওমরের সক্রিয় অংশগ্রহণ ব্যতীত সম্পাদিত হয়েছে।

এইজন্য এসব ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ লিখতে গেলে তা ওমরের জীবনী না হয়ে নবীজীর জীবনীতে পরিণত হয়। তাঁর কর্মবহুল জীবন ছিল নবীজীর জীবনের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত।

ওমর বদর, উহুদ, খন্দকসহ সকল যুদ্ধেই নবীজীর সাথে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাছাড়া আরো বেশ কিছু ‘সারিয়্যা’ (যে-সব ছোট অভিযানে নবীজী নিজে উপস্থিত হননি)-তে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

বদর যুদ্ধের পরামর্শদান ও সৈন্যচালনা হতে আরম্ভ করে প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি নবীজীর সাথে দৃঢ়ভাবে কাজ করেন। বদর যুদ্ধের বন্দীদের সম্পর্কে তাঁর পরামর্শই আল্লাহর পছন্দসই হয়েছিল। এ যুদ্ধে তাঁর বিশেষ ভূমিকা নিম্নরূপ-

  • এ যুদ্ধে কুরাইশ বংশের প্রত্যেক শাখা হতে লোক যোগদান করে; কিন্তু বনী আদী অর্থাৎ ওমরের খান্দান হতে একটি লোকও যোগদান করেনি। ওমরের প্রভাবেই এমনটি হয়েছিল।
  • এ যুদ্ধে ইসলামের বিপক্ষে ওমরের সাথে তাঁর গোত্র ও চুক্তিবদ্ধ লোকদের থেকে মোট বারো জন লোক যোগদান করেছিল।
  • এ যুদ্ধে ওমর তাঁর আপন মামা আসী ইবন হিশামকে নিজ হাতে হত্যা করেন। এ হত্যার মাধ্যমে তিনিই সর্বপ্রথম প্রমাণ করেন, সত্যের পথে আত্মীয় প্রিয়জনের প্রভাব প্রাধান্য লাভ করতে পারে না।

উহুদ যুদ্ধেও ওমর ছিলেন একজন অগ্রসৈনিক। যুদ্ধের এক পর্যায়ে মুসলিম সৈন্যরা যখন বিপর্যয়ের সম্মুখীন হলেন এবং নবীজী আহত হয়ে মুষ্টিমেয় কিছু সঙ্গী-সাথীসহ পাহাড়ের এক নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিলেন, তখন কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান নিকটবর্তী হয়ে উচ্চস্বরে নবীজী, আবু বকর (র), ওমর (র) প্রমুখের নাম ধরে ডেকে জিজ্ঞেস করলো, তোমরা বেঁচে আছ কি?

নবীজীর ইঙ্গিতে কেউই আবু সুফিয়ানের জবাব দিল না। কোন সাড়া না পেয়ে আবু সুফিয়ান ঘোষণা করলো- ‘নিশ্চয় তারা সকলে নিহত হয়েছে।’

(চলবে…)

……………………………..
পুনঃপ্রচারে বিনীত: নূর মোহাম্মদ মিলু

……………………
আরো পড়ুন:
হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব : পর্ব-১
হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব : পর্ব-২
হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব : পর্ব-৩
হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব : পর্ব-৪
হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব : পর্ব-৫
হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব : পর্ব-৬

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!