সোহরাওয়ার্দি

সোহরাওয়ার্দির ইশরাকি দর্শন

-মূর্শেদূল মেরাজ

সোহরাওয়ার্দির ইশরাকি দর্শন

সোহরাওয়ার্দির ইশরাকি বা আলোকিত দর্শনের ভিত্তি ধরা হয় ইবনে সিনার মাশায়ি বা অ্যারিস্টটোলীয় দর্শন, সুফিবাদ, প্রাচীন ইরান ও গ্রীসের দর্শনকে। এ দর্শনে অস্তিত্বের যুক্তির পাশাপাশি স্রষ্টাপ্রেমের আধ্যাত্মিকতাও যুক্ত। অনেকে মনে করেন, শরিয়ত-মারফতের মাঝামাঝি রূপ হল এই ইশরাকি দর্শন।

সোহরাওয়ার্দির মতে, আলোকিত দার্শনিকরা যুক্তি, মতামত ও বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে যা কিছুর সন্ধান পান আত্মিকভাবেও সেসবের অভিজ্ঞতা অর্জন করে। কেবল যুক্তি দিয়ে দার্শনিক গবেষণা যেমন অর্থহীন।

তেমনি যুক্তি-প্রমাণ বাদ দিয়ে কেবল স্রষ্টাপ্রেমের আধ্যাত্মিকতাও বিপথগামীতা। এ দর্শনে যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিকে পূর্ণতার প্রথম স্তর হিসেবে ধরা হয়।

অ্যারিস্টটলীয় ধারার দার্শনিকরা মনে করেন নফস বা মন হচ্ছে প্রকৃতিবিদ্যার অংশ। অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দি নফস ভাবনাকে স্রষ্টামুখী ধর্মতত্ত্ব হিসেবে দেখেছেন। বস্তুগত বিশ্ব থেকে দেহ ও মানুষের মুক্তির পথ নিয়ে আলোচনা করেছেন।

সোহরাওয়ার্দি মনে করেন, দর্শন এমন এক প্রাচীন বিষয় যার প্রতিষ্ঠাতা হেরমেস। এরপর পিথাগোরাস, বায়জিদ বোস্তামি, মনসুর হাল্লাজ ও আবুল হাসান খারাকানি এর আধ্যাত্মিক উত্তরসুরি হয়েছেন। তিনি নিজেকে গ্রিক মনীষীদের চেয়ে ইসলামী ও প্রাচীন ইরানি দার্শনিকদের দ্বারা বেশি প্রভাবিত বলে মানতেন।

ডক্টর সাইয়্যেদ হুসাইন নাসর সোহরাওয়ার্দির ফারসি রচনার ভূমিকায় লিখেছেন, ‘সোহরাওয়ার্দি নিজেকে গ্রিক ও ইরানি প্রথার উত্তরসুরি মনে করেন। তার মতে প্লেটো, জরাথ্রুস্ত, প্রাচীন ইরানের দার্শনিকরা এবং সক্রেটিসের আগের গ্রিক দার্শনিকরা মূলত একই আধ্যাত্মিক বাস্তবতা তুলে ধরেছেন।

সোহরাওয়ার্দির মতে, প্রাচীন ইরানি মনীষীরা বিশ্বকে আলো-অন্ধকার এবং আত্মিক পরিশুদ্ধির তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করতেন। আলোর বদলে অস্তিত্বের তত্ত্ব ব্যবহার করে সোহরাওয়ার্দি নিজ দার্শনিক তত্ত্বকে গ্রিসের প্লেটো ও অ্যারিস্টোটলের তত্ত্ব থেকে আলাদা করেছেন। তাতে নব্য-প্লেটোনিক ও ধর্মীয় ব্যাখ্যায় এনেছেন প্রাচ্যের ভাব।

ডক্টর নাসরের মতে, প্রাচীন ইরানি দর্শনের সঙ্গে আধ্যাত্মবাদ ও ইসলামী দর্শনের সংমিশ্রণ সোহরাওয়ার্দির ইশরাকি দর্শনের বৈশিষ্ট্য। বস্তু বা প্রকৃতি বিষয়ে তিনি অ্যারিস্টটলীয় ধারার দার্শনিকদের সাথে একমত হলেও নফস বা প্রবৃত্তির বিষয়ে ভিন্ন মত পোষন করেছেন।

অ্যারিস্টটলীয় ধারার দার্শনিকরা মনে করেন নফস বা মন হচ্ছে প্রকৃতিবিদ্যার অংশ। অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দি নফস ভাবনাকে স্রষ্টামুখী ধর্মতত্ত্ব হিসেবে দেখেছেন। বস্তুগত বিশ্ব থেকে দেহ ও মানুষের মুক্তির পথ নিয়ে আলোচনা করেছেন।

সোহরাওয়ার্দি প্লেটোকে দার্শনিকদের নেতা ও ইশরাকি দার্শনিকদের পুরোধা বলেও মনে করতেন। তার মতে, প্লেটো যুক্তি ও দলিল-প্রমাণকে আধ্যাত্মবাদের রসে ডুবিয়েছেন।

সোহরাওয়ার্দির রচনায় উল্লেখিত উপমা ও রূপক প্রতীকের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়ে এই আলো এবং অন্ধকার। এসব রূপক উপমার কিছু কিছু প্রাচীন ইরান ধর্ম-দর্শন থেকে নেয়া হলেও বেশিকিছু উপমা অ্যারিস্টটলিয় স্বয়ং উদ্ভাবন করেছেন। যা প্রাচীন ধর্ম-দর্শন-সাহিত্যে পাওয়া যায় না।

সোহরাওয়ার্দির মতে, প্রাচ্য আধ্যাত্মের আলোয় আলোকিত। এই আলোর জগতে বস্তুর অস্তিত্ব নেই। অন্যদিকে পাশ্চাত্য অন্ধকারে নিমজ্জিত। সে জগৎ কেবলই বস্তুর জগৎ। বস্তুর বাস্তবতা আলো নির্ভর। বস্তুর গুরুত্বের মাত্রা এক আলোর তীব্রতার মাত্রার ওপর নির্ভর করে।

প্রকৃত আলো সত্তাগতভাবেই উজ্জ্বল। সকল কিছু প্রকাশ হয় তার মধ্যে থাকা আলোর তীব্রতার মাত্রা পরিমাপের মাধ্যমে। আর স্রষ্টার সত্তা হচ্ছে পরিপূর্ণ অস্তিত্ব ও তা পরিপূর্ণ খাঁটি আলো।

কোরানের বাণী থেকে প্রেরণা নিয়ে সোহরাওয়ার্দি স্রষ্টাকে ‘নুরুল আনোয়ার’ অর্থাৎ ‘আলোসমূহের আলো’ বলে অভিহিত করেছেন। আর এই পরম আলোর সঙ্গে মিশতে পারাকেই সাফল্য বলে প্রচার করেছেন তার দর্শনে।

আলো বলতে সোহরাওয়ার্দি বস্তুগত বা এই পার্থিব জগতের আলোকে বোঝাননি। এই আলো বা নুর হচ্ছে আধ্যাত্মিক বা অবস্তুগত আলো। অপার্থিব আলো। যার দর্শন লাভ করে কেবল স্রষ্টাপ্রেমীরাই।

অ্যারিস্টটলীয় দর্শনে বিভিন্ন অস্তিত্বের মধ্যে যৌক্তিক সম্পর্কের যে কথা বলা হয় ইশরাকি দর্শনে সেটাকেই পরাবাস্তব বা অলৌকিক প্রেম হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। নুরুল আনোয়ার বা স্রষ্টার নিজ সত্তার প্রতি যে প্রেম তাই ‘আলো’ ও পরম পরিপূর্ণতা। আর তাই তার সৃষ্টিকুলে ছড়িয়ে পড়েছে।

সোহরাওয়ার্দির রচনায় উল্লেখিত উপমা ও রূপক প্রতীকের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়ে এই আলো এবং অন্ধকার। এসব রূপক উপমার কিছু কিছু প্রাচীন ইরান ধর্ম-দর্শন থেকে নেয়া হলেও বেশিকিছু উপমা অ্যারিস্টটলিয় স্বয়ং উদ্ভাবন করেছেন। যা প্রাচীন ধর্ম-দর্শন-সাহিত্যে পাওয়া যায় না।

(চলবে…)

<<সোহরাওয়ার্দি: জীবন ও কর্ম ।। সোহরাওয়ার্দি: সাহিত্য>>

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

………………………..
আরো পড়ুন:
সোহরাওয়ার্দি: জীবন ও কর্ম
সোহরাওয়ার্দি: ইশরাকি দর্শন
সোহরাওয়ার্দি: সাহিত্য
সোহরাওয়ার্দি: জিব্রাইলের পালকের শব্দ
সোহরাওয়ার্দি: উইপোকার আলাপচারিতা
সোহরাওয়ার্দি: প্রেমের বাস্তবতা
সোহরাওয়ার্দি: লাল বুদ্ধিবৃত্তি
সোহরাওয়ার্দি: সী-মোরগের দূত

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!