হজরত ওমর

ইসলাম গ্রহণের পর কুরাইশদের একজন সম্মানিত ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে ইসলামের শত্রুদের লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়। তাঁর চাচা হাকাম ইবন আবিল আস তাঁকে রশি দিয়ে বেঁধে বেদম মার দিত। সে বলতো, একটা নতুন ধর্ম গ্রহণ করে তুমি আমাদের বাপ-দাদার মুখে কালি দিয়েছ।

এ ধর্ম ত্যাগ না করা পর্যন্ত তোমাকে ছাড়া হবে না। এতে উসমানের ঈমান একটুও টলেনি। তিনি বলতেন- তোমাদের যা ইচ্ছে কর, এ দ্বীন আমি কক্ষণো ছাড়তে পারবো না। (তাবাকাত- ৩/৫৫)

উসমান ইসলাম গ্রহণের পর নবীজী নিজ কন্যা ‘রুকাইয়্যাকে’ তাঁর সাথে বিয়ে দেন। হিজরী দ্বিতীয় সনে মদীনায় রুকাইয়্যার ইনতিকাল হলে নবীজী তাঁর দ্বিতীয় কন্যা উম্মু কুলসুমকে তাঁর সাথে বিয়ে দেন। এ কারণে তিনি ‘যুন-নূরাইন’- দুই জ্যোতির অধিকারী উপাধি লাভ করেন।

রুকাইয়্যা ছিলেন হজরত খাদীজার (র) গর্ভজাত সন্তান। তাঁর প্রথম শাদী হয় উতবা ইবন আবী লাহাবের সাথে এবং উম্মু কুলসুমের শাদী হয় আবু লাহাবের দ্বিতীয় পুত্র উতাইবার সাথে। আবু লাহাব ছিল আল্লাহর নবীর কট্টর দুশমন।

পবিত্র কোরানের সুরা লাহাব নাযিলের পর আবু লাহাব ও তার স্ত্রী উম্মু জামীল (হাম্মা লাতাল হাতাব) তাদের পুত্রদ্বয়কে নির্দেশ দিল ‍মুহাম্মাদের কন্যাদ্বয়কে তালাক দেওয়ার জন্য। তারা তালাক দিল।

অবশ্য ইমাম সুয়ূতী মনে করেন, ইসলাম গ্রহণের পূর্বেই রুকাইয়্যার সাথে উসমানের শাদী হয়। উপরোক্ত ঘটনার আলোকে সুয়ূতির মতটি গ্রহণযোগ্য মনে হয় না।

নবুওয়াতের পঞ্চম বছরে মক্কার মুশরিকদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে প্রথম যে দলটি হাবশায় হিজরত করেছিলেন তাঁদের মধ্যে উসমান ও তাঁর স্ত্রী রুকাইয়্যাও ছিলেন। হজরত আনাস (র) বলেন- ‘হাবশার মাটিতে প্রথম হিজরতকারী উসমান ও তাঁর স্ত্রী নবী দুহিতা রুকাইয়্যা।’

নবীজী দীর্ঘদিন তাঁদের কোন খোঁজ-খবর না পেয়ে ভীষণ উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েন। সেই সময় এক কুরাইশ মহিলা হাবশা থেকে মক্কায় এলো। তার কাছে নবীজী তাঁদের দু’জনের কুশল জিজ্ঞেস করেন। সে সংবাদ দেয়, ‘আমি দেখেছি, রুকাইয়্যা গাধার ওপর সওয়ার হয়ে আছে এবং উসমান গাধাটি তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

নবীজী তাঁর জন্য দোয়া করেন- আল্লাহ তার সহায় হোন। লূতের (আ) পর উসমান আল্লাহর রাস্তায় পরিবার পরিজনসহ প্রথম হিজরতকারী। (আল-ইসাবা)

হাবশা অবস্থানকালে তাঁদের সন্তান আবদুল্লাহ জন্মগ্রহণ করে এবং এ ছেলের নাম অনুসারে তাঁর কুনিয়াত হয় আবু আবদিল্লাহ। হিজরী ৪র্থ সনে আবদুল্লাহ মারা যান। রুকাইয়্যার সাথে তাঁর দাম্পত্য জীবন খুব সুখের হয়েছিল। লোকেরা বলাবলি করতো কেউ যদি সর্বোত্তম জুটি দেখতে চায়, সে যেন উসমান ও রুকাইয়্যাকে দেখে।

হজরত উসমান বেশ কিছু দিন হাবশায় অবস্থান করেন। অতঃপর মক্কায় ফিরে আসেন এই গুজব শুনে যে, মক্কার নেতৃবৃন্দ ইসলাম গ্রহণ করেছে। নবীজীর মদীনায় হিজরতের পর আবার তিনি মদীনায় হিজরত করেন। এভাবে তিনি ‘যুল হিজরতাইন’- দুই হিজরতের অধিকারী হন।

কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, তাবুকে রণপ্রস্তুতির জন্য উসমান কোরচে করে এক হাজার দীনার নিয়ে এসে রাসূলুল্লাহর কোলে ঢেলে দেন। নবীজী খুশীতে দীনারগুলি উল্টে পাল্টে দেখেন এবং বলেন- ‘আজ থেকে উসমান যা কিছুই করবে, কোন কিছুই তার জন্য ক্ষতিকর হবে না।’

একমাত্র বদর ছাড়া সকল যুদ্ধে তিনি নবীজীর সাথে অংশগ্রহণ করেছেন। নবীজী যখন বদর যুদ্ধে রওয়ানা হন, হজরত রুকাইয়্যা তখন রোগ শয্যায়। নবীজীর নির্দেশে হজরত উসমান পীড়িত স্ত্রীর সেবার জন্য মদীনায় থেকে যান।

বদরের বিজয়ের খবর যেদিন মদীনায় এসে পৌঁছুলো সেদিনই হজরত রুকাইয়্যা মৃত্যুবরণ করেন। নবীজী উসমানের জন্য বদরের যোদ্ধাদের মত সওয়াব ও গনীমতের অংশ ঘোষণা করেন। (তাবাকাত- ৩/৫৬)

এ হিসেবে পরোক্ষভাবে তিনিও বদরী সাহাবী।

রুকাইয়্যার মৃত্যুর পর নবীজী রুকাইয়্যার ছোট বোন উম্মু কুলসুমকে উসমানের সাথে বিয়ে দেন হিজরী তৃতীয় সনে। একটি বর্ণনায় জানা যায়, আল্লাহর নির্দেশেই নবীজী উম্মু কুলসুমকে উসমানের সাথে বিয়ে দেন। হিজরী নবম সনে উম্মু কুলসুমও নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যান।

উম্মু কুলসুমের মৃত্যুর পর নবীজী বলেন- ‘আমার যদি তৃতীয় কোন মেয়ে থাকতো তাকেও আমি উসমানের সাথে বিয়ে দিতাম।’ (হায়াতু উসমান- রিজা মিসরী)

উসমান উহুদের যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু সেই মুষ্টিমেয় কিছু যোদ্ধাদের মত রাসূলুল্লাহর সাথে অটল থাকতে পারেননি। অধিকাংশ মুজাহিদদের সাথে তিনিও ময়দান ছেড়ে চলে যান। অবশ্য আল্লাহ তায়ালা তাদের জন্য ক্ষমা ঘোষাণা করেছেন। পরবর্তী সকল যুদ্ধেই অন্যসব বিশিষ্ট সাহাবীদের মত অংশগ্রহণ করেছেন।

নবীজী তাবুক অভিযানের প্রস্তুতির ঘোষণা দিলেন। মক্কা ও অন্যান্য আরব গোত্রসমূহেও ঘোষণা দিলেন এ অভিযানে অংশগ্রহণের জন্য। ইসলামী ফৌজের সংগঠন ও ব্যয় নির্বাহের সাহায্যের আবেদন জানালেন। সাহাবীরা ব্যাপকভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন।

আবু বকর তাঁর সকল অর্থ রাসূলের হাতে তুলে দিলেন। ওমর তাঁর মোট অর্থের অর্ধেক নিয়ে হাজির হলেন। আর এ যুদ্ধের এক তৃতীয়াংশ সৈন্যের যাবতীয় ব্যয়ভার উসমান নিজ কাঁধে তুলে নিলেন। তিনি সাড়ে নয় শ’ উট ও পঞ্চাশটি ঘোড়া সরবরাহ করেন।

ইবন ইসহাক বলেন, তাবুকের বাহিনীর পেছনে হজরত উসমান এত বিপুল অর্থ ব্যয় করেন যে, তাঁর সমপরিমাণ আর কেউ ব্যয় করতে পারেনি।

কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, তাবুকে রণপ্রস্তুতির জন্য উসমান কোরচে করে এক হাজার দীনার নিয়ে এসে রাসূলুল্লাহর কোলে ঢেলে দেন। নবীজী খুশীতে দীনারগুলি উল্টে পাল্টে দেখেন এবং বলেন- ‘আজ থেকে উসমান যা কিছুই করবে, কোন কিছুই তার জন্য ক্ষতিকর হবে না।’

এভাবে অধিকাংশ যুদ্ধের প্রস্তুতির সময় তিনি প্রাণ খুলে চাঁদা দিতেন। একটি বর্ণনায় এসেছে, তাবুকের যুদ্ধে তাঁর দানে সন্তুষ্ট হয়ে নবীজী তাঁর আগে-পিছের সকল গুনাহ মাফের জন্য দোয়া করেন এবং তাঁকে জান্নাতের ওয়াদা করেন। (আল-ফিতনাতুল কুবরা)

রাসূলুল্লাহর ওফাতের পর যখন আবু বকরের হাতে বাইয়াত নেওয়া হচ্ছিল উসমান সংবাদ পেয়ে খুব দ্রুত সেখানে যান এবং আবু বকরের হাতে বাইয়াত করেন। মৃত্যুকালে আবু বকর ওমরকে (র) খলীফা মনোনীত করে যে অঙ্গীকার পত্রটি লিখে যান, তার লেখক ছিলেন উসমান।

হুদাইবিয়ার ঘটনা। নবীজী ওমরকে ডেকে বললেন- তুমি মক্কায় যাও। মক্কার নেতৃবৃন্দকে আমাদের আগমণের উদ্দেশ্য অবহিত কর। ওমর বিনীতভাবে বললেন- ইয়া রাসূলাল্লাহ! কুরাইশদের কাছ থেকে আমার জীবনের আশঙ্কা করছি। আপনি জানেন তাদের সাথে আমার দুশমনি কতখানি।

আমি মনে করি উসমানই এ কাজের উপযুক্ত। নবীজী উসমানকে ডাকলেন। আবু সুফিয়ান ও অন্যান্য কুরাইশ নেতৃবৃন্দের নিকট এ পয়গামসহ উসমানকে পাঠালেন যে, আমরা যুদ্ধ নয়, বরং ‘বাইতুল্লাহর’ যিয়ারতের উদ্দেশ্যে এসেছি।

নবীজীর পয়গাম নিয়ে উসমান মক্কায় পৌঁছলেন। সর্ব প্রথম আবান ইবন সাঈদ ইবন আস- এর সাথে তাঁর দেখা হয়। আবান তাঁকে নিরাপত্তা দেন। আবানকে সঙ্গে করে তিনি কুরাইশ নেতৃবৃন্দের সাথে দেখা করে নবীজীর পয়গাম পৌঁছে দেন।

তারা উসমানকে বলেন, তুমি ইচ্ছে করলে ‘তাওয়াফ’ কতে পার। কিন্তু উসমান তাদের এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, আল্লাহর নবীজী যতক্ষণ ‘তাওয়াফ’ না করেন, আমি ‘তাওয়াফ’ করতে পারিনে। কুরাইশরা তাঁর এ কথায় ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে আটক করে।

কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, উসমানকে তারা তিনদিন আটক করে রাখে। এ দিকে হুদাইবিয়ায় মুসলিম শিবিরে গুজব ছড়িয়ে পড়ে উসমানকে শহীদ করা হয়েছে। নবীজী ঘোষণা করলেন উসমানের রক্তের বদলা না নিয়ে আমরা প্রত্যাবর্তন করবো না।

নবীজী নিজের ডান হাতটি বাম হাতের ওপরে রেখে বলেন- হে আল্লাহ! এ বাইয়াত উসমানের পক্ষ থেকে। সে তোমার ও তোমার রাসূলের কাজে মক্কায় গেছে। উসমান মক্কা থেকে ফিরে এসে বাইয়াতের কথা জানতে পারেন। তিনি নিজেও রাসূলুল্লাহর হাতে বাইয়াত করেন।

ইতিহাসে এ ঘটনা বাইয়াতু রিদওয়ান, বাইয়াতুশ শাজারা ইত্যাদি নামে খ্যাত হয়েছে। পবিত্র কোরানে এ বাইয়াতের প্রশংসা করা হয়েছে।

রাসূলুল্লাহর ওফাতের পর যখন আবু বকরের হাতে বাইয়াত নেওয়া হচ্ছিল উসমান সংবাদ পেয়ে খুব দ্রুত সেখানে যান এবং আবু বকরের হাতে বাইয়াত করেন। মৃত্যুকালে আবু বকর ওমরকে (র) খলীফা মনোনীত করে যে অঙ্গীকার পত্রটি লিখে যান, তার লেখক ছিলেন উসমান।

খলীফা হজরত ওমরের (র) হাতে তিনিই সর্বপ্রথম বাইয়াত করেন।

হজরত ওমর ছুরিকাহত হয়ে যখন মৃত্যু শয্যায়, তাঁর কাছে দাবী করা হলো পরবর্তী খলীফা নির্বাচনের জন্য। কিন্তু তিনি ইতস্ততঃ করে বললেন- আমি যদি খলিফা বানিয়ে যাই, তবে তার দৃষ্টান্ত অবশ্য আছে, যেমনটি করেছেন আমার থেকেও এক উত্তম ব্যক্তি, অর্থাৎ আবু বকর (র) আর যদি না-ও বানিয়ে যাই তারও দৃষ্টান্ত আছে। যেমনটি করেছিলেন আমার থেকেও এক উত্তম ব্যক্তি, অর্থাৎ নবীজী।

তিনি আরো বললেন- আবু উবাইদা জীবিত থাকলে তাকেই খলীফা বানিয়ে যেতাম। আমার রব আমাকে জিজ্ঞেস করলে বলতাম, আপনার নবীকে আমি বলতে শুনেছি, তিনি এই উম্মাতের আমীন বা পরম বিশ্বাসী ব্যক্তি।

যদি আবু হুজাইফার আযাদকৃত দাস সালেমও আজ জীবিত থাকতো, তাকেও খলীফা বানিয়ে যেতে পারতাম, আমার রব জিজ্ঞেস করলে বলতাম, আপনার নবীকে আমি বলতে শুনেছি, সালেম বড় আল্লাহ-প্রেমিক। এক ব্যক্তি তখন বললো, আবদুল্লাহ ইবন ওমর তো আছে।

(চলবে…)

……………………………..
পুনঃপ্রচারে বিনীত: নূর মোহাম্মদ মিলু

……………………
আরো পড়ুন:
হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব : পর্ব-১
হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব : পর্ব-২
হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব : পর্ব-৩
হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব : পর্ব-৪
হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব : পর্ব-৫
হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব : পর্ব-৬

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!